আমার পাহাড়, রক্তকরবী ও কুয়াশার ভেতরের সিঁড়িগুলি

বিশ্বদীপ দে



মানুষের শরীরেই সব আছে।
সেখানে সমুদ্রের নোনা হাওয়ার বিষাদ আছে। আছে জঙ্গলের আদিম রোমাঞ্চ। নদীর পলির মধ্যে মিশে থেকে বহতা জীবনের এলোমেলো বয়ে চলাও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কিংবা মরুঝড়ে এলোমেলো বালিকণার দাপাদাপি। ব্যস্ত শহর যেমন আছে, তেমনই রয়েছে ঝিম ধরা শহরতলির একলা দুপুর। হ্যাঁ, খুঁজে নিতে হবে কেবল। অবশ্য এক জীবনে তার কতটুকুরই বা খোঁজ মেলে?
শরীর থেকে শরীরে, জীবন থেকে জীবনে পালটে পালটে যায় চেহারাগুলো। তোমার সমুদ্র আর আমার সমুদ্র এক নয় মোটেই। তোমার শরীরে যে একলা নদী, তার ঢেউ আমি চিনি না। আমার নদীর মধ্যে বয়ে চলা স্মৃতির পলি, সেও তো তোমার অজানা। প্রতিটি মানুষের শরীরে তাই আশ্চর্য নতুন নতুন সব ট্যুরিস্ট স্পটের খোঁজ মেলে। খোঁজ মেলে সমুদ্র, অরণ্য, মরুভূমির। আর হ্যাঁ… পাহাড়েরও।

কথা বলতে বসেছি পাহাড়ের। কিন্তু আমার পাহাড় তোমার সঙ্গে মিলবে না। তোমার কাছে পাহাড় আসলে একটা লক্ষ্য। একটা টার্গেট। কিংবা হতে পারে পাহাড় আসলে তোমার কাছে ভার্জিনিটি। এক না এক সময় তার দুর্লঙ্ঘ্য অস্পর্শ চূড়োতেও উড়তে থাকবে পতাকা। কিংবা… কিংবা আরও অনেক কিছু। সে সব না হয় তুমি-ই বোলো। আমি আমার কথা বলি। তোমার শরীরের অভিযানের পথে না হয় অন্যদিন যাব। অন্য কোনও দিন।
আমার কাছে পাহাড় আসলে আড়াল। রক্তকরবীর রাজা। সেও তো ছিল আড়ালেই। বলেছিল, ‘আমি পর্বতের চূড়ার মতো, শূন্যতাই আমার শোভা।’ বলেছিল, ‘একদিন দূরদেশে আমারই মতো একটা ক্লান্ত পাহাড় দেখেছিলুম। বাইরে থেকে বুঝতেইপারিনি তার সমস্ত পাথর ভিতরে ভিতরে ব্যথিয়ে উঠেছে। একদিন গভীর রাতে ভীষণশব্দ শুনলুম… সকালে দেখি পাহাড়টা ভূমিকম্পের টানে মাটির নীচে তলিয়ে গেছে। শক্তির ভারনিজের অগোচরে কেমন করে নিজেকে পিষে ফেলে, সেই পাহাড়টাকে দেখে তাইবুঝেছিলুম।’ জালের আড়ালে থাকা রাজা ছিল আসলে একটা পাহাড়েরই আড়ালে। তবে সে পাহাড় আলাদা পাহাড়। সেখানে একাকীত্ব হয়তো আছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি আছে আস্ফালন।

কিন্তু আমরা তো রাজা নই। আমাদের আড়াল তাই অন্যরকম। নিভৃতে, নিজের ভিতর উবু হয়ে বসে থাকি আমরা। সমস্ত যন্ত্রণা, সব আনমনা আঁকিবুকি সযত্নে রেখে দিই সেই আড়ালে। আমাদের গোপন গভীরে এক পাহাড় জেগে থাকে।
যে পাহাড়ের আড়ালে বসে মানুষ ভানহীন হয়েযায়। কিন্তু কোথায় তেমন পাহাড়? যতই একলা হবে, ততই স্মৃতির ভেতর, ক্ষতের ভেতর নেমে আসতে থাকবেশুকনো পাতারা। পাহাড় তাই থেকে যাবে অধরা। আর তুমি কেবল সন্ধানে থাকবে।

আড়াল পেলে লাজুক মেয়েটি কত কথা বলে ফেলে। কিংবা অন্তর্মুখী যুবকটিও। আন্তর্জাল নামের এক পাহাড়ের আড়ালে চলে গিয়ে। সেখানে তাদেরশুধুই ছবি হয়ে থাকতে দেখা যায়। অক্ষরে অক্ষরে জেগে থাকে কেবল কথারা। ছায়ার ভেতর তাদের সংলাপ জেগে থাকে। আর বাকিটা জুড়ে থাকে মস্ত আড়াল। পাহাড়ের আড়াল।
আস্তে আস্তে গোটা পৃথিবীটাই যেন আড়ালে চলে যাচ্ছে। ‘মুখোমুখি বসিবার’ জন্যে ‘থাকে শুধু অন্ধকার।’ অন্ধকারের পাহাড়। পরস্পরের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে আমরা রচনা করেছি এক অমোঘ আড়াল। রক্তমাংসের কথা ফুরিয়ে গেছে। এখন কথা খালি ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থেকে। ছায়ার আড়ালেই সত্য লুকিয়ে থাকে।
যেমন কবিতার ছায়া। কবিতার আড়াল। আড়ালের ভেতরে ইশারা লুকিয়ে রাখেন কবি। তিনিও তো ‘নিজের মুদ্রাদোষে’ একলা। চারপাশে হইহই চললেও সেই নিস্তব্ধতা কাটে না। শুধু এক আশ্চর্য কুয়াশার ভিতর উঁচুতে উঠে যেতে থাকে স্বপ্নের সিঁড়িগুলো। দুপাশে তার গাঢ় খাদ। সিঁড়ির মাথায় কবি ঝুলিয়ে রাখেন কলমের মুকুট। যা আসলে পাহাড়েরই চুড়ো।

কবি তো দ্রষ্টা। তাঁর আড়াল তো তাঁর মগ্নতার, তাঁর সাধনার আবাদভূমি। কিন্তু আমরা তো রাজাও নই। কবিও না। তবু সমস্ত অপমানের থেকে শেষমেশ আড়াল চেয়ে থাকি আমরা। এমন আড়াল যা রক্তমাংস হোক বা ছায়া, কিচ্ছুটি বাকি রাখবে না। সবটুকু ঢেকে ফেলবে। সেই নিরাপদ নিশ্চিন্ত পাহাড়ের চওড়া ছায়ার ভেতর বসে আমরা বিশ্রামের স্বপ্ন দেখি।
এসো, সেই পাহাড়, সেই অতিকায় আড়ালের ভেতর চলে যেতে হবে আমাদের। আবার নতুন করে রোদের অতিবেগুনি তেজ লাফিয়ে নামার আগে, নিজেই নিজের ভেতরে তলিয়ে যেতে থাকি আমরা। নিজের আড়ালের চেয়ে বড় কোনও পাহাড় আছে কি কোথাও?চোখের পাতায় ভারী হয়ে নেমে আসতেথাকে আস্ত পাহাড়ের দেশ।
ঘুমযে একটা পাহাড়েরই নাম, মনে নেই তোমার!