ঠিক যেন কাচ

চিত্রালী ভট্টাচার্য



রাতের ছাদ। এর চে মনেরমত জায়গা আমার আর নেই। যেন রাতের আকাশের নিচে এক ঝুলন্ত উদ্যান। এ এক আশ্চর্য আত্মগোপনের জায়গা আবার একইসঙ্গে আত্ম-উন্মোচনেরও। আধো- অন্ধকার ,আধো- আলোর একটা রহস্যময় গোপনীয়তায় ঘেরা ছাদের আলশেতে ঠেশ দিয়ে বহুক্ষণ কাটিয়ে দিই আমি। মাঝে মাঝে একনাগাড়ে তিন-চার ঘন্টাও। রাত বাড়লে মা যখন ডাকে,-- পলি খাবি আয়, তখন চটক্‌ ভাঙ্গে।
আজও রাতের ছাদে দাঁড়িয়ে তেমনি করেই ভাবছিলাম। ভাবছিলাম একটা মানুষের কতকিছুই যে অগোচর থেকে যায়। কতকিছুই বলা হয়ে ওঠেনা কাউকে। এই যে আমি মাঝে মাঝেই বেশ রাত করে বাড়ি ফিরি তা নিয়ে মায়ের র্দুভাবনার অন্ত নেই। কত যে জিগ্যাস্য আছে এই নিয়ে মায়ের, কত যে কৌতুহল! কিছু কিছুর জবাব দিই মাঝে মধ্যে, বেশির ভাগই এড়িয়ে যাই। সবচে বেশি এড়িয়ে যাই যে প্রশ্নটায় তা হল—আমি কার সঙ্গে প্রায়ই এত রাত পর্যন্ত-----?
অংশুদার নামটা ঠোঁটের ডগায় এসেও আটকে যায়। জানি বললে একেবারে অনর্থ বেঁধে যাবে। এ এমন একটা নাম যা উচ্চারণ করলে ত্র্যহস্পর্শ ঘটে যেতে পারে। শুধু মা কেন, আত্মীয় স্বজন এমনকি আমার খুব কাছের বন্ধু- বান্ধবরা পর্যন্ত আমার মুখে ও নাম শুনলে চমকে উঠবে, বলবে—শেষ পর্যন্ত অংশুদা!
হ্যাঁ অংশুদা। অংশুদা আসলে চির বাউন্ডুলে,বেখাপ্পা, আত্ম- অচেতন অথচ অত্যন্ত মেধাবী মাপের একজন মানুষ। না, ওর মুকুটে সেই অর্থে কোনো সোনালি পালক নেই। কোনো সুপরিকল্পিত পথ নেই ওর চলার, কোনো স্থির উপার্জন নেই। থাকার মধ্যে আছে উওর কলকাতার হরিঘোষ স্ট্রিটে এক পৈতৃক ভিটে, যা প্রয়োজনের থেকেও বিশাল।ভিটের বড় বড় থামে আর দেওয়ালে অংশুদার লেপে দেওয়া অযত্ন স্পষ্ট, আর বইয়ে ঠাসা অংশুদার ঘর যেখানে ও সারাদিন ওর কিছু ব্যক্তিগত গবেষনার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এ তো গেল ওর বাহির মহল। আর অন্তর মহল?সে খবর প্রায় কেউই রাখেনা, বা রাখলেও বুঝতে পারেনা। কিন্তু আমি জানি, সেখানে আছে এক আশ্চর্য ফ্যান্টাসির সাম্রাজ্য। সে সাম্রাজ্যের অবিসংবাদি রাজা ও। অংশুদা এত সুন্দর করে কল্পনার জাল বিছাতে পারে যে সমস্ত অবিশ্বাস্য বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে। মানুষের অবচেতন যে ফ্যান্টাসির কাঙাল সে ফ্যান্টাসির জাদুকর ও। মনেহয় ঠিক যেন কাচ, আর সে কাচের ওপর তৈরি করা ওর এক নিল স্বপ্নের জগত। একদিন তো মজে যাওয়া ডুলুং নদীর ধারে বসে আমাকে এমন এক পিষন রাজের কাহিনি শুনিয়েছিল যে আমি চোখের সামনে তাদের প্রত্যক্ষ করছি মনেহয়েছিল।এতই জীবন্ত হয়ে উঠেছিল সে কাহিনি।
আর একদিন এই ছাদেই-----। হ্যাঁ, সেদিন মা গেছিল মাসির কাছে। বেহালায়। বাড়িতে আমি একা। ভাল্লাগছিল না। খানিক এদিক ওদিক করতে করতে হঠাত্‌ আলশেতে ঝুঁকে পড়ে দেখি অংশুদা । ডাকলাম—অংশুদা---
ও ফিরে তাকাল।
তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে, দরজা খুলে বললাম—আসবে?
--কেন?
--একা একা ভাল্লাগছেনা।
---কাকিমা নেই?
-- না, মাসির কাছে গেছে।
খানিকটা ইতস্তত করে বলল — চ তাহলে।
দুজনে ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। শুধু জ্যোৎস্না কথা বলছিল। ছাদের আনাচে কানাচে যত অন্ধকার জমাট বেঁধে ছিল সেখানে জ্যোৎস্নার আলো ঢুকে আদ্ভুত এক রহস্য তৈরি হচ্ছিল। ধীরে ধীরে কথা শুরু করল অংশুদা। বলতে বলতে কত যে কথা হল—ঈশ্বর- কসমিক এনার্জি,-মানুষের মন, তার জটিলতা—আরো আরো কত কি---। আমিও তর্ক জুড়ছিলাম মাঝে মাঝে। হঠাৎ একসময় কথা থামিয়ে বলল—দ্যাখ—দ্যাখ---
আমি বিহ্বল হয়ে তাকালাম এদিক- ওদিক। একবার আকাশ, একবার ছাদ , একবার অন্ধকার তো একবার আলো! কিছুরই ঠাহর না পেরে বললাম—কি দেখব? কি---!
ও বলল—জ্যোৎস্নার জাদু—
আমি আরো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।
ও বলল—কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছিস না? কিচ্ছু না! আমি ভেবেছিলাম তুই অন্তত পারবি।
জেদ চেপে গেল , ভাবলাম পারতেই হবে। বললাম—ঠিকমত বললে নিশ্চয়ই পারব।
--দেখছিস না জ্যোৎস্না কেমন প্ররোচিত করছে আমাদের ? দ্যখ্‌, তোকে আর আমাকে মায়ায় বেঁধে ফেলেছে ! আমরা নিজের অজান্তেই দুজনে দুজনের কত কাছাকাছি চলে এসেছি! ভালোবাসা খুঁজছি একে অপরের কাছে! দেখেছিস? দেখেছিস?
আমি চমকে উঠলাম। তাইতো! একেবারে কাছাকাছি আমরা দুজন। আমার মুখের সামনেই ওর মুখ! ওর নিশ্বাসে মিশে যাচ্ছে আমার নিশ্বাস। হাতে হাত ঠেকে ঠেকে যাচ্ছে। কখন এলাম! অংশুদা আগে এসেছে নাকি আমি ! আমি? হ্যাঁ তাইতো! আমিই তো আসেছি। অংশুদা তো নিজের জায়গাতেই-----! কিন্তু অংশুদা কি করে বুঝল?নাকি এটা অংশুদার কথামত জ্যোৎস্নার জাদু! একটা প্রচন্ড আবেগে কেঁপে উঠল সমস্ত শরীর । আমি অস্ফুটে বললাম-আমি তোমায় ভালবাসি অংশুদা।
হঠাত্‌ অংশুদা খুব স্বাভাবিক গলায় বলল—দ্যুর বোকা, এতো একটা ফ্যান্টাসি, এরজন্য তুই আমার মত একটা চালচুলোহীন পাগলকে ভালবেসে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনবি?
আমি মরিয়া । বললাম—তা কেন?
ও স্থির। বলল—তাইতো। তুই জানিস না আমি একটা কাচের স্বর্গে বাস করি। অপার থেকে দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না। ছুঁতে গেলেই হারিয়ে ফেলবি, বলতে বলতে অংশুদা নেমে গেল নিচে, অন্ধকারে।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম একা। জ্যোৎস্না তখনও কি মোহময়!