সর্বংসহ

মালিনী ভট্টাচার্য.



আমাকে এই পৃথিবীর সকলেই চেনে। আমার মাথা সবচেয়ে উঁচু— গগনস্পর্শী। প্রত্যেকের মতো আমিও আবির্ভূত হই এক লবণাক্ত সাগরের গহ্বরকে উথাল-পাথাল করে। অনেকের মতো আমার জন্মদাত্রীও উধাও হয়ে যান। মাতৃসুধার স্বাদ আমি পাইনি। তাই বোধহয় আমি এমন কর্কশ, এমন কঠিন। আমার শরীর পাথরের, মন হিমের। আমি হিমানী আবৃত। হিমানী আমার চিরসঙ্গিনী, আমার মর্মসহচরী। আমার মতো অনেক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী সে। আমাদের সন্তান-সন্ততি অনেক বর্ণের, অনেক ধর্মের। কখনো তাদের নাম হিন্দুকুশ, কারাকোরাম, শিবালিক, কখনো বা মানস, কখনো গঙ্গা-যমুনা-সাংপো। এরা কেউ কঠিন, কেউ ধীর, কেউ চঞ্চল। লতায়-পাতায় জ্ঞাতি-কুটুম্বও কম নয়। বিন্ধ্য, আরাবলী, সহ্যাদ্রী, গাড়ো, খাসি, জয়ন্তিয়া। আমি যেন এক বিরাট যৌথ পরিবারের বৃদ্ধ পিতামহ। কলিকালের নিয়ম আমাদের ক্ষেত্রে বোধহয় জন্মলগ্নেই প্রয়োগ হয়েছিল— আমাদের জ্ঞাতি-কুটুম্ব সকলেই প্রবাসী; বিভিন্ন সভ্যতা ও রাজ্যপাট স্থাপনে তাদের বিশাল ভূমিকা। তারা ফেরে না। ফেরার উপায়ও নেই। আমরা যে চলচ্ছক্তিহীন। তাই এই নির্জন নিঃসঙ্গতায় আমার একমাত্র সঙ্গিনী হিমানী। আমার উপর ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতো সে বর্ষিত হয় অবিরত। সে যখন তার সাদা পলিত কেশ মাথা আমার বুকে রাখে তখন বড় নিশ্চিন্ত বড় ঠাণ্ডা মনে হয়। পরস্পরের কানে ফিসফিস করে আমরা মনে করি অতীতের ইতিহাস।

যে চরম সংঘাতের মধ্যে আমার জন্ম হয়েছিল যা তা এখন লক্ষ লক্ষ বছরের অতীত। এর মধ্যে কত কত শতাব্দী চলে গেছে। কত পদচিহ্ন পড়েছে আমার সর্বাঙ্গে। আমি সুস্থির, ধৈর্যশীল, সহিষ্ণু। আমার পায়ের কাছে যে ঘন বনানী সবুজ আঁচল মেলে শুয়ে আছে তার গভীরে আমি আশ্রয় দিয়েছি দুষ্প্রাপ্য সব বৃক্ষ, গুল্ম ও প্রাণীদের। আমার বৃহৎ শরীরের নির্জন কন্দরে যুগে যুগে আশ্রয় দিয়েছি তপস্যারত মুনি ঋষিদের। আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের খাঁজ বেয়ে কত মানুষ পারাপার করেছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে। ব্যবসায়ীরা নিয়ে গেছে রেশমের পসরা। ধার্মিকরা শালগ্রাম শিলা। বৌদ্ধরা পেয়েছে নির্বাণ। কখনো ভ্রমণ-পিপাসুর দল লুটিয়ে পড়ে বুক ভরে নিয়েছে ফুলের উপত্যকার ঘ্রাণ; কখনো পর্বতারোহীর দল কাঁধে-পিঠে এমনকি মাথায় চড়েছে আমার। তাদের দস্যিপনায় বৃদ্ধ পিতামহের মতোই আমোদ অনুভব করেছি আমি।

তবে ক্রমে ক্রমে দিনকাল বদলেছে। নতুন একটা শব্দ শুনলাম— সীমানা। কার ভাগে আমার ধড়, কারই বা ভাগে আমার মুণ্ডু তাই নিয়ে চলেছে চুলচেরা হিসাব। হাসি পায়, বিরক্তও লাগে। যাদের বালখিল্য আয়তনের তুলনায় আমি মহীরুহ তারা আমায় ভাগ করে কোন স্পর্ধায়! কিন্তু আমি নির্বাক। ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা ঈশ্বর আমায় দেন নি। একদিন দেখলাম যীশুর মতো আমারও শরীরে গেঁথে দেওয়া হল কাঁটাতার, রাস্তা বানানোর জন্য ডিনামাইট ফাটল, আর আমার গা মুড়ে দেওয়া হল লৌহজালে। তারপরে সেই সীমানা নিয়ে শুরু হল নোংরা রাজনীতি ও গুপ্তঘাতকতা। আমার শ্বেত শরীরে নিয়মিত ভাবে পড়তে থাকল রক্তের ছিটে। সে রক্ত সেনানীর না জেহাদির তা আমি জানি না। শুধু জানি সেই রক্তের চটচটে ভাবে অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যায় আমার সারা শরীর। আরও আরও লোভের কারণে ক্রমশ নাশ হতে থাকে আমার কোলে বনস্পতির দল ও জীবজগৎ। আপনহারাদের যন্ত্রণায় ছটফট করি আমি। রাগের উত্তাপে গলে পড়ে হিমানী। মানুষের অভিধানে ধ্বস অথবা হড়পাবাণ ঘটিয়ে আমরা হই নরহন্তা। ওরা ভাবে না প্রয়োজনের অনুপাতে অধিক চাইতে চাইতে কি ভাবে বিনষ্ট করছে আমার সার্বিক সম্ভ্রম। আনাচে-কানাচে আবর্জনা, দুর্গম থেকে দুর্গমতর এলাকায় ক্যাম্পফায়ারের দহন, বৃদ্ধ কাঁধে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বহুতলের ভার। তবু মুখ বুজে সহ্য করি সবই। অভিযানে এসে দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় যাদের তাদের হিমানী নিজের আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখে পরম মমতায়।

মাঝেমাঝে বড় ক্লান্ত লাগে। মাঝেমাঝে মনে হয় এই সহিষ্ণুতা চরম মুর্খামি। ইচ্ছে করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠি। ধ্বংস করে দিই ক্ষুদ্র প্রাণীদের স্পর্ধিত প্রয়াস। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে পারি না। আমি যে পিতামহ। ভীষ্মের মতো শরশয্যায় শুয়ে হলেও এই অধর্ম, এই অনাচার এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যত প্রাণের সৃষ্টি করেছি তাদের নিরন্তর বিনাশদেখে যেতে হবে। তবে এও নিশ্চিৎ যে একদিন আমি চিরবিশ্রামে যাব। হিমানীকে বুকে নিয়ে সীতার মতো ডুব দেব মাতৃজঠরের নিরাপত্তায়। সে দিন পৃথিবীর মানচিত্র বদলে ফের উথলে উঠবে টেথিস মহাসাগর। সেদিন মানচিত্র থেকে মুছে যাবে এক অস্তিত্ব যার নাম হিমালয়।