মাটির নীচে পাহাড়

মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায়



গল্প বড্ড অদ্ভুত ভাবে শুরু হয়। শুরুর সময় যেমন ভসের হঠাত জ্বর এসে যায়। কানের ভেতর হালকা ভাবে বাজে লিখতা হু খতসে... কল্যাণী থেকে পলতা আসতে আসতেই ধুম জ্বর। পাত্তে কেয়া ঝড়তে হ্যায় পাকিস্তা মে ওয়্যাসে ঝড়তে হ্যায় ইহা। জ্বরের ওষুধের একটা গন্ধ থাকে। অদ্ভুত সেই গন্ধ। মা চামচের গরম জলে গুলে দিত। গলার স্বরটা ভেঙ্গে ভেঙ্গে ঘুরে বেড়াত মাথার কাছে। জল বোলাতে বোলাতে, মা একটা গান গাইত, জ্বর সেরে গেলে আর সে গান মনে থাকত না। শুনতে শুনতে চোখটা হালকা বন্ধ হয়ে আসে ভসের। একটা কলকাতা স্টেশান। তিনটে ছেলে। ভারী ব্যাগ কাঁধে। উঠে পড়ল একটা পাহাড়ি ট্রেনে। কামরাটা ইঞ্জিনের খুব কাছে। কাছে কোথাও শাঁখ বাজল। চলতে থাকল ট্রেনটা। এক সময় খড়দা পলতা ছেড়ে চলল। কামরায় বেশির ভাগই অবাংলী। সামনের সিটে তিন মুসলিম, মা মেয়ে ছেলে। পাশে এক পাঞ্জাবী। উপরের সিটে শুয়ে পাতা। জানলার ধারে মাগু। মাগুর সামনে বহির। এদের কারোরই ভালো নাম মনে পড়ে না জ্বরের। মাথার ঝিম ধরা ব্যথাটা কখন একটা ছন্দ পেয়েছে। দূরপাল্লার একটা ট্রেন চলার ছন্দ। আর মায়ের গলাটা খুব কাছ থেকে ডাকে, গঙ্গা আসছে। ব্যাণ্ডেলের ব্রিজটা পেরচ্ছে ট্রেনটা। গঙ্গা দেখতে ঝুঁকে পড়ে ছেলে আর মেয়েটি। বোরখার ফাঁকে থাকা চোখটায় ছায়া পড়েছে নৌকার। তিরতির কাঁপছে আলো। এমন গঙ্গার পারে কোনদিন বসে নি ভস।

ট্রেনটা মধুপুর এসে থেমে যায়। তিনটে কামরা ছেড়ে বাকি ট্রেনটা এগিয়ে যায় দিল্লীর দিকে। বাকি তিনটে কামরা কোনদিন রাজধানী দেখল না। অপেক্ষা করতে থাকল কখন ডিজেলের ইঞ্জিন আসবে। একটা ঘণ্টা বেজে দেড়টা বাজলো। বহির স্টেশনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। মাগু বরফ বন্দির ডায়েরি পড়ছিল। পাতা ঘুমচ্ছে মিডিল বার্থে। পাশের বাড়িতে হালকা একটা গান চলছে। বালিশটা কানের কাছে টেনে নেয় ভস। যাব শ্যাহের হামারা শোতা হ্যায়। গাড়িটা আবার চলা শুরু করল। ছোট ছোট পাহার। মাঝে ফাঁকা জমি। ঘর বাড়ি নেই। হু হু হাওয়ায় কথা পৌঁছচ্ছে না। ডিজেলের ধোঁয়া। ইঞ্জিনের শব্দ। তারপর চুপ। হালকা ঠাণ্ডা নেমে এসেছে। একটা বর্গাকার আলো। মাটির গায়ে হাতুরি পড়লে কখনো শব্দ পাথরের হয়। কালো পাথর। কয়লা। মইন হাঁটু মুড়ে বসেছে। হাতুরি চালিয়ে যাচ্ছে। মাটির থেকে ১৫০ ফুট নীচে। একটা চার ফুট বাই চার ফুট গর্ত নেমে যেতে থাকে। একটা কপিকল লাগানো। তা থেকে ঝোলানো দড়ি নেমে গেছে নীচে। মইন সেটা বেয়ে নেমে যায়। বাইরের গরমটা আসতে আসতে কেটে শীত আসে। হাফ বেলা কাজ করে, এক বস্তা কয়লা হয়। দাম বাজারের থেকে অনেক কম। মাঝে মাঝে সরকার গর্ত বুজিয়ে দেয়। পুলিশ এসে ঘুষ নেয়। টাকা বা কয়লার বস্তা। একটা বিরাট মাঠের মাঝে মাঝে এরকম গর্ত প্রতিটা গর্তই নেমে গেছে ১০০ – ১৫০ ফুট। আর মাটির নীচে প্রতিটি গর্তের সাথে আর একটা গর্তের সুড়ঙ্গ। কয়লাখনির কাছে একটু ভিতরে এরকম মাঠগুলোর প্রতিটাতেই এরকম গর্ত। অনেক গর্ত। মইনরা গর্ত খুঁড়ে নামতে থাকে, নামতে নামতে খুঁজতে থাকে কয়লায় অস্তিত্ব। পেলেই খোঁড়া শুরু নিয়ম করে। মাঝে মাঝে গর্তে ধস নামে। বুজে যায় গর্ত। মইন যে গর্ত দিয়ে ঢুকেছিল, ধস নেমে সে গর্ত বুজে গেছে, তখন আর একটা গর্ত দিয়ে বেরয়। যদিও অনেক সময়ই আর বাইরে আসা হয় না। পৃথিবী এক বিরাট কবরস্থান।
ভসের ঘুমটা হালকা ভেঙ্গেছিল। গাড়ি একটা স্টেশনে থামলো। ৩ টে ৩০। সাইকেল নিয়ে সারি মানুষ দাঁড়িয়ে। ট্রেন থামতে, সাইকেলটা উল্টো করে ঝুলিয়ে দিল, ট্রেনের জানলায়। নিজেরা উঠে বসল ট্রেনে। রিজার্বেশান কামরায়, আনরিসার্ভড মানুষগুলোকে উঠতে দেখে, মনে পড়ল নিজের চাকরির ফর্ম ফিলাপের কথা। যেখানে আমাকে আনরিসার্ভড-এ টিক মারতে হয় বরাবর। ওরাই বলল, আর দশ মিনিট। পাতাকে চেঁচিয়ে ডাকল, মাগু। বহিরকে বলল, গুছিয়ে নে। “হুঁ” হালকা স্বরে বলল ভস। অতয়েব গিরিডি। মইনের শহর।
ঠাণ্ডা কাটিয়ে আসতে আসতে গরমটা গায়ে লাগাতে ভালো লাগে মইনের। চুপসে গ্যাছে হাত পা গুলো। স্যাঁতস্যাঁতে শরীর। চোখ লাল। নীচ থেকে উঠে, মাটিতে শুয়ে পড়ল মইন। “ দুধটা খেয়ে নে” মার গলা পেল ভস। জ্বরটা কমেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে মইন। একটু দূরে আওয়াজ হয়। বৈধ কয়লা খনিতে ব্লাস্ট হল। পর পর দুটো। মইন দেখেছে ছেলেবেলায়। কয়লা গুলো ছিটকে ছড়িয়ে পড়ে। মাটিটা খুবলে নিয়েছে যেন কেউ। মইন ভাবে এই সব। ওর বাবা খান্তার নীচে চাপা পড়ে মরেছে। চারটে ভাই মরে গ্যাছে, খান্তায়। খান্তা, এই ইললিগাল কোল মাইনের স্থানীয় নাম। মইন জানে, ও-ও মরে যাবে!

ছোটবেলায় অনেক ভুল সংজ্ঞা পড়ানো হত আমাদের। আসল সংজ্ঞাগুলো বড় না হলে বুঝবো না। এখনো আমি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ি বইয়ের উপর। চুলের তেল লেগে যায় পাতায়। তেমনই কোন তেল চিটে পাতা আমাকে পাহাড়ের কথা বলেছিল প্রথম। আমার সমতল থেকে অনেকটা ওপরে। যেখান থেকে গোটা শহরটা দেখা যায়। দেখ যায় বৈশাখের শুকিয়ে আসা নদী। শুয়ে আছে ফাটা মাটির উপর। মহিষ চড়াচ্ছে কোন লালটেম। একটা ছোট ব্রিজ। ব্রিজ পেরচ্ছে একটা অটো। অটোতে মাগু পাতা আর বহির। উশ্রী পেরিয়ে যাচ্ছে। উশ্রী আমাকে প্রথম কোন মাওবাদীর হাত চিনিয়েছিল। কালো মাটি লাগা হাত। শিরা বার করা। পাথরে পিছলে যাওয়ার সময় আমার হাতটা ধরেছিল। নিজেকে সামলে নিতে নিতে দেখেছিলাম, বুক ভরা হাড়। ভেঙ্গে পড়া মুখ। চোখে হিংসে নেই। সে বলেছিল, এই উশ্রীর আপাত অগভীর জলের নীচে এক গভীর খাদ। প্রতি বছর একটা করে মানুষ খায়। অথচ নদী খাদক নয়। কালো হাতের তীর ধনুক দেখেও আমার মনে হয়, তা দিয়ে মানুষ মারা যায় না। সেবার শিমুলতলায় অটো নিয়ে বেরিয়েছিলাম। গল্পে গল্পে জানিয়েছিল চালকটি, সেও ছিল মুভমেণ্টে। এখন আর নেই। এক এক পাহাড় জীবন। কোথাও অটো-চালক। কোথাও উশ্রীর গাইড। উশ্রীতে ঢোকার মুখেই একটা কাপড়ের তৈরী প্রবেশ দরওয়াজা। লেখা আদিবাসী এলাকা। অটো থামতে দেখলাম, তিনটে মানুষ দাঁড়িয়ে। কেজরিলাল, যার অটো, বলল, ওরা গাইড। বলবেন, আপনাদের গাইড লাগবে না। এখানে মানুষগুলো দেখতে সবাই একই রকম। হাড়-বুক, ভাঙ্গা-মুখ, চোখে কথা নেই। কোন পাথরের মূর্তিতে দয়া করে ঈশ্বর প্রাণ দিয়েছেন। আমরা কথা মতো বারণ করলাম, গাইড কি জরুরত নেহি হ্যায়। ফাঁকা উশ্রী, ক্লান্ত। পাহারের গা থেকে জল নামছে, ক্ষিণ। টুরিস্টের ফেলে যাওয়া মদের বোতল, ভাঙ্গা কাঁচ, খাবার প্লেট, কোথাও পাথরের খাঁজে, ব্লাউসের ছেঁড়া অংশ। উশ্রীর স্মৃতি হিসেবে মানুষ নুড়ি নিয়ে যায়। উশ্রী রেখে দেয়, পাথরের আড়ালে, মানুষের গোপন রিপু।
উশ্রী থেকে আমরা অটোতে উঠতে যাব, সেই তিনটি মানুষ এসে দাঁড়ালো সামনে। যারা আমাদের হাত ধরে উঠিয়েছে পাহাড়ের গা বেয়ে। গল্প শুনিয়েছে, উশ্রীতে আসা কোন এক বাঙ্গালী সাধুবাবার। এখন টাকা দাবী করছে। বহির কথা বলল, কিসের জন্য টাকা? আমরা তো গাইড নিই নি। কেজিরিওয়াল হিন্দি বাংলা মিশিয়ে বোঝাল, এই এলাকায় ঢুকেছি বলে ওরা এটা দাবী করে। এখানে যত গাড়ি আসে সবার থেকেই ওরা নেয়। অটো একটু এগোতে কেজরিলাল বলল, ওরা মাওবাদী আছে। আপনারা তো চলে যাবেন। আমাদের তো রোজ আসতে হবে। “কাজ করবে না, এমনি এমনি পয়সা!” মাগু অনেকক্ষণ বাদে কথা বলে। বহির, ঘুরেছে, মিশেছে, কাছ থেকে দেখেছে এরকম মানুষগুলোকে। সে বোঝায়, সরকার যদি এটার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখানে লোক রাখত, একটা টিকিট ঘর বসাতো, তাহলে স্থানীয় লোকদের কেই নিয়োগ করতে হত। সরকার সেটা করে নি। তাই ওরাই গভর্ণমেণ্টের কাজটা করছে। “ কোথায় করছে? নোংরায় ভর্তি, ন্যাপকিন, মদের বোতল, খাবার থালা...” মাগু বকতে থাকে। ওদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলতে থাকে। ভস চুপচাপ শোনে বিছানায় বালিশে মাথা দিয়ে। গলার ব্যথায় কথা বলতে কষ্ট হয়। বললেও মাগু থামিয়ে দিত। মাগু গল্পে অনেক কিছু লেখে, কিন্তু বাস্তবে একটা গরিব মানুষকে কখনো দশটাকা দেয় না! হুহ্‌। ভস ভাবে এই সব। জ্বর খুব দুর্বল করে দেয়। ঘুম আসে। অন্ধকার ঘুম। টিপ টিপ করে জ্বলে সামান্য আলো। মাটির নীচে। জায়গাটা কোল মাইনের একদম কাছে। কয়লাখনির খনির গা বেয়ে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে। সেটা দিয়ে কিছুটা এগোলেই একটা জনপদ। জনপদ ধরে কিছুটা এগোলেই আরো সরু একটা রাস্তা। তার আশে পাশে বাড়িগুলোর উঠোনে খোঁড়া কুয়ো। কুয়ো নয় খান্তা। ঘরের লোক নেমে যায় নীচে। সব গুলোর কপিকল থাকে না। চার দিকের দেয়ালে ভর করে নামতে থাকে একশো দেড়শো ফুট। হাত পা ফস্কালে বাঁচে না। চুপচাপ দেহ তুলে আনতে নীচে নামে লোক। দেহ তুলে এনে পুড়িয়ে দেয় বা কবর দেয়। এদের কোন ডেথ সার্টিফিকেট নেই। মইন জানে যে গর্তে সে নামছে, সেই গর্তেই তার বাপ মরেছে চার ভাই মরেছে। কেন করিস এই কাজ মইন, জিজ্ঞেস করে ভস। -আর কি করব? মইন আর একটু যখন ছোট ছিল, মাল গাড়ি লুঠতো। মাঠটা পেরিয়ে অল্প এগিয়েই লাইন। সেখানে মালগাড়িগুলো কয়লা ভরে নিয়ে যায়। এই অঞ্চলের আর একটা রোজগার, ওয়াগান ব্রেক। কয়লা লুঠ। ছোট ছেলেরা উঠে যায় মাল গাড়ি বেয়ে। কয়লা তুলে লাইনের দুদিকে ছুঁড়তে থাকে। ‘গুণ্ডে’ নিতান্তই বাজে স্ক্রিপ্ট, বোঝা যায় নিজের চোখে দেখলে। আমাদের তিনজনের জীবনেই এই প্রথম দেখা কয়লা লুঠ, প্রথম দেখা খান্তা। প্রথম আলাপ নাম না জানা মইনের সাথে। আমি একটুকরো কয়লা এনেছিলাম, গিরিডির স্মৃতি। গুড্ডু বলেছিল, ভেঙ্গে দেখ যদি হিরে থাকে। তখন মনে পড়েছিল, মইনের কথা, মইন কি কখনো হিরে পাবে? হয় তো তার কাছে কয়লাই হিরে। আলাদা করে কোন হিরের অস্তিত্ব নেই।
আমরা ছোটবেলায় অনেক সংজ্ঞা পড়ি। যা বড় বেলাতেও একই থেকে যায় বইতে। ভুল সংজ্ঞাটাই বার বার পড়ি আমরা। পাহাড়, আমার সমতলের থেকে নীচে, ১০০ ফুট ১৫০ ফুট নীচে। কিন্তু সেখানে নামলেই আসল শহরটা দেখা যায়।