ফ্রোজেন শট

অদ্বয় চৌধুরী



এটা তোলা হয় বেশ কিছুদিন আগে। কয়েক বছর আগে হয়তো বা। মনে নেই ঠিক। মনে পড়ে না।

প্রথমে মনে হয় বিলীন হতে থাকা অর্থহীন কিছু ছাপ। কোনরকমে লেপটে রয়েছে। শীতের সাঁঝবেলায় মড়াপোড়ানো ধোঁয়ার রেশটুকু মাঝপথে যে ভাবে লেপটে থাকে কুয়াশায়। ঝাপসা রেখা আর ধূসর দাগ মিশে আছে কাগজে।

পরে, যদি সময় হাতে থাকে, খুঁটিয়ে দেখ। দেখতে পাবে বাঁ দিকের কোণে, উপর দিকে, কিছু একটা যা অনেকটা থোকা থোকা ফুলের মতো। আগুনে রং আর নেই, তবু ভালো করে দেখলে বোঝা যায় রডোডেনড্রনের থোকা। বাইরে থেকে ঢুকে পড়েছে ভিতরে। উঁকি মারছে। চিরতরে খসে পড়ার আগে তোমাকে একবার দেখতে চায়। তোমাকে? নাকি আমাকে দেখবে বলে সে এসেছিল? এখন যে আর দেখার উৎসাহ নেই তা কিন্তু নিশ্চিৎ। অথবা হয়তো হারিয়ে ফেলেছে দেখার ক্ষমতা। ঝাপসা দৃষ্টি।

ডান দিকে, ঐ বিস্তৃত অংশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট বড় উঁচু নিচু ঢাল। একসময় সবুজ ছিল হয়তো। এখন কি রং? হলদেটে ধূসর? একটু জলদি দেখ তুমি, নতুবা যদি আলো কমে আসে ওই ঢালগুলো মনে হবে কালো কালো কিছু ছোপ। রাস্তায় পড়ে থাকা আবর্জনার স্তূপের মতো। ওরা রং হারিয়ে ফেলে খুব তাড়াতাড়ি।

ঐ ঢালগুলো চিরে যে সরু পথ চলে গেছে পিছনে সেই পথের মাথায় একটি ছোট্ট কাঠের বাড়ি। এখনো ভেঙে পড়েনি কিন্তু। যদিও চালটা ডানদিকে কাৎ হয়ে গেছে। গায়ে শেওলা ধরেছে। পিছনে কিছু উঁচু উঁচু গাছ। দেখ, এখনি তারা কেমন কালচে হয়ে গেছে। কাজলপড়া চোখ থেকে গড়ানো জলের দাগের মতো। এখনো তো এখানে বাইরে আলো আছে। ওখানে, ঐ উপরের দিকেও তো আলো আছে। ঐ যে পিছনে, আরও অনেকখানি পিছনে ঐ উঁচু পাহাড়ের মাথায়। দেখেছ সাদা বরফ কেমন ঝলসে দিচ্ছে চোখ? ওখানে এখনো বরফ। ওখানে এখনো আলো। বরফে আঁধার নামে না কখনো।

ছবিটা তোলা হয়েছিল আমি বরফে চাপা পড়ার পরের দিন। রডোডেন্ড্রনের আগুন যেদিন আর বরফ গলাতে পারল না ঠিক তার পরের দিন। ঐ উঁচু পাহাড়ের মাথায়, বরফের মধ্যে, ছবির মাঝামাঝি উপরের দিকে আমি রয়েছি। ঠিক কোথায় আছি তা অবশ্য বলা কঠিন। অথবা এটাও বলা কঠিন আমার আকার ঠিক কতটা বড় বা ছোট। পাহাড়ের মাথায় বিস্তৃত বরফের উপর রোদ পড়ায় চোখ ঝলসে যায়। কিন্তু যদি তুমি যথেষ্ট সময় নিয়ে খুঁটিয়ে দেখ শেষ পর্যন্ত আমায় দেখতে পাবে। পাবেই।



ঋণ: মার্গারেট অ্যাটউড