এক বিজন চুড়োয় পুনরুত্থান; হ্যামিলনের মাউথঅর্গ্যানে

আসমা অধরা



দিনে দিনে কবিতাবৎ কিছু লিখতে গিয়ে ন্যুব্জ হয়ে যাই প্রেমে। অনুভবের ভেতরে বাজতে থাকে ফিফথ্ সিম্ফনি চরম মুহূর্তে কেমন ঘেমে ওঠে অর্কেস্ট্রা, এইসব সুরযাদুকর। সুরের সাথেই আরোপিত প্রাচীন প্রেম আমার, সেই সুরের কথায় মগ্ন হলেই প্রবল মৃত্যুভীতি হয়। প্রেম, সুর এবং মৃত্যুর সখ্যতা তীব্র বলেই জোছনা এই তিনকেই প্রোরোচিত করে। কাছে টানে যে মায়া, সেই মায়াতেই বিচ্যুত হয় প্রাণ। এমন বিনাশী অবিনাশী চন্দ্রালোকে দৃঢ়তর হয় ঈশ্বরপ্রতীক, মন দ্রবীভুত হয় তরলে আর তখনি, ঠিক সেই সময়েই কোন এক ব্যালকনিতে বসে থাকা ক্ষীণদৃষ্টির যুবক তার মোটা কাঁচফ্রেমের চশমায় দুলে দুলে পড়ে লোরকার কবিতা।

এমন সব কথা ভবতে ভাবতে বয়স বেড়ে গেল; পরিবর্তিত রঙের চুলে মেহেদীর রঙ গাঢ় হয়। অথচ প্রকৃতির ওসব কিছুই লাগেনা। যে পাহাড় নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে, তারও না। ও নীল পাহাড়! তোমার বয়স কতো? রুপোলী ফিতের জালে দেখে যাই কুয়াশায় ঢাকা চুড়ো। হার্ট সার্জারীর আগে ছিমছাম সুদর্শন ডাক্তার এলো, এমন পরিপাটি যে দেখলেই আমার ছেলের কথা মনে পড়ে যায়। মৃদু হাসে সে। তাকে ডেকে বলি, ও ডাক্তার, তোমার স্টেথো বসিয়ে দ্যাখতো ওই পাহাড়ের খাঁজে, বয়সটা কি বোঝা যায় কিনা!

জীবন নদীতে প্রাণপণ ডুবসাঁতার। সারাজীবনের স্বপ্ন নীল পাহাড়ের চুড়ো। তাই শ্বাস প্রশ্বাসে প্রতিদিন ভাঙ্গছি টিলাসমূহ, খানা-খন্দ। তবুও ডাকে ঝুরো মাটি গড়ানো পাহাড়ের ঊর্ধ্বগামী পথ আর লেবুফুলের ঘ্রাণ। ঐ পাহাড়ের উপর এক কামরাঙ্গা গাছের টিয়াপাখীর দল, শেষ দুপুরের আলোয় যারা বেগুনী ফুল ঝরায়। সেই পাতার বাঁশীর শব্দে একরাত নীল চাঁদোয়ায় মৃত মাছেদের চোখের মতো আকাশ দেখা শুকনো ঝর্ণার পাশে। অথবা রোদসঙ্গমে- ইচ্ছেদের বনবাস কেবল একবার এক অন্যজীবনের গল্পের মতো।

কোথাও সুর্যোদয়ের পাহাড় চুড়ো নেই, নেই কৃষ্ণচূড়ায় ছাওয়া পথ। শেষ বৃষ্টিতেও যার ওড়নার রং ধুয়ে ওঠেনি কোনও লন্ড্রি মেশিন। আমার কোন জারুল বনও নেই তবুও বেগুনী উত্‍পাদন করেই চলে আলট্রা ভায়োলেট রে, দুরন্ত উত্তাপে চামড়ার নীচে বাড়ে মেলানিন হরমোন । সেই ছাতিমের ডালেডালে চড়ুই নাচে না, কাঠবেড়ালীর খসে যাওয়া লেজও দেখেছিলাম; বিষন্ন ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েও মৃত্যু নেই, বয়ে যাওয়া খরপোশ আর হিসেবের খাতা।
নিশ্চুপ সোয়ালো হা করতেই পলিফোনিক অরগ্যানে বাজতে থাকে মিয়ানমারের বাঁশি। এদেশেও চাঁদ পারস্যের রাতের মতোই রহস্য ঝরায় কুয়াশায়। হাতের মুঠোয় সিরিয়ার স্বর্ণ মূদ্রা আর বুকে সিংহল সমূদ্রের বাতাস পুরে রেখে অবসাদে কেঁপে ওঠে জীবন। বাঁ কররেখায় থাকে এক ক্ষ্যাপা যাদুকর, তিনি সব পারেন। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কাজ নেই তাই পৌরণিক সিংহাসনে বসে চোখের ইশারায় ভাঙ্গেন, গড়েন। এভাবে নিজেকে ভেঙ্গে গড়ে বেঁচে থাকবারই বা কি দরকার! এ দেশে প্রেম নেই, প্রীতি নেই। ঘর গুলো সব গড়ের মাঠ; তাতেও আবার কোন সন্মুখ সমর নেই- কেবল মনে মনে গৃহযুদ্ধ। বাদবাকী যা আছে তাতেও অবাক করে দেবার মতো একটুকুও আনন্দ বা বিষাদ নেই। সব ঘরে বাতি নিভিয়ে আসার পরে নিজেকে আস্তে করে অন্ধকার করে দেবার একটিও সুইচ নেই।

জেগে থাকার গল্পগুলো জানা হয়না, বলা হয়নি বলেই। বা, ম্লান অন্ধকারে সাঁতরে আসা অস্থির বিষন্নতার অন্যপাড়। হাতড়ে হাতড়ে আঁকড়ে ধরা স্মৃতি- হলদে কৃষ্ণচূড়ার মতো সেই ফুলগুলো যত্ন করে রাখি বিদায়ী সিঁড়িতে। তবুও ওগুলো এখন বিভত্‍স অশ্লীল ভাবে সুখের প্রতিধ্বনি করে। দুঃখ পোড়ানো তাপে, পোহাতে ইচ্ছে করে ভালবাসা- প্রিয় মৌনতায়, উপচে পড়া একান্ত রজনী। পরিব্রাজকের মতো, পরিযায়ী পাখী হয়ে তৃষ্ণার্ত অবলম্বন খুঁজে ফেরা, তবুও নিবারনের জলীয় উপাদান সব পিড়ামিডের ভেতর মমিদের পাশে মদের বোতলে বন্দী। খাঁ খাঁ আকাঙ্খায় অপেক্ষার বালিঘড়ী তিরতিরে সময় ঝরিয়ে চলে যায়।


তবুও তৃষ্ণারা জেগে থাকে সাথে... জল চায়, জল চায়! বয়ে চলে, ছুটে যায় এক সমূদ্রে এক নদী । ডুবসাঁতারে পাড়ের হদিস নেই, নেই হরিণঘাটার বাঁকের সন্ধান। জানে নাই মাঝি তবুও হাতের পাঁচ আঙুলে আঙুল রেখে ভাললাগা দিয়ে যাই; দেখে যাই হু হু বাতাসে বেহালা বাজায় মাঝরাতের রুপোলী চাঁদের আলো। আহা, কেন বাঁশী বাজাতে জানিনা, পঞ্চমীর জোছনায় দু'টুকরো হয়ে গেলে চন্দ্রমা; আমি চুম দিয়ে যাই সে দ্বিখন্ডিত ভেজা চাঁদে।
দিনপাহাড়ের ভাবনা নিয়ে রাতদুপুর অব্দি দৌড়ে চলা, কচ্ছপের গর্ত থেকে প্রাচীন গুহায়, সিম্বলিক হতে চাওয়া অসাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। এমন সব কিছুই খেয়ে নেয় ঘুমবাড়ী, তারপর সোল্লাশে নাচ জুড়ে দেয় পেটফুলো বামনের মতো। বিবিধ শর্তাবলীর সুতো ছাড়তে ছাড়তে চলে যায় মন্থর শামুক। লুপ্তাক্ষরের মতো লীন হয়ে যেতে যেতে বিজন পাহাড়ের চুড়োয় বসে মাথা দোলাই, পা দোলাই। পুনরুত্থানের ঠিক আগের মুহূর্তেই বেজে ওঠে ঘর পোড়া সাইরেন। শৈশব সমুদ্রের ছুটির ঘন্টা বাজে, উড়ে যায় নীল কাছিমের দল। মন্ত্র ভুলে গিয়ে বিষণ্ণতার গীত গাইতে গাইতে মাথা নাড়ে ন্যাড়া দাঁড়কাক।

পালিয়ে যাবার আগে, যতগুলো শতাব্দীর ইতিহাসে ভারী হয়ে আছি, সেখান থেকে সুতীক্ষ্ম উড়ন্ত ব্লেডের আঘাতে কিছুটা ঝরে যাক। তারপর রাত হোক মখমলের সূজনী, রাত হোক মহুয়ার আতর। এক প্রস্তরযুগে গেঁথে যাবার পর, নিজের ভেতর থেকে ভেঙে গুড়িয়ে দেই কংক্রিট আস্তরন। ধীরে ধীরে আরো মানবীয় হয়ে উঠি এইসব গুপ্ত সন্ত্রাসের কালে। তারপর জীবন গোলাপী জারবেরা, জীবন দিলরুবা বাতাস।

এইসব একা একা গাছেদের দেশে, ভালোপাহাড়ের ছায়ায় কেবল অজীর্ণ হয়, এই যে শুকিয়ে আসা রক্ত আর হাড়ের ভেতরে কমতে থাকা ক্যালসিয়ামের কালশিটে- মরে যাবার পরে সব মাটি। তারপর এক বরফের দেশ, তারপর মাউথঅর্গ্যান।