চন্দ্রঘোনা

অপরাহ্ণ সুসমিতো



বারঘোনা বাজারটায় যেতে হয় বারঘোনা পাহাড়টাকে পাশ কাটিয়ে । অনেক ভাবে যাওয়া যায় তবে গম ভাঙ্গানোর মেশিনটা পেরিয়ে যেতে সুবিধা । গম ভাঙ্গানোর মেশিনটা পেরিয়ে যাবার সময় গরম আটার একটা তামাটে পোড়া গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায় । লোকটা তখন ঝুপড়ির বাইরে এসে বসে । গরমের তেতো একটা রোদ উড়ে বেড়ায় । কখনো আচমকা কর্ণফুলী রেয়ন মিলের বিটকেলে গন্ধ । কর্ণফুলী নদীটার পাশ ঘেঁষেই সবুজ পাহাড়ের রহস্য । সারাক্ষণ আবছায়া একটা কুয়াশা ভেসে থাকে পাহাড়ের শানুতলে ।


লুঙ্গিটা হাঁটু পর্যন্ত তুলে লোকটা ফস করে বিড়ি ধরায় । প্রথম বস্তা গম উপুড় করে মেশিনের ইয়াব্বড় মুখে ছাড়া হয়েছে । পিচ্চি সহকারীটা সময় হলেই ডাক দেবে;

: ওস্তাদ ।

হাতে অনেক সময় আছে । এই সুযোগেই বিড়ি ধরানোর মওকা পাওয়া গেছে । গায়ের গেঞ্জীটা ঘামে গায়ে লেগে চিমসে রোদ্দুরে হয়ে আছে । বিড়ি দুই টান কষে টেনে দেবার পরই লোকটা ডাক দেয় কলের শব্দ ছাপিয়ে –


: এই যা তো,একখান মুরগীর পাখনা নিয়া আয় ।


লোকটা মুরগীর পাখা দিয়ে চোখ বুজে আরামে কান চুলকাবে । ঝিম ঝিমানো সুখে দূরের পাহড়ের দিকে তাকিয়ে উদাস হবে । মনে মনে ভাববে এরকম একটা পাহাড়ের মালিক যদি হওয়া যেত । বিনা পয়সার সুখ । ১২ নম্বর লাইনের ঢোকার মুখেই অনেকগুলো বিশাল আম গাছ,একটা রেইনট্রি গাছও আছে বড় ড্রেনটার এপাশে । এতো বড় বড় গাছের কারনে রোদ এসে জমিনে না পড়ার কারনে প্রখর রোদেও জায়গাটায় এ সময়ে ডাবের পানির মতো আরাম ।


লোকটার ছোট ভাই চৌদ্দগ্রামে রিক্সা চালাতো কিছুদিন আগ পর্যন্ত । আরেক রিক্সাওয়ালার বউয়ের সাথে খানিক ইচিকদানা বিচিকদানা হওয়ার সাথে সাথে ধরা পড়ে যায় । তখন বিচার,সালিশ কতো কিছু । ছোট ভাইটা ভয়ে চৌদ্দগ্রাম ছাড়া । ভাড়া রিক্সাটা কোনো রকম জমা দিয়ে পালিয়ে এসে শেষে এই পার্বত্য চন্দ্রঘোনা এসে হাজির,বড় ভাইছা’র (বড় ভাই) কাছে ।


বড় ভাই এই গম ভাঙ্গার মেশিনে কাজ করে । কাজটা টেমপোরারী । পেপার মিলে এরকম টেমপোরারী শ্রমিক অগণিত । ইউনিয়ন নেতা কালাম গ্রুপ করে । গ্রুপ না করলে নাকি শ্রমিক হিসেবে টেকা যাবে না । লোকটার মাথায় এতো সব গ্রুপিং ট্রুপিং ঢোকে না । কালাম সাহেবের লাঠিয়াল পিলু ওকে এই গমের মেশিনে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে । মন্দ না । শুধু মিছিলের টাইম এলেই লোকটা ভড়কে যায় ।



তো ছোট ভাই ঘাড়ের উপর এসে পড়াতে লোকটার বউ প্রথমে খুব ঘ্যান ঘ্যান করলো । পারে তো নিজের ভাতার-কে ঘর ছাড়া করে অবস্থা । শেষে কালাম গ্রুপের কে যেন পরামর্শ দিলো বারঘোনিয়া কলোনীতে ঝাঁকা মাথায় করে ক্ষিরা বিক্রি করার জন্য । গরমে সামান্য লবন মরিচ দিয়ে কাটা ফালি ফালি ক্ষিরা খুব চলবে । অমৃত ।


বউটার মাথায় ঘুণ পোকার মতো সারাদিন কিলবিল করে কী করে এই দেবরকে পাহাড়ের এক অংশ দখলের কাজে লাগানো যায় । একবার দখল করতে পারলেই হলো । বাকী জীবন সুখের পেয়ালা । শুধু ফুরুত ফুরুত সুখের পেয়ালায় পাহাড়িয়া চুমুক ।


ছোট ভাইটা সুরে সুরে ‘এই ঠান্ডা ক্ষীরা’ডেকে ডেকে ১২ লাইন ধরে ঢুকে পড়ে । কেপিএম স্কুলের সময় হয়ে আসে তখন। সকাল ৯টার মতো তখন । চারপাশে দল বেঁধে ছেলে মেয়েরা বই খাতা নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে । লোকটা এরকম নানা বর্ণের ছেলে মেয়ে দেখে সুর করে ডাকা ভুলে যায় ।

হবু গায়ক কনকের গীটার প্র্যাকটিস বেড়ে যায় তখন । ৭ নম্বর লাইনের মাঝামাঝি ওদের বাসা । কনক গান শুরু করে :

“আবার এলো যে সন্ধ্যা ...”


কনকের বন্ধু জাহাঙ্গীর রেজা গোরা সাদা জানালার পর্দা তুলে দেয় গান শুনে। গানের সাথে পাল্লা দিয়ে রেডিওর ভলিউম বেড়ে যায় আচমকা । প্রজাপতির মতো বাতাসে নার্গিস পারভীনের গানের গলা ভেসে আসে;


'ভালোবাসা দিয়ে মোরে এত সুখ দিয়েছো,চাই না আর চাই না ।'


মোশাররফ তখন কালুর দোকানে সিঙ্গারা খেতে খেতে লাতু’র কথা ভাবছিল । কি করে আজ চন্দ্রিমা সিনেমা হলে নতুন মুক্তি পাওয়া ছবি “সবুজ সাথী”দেখা যাবে । খুব প্যাথেটিক মুভি । কাঁদতে কাঁদতে সবাই হল থেকে বের হয় ।


এরকম সুখ সুখ ভাবতে এক কামড়ে সিঙ্গারা সাবাড় করবে ভাবতে গিয়ে জিভে পরম ছ্যাকা এসে লাগে । উফ । কালুকে লক্ষ্য করে মোশাররফ,দেখে কালু টাইট হয়ে ক্যাশে বসে আছে । মোশাররফ মুহূর্তে বুঝে ফেলে যে আজ বিকেলে পাহাড় ঘেঁষে থাকা ভিউ ক্লাবে অনুষ্ঠান আছে । চন্দ্রঘোনার প্রায় অনুষ্ঠানগুলো এই ক্লাবেই হয় । অনুষ্ঠান এলেই কালু’র সাজগোজ বেড়ে যায় । চুলের ভাজ যেন নষ্ট না হয় সেজন্য টুপি পড়ে থাকে । এ দেখে ফিক করে হেসে ফেলে মোশাররফ ।



দুপুরটা চিল পাখির মতো উড়ে যায় কুয়াশা রহস্য ছুঁয়ে পাহাড়ের পাশ গলে।



চন্দ্রিমা সিনেমা হলের পাশে নিরীহ গোছের মশু সিগারেটের ভিতর গাঁজা নিয়ে ঘোরে । ইশারা দিলেই ভদ্র লোকের মতো আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে । না চেনার ভান করে মুখ না ঘুরিয়েই জিজ্ঞেস করবে;


: কয়টা লাগবো ?


আবারো দুপুর নামে চন্দ্রঘোনায় । বারঘোনা বাজারে আজ কাঁঠাল আর কলার মেলা বসেছে । পাহাড়ের পাশ দিয়ে মানুষের অবনত মুখ ঢল । পাঁকা কাঁঠালের গন্ধে মৌ মৌ পুরো বাজার । ছোট ভাইটা তখন স্কুলের পথে ক’টা মেয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে,সুরের ডাক থেমে যায় । ব্রিক ফিল্ডের পাশে রেলগাড়ির মতো চাকাগুলোতে রোদের তীব্র আলো পড়ে ঝলসে যায় । ছোট ভাইটা ঘর থেকে একটা বড়সড় পোটলার মতো কি যেন নিয়ে বেরুতেই লোকটার বউ জোরে ডাক দিয়ে বসে;


:ও ছোট সাহেব চাল নিয়ে যাচ্ছিস কনে ? চাল চুরি করিস ঠিক আছে । তবে কলাম আমার পাহাড় কিন্তু চাই ..


মুহূর্তেই খান খান রোদ ভেঙ্গে চৌচির হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বারঘোনায়,চন্দ্রঘোনায় ।


কী যে একটা সবুজ পাহাড়ি দুপুর !