একলা অথবা হাতে হাত রেখেছে যারা

বিদ্যুৎলেখা ঘোষ


ভাঁজ
যে টেলিফোনটা আসার কথা ছিলো, আসার কথা ছিল পরবর্তী ঝুমবৃষ্টিপাতের; অনেকবারই দেখা যায় তা হয়তো আসে না। উঠে আসে কেবল সদ্য জেগে ওঠা স্থলভাগের মতো কিছু প্রশ্ন। হয়তো থেকেও যায় কিছু নিরুত্তর। তবু সোনালী আসে পুবে অবিরাম। তাই বোধহয় বারীন দা’র ‘পুব আর ফুরোয় না’। বারীন দা বলে ছিলো ‘ চলো পুবে যাই’। তখন রাজ্যবাজেট পেশ চলছে। অ্যানড্রয়েড এর দাম কমেছে। দামী সিগারেটকে পিছনে ফেলে ফিনিশ রিবন ছুঁতে যাচ্ছে ভোজ্যদ্রব্য।
আমি গিয়েছিলাম দক্ষিনে। সহযাত্রিণী মালদার রেণুকা মাসীমার ও ছিলো অনেক প্রশ্ন। লোয়ার বার্থে পা ছড়িয়ে বসে বাইরে উদাস দৃষ্টি মেলে জিগেস করে যাচ্ছিলেন একের পর এক। জলের উপর এক একটা টুপ, তারপর মুকুট, তারপর তরঙ্গ। আমার কোলের উপর রাখা বইয়ের মলাট থেকে বৃদ্ধ স্মিত হেসে ফিসফিস করে বলছে ‘ শুনতে পাচ্ছো টুং টাং ! উত্তর দিতে না পারলে ওই মুকুট তোমাকে ভিজিয়ে দিয়ে বলবে ‘এ বাবা হেরো, তুমি হেরো’। ওই তরঙ্গের প্রতি ভাঁজে বিচিত্র সুর, কোনোটা সিনক্লাইন কোনটা অ্যান্টিক্লাইন... শুনতে পাচ্ছো তুমি...! মাসীমার শরীরটা কুঁকড়ে উঠছে যন্ত্রণায়। যেমন দুমড়ে মুচড়ে ওঠে মাটি ভূমিকম্পে।
কত্তগুলো টাকা ধার নিয়েছিল সোনার দোকানের লোকটা তার স্বামীর কাছ থেকে। ফেরত চাইতে গেলে অ্যাসিড ছুঁড়ে চোখ নষ্ট করে দিলো অকৃতজ্ঞ। সংসারের সমস্ত জোয়াল টানতে টানতে মাসীমা এখন অষ্টিও আর্থারাইটিসের রুগী। কী দোষ ছিল তার? উপকার করলে নাকি এইভাবে গুনগার দিতে হয় বাকি জীবনটা? আবার চুপি চুপি শুনছি ‘ মহাদেশীয় পাত এইসব প্রশ্নে প্রশ্নে যুদ্ধ চলছে নিয়ত। প্রত্যেকের স্বপক্ষে কত সেনা ! বিপুল পরাক্রমে লড়ছে পরস্পরের সাথে। শুনতে পাচ্ছো কলরব ! যুদ্ধ করতে করতে ওরা প্রবীণ অথচ বেড়ে উঠছে কেমন দেখো ! ওরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে নবীন যোদ্ধারা যেমন যুদ্ধ চালিয়ে যায়...’
ওঠা-পড়া
আলুর বন্ড কিনে রেখেছিলো যারা, এবার বাজারে ছাড়ছে ভালো দাম পাবে বলে। রোজ সন্ধ্যেয় রয়্যালস্ট্যাগ পাব্বন অব্যাহত রাখছে কিছু মধ্যসত্ত্বভোগী। ধর্ষিত সেই যে মেয়েটা সেজাট, ওর অসুখটা শেষ মাত্রায় চলে গেছে। লড়াই করবার ক্ষমতা ফুরিয়ে আসছে ক্রমশ। পার পেয়ে যাবে ধর্ষক। শাসনযন্ত্রের চোখের উপর ঠুলিটা আরও কষে শক্ত করে এঁটে বেঁধে দিচ্ছে প্রশাসন। মদালসা রাত্রি উপহার দিতে হচ্ছে মেয়ে পুলিশকেও। অটো ইউনিয়নের লিডার খাচ্ছে। লিকার খাচ্ছে নেতা।খেতে খেতে জেরবার হয়ে বিনা রোগে হাসপাতালে হুইলচেয়ারে জাঁকিয়ে বসে আছে ব্রীড়াবনত। কে কত বেশী খাচ্ছে জানার প্রয়োজন আজ আর নেই কোনো সু-মনের। চুনোচানা চ্যানেল মালিক নাকে নল গুঁজে হেদিয়ে মরছে।
পন্ডিচেরীতে যখন পৌঁছলাম তখন রাত ১০টা বেজে গেছে। বেশ ভারি ভারি গয়না পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে মহিলারা। কোন লোলুপ হায়না ছুটে আসে তাদের গন্ধে, এ খবর পাইনি বড় একটা। চায়ের দোকান এখানে সকাল আর সন্ধ্যেবেলা ছাড়া অন্যসময় খোলা থাকেনা। রাস্তায় নেশা করতে দেখা গেলে জেল জরিমানা হয়। এ যেন অন্য বিষুব অঞ্চল, যেখানকার মানুষেরা কোনও জাদুবলে যেন পাপভরশূন্য হয়ে মাটি থেকে উপরে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে।
ঋষি অরবিন্দ ও মাদারের সমাধির কাছে গিয়ে বসে চোখ বন্ধ করতেই ফিসফিসে বৃদ্ধ বলতে শুরু করলো ‘ প্রশ্ন ওঠেনা তোমাদের মনে তোমাদের কাছের মানুষ কেন এত দূরে চলে এলো? যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে সত্যি কী মানুষটা পালিয়ে এসেছিলো! ওদের সমাধি ভূমিতল থেকে উত্থিত করে রেখেছে কোন সে অসামান্যতা! জেনে নিয়েছো, কতটা সময়ের তানাবানা অগ্রাহ্য করে এইখানে এই ক্রিস্টালাইন পাতে কেমন করে জমে উঠেছে নিরন্তর বিস্তৃত আশিয়ানা...’
তুবড়ি
বসন্ত ফিরে গেছে। ঘন পাতার ফাঁকে লাল হলুদ কিংবা বেগুনি পাপড়ির ভিতর ছোট্ট কন্ট্রাস্ট কোনো বিন্দু এঁকে রাখেনি বুঝি কেউ। ধুলো পড়া ঘরদোর ধুয়ে মুছে রাখার ইচ্ছেও হয়নি কারো। কোনও অনীহা হয়তো ছিল না। আর্ত অপেক্ষমান সজীবতা না পেয়েই বোধহয় ফিরে গেছে সে। সেজাটের মৃত্যুর কারণ শুধুমাত্র অসুখ কি না তাও স্পষ্ট নয়। এমন কোনও রুপোলী আলো ভাসা রাত আসেনি একান্ত তার জন্য যখন মুহূর্তে এই পাটোয়ারী পৃথিবীটা হয়ে উঠতে পারতো ভরপুর মিস্টিক এক প্যান্ডোরা। ওর না বলা অনুভূতিরা যত উন্মুখ হয়েছিল আগুনের ফোয়ারার মতো বেরিয়ে আসতে না পেরে তারাও চিরঘুমের দেশেই ফিরে গেল ওর দোসর হয়ে।
কন্যাকুমারীর থেকে কোভালাম যাওয়ার পথে জনবিরল এক জায়গায় চোখে পড়ল জয়ললিতার ছবির নীচে লেখা One Man Army লেখা পোস্টার। পাশের ফলের দোকানটায় প্রচুর ডাব আর পুরুষ্টু কলার কাঁদি ঝোলানো ছিল। ওরা কলার কাঁদি উল্টো অর্থাৎ মোটা ডাঁটিটা নীচের দিকে করে ঝুলিয়ে রাখে। এতো তামাটে রঙের কলা এখানেই দেখলাম।
সঙ্গে বই নেই তাই বোধহয় মলাটের বৃদ্ধের ফিসফিসানি আর শুনতে পাচ্ছিনা। কিন্তু লংড্রাইভে ফেরার পথে বেশ বুঝতে পারছিলাম, শুধু যাওয়া-আসা, ‘খাওয়ার পরে রাঁধা আবার রাঁধার পরে খাওয়া’, দিন-রাত, সুখ-দুঃখ, দারিদ্র্য-সম্পন্নতা, হয়ে ওঠা-না হতে পারা এইসব এক অথবা শূন্য এই বাইনারি চাকায় সঞ্চিত হয় যত ইচ্ছের ছাই, স্বপ্ন পোড়া ধোঁয়া, লকলকে আগুন হতে চাওয়া অশ্রুর হিসেব নিকেশ। হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম বর্তমান দুর্নীতিগ্রস্থ সরকার ও চায় না জনগন। এবার শুনতে পেলাম ফিসফিসানি, ‘হরেকরকমবাজিওবারুদের কারখানা খুলবে এখানে? তুমি তো বেকার...’।
অন্তরে অন্দরে
শুভঙ্করের ফাঁকি শেষমেশ আঁতের সত্যিটাকে টেনে বের করে ফেলে সবার সামনে। 95 এর The Englishman Who Went Up a Hill But Came Down a Mountain ছবিতে কার্টোগ্রাফার বা ম্যাপমেকার নায়ক ছোকরা ঠিক ধরে ফেলেছিল 1917 সালে সরকার সেই স্থানীয় অঞ্চলের একমাত্র পর্বতের উচ্চতা মাপতে পাঠালে , যে তা পর্বত নয় পাহাড়। কিন্তু গ্রামবাসী এই মানহানি মানবে কী করে। অবশেষে প্রচুর পাথর আর জঞ্জাল পাহাড়ের উপর টেনে নিয়ে গিয়ে জমা করে পর্বতের তকমা বজায় রেখেছিল।মনে পড়ে ‘ কাঞ্চনজঙ্ঘা ’ সিনেমার লাল লাল গালের সেই লামা বাচ্চাটাকে ? ওর গলায় পাহাড়ি গানেও মাখানো ছিল অনেকটা কোমলনিষাদ।
সদা ওঙ্কারধ্বনিত বিবেকানন্দ রকে ধ্যানমন্দিরে অনুভূত হল তেত্রিশ হাজার আটশো আঠাশ বর্গমাইল আমাদের বসত জমিন আসলে একটা গ্রস্ত উপত্যকা। ধরা পড়ে গেল মলাটের বৃদ্ধের চারটে মাথা, আমাকে ভেঙেচুরে বিনির্মাণে মেতেছে। ওর ফিসফিস করে ভৈরবমন্ত্রনা ‘ হরেকরকমবা...’ কথার মানে আসলে Ring of Fire ।
রক থেকে দেখা ভোরের সূর্যের দিকে চোখ রাখলে মনে হল ও আসলে বারীন দা’র ‘পুব’এর প্রাত্যহিক সোনালী। সাত রঙের ‘প্রতি’ রঙে রাঙিয়ে দিতে দিতে বারীন দা’কে বানিয়ে দিয়েছে চীনের সুনান ও সংলগ্ন শহরের সেই রামধনু পাহাড়। যার গায়ে সময়ের অ্যাসিড রেন, প্রতিকূলতার হিমবাহ, খরদিনের উত্তাপ ক্ষয় করতে করতে নানা আকারের বিশিষ্ট ল্যান্ডক্রপ তৈরি করে দিয়েছে। ওই ‘প্রতি’ আকার যেন জীবন্ত আর যেন মেঘ সরিয়ে নীল শামিয়ানা দেখছে বেপরোয়া। ধরা পড়ে গেলো শুভঙ্করের এই ফাঁকিও যে আমাদের গ্রস্ত উপত্যকাকে উত্থিত করে তুলতে প্রয়োজন ওরকম হাতে হাত ধরে রাখা ‘প্রতি’মানবীয় ল্যান্ডক্রপ। এবার তাই ‘পুবে’ যাবো।