মুক্তগদ্য: চিন্ময় দুঃখের গান

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য



সংগীত, পাহাড় আর জীবন প্রকৃতঅর্থে একই রাশির জাতক। তারা আরোহণ আর অবরোহণের নিরন্তর এই পরিভ্রমণ জেগে থাকে জন্মাবধি।

পাহাড়ের সিঁড়ি উঠে গেছে আকাশে। আরপরে নেমে গেছে পাতালে। পাহাড়ের সিঁড়ি নিয়ে যাবে পোড়োবাড়ি তলে। পাহাড়ের সিঁড়ি নামিয়ে দেবে রাতুল পাতালে। ছয়দেয়ালের মধ্যে ধোঁয়ার পাহাড় জেগে আছে। জেগে আছে বিনম্র বিস্ময়ে একাকার। একফালি আয়নায় দৃশ্যমান ঘরের বৈভব। যেদিকে নদীপথ দূর গহ্বরের খোঁজে। দুর্নিবার অমাকাল যাচ্ছে চলে প্রাকৃত আলোয়। আলোর নাম রংহীন ঘুমের মুগ্ধতা। চিরচেনা অসুখের দেশ ভিন্ন করে আমাদের পাতাতৃণ। ভিন্ন করে সকরুণ গাছ সকল। একটি শব্দ নিভে গিয়ে পুনর্বার জ্বলে উঠে। তার অর্থ ধারণ করে মুহূর্তের যাকিছু আয়তন। ঘরের বিস্ময় কেটে যাবে। একদিন ধোঁয়াপাহাড় ঝড়ের গন্ধ হবে।

কারো খুব অসুখ বলে সে এখন পাহাড় দেখে ছুটে যায় না। তার নাম সমাপ্তি হতেও পারে। সে এখন পাহাড় দেখে ভয় পায়। তার নিজের মধ্যে পাহাড়ের চিহ্ন। তার চোখে মোটাকাচের চশমা। সে বৃষ্টি ডাকে না চুলে। সে পটমঞ্জরী তুলে না সেতারে। সে ঝিমধরা চোখে তাকিয়ে থাকে। তাকে সবাই চেনে, তাকে আর কেউ চিনবে না। কোনোদিন ভোরে কেউ সপ্তক ছিঁড়ে ফেলে। নামতে চায় জলে। তার খাতাগুলি জলে ভেসে ভেসে ডুবে গিয়েছিলো। শাদাশাড়িতে তার আকাশ আঁকতে মানা। সপ্তক ও সমাপ্তির কাছে মৃত্যু যায় না জানা। খাতাগুলি ডুবে গিয়েছিলো সকলে অক্ষরের ভারে। অক্ষরগুলি কীভাবে শব্দকে করেছিলো ধারণ অন্ধকারে। সপ্তক ও খাতাসব ছিলো কোনোদিন।

কোথাও পাহাড় আছে ঝড়ে আর ঝড়ে একাকার। মাঝখানে উপত্যকার মায়া টেনে নিয়ে যেতে চায় দিগন্তের কাছে। পাহাড়ে ওঠতে ওঠতে একজন মানুষ কতোবছর বাঁচে? সিসিফাস ওঠতো পাহাড়ে। সে ওঠতো গোলাকার এক পাথর ঠেলে ঠেলে। সেই পাথর গড়িয়ে পড়তো, আবার ঠেলে ঠেলে ওঠাতো। সিসিফাস নতজানু না হয়ে এই শাস্তি মেনে নিয়েছিলো। এটা তার হিরণ্ময় অহম। আমি, তুমি আর সে তার চিন্ময় দুঃখের সন্তান। আমরাও পাথর ঠেলে ঠেলে পাহাড়ে উঠি, পাথরের সঙ্গে পুনর্বার গড়িয়ে পড়ি। এইসব সংগঠন শিখে ফুরিয়ে যাই না, বেঁচে থাকি; জীবনযাপন করি।

আমার আর ঘোর ভাঙে না। যারা পাহাড়ে আগুন ধরায়, যারা ঘোর পূর্ণিমায় আজলা ভরে নদী এনে ভিজিয়ে রাখে উঠান আর বারান্দার কারুকাজ, যারা দুরন্ত ঝড়ে বনে বনে ঘুরে ঘুরে জ্বালায় চোখের বৃন্ত, যারা গাছ আর আগাছার নিবিড় রাখীবন্ধন-- আমি তাদেরই একজন। আমাকে যদি চিনতে না পারো তবে ফিরে যাও অলিখিত গুহার ভিতর। ওখানে সূর্য গিয়ে তোমাকে ডেকে নেবে একদিন ভোরের বেলা। ভোরের অবসান হয়, অন্ধকার পুড়ে ছাই হলে আমরা প্রত্যেকে সিসিফাসের নিয়তি মেনে নিই দুইহাতে। মা আমার চিরদিন জননী ধরিত্রী হয়ে উদাস চোখে আমাদের আরোহণ আর অবরোহণ দেখে। আর স্মৃতিমগ্ন চোখে হাসে। মায়ের হাসিতে ম্লান হয়ে যায় উদ্ধত সূর্যের দিন।