পাহাড়, তুমি কোথা হইতে আসিতেছ

সরোজ দরবার



নদী তুমি কোথা হইতে আসিতেছ, এ প্রশ্নের উত্তর মেলে। পাহাড়ের কাছে এ প্রশ্ন বৃথা। পাহাড় কি কোথাও থেকে আসে নাকি? সে তো স্থির, সেই কোন কাল থেকে এক জায়গায় তার শিকড় চারিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবু পাহাড় কি আসে না? আসে তো। হঠাৎ হঠাৎ আমাদের বুকের উপর যে অপ্রত্যাশিতের ভার এসে চেপে বসে সে পাহাড় নয় তো কী? আচমকা এক একদিনে বিষাদ জমতে জমতে যে উচ্চতা পেয়ে যায়, আর যা সেদিনের মতো টপকানো যায় না কিছুতেই, সে তো পাহাড়ই। সে আসে কোথা থেকে? পাহাড় বলে, আসি ভিতরের দিক থেকেই।
প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির টেকটোনিক পাতের ভিতর একটা পাহাড় যে গোপনে বসে থাকে, তা টেরই পাওয়া যায় না, যতক্ষণ না সে দিব্যি বেশ খানিকটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ছোট খোকা(খুকিও) যখন অ, আ বলা শুরু করল, তখন তো সে কথা কওয়াও শেখে না। তবে কতকাল আর বলো খোকা-খুকি রবে নীরব হে! অ, আ টপকাতে টপকাতে তারা কতদূর চলে এসে বোঝে, এ যে তার রাস্তাই নয়। এই যে চলা, এই যে বেঁচে থাকা কিংবা বর্তে যাওয়া সবই যেন কোন ইশারায় এগিয়ে যাচ্ছে। কে যেন তাদের ঘাড় ধরে এগিয়ে নিয়ে চলেছে বেঁধে দেওয়া চাহিদার রোডম্যাপে। ইসস, একটা গোটা জীবনের অভিযান রোমাঞ্চহীন প্যাকেজ ট্যুর হয়ে উঠবে নাকি! তখন খোঁজ পড়ে ভিতরে, কে? কে? একটা মানুষ, দুটো মানুষ, একটা সম্পর্ক, দুটো সম্পর্ক...তারপর গুলিয়ে যায়। বোধগম্য হয় প্রত্যাশার একটা পারসেপশনল ফর্ম সেই কবে থেকে যেন তৈরিই হয়ে আছে। নির্ধারিত যে, সে পাত চলবে ব্যক্তিইচ্ছের বিপরীতমুখী। আগে আন্দাজ পেলে হয়তো ভূমিরূপ এমন খাড়া হয়ে উঠত না। কিন্তু ভবিতব্য আঁচ পাওয়া এত সহজ নাকি। যেদিন অ, আ বলা খোকা কথা বলতে শুরু করল সেদিন দুই পাতে ঠোকাঠুকি লেগে আস্ত একটা পাহাড় খাড়া হয়ে গেছে। এবার শুরু অভিযান। এবার তাকে টপকে যাওয়ার সাফল্য। না পারলে অমোঘ জীবনের খাদ। ব্যতিক্রম নাকি সূত্রদের মান্যতা দেয়। ব্যতিক্রম জানে, সে মান্যতার ভিতর ঝুলে থাকে এই পাহাড়টাই। মানুষও বোধহয় জানেই, গ্রস্ত উপত্যকার ভিতর হেঁটে যাওয়াই বেশীরভাগের ললাটলিখন, দু’একজনই পাহাড় টপকাতে পারে। বলা বাহুল্য, কোনও ট্রেকিংয়ের ট্রেনিং এ অভিযানে থাকে না। আমরা তবু ক্রমাগত পাহাড়ের মুখোমুখি হই।
এই কবিতাটা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে,
‘তোমার একান্ত আমি টেনে রাখি, অন্য প্রান্ত দাঁতে করে
ছুটে যায় গন্ধমুষিকেরা
স্থিতিস্থাপকতা নেই তোমার চরিত্রে, গানে, তাই
দুই বিপরীত টানে বেড়ে যায় মধ্যভাগ, উদাসীন তোমার শূন্যতা’ (মানুষীর মধ্যভাগ/রনজিৎ দাশ)
স্থিতিস্থাপকতা কি চরিত্রে ছিল তেমন করে? প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ালে সামনে একটা পাহাড় এসে পড়ে। প্রেম আর প্রেমহীনতার বিপরীত টানে যে জন্ম নেয় ঠিক করে দেওয়া ব্যক্তিগত ব্রেক ইভেন পয়েন্টে। কতখানি স্থিতিস্থাপক হওয়া উচিত ছিল চরিত্রে? বেঁচে থাকার রাজনীতি বলে, ততোটাই যতখানি মেনে নিতে পারো। এদিকে রাজনীতির বেস ক্যাম্পে নিয়ত অন্তর্দ্বন্দ্ব। কারা যেন বলেছিল, মেনে নেওয়া বলে কিচ্ছুটি নেই, চলে যাও যেদিকে দুটো মন যায়। সে সব কন্ঠস্বর চাপা পড়ে থাকে, সে সব মতবাদ সিনেমার মতো। সীমার ভিতর সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার বাসনা বাস্তবে অস্বীকৃত। একদিন আবেগের সঙ্গে তাই সমঝোতায় বসতে হয়। ডানা ছাঁটা হয়ে কল্পনার। বেদনার প্রথম রক্তের কাছে তবু অস্বীকৃত ঋণ নিয়েই জীবনের চোরাকারবার ফুলেফেঁপে ওঠে। ক্রমে যে আমার কথা ছিল তোমার একান্ত টেনে রাখার, সে আমিই চলে যাই গন্ধমুষিকের দলে। ভাবা যায়, জীবনের যখের ধন রাখা থাকে বাস্তবের ওই কোঁচড়েই। তারপর কে না জানে, সে মৃত ধনের রাশি জমে জমে পাহাড় হয়। ধরা যাক তারই নাম-শূন্যতা। সে পাহাড় ঘাড়ে করে আমরা বাসে-ট্রামে-জীবনে ঘুরে বেড়াই। ঘাড় নুয়ে পড়ে। ভেঙে যাই, কিন্তু মচকাই না। বেঁচে থাকার রাজনীতি একটা শুকনো পাহাড়কে আমাদের অস্ত্বিত্বে আগাগোড়া সেলাই করে দেয়। কপালগুণে, সেখানে কখনও কেউ ঝর্ণা হয়ে দেখা দেয়। বেশ একটা ঝলমলে চেনা পাহাড়ের ছবি আমরা মানিব্যাগে তুলে রেখে বড়জোর বলে উঠতে পারি- ভালো আছি, ভালো থেকো।
অথচ যে জীবন মানুষের বলে এত অহংকার, এত রাজনীতি, সে তো আসলে একটা গিনিপিগের। কবি জানেন, ‘সারাজীবন ধরে একজন মানুষ/ এমন একটিও কাজ করে উঠতে পারে না/ যা তার যৌনতা এবং তার স্বার্থপরতার সঙ্গে জড়িত নয়।’ পা ফেলার প্রতি অঙ্কে তবে জুড়ে বসে আছে এই স্বার্থের যোগবিয়োগ। যেখানে স্বার্থ নেই, স্বার্থের অধীন গিনিপিগ সে পথ মাড়ায় না। নিস্বার্থের ভিতরেও সে আছে, যেমন নিরপেক্ষতা আসলে বুদ্ধিমানের চাতুরী। তবু সিদ্ধি যেখানে নেই স্বার্থ প্রায়শ সেখানেও নিয়ে চলে যায়। আদতে যা বিদ্বেষের আঁতুড়ঘর, জন্মহারে লাগামছাড়া। অমৃতের সন্তান সব বিদ্বেষের পূর্ণকুম্ভ ভরে তোলে। অমৃতের পুকুরে আর ঘটি ডোবে না, বিদ্বেষের কলসে সারি সারি জমে মাথা তোলে, প্রতিদিন একটু করে উঁচু হয়। একদিন আমরা নিজেরাই নিজেদের রাখা কলসের নাগাল পাই না। বিরাট ভারের বোঝা সামলে নীচেরটাও সরাতে পারি না। ইতিহাস থেকে এগিয়ে চলে আগামি, একটা পাহাড়কে লুকিয়ে রেখে। আমাদের আর কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নাই। এই পাহাড়ের ওপারেই মানবতা, এপারে নিছক মানুষ অথবা গিনিপিগ আমরা খাই-দাই ঘুরি-ফিরি যৌনতায় ও স্বার্থপরতায়।
সেই যে পাঁচমুড়ো পাহাড়, যেখানে অমলের আর যাওয়াই হল না, সে বুঝি আমাদেরও গন্তব্য ছিল। অকৃতজ্ঞ জীবন তাকে মনে রাখেনি। তাই আজব সব পাহাড়ের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে যায়। পালকের মতো হালকা হতে গিয়ে আমরা ক্রমশ পাথরের মতো ভারি হয়ে উঠি। যদি বায়ুশূন্য হয়, তবে দুটোই সমান হত। বায়ুনিরপেক্ষ জীবন তবু আমাদের আয়ত্তের বাইরে। এইসব পাহাড়ের সামনে আমাদের তাই দাঁড়াতেই হয়। যা সব টপকে যাওয়ার কথা, তার খানিকটা উঠেই আমাদের হাঁফ ধরে। আদর করে আমরা পাহাড়ের গায়ে তখন রোমাঞ্চ বুনে দিই। বলি, তুমি হলে যৌনতার ছবি। সমস্ত অবদমিত বাসনাসমূহের হয়ে তুমি একা দাঁড়িয়ে থাকো। পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকে আর উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরিত হয় অভিযাত্রীর ডায়রি। প্রথমে সে জানে এই যে, পাহাড় তার আগেও দাঁড়িয়ে ছিল। পরে সে টের পায়, পাহাড় আসে, তার ভিতর থেকেই। সে বুঝতে পারে, আসলে তার দেখার কথা ছিল কী করে কত অসামান্যও পালকের মতো লঘু হয়ে যায়। বিনিময়ে সে সাক্ষী থাকে কত নেহাত সামান্যও পাহাড়প্রমাণ ভারী হয়ে ওঠে।
পাহাড় অবশ্য খেদ করে বলতে পারে সবসময়ই সে এমন কালো রঙের হয় নাকি! মন হারানো পাহাড়ের ডাক কতজনেই তো শুনেছে। দলবেঁধে কতজনে কত হই হল্লা করে আসে। কত সাফল্যের ছবি বাঁধানো থাকে ড্রয়িংরুমে। কতজনে জানে, পাহাড় ধ্যানগম্ভীর, খতরনাক, আবার দরকার পড়লে সে কাগজে কলমে হাসেও। পাহাড় শুধু এক কিসিমের হবে কেন? হ্য়তো ভালো পাহাড়ও আছে। আমাদের সবার সেখানে যাওয়া হয় না। নিজস্ব ধারণার ভিতর থেকে যায় ভূগোলে অনুল্লেখিত কিছু পাহাড়ের জন্ম। সে পাহাড়ের ডাকও শোনা যায়। যেমন শুনছি, ‘নাম লিখেছি একটা তৃণে...’। ১ লা এপ্রিল, বছর ঘুরলে, আমিও তো দেখব, একটি তৃণও কেমন করে পাহাড় সমান হয়ে ওঠে।