পাহাড় দেখার আনন্দে

রাণা রায়চৌধুরী



১।
যে কোনও পাহাড়প্রমাণ সমস্যাই আমাদের কানাইদা এক লাফে পার হত। কানাইদা লাফ মারল, ব্যাস! দু’পায়ের ফাঁক গলে যাচ্ছে সব সমস্যা তার। দু’পায়ের ফাঁকে তখন দার্জিলিং, কালিম্পং, লেপচাজগত, লাভা, রিশপ ইত্যাদি। কানাইদা লাফ মেরে নামল তো আর কোনও সমস্যা নেই – তো কোথায় কাঞ্চনজঙ্ঘা, কোথায় এভারেস্ট আর কোথায়ই বা লাভা, লোলেগাঁও বা ডেলো পাহাড়?
আমরা কানাইদাকে বলতাম অমন করে লাফ মেরো না – তুমি লাফ মারলে আমাদের আর পাহাড় দেখা হবে না। বরং পৃথিবীতে সমস্যাও থাক, পাহাড়ও থাক। সমস্যা মানেই যে তা পাহাড়প্রমাণ হবে – বাঙালি তা জেনেছে সবচেয়ে ভাল। লন্ডন-এর লোকেদের, পাঞ্জাবের লোকেদের, আফগানিস্তানের লোকেদের সমস্যা আছে; কিন্তু বাঙালির মতো পাহাড়প্রমাণ সমস্যা আর কারো নেই! পাহাড়প্রমাণ সমস্যার জন্য বাঙালি আর হাসে না, কাঁদেও না, বাঙালি শুধু ফেসবুক করে পাহাড়প্রমাণ ফেসবুক। ফেসবুকে বাঙালির নানান রঙের, নানান চূড়ার, নানান বাঁকের স্ট্যাটাসের পাহাড়! লাইক কমেন্ট–এর পর্বত সে বয়ে বেড়ায় প্রত্যহ। বাঙালি ফেসবুক চূড়ার শীর্ষে বর্তমান!


২। আমি চিত হয়ে শুয়ে বই পড়ি। একটা বই কিছুটা পড়ে রেখে দিলাম ফ্ল্যাপার দিয়ে হয়ত। আবার একটা বই ধরলাম পড়তে ... পড়তে পড়তে আবার ফ্ল্যাপার গুঁজে রেখে দিলাম ... এইভাবে আমার সাহিত্যচর্চা চলে। আমার বইগুলোর ভাঁজে ভাঁজে ফ্ল্যাপারের পাহাড় জমে আছে। ফ্ল্যাপার বলতে কী? না জনৈক মৌমিতা কুণ্ডু ওরফে ববি কুণ্ডু যে নাকি এল আই সি-র এজেন্ট – তার ভিজিটিং কার্ড ... কিম্বা আমার ব্যর্থ কবিতার বহুবছর আগের লেখা পৃষ্ঠা ... তারাপীঠের পান্ডার নাম ও ওঁ লেখা ফোন নম্বর ও ঠিকানা। পুরীর হলিডে হোমের বিস্তারিত কার্ড ... এইসবই আমার ফ্ল্যাপারের পাহাড়পর্বত! সেই ফ্ল্যাপার পর্বতের গুহায় আমি সাধনায় বসি রোজ।
সেদিন চিত হয়ে শুয়ে বই পড়ছি – বই খুলে পাতা ওল্টাতেই বুকের ওপর তারাপীঠ-পান্ডার ভিজিটিং কার্ড খসে পড়ল, তাতে লেখা, সততার সঙ্গে দেবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করানো হয়! কার্ড পড়ে আমি তো অবাক! বিভূতিভূষেণের উপন্যাস দৃষ্টিপ্রদীপ-এর পাতায় পাতায় তখন আলোর এবং দুঃখের বর্ণনা ... সেখানেই দেবীকে স্নানের ঘরে ন্যাংটো দেখে আমি বিস্মিত! এইভাবে আমি প্রত্যহ লাল নীল সবুজ ফ্ল্যাপারের পাহাড়ের নীচে নির্জনতা উপভোগ করি।
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা জীবনকেও তো ফ্ল্যাপার দিয়ে চিহ্নিত করি? পাহাড়ের বাঁকে বাঁকেও আমি বা আমরা তো কত না ফ্ল্যাপার গুঁজে রাখি? পাহাড়ের যে বাঁক আমি দেখেছি সেখানে ফ্ল্যাপার গোঁজা - যেখানে পাহাড়ি নদী একা একা বাঁক নিচ্ছে দূরের সবুজবিস্তৃত আরও বড় পাহাড়ের দিকে।

৩।
আমার স্কুলের বাচ্চারা, ড্রইংক্লাসে কেবল পাহাড় আঁকে। আমি তাদের আঁকা নাম না জানা বিরাট বিরাট পাহাড় দেখে চমকে যাই। কেউ পেন্সিলে, কেউ বা প্যাস্টেলে, কেউ বা জলরঙে এঁকে চলেছে পাহাড়ের পর পাহাড় ... শিশুরা তাদের রং দিয়ে পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছোতে চাইছে। বিরাট উঁচু পাহাড়, পিছনে লাল রঙের সূর্য উঠেছে, সবুজ রঙের গাছপালা, খয়েরি রঙের রাস্তা নেমে আসছে পাহাড় থেকে। পাহাড়ের শানুদেশে বাড়ি, জনবসতি এবং গঞ্জের প্রবাহ। পাহাড়ের পায়ের কাছে নতজানু মানুষ পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে বাঁচতে চাইছে।
আমি এই শিশুদের কল্পনাশক্তি দেখে অবাক! আমার জীবনে কোনও পাহাড় নেই, উচ্চতা নেই, বাঁক নেই, বাঁক ঘুরলেই বিস্ময় নেই কোনও! আমি সোজা পথে সোজা চপ্পলে হাঁটা মানুষ, আমার ছাত্রদের চড়াই-উতড়াইয়ের ক্ষমতা দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। অথচ তারা কেউই দূরের কোনও ঠান্ডা পাহাড়ের দেশে ভ্রমণে যায়নি। রং আর কল্পনা আর অনুভূতি দিয়েই ওরা পৌঁছোয় নির্জন পাহাড়ের সবুজ বনানীর কাছে। ওরা সিমলা, কুমায়ন, গাড়োয়াল যায়নি, ওরা অযোধ্যা পাহাড়ের বা জয়চন্ডী পাহাড়ের ছোট টিলার ছবি আঁকে, আমাদের দেশের গরীবের সন্তানেরা যা এঁকে এসেছে এতকাল! আমি ওদের রঙের হাত ধরেই ঐসব ছোট ছোট টিলায় উঠি, পাহাড়ে উঠি, এইভাবে আমার ছাত্রদের হাত ধরে আমারও কিঞ্চিৎ পাহাড়ে ওঠা হয়। শোনা হয় পাহাড়ি পাখির কলকাকলি, পাহাড়ি নদীর গান!

৪।
পুরুলিয়া যেতে ট্রেন থেকে ছোট ছোট পাহাড় দেখা যায়। সবুজের ছড়াছড়ি। তার মধ্যে জয়চন্ডী পাহাড়ও আছে। আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি সেইদিকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় বেশ জটলা চলছে পাহাড়ে-পাহাড়ে। টিলায়-টিলায় গল্পগুজব খুনসুটি চলছে। সবুজে সবুজে যেন প্রেম চলিতেছে। আমি ট্রেনকে থামতে বলি। ট্রেন থামে না কিছুতেই। ট্রেন আমার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যায় দূরে। জীবনের পথে হঠাত দেখা এইসব অল্পউচ্চ পাহাড়েরা আমাদের সরলরেখার পথে হঠাত বাঁক এনে দেয়, দেখা দেয় সহজ বালিকার মত জয়চন্ডী পাহাড়ের চূড়া। আমরা তো এইজন্যই এসেছিলাম পৃথিবীতে! সব হানাহানি, সব কূটকচালি, সব হীনতা সরিয়ে আমরা অস্ফুটে দেখেছিলাম জয়চন্ডী পাহাড়ের ক্ষীণ চূড়াটুকু, আলোটুকু!
ছোট ছোট পাহাড়গুলির আত্মীয়তা, একে অপরের সহজ সখ্যতা, সবুজ বনানীর নীরব কোলাহল – এইসবেই যেন সহজ মানুষের প্রাণের স্পন্দন লেগে আছে। ট্রেন থেকে দেখে মনে হয় পাহাড়গুলোর শরীরে প্রাণ আছে, গান আছে, মায়া আছে, আর আছে হৃদয়ের বিরাট উঠোন। পুরুলিয়া যাওয়ার পথে ট্রেন থেকে আমি আমার আত্মীয়দের যেন দেখতে পাই, দেখতে পাই আমার হারানো হারমোনিয়ামকে!

৫। আমি কোনোদিন ট্রেকিং করিনি। কিন্তু জীবনের উচ্চতায় ওঠার জন্য আমাকে প্রতিনিয়ত ট্রেকিং করতে হয়। সেই ওপরে ওঠার ক্ষমতা, পরিশ্রমের ইচ্ছা আমাকে পাহাড়ই দিয়েছে। পাহাড়চূড়ায় ওঠা যত কঠিন, নেমে আসাও ততটাই কঠিন। আমি চূড়ায় উঠতে চাইনি। জীবনের প্রয়োজনে যতটুকু ওঠার প্রয়োজন, আমি ততটুকুই উঠতে চাই। নেমেও আসতে চাই ততটুকুই।
তবু ট্রেকিং করতে হয় প্রত্যহ। প্রতিটা বাঁকেই মানুষ পাহাড়কে সামনে রেখে উঠতে চায় ওপরে, উঁচুতে। কেউ পারেন, কেউ পারেন না। শীর্ষে ওঠার ইচ্ছে নিয়েই মানুষ বাঁচে, গান গায় প্রতিনিয়ত। এই সমতলই মানুষের জীবন সংগ্রামের পাহাড়। হেরে যাওয়া, জিতে যাওয়া উভয়েই ওপরে উঠতে চায়। হেরে যাওয়া মানুষের দলই পৃথিবীতে বেশি। যারা পারেনি, যারা গাইতে পারেনি, যারা হেরে গেছে – তাদের জন্যই তত্ত্ব, বক্তৃতা। তাদের জন্যেই বাণী ভাষণ, থিয়োরি। থিয়োরি দিয়ে বাণী দিয়ে আমরা হেরে যাওয়া মানুষের দল চেষ্টা করব শৃঙ্গ জয় করতে? কিন্তু পারিনা আমরা। পৃথিবীতে আলোর বড় অভাব, অক্সিজেনের বড় অভাব। অনেক উঁচুতে পৌঁছন দু’একজন। বেশিরভাগই আমরা অল্প আলোয় অল্প অক্সিজেনে সমতলে পায়চারি করি, ছবি আঁকি, লুডো খেলে বাঁচি আমরা সমতলে, গাই সাম্যের গান, ফুল তুলি জয়ের জন্য – এইই আমাদের পাহাড়ে চড়া! আমিও এদের মধ্যে একজন।

৬।
আমি তো সামান্য একজন লেখক! যে দু’চারজন পাঠক বিরাট হয়ে আমার বই কেনেন এবং আমাকে বলেন, ‘একটু লিখে দিন’ – আমি আমার সেই ঈশ্বরতুল্য পাঠককে লিখে দিই – ‘কৌস্তভকে পাহাড় দেখার আনন্দে’ । এইসব লিখে আমি ভাবি কেন লিখি এমন বানানো কথা?
কিন্তু পাহাড় তো দেখি না রোজ? তবে কেন ‘পাহাড় দেখার আনন্দে’ এইসব লিখি আমি? আসলে আমরা বোধহয় প্রতিনিয়তই পাহাড় দেখি স্বপ্নে কল্পনায় মানসভ্রমণে। পাহাড়ের সৌন্দর্য, পাহাড়ের উচ্চতা, পাহাড়ের প্রতিটা বাঁক আমাদের প্রত্যহের যাপনে লেগে থাকে সম্ভবত। পাহাড়ের পাখিডাকা নির্জনতা আমাদের নির্জন হতে বলে আরও। এ পাহাড় থেকে ওই পাহাড়ে আমরা চিৎকার করি ‘রবীন্দ্রনাথ’! পাহাড়ে পাহাড়ে সেই ‘রবীন্দ্রনাথ’ উচ্চারণ ধাক্কা খেয়ে, ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে আমাদের কাছে। এইভাবে পাহাড়ি রবীন্দ্রনাথ আমাদের বড় করে তোলেন। এইভাবে আমরা মংপুতে যাই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে, আমাদের সমতলের বাঁচা বাঁচতে। এইভাবে প্রতিদিন আমরা কল্পনা করি যে, পাহাড় দেখছি আমাদেরই জানালার পাশে। ওই দূরের তালগাছ, ওই দূরের মেঘপুঞ্জ, ওই দূরের পাখির ওড়াওড়ি তো পাহাড় দেখারই সামিল! আমি তাই লিখি পাহাড় দেখার আনন্দের কথা! আমাদের পাড়ায় পাড়ায় পাহাড়িয়া গাছ পাখি নদী, আমাদের হৃদয়ে পাহাড় জেগে আছে সর্বদা!

৭।
সুকনা চা বাগানের গা বেয়ে হিমালয় উঠেছে। আমি তখন বালকমাত্র। সুকনা চা বাগানে গেছি কাকার মেয়ের বিয়েতে। মনে আছে কাকার শ্বশুরবাড়ির দিকের এক আত্মীয়ার নরম কন্যার কথা। সেই নরম কন্যাটি আর আমি টয়ট্রেনের লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে সমতল থেকে পাহাড়ে উঠে যেতাম – আরও সৌন্দর্যের সন্ধানে। আমরা দু’জন, দুই বালকবালিকা রেলের দুটো লাইনে ব্যালান্স করতে করতে হেঁটে যেতাম পাহাড়ের দিকে। মাঝে মধ্যে ব্যালেন্স না রাখতে পেরে পড়েও যেতাম ছিটকে পাথরের মধ্যে। এই ছিল আমাদের বালককালের ভ্রমণ ভ্রমণ খেলা। এইভাবে সমতল থেকে পাহাড়ে ওঠার আনন্দে, আমরা বালকবালিকা থেকে তরুণতরুণী হয়ে উঠতাম প্রত্যহ।
মেয়েটির মিষ্টিসুন্দর মুখশ্রী। পায়ে নূপুর বাজত ঝুমঝুম করে – আমি সেই ঝুমঝুম বাজনা সঙ্গে করে, তার পাখির মতো মুখশ্রী সঙ্গে করে পাহাড়ের বাঁক বেয়ে বেয়ে উঠে দেখি হঠাত শৃঙ্গচূড়ার বিভাস! মেয়েটি বলল, এই পাহাড়চূড়া তার বন্ধু, নাম কাঞ্চনজঙ্ঘা! এইভাবে সেই বালিকার হাত ধরে আমার প্রথম কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা হয়। আমার সেই কাঞ্চঞ্জঙ্ঘার বিস্ময় যেমন আজও আছে, তেমন হৃদয়ে আজও আছে মেয়েটির নরম নূপুরের বাজনাটিও। আমি সেই কাঞ্চনজঙ্ঘাকে আজও দেখি আমার হাঁটা পথের ঘাসে, পাথরে ... সেই নূপুরের বাজনাই যেন আমার সারাজীবনের কাঞ্চনজঙ্ঘা!