পর্যটকের ডায়রি

বিধান সাহা




০১.

পেছনে, রাইট সাইডে বসিয়ে গত হয়ে যাওয়া সুপারমুন দেখাতে দেখাতে ছুটে চলছে আট সদস্যের নোয়া গাড়িটি। ক্যাসেটে ‘জিয়া বেখারার হে...’ বেজে চলছে। তার সাথে কণ্ঠ মেলাচ্ছে সিফাত অথবা একই সময়ে ভ্রমণরত সকল সৌখিন পর্যটক। লেগুনায় ঝুলে ঝুলে ঘরে ফিরছে কতিপয় গৃহস্বামী। হেড-লাইটের আলোয় পাশ কাটাতে কাটাতে এইটুকুই দেখা গেল মাত্র। কিন্তু বোঝা গেল আরও বেশি। ফরিদ ভাই, অনুপ’দা কিংবা জানে আলম ভাই অথবা এরা কেউই নয় এই মুহূর্তে ছুটন্ত গাড়ীতে কথামুখর অথবা নিদ্রামগ্ন হয়ে আছে জগতের সকল ভ্রামণিক। নরসিংদীর ভেলানগর বাজারের মতোই কোন বাজারে নেমে হয়তো তারা হালকা নাস্তাও সেরে নিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। গাড়ী ছুটে চলছে, ছুটে চলছে- একটা চাঁদ শুধু মুখোমুখি তাকিয়ে বহু বহু পুরনো স্মৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এইমাত্র ভৈরব ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে একটা সেলফি তুললো একজন। সে হয়তো আমি অথবা আমার মতোই কেউ।

প্রকৃতি ভ্রমণের ভেতর দিয়ে মানুষ মূলত তার আত্মপ্রকৃতির ভেতর দিয়েই ভ্রমণ করে থাকে।

০২.

সিলেটের রাতারগুল আমার যাওয়া হয়নি কখনো। লাউয়াছড়াও। একবার মাধবকুণ্ড যাবো যাবো করেও হয়ে ওঠে নি। ষাট কিলোমিটার পার হয়ে এসে একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বলল— পেছন দিকে অন্তত ষাট কলোমিটার যেতে হবে আপনাদের। পথটা অনেক পেছনে ফেলে এসেছেন। ‘বিল্পবীরা পেছনে তাকায় না’ এই বিশ্বাসে আমাদের আর মাধবকুণ্ড যাওয়া হয় নাই। মানে যাই নাই। সেবারও সেপ্টেম্বর ছিলো। ১৪ তারিখ। আর এবার ১২ তারিখ। মানে ১১ তারিখ রাতে রওনা। আবারও সেই টিম পরিযায়ীর সাথে। মানে কলিগদের সাথে। সেবার হযরত শাহজালালের মাজারে সিলেটের বন্ধু কবি বেলাল আহমেদ দেখা করতে এসেছিলো। এসেছিলো কবি আজিম হিয়া। তার সাথে আরো একজন নাম ভুলে যাওয়া গবেষক বন্ধু। যিনি তখন কোন একজন বাউলের জীবনী নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এবারও কবি বন্ধু বেলাল আহমেদ অনবরত রাতারগুল সহ বিভিন্ন রাস্তার লোকেশন বলে দিচ্ছেন। আরেক কবি বন্ধু অপূর্ব সোহাগ জানাচ্ছেন কোথায় থাকলে আমাদের বাঁধনহারা ট্যুরিস্ট-জীবন নিরাপদ ও আনন্দমুখর হবে। কিংবা শ্রীমঙ্গলের কোথায় কোথায় দর্শনীয় কী কী দেখার আছে সেসব। আর কবি জাহেদ আহমেদ, যাকে আহ্লাদ করে ওস্তাদ ডাকি, শুরু থেকেই এসব বিষয়ে কি কি করা যায়, কোথায় থাকলে ভালো হবে, ইত্যকার বিষয় নিয়ে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। এঁদের আমি কৃতজ্ঞতা জানাবো না। কৃতজ্ঞতা জানালে ঋণ হালকা হয়ে যায়। তাদের কাছে আমার এ ঋণ থাক। পর জনমে না হয় শোধ করা যাবে।

গতকাল রাতে শুয়ে শুয়ে গতবারের স্মৃতিগুলো অটো-রিপিট করে দেখছিলাম। আখাউড়া ফিলিং স্টেশনে তেল নেয়া, সেই সাথে ‘গাড়-সম্পর্কের’ কলিগদের মধ্যে ঠাট্টা, ইয়ার্কি—চা-আড্ডা— কোন এক রাস্তার মাঝখানে ট্রেন যাবার কারণে লেট হওয়ায় জলবিসর্জন— জাফলং-এ জলজ উল্লাস— খাসিয়া পল্লী—শ্রীমঙ্গলে নীলকণ্ঠের সাত-লেয়ারের চা.... আরো যে যে ঘটনাগুলো ভুলে যাচ্ছি বারে বারে, পরে একসময় রিপিট করে আবারও স্মরণ করে নিয়েছিলাম।

কিন্তু এবার কী কী হবে? ভাবতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলছি সব কিছু। গাড়িতে গান হবে? ভৈরব ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আবারও ছবি তোলা হবে? আর সেই ছবিতে ধরা পড়ে যাবে নিলয়’দার চুরি করে গোপন ম্যাসেজ পাঠ করার এক দূর্লভ ছবি? এবারও কি শ্রীমঙ্গল যাবার পথে কোন এক ‘শাপলা চত্বরে’ ঢুকে যাবো আমরা? এবার কি বিপ্লব’দার কণ্ঠে আবৃত্তি হবে? আহা, সেবারের ‘সুপ্যারম্যান’ খ্যাত আরাফাত ভাইকে পাওয়া যাবে না এবার। পাওয়া যাবে না রাজু’দাকেও। এদের মিস করবো খুব। খুবই মিস করবো আমি।

গত পরশু সুপারমুন চলে গেলেও আকাশে এখনো বড় একফালি চাঁদ ওঠে। চা-বাগানের মাঝে বসে ‘জলের গান’র সাথে আবৃত্তি, তৎসঙ্গে এমন উদাস প্রান্তরে বসে যদি কারো পুরোন প্রেমের কথা মনে পড়ে যায়—বিরহ চাগাল দিয়ে ওঠে— যদি রাতারগুলের জলে নেমে সকলে শিশুদের মতো জলপোকা হয়ে ওঠে— তবে নিশ্চিত জানি, আরো এক নুতন অভিযাত্রার দিকে পুনরায় তাকিয়ে থাকা যাবে আরেকটি আনন্দস্মৃতি নিয়ে।

চলো, রাখি মনে মধুভাণ্ড—উড়াই জীবন।

০৩.

জান্নাত। শুধু এইটুকু মনে আছে। বাঞ্ছারামপুর ঘাট থেকে যখন লঞ্চে উঠি তখনও আমার ভাবনা বা মনোযোগ ফরিদ ভাইয়ের সস্তায় কেনা মেঘনার টাটকা মাছগুলো নিয়ে। ঢাকা শহরে এই মাছের দাম কত হতো— অসচেতনভাবে এসব ভেবে যাচ্ছিলাম হয়তো। ওরা তিনজন— ওর মা আর ছোট বোনসহ আমাদের মুখোমুখি বসলো এসে। যেন জীবনানন্দের মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন। কথার কোন্ খণ্ডিত অংশ টেনে নিয়ে কথা শুরু হয়েছিলো মনে নেই। প্রথম কে শুরু করেছিলো, তাও মনে নেই। ভ্রু-পল্লবে ডাক না দিলেও মনে আছে, সেই অল্প সময়ে আমরা নিজেদের টপকে গিয়ে গোল হয়ে বসেছিলাম চন্দনের বনে।

মেঘনার অথৈ জলে ভেসে যাচ্ছে ইঞ্জিনচালিত নৌকাটা। আমিও কি থৈ হারাচ্ছিলাম কোথাও? মুখোমুখি বসা 'বনলতার' সামনে আমাকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করার জন্য প্রসংশার স্রোত বইয়ে দিচ্ছিলেন ফরিদ ভাই। তাঁর নাকেও কি সেই চন্দনের ঘ্রাণ এসে লেগেছিলো? টের পেয়েছিলেন— মেঘনার এইখানে একটা গভীর খাদ রচিত হচ্ছে কালে কালে ভরাট হবার বাসনায়?

লঞ্চ পৌঁছে যাচ্ছে নরসিংদী ঘাটে। বুঝতে পারছি সময় শেষ। একটু পরেই চিরকালের মতো ছেদ। কে যে কোথায় হারাবে কে জানে! মেঘনার নিজস্ব বেদনার সাথে এই বেদনাটুকুও যুক্ত হয়ে রবে চিরকাল। একা বা সঙ্গীসহ ফরিদ ভাই ফের কোনদিন মেঘনায় নিজেকে ভাসালে আমার এই বেদনাটুকু তাকেও স্পর্শ করবে নিশ্চয়ই। প্লাবিত জলের বৃত্তে পাক খাবে অন্তহীন স্মৃতির বাড়াবাড়ি।

হ্যাঁ রে মেঘনা, জান্নাতবাস চিরকাল হয় কি কখনও?

০৪.

জীবন একটা বিস্তৃত চা-বাগান। উত্থান ও পতন আশ্রিত। সবুজ। রোদ ও ছায়া মুখরিত।

প্রতিটি চা-বাগানের পথ চিরকাল পরনারীর মতো কৌতুহলোদ্দীপক ও রহস্যময়।



০৫.

পাহাড়েরও মন আছে ভীষণতর কান্না আছে মন খারাপ হলে পাহাড়ও কুয়াশায় নিজেকে লুকায়।

আর তার গোপন কান্নাজলে আমরা কতিপয় উল্লাস করে ফিরি।

০৬.

চিরকাল মৌন হবার দীক্ষা দেয় সে। অনর্থক দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা নেই তার, চেষ্টা নেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণেরও।

আহা পাহাড়! পাহাড়ের কাছে গেলে নিজের তুচ্ছতা আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

০৭.

আমি পাহাড় ডিঙাতে পারি না, মেঘ! কেবল গড়িয়ে পড়ি নিজেরই পায়ের কাছে। এখনো হলো না কিছুই। শুধু শুধু এই দীর্ঘ, দীর্ঘ চেয়ে থাকা!