পাহাড়প্রমাণ

অর্ক চট্টোপাধ্যায়



পাহাড় দেখলেই লোকটার চড়তে ইচ্ছে করতো। না চড়া অব্দি শান্তি পেত না। পাহাড়ের সুবিধাহলো তা পর্বত নয়। টিলা এমনকি পাহাড়ও চেষ্টা করলে হেঁটে মেরে দেওয়া যায়। লোকটার শিখরারোহণের আকাঙ্খার পেছনে হয়ত অবদমিত কাম ছিলো! মেন লাইক টু বি অন টপ!অনেকদিন আগে একটা বইয়ে পড়েছিল পুরুষের পাহাড়ে ওঠার মধ্যে একটা অর্গাজমিক প্লেজার কাজ করে। লোকটা ছুটি পেলেই হিমালয়ে ছোট ছোট ট্রেকিংয়ে বেরিয়ে পড়ত: রিশপ, ভারসে ইত্যাদি। বিহার ছত্তিসগড় অঞ্চলে যে সব জায়গা বিশেষ করে টিলাময় সেগুলো ওকে খুব টানতো। টিলা চড়তে চড়তে ওর অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ত। গালুডি, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ, কাঠিকুন্ডাইত্যাদি। টিলার ছাদে উঠে দাড়াত যখন ততক্ষণে লোকটার মনের ভেতরেও স্মৃতির কথা-দৃশ্যমিলিয়ে একটা ছোটখাটো টিলা-পাহাড় গজিয়ে উঠেছে। লোকটা যত পাহাড়ে উঠতো, তার স্বপ্নগুলোয় ততই একটা উলটপুরাণ দেখা দিতো। স্বপ্ন দেখতো সে বিছানায় শুয়ে আছে আর বাড়ির দেওয়াল ভেঙ্গে একটা পাহাড় আস্তে আস্তে তার গায়ের ওপর চড়ছে। এভাবে সে যত পাহাড়েউঠতো, ততই স্বপ্নে তার উপর উঠে আসতো একটা পাহাড়।

একটা পাহাড়ে চড়তে চড়তে আরেকটা পাহাড়ের কথা মনে পড়ত লোকটার। দেওঘরে ত্রিকূট পাহাড়ে চড়তে গিয়ে ম্যাসাঞ্জরের টিলার ওপরকার ইউথ হোস্টেলটা দেখতে পেত সে। তখন তার ইউথ কই? সে তো নেহাতই ছোটবেলা। একবার বাবা-মার সাথে আর একবার মা যে ইস্কুলে পড়াত তার বাচ্চাদের সাথে গিয়েছিলো ম্যাসাঞ্জর। আর মা মারা যাবার পর বাবার থেকে শুনেছিলো কলেজ ট্রিপে ওরা সবাই এসে ওই পাহাড়ের ওপরেই ছিলো। সেদিন রাতে পাহাড়ের ওপর গান হয়েছিলো: 'মনে হলো যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ, আসিতে তোমার দ্বারে' সেই নাকি তার বাবা-মার প্রেমপর্বের সুত্রপাত। একথা শোনার পর লোকটার মনে হয়েছিলো, পাহাড় তার জন্মে আছে, অন্ধকার ঘরে রাখা তার আম্বিলিকাল কর্ড, খোদ কুম্ভ মেলাতেও যা হারিয়ে যায়নি।

এভাবেই পাহাড় চড়তে চড়তে নানা হাবিজাবি কথার পাহাড় চড়ে বসত মাথায়। যেমন সেবার ভারসেতে, ডিসেম্বরে তখন রডোডেনড্রনহীন রডোডেনড্রন উপত্যকা। বর্ষশেষের যৌবন লোকটার। ভারসে যাবার আগের দিন যখন মার রক্তবমির খবর আসে, তখন ফেরার উপায় ছিলোনা আগামী দুদিন। পরের দিন ভারসে ট্রেক করার সময় তাই বন্ধুদের মধ্যেও একা হয়ে পড়েছিল লোকটা, নিজের দুঃখে একা। মায়ের রক্তে লাল ছিলো রডোডেনড্রনহীন রডোডেনড্রন উপত্যকা।সময়ে সময়ে নামিয়ে রাখা রুকস্যাক আর জলের বোতলের পাশে পাহাড়ে সেদিন অবিতরণীয় মৃত্যুর একাকিত্ব নেমেছিল, পাহাড় যাকে লালন করেই বড় হয়েছে।

তারপর আরেক পাহাড়ে উঠতে উঠতে বুরুডি ড্যাম থেকে লালমাটির পথে শুকনা পাহাড়ে ওঠার স্মৃতি। একটা পাহাড় পেরোলে মিলিটারী ক্যাম্পে ঘেরা অর্ধভূক্ত বসডরা গ্রাম যেটা ছাড়িয়ে লোকটা আর তার বন্ধু ধারাগিরি জলপ্রপাত দেখতে গিয়েছিলো। ফেরার পথে গ্রামের কয়েকটা বাচ্চা পেছনপেছন আসতে আসতে বলেছিল: 'টাকা না দিলে তোদের ভূতে খাবেক'। টাকা তো দ্যায়নি তাই ভূতেই হয়ত খেয়েছিলো লোকটাকে। লালমাটির ওপর চকচকে কয়েনের ঝিলিকের মত শেষ আলোয় বুরুডির জলে শুকনা পাহাড়ের ছায়া চকচকিয়ে ছিলো সেদিন।

এইভাবেই লোকটা একদিন বুঝতে পেরেছিল পাহাড় আসলে আর কিছু নয়, শুধুই মাটির দুঃখ। সমতলের আনন্দ ছেড়ে মাটি যেখানে যেখানে গহীন মনের অজ্ঞেয় কোনো বৈকল্যে ভুগেছে,সেখানে সেখানেই সে কুঁকড়ে দলা পাকিয়ে টিলা-পাহাড় হয়ে উঠেছে। মাটির ওই বক্রতা আর উত্থান শত সহস্র আলোকবর্ষ আগেকার পৃথিবীর দুঃখের কাহিনী। যে দুঃখ এতগুলো আলোর বছর পেরিয়ে এসে লোকটাকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলছে। দুঃখের এই স্তূপ উজিয়েই তার জীবন আর উজানে মৃত্যু।

লোকটা যেদিন একথা বুঝতে পারলো সেদিন রাতের স্বপ্নে দেখলো, সে বিছানায় শুয়ে আছে আর দেওয়াল ভেঙ্গে একটা পাহাড় এসে তার ওপর চড়ে বসছে, তাকে আদর করছে। সেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসছে একটা মেয়ে। অন্ধকারে যার মুখ দেখা যাচ্ছে না ভালো করে। তবে স্বপ্নের অন্ধকার তার অঙ্গসৌষ্ঠব গোপন রাখতে পারেনি। পাহাড়টা যত লোকটার ওপর উঠছে, মেয়েটিততই নীচে নেমে আসছে। নীচে, আরো নিচে। উত্তেজনায় লোকটার লিঙ্গ ঠাস হয়ে গ্যাছে আর মেয়েটি তার উৎসৃত লিঙ্গ দুহাতে বেষ্টন করে মাটি-টিলা-পাহাড়ের দুঃখে অঝোরে কেঁদে চলেছে।মেয়েটির চোখের জল আর লোকটার জারণরস মিশছে তার নিম্নাঙ্গের উত্থানে। তার শরীরের সমতলে একটি সাশ্রু পাহাড় স্থানু হচ্ছে অন্ধকারে। পৃথিবীর দুঃখে বিলীন হয়েছে চরাচর।