হিমায়িত

ইন্দ্রনীল বক্সী



নিথর –নিস্তব্ধ চরাচরে আবছা হয়ে আসছে ক্রমশ দিনের আলো । চারিদিকে জন-মানবহীন রুক্ষ কঠিন শিলা-প্রান্তর । তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ অপার গাম্ভীর্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রবলভাবে । স্থানিক পরিমণ্ডলে বিরাজ করছে এক অদ্ভুত অসহ্য নিস্তব্ধতা । শুধু গাড়োয়াল হিমালয়ের এই নির্জন সুউচ্চ স্থানে বয়ে চলেছে শুষ্ক হীমবাতাস ,বুঝিবা কিছু তুষার-কণা বয়ে চলেছে বাতাসের প্রবাহে । দূর থেকে লক্ষ্য করা যায় এক সু-দেহী ,দীর্ঘকায় পুরুষ, নিবিষ্ট চিত্তে একটি বৃহৎ শিলা খণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে সামনের গিরিখাতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ... নিচে ,বেশকিছুটা নিচে ,চারিদিকে পর্বতের বেষ্টনীর মাঝে যে বলয় তৈরি হয়েছে সেখানে রয়েছে এক অপূর্ব গিরি-হ্রদ । তারই দক্ষিণে সারি-বেঁধে রয়েছে অপূর্ব বর্ণময় শামিয়ানা ,তাঁবু । প্রবল বাতাসে পত পত করে উড়ে চলেছে তাদের শীর্ষে থাকা রাজধ্বজা । কেঁপে কেঁপে উঠছে এমনকি ভিতরের চমরী গাইয়ের চর্বির প্রজ্জ্বলনমান বৃহৎ প্রদীপের আলোও । বাইরে অগ্নিকুণ্ড ঘিরে বসে রয়েছে বেশ কিছু অসমবয়সী যুবা-পুরুষ । আগুনের শিখার আলো তাদের কর্মঠ পেশীবহুল মসৃণ শরীরে ঠিকরে পিছলে যাচ্ছে , বাতাসের তোড়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে কুণ্ডের লেলিহান শিখা ।
বিশাল শিলা খণ্ডের উপর দণ্ডায়মান সু-দেহী পুরুষটি এবার মুখ ফিরিয়ে তাকালেন উপর থেকে নিচে শিবিরের দিকে । এবার এই পড়ন্ত আলোতেও তাঁকে চেনা যাচ্ছে , তীক্ষ্ণ শ্যেন দৃষ্টি , ধারালো মুখের অভিজাত পুরুষটি আর কেউ নয় কহ্নকুব্জরাজ যশধাওয়াল ...

আজ একই সঙ্গে রাজা যশধাওয়ালের একরকম তৃপ্তি ও উদ্বেগ এই দুই আবেগের স্রোত চিত্তচাঞ্চল্য ঘটাচ্ছে । নিবিষ্ট মনে তিনি লক্ষ্য করছিলেন পরবর্তী যাত্রার গিরি পথের নির্দেশ ,এখনও বহু যোজন দূর তাঁর এই রাজ জট যাত্রার অভীষ্ট লক্ষ্য , বহু দুর্গম পথ এখনও অতিক্রম করতে হবে গন্তব্যে পৌঁছতে । ঐদিকে ওই অসংখ্য আবছা তুষার মণ্ডিত গিরিশৃঙ্গের মধ্যে কোন একটি দেবীর আবাস ,ওনাকে ,ওনাদের যে পৌঁছতেই হবে সেই পবিত্রে শৃঙ্গের পাদদেশে –হেমকুণ্ডে ।
সামনে আজ এই বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ত্রিশূল পর্বত যেন পথ আগলে নির্দেশ করছে আগামী দুর্গমতার , হিমেল তুষার বাতাস যেন বয়ে আনছে তুমুল ঝঞ্ঝার বার্তা । রাজা যশধাওয়ালের মুখ আরও কঠিন হয়ে ওঠে । না: তাকে পারতেই হবে , এই জন-মানবহীন , প্রাণহীন দুর্গম গিরি-প্রান্তর অতিক্রম করতেই হবে , যতই কঠিন হোক,যতই নির্দয় হোক সে যাত্রা ।
নিচে লক্ষ্য করতে থাকেন তাঁর লোক লস্কর , স্থানীয় গাড়োয়ালি বাহকেরা দূরে হ্রদের কিনারায় অগ্নিকুণ্ডের চারিধারে বৃত্তাকারে বসে উত্তাপ সংগ্রহ করছে । নিজেদের মধ্যে অনুচ্চস্বরে হাসি-মস্করা করছে কেমন নিশ্চিন্ত মনে । বাঁ দিকের শেষতম শিবিরটি রন্ধনশালা , পাচকেরা অনেকক্ষন থেকেই রান্নার কাজে নিযুক্ত , তাদের দায়িত্ব নিতান্ত কম নয় অন্তত তিন-শতাধিক যাত্রী , যার অধিকাংশ পুরুষ , সৈন্য , ভৃত্য , বাহক । আরও একটি তুলনায় ছোট রন্ধন শিবির রয়েছে যেখানে রাজা-রানী ,রানীর ব্যক্তিগত সহচরী , নর্তকী ও বাদকদের জন্য নির্দিষ্ট । আরও রয়েছেন চার জন কহ্নকুব্জীয় ব্রাম্ভন রাজ-পুরোহিত ,যাঁরা নিজেদের রন্ধনের ব্যবস্থা করে নিয়েছেন পৃথকভাবে । মধ্যের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ শিবিরটি রাজা যশধাওয়াল ও তার প্রিয়তমা রানী বালম্পার ।
অপরূপ ভয়ংকর এই গিরিশ্রেনী বেষ্টিত স্থানে নিতান্তুই ছোট একটি জনপদের সৃষ্টি হয়েছে রাজা যশধাওয়ালের এই রাজ জট যাত্রার শিবিরে । এই নিথর প্রাণহীন হীমপ্রান্তরে অকস্মাৎ এই সমাগম নিতান্তই যেন বিঘ্নিত করছে গাড়োয়াল হিমালয়ের প্রবল গাম্ভীর্যকে ।

“রাজন” ...যাত্রী চার রাজ-পুরোহিতের অন্যতম আচার্য বল্লদেভের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলেন রাজা যশধাওয়াল ।
“বলুন আচার্য ! কি মনে করে ?”
“ রাজন এখনও পর্যন্ত ,সেই যাত্রার দিন থেকেই বিধি ও তিথি নির্দিষ্টভাবে আমরা পথ চলেছি ... এবং এ যাবত যাবতীয় বাধা ও দুর্গম পথ আমরা প্রায় নিরাপদেই অতিক্রম করতে পেরেছি , শুধু ...ইতর-শ্রেণীর তিনজন স্থানীয় মালবাহক ও একজন ভৃত্য পথেই মৃত ,যা ধর্তব্য নয় । আমার আবেদন আপনার কাছে আগামী পথও যাতে আমরা নির্দিষ্ট ভাবে অতিক্রম করতে পারি তার প্রস্তুতির নির্দেশ দিন আপনি । আগামীকাল প্রথম প্রহরেই যাত্রা শুভ হবে –এমনই আমাদের বিচার ...”
“ সে ঠিক আছে আচার্য , আমি মালবাহকদের সর্দার ও সেনাদের সেই নির্দেশই দিচ্ছি রাত্রি আহারের পর ... কিন্তু আচার্য...” এতদূর বলে রাজা যশধাওয়াল নীরব হয়ে গেলেন , গভীরভাবে কিছু ভাবতে লাগলেন ।
“ বলুন রাজন ... কি দ্বিধা আপনাকে বিচলিত করছে ! ”
“আচার্য ...ঘুরেফিরে আমার জট যাত্রার প্রাক্কালে প্রধান রাজ পুরোহিত আচার্য মন্দভার কথাগুলি মনে পড়ছে ! ...”
আচার্য বল্লদেভ নিশ্চুপ থাকেন । তারঁও স্মৃতিতে স্পষ্ট সেদিনের কহ্নকুব্জের প্রাধান রাজ-পুরোহিত ও বয়োজ্যেষ্ঠ মন্দভার কথাগুলি ...
রাজ জট যাত্রার বিপুল আয়োজন , লোক-লস্কর , ভৃত্য , নর্তকীর সমাবেশ দেখে আচার্য মন্দভার ভীষণ আশ্চর্য ও ক্ষুব্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ রাজা যশধাওয়ালের কাছে গিয়েছিলেন সঙ্গে আরও কয়েকজন রাজ পুরোহিত ,যাদের মধ্যে বল্লদেভও ছিলেন । রাজা তখন বিশ্রাম কক্ষে । ভৃত্য গিয়ে বলাতে কিঞ্চিৎ বিরক্ত বোধ করলেও প্রধান পুরোহিত মন্দভার সম্মানে তিনি বাইরের অপেক্ষা-কক্ষের দিকে গেলেন । কক্ষে প্রবেশ করতেই অপেক্ষারত ক্ষুব্ধ জ্যেষ্ঠ ব্রাম্ভন অভিবাদন পর্বের পরেই উল্লেখ্য করেন তাঁর অসময়ে অন্দরমহলে আসার কারণ...
“ একি দেখছি রাজন ! ...এই বিপুল আয়োজন , নর্তকী!! ... আপনি কি জানেননা পবিত্র ভূমিতে জট যাত্রার কিছু বিধি আছে ? ...যা অলঙ্ঘনীয় !! ”
রাজা যশধাওয়াল সোজা হয়ে দাঁড়ালেন , তাঁর মুখাবয়ব কঠিন হয়ে উঠল ...
“বলুন ...শুনছি ”
“ ...এমনকি শুনলাম আপনি রানী বালম্পাকেও নিয়ে যাচ্ছেন ? যতদূর জানি উনি সন্তান সম্ভবা ! ... না না এ আপনি ঠিক করছেন না , দেবভূমিতে যাত্রা শুধুমাত্র পুণ্যের অভীষ্ট লক্ষ্যে ,কৃচ্ছতাসাধনই তার একমাত্র পথ ... আমোদ প্রমোদ নয় ... এ এ আমি মানতে পারছি না রাজন ...কিছুতেই মানতে পারছিনা ...”
আচার্য এতদূর বলার পরেই রাজা যশধাওয়াল হাত তুলে থামতে বললেন তাঁকে নিতান্ত ক্রুদ্ধ অভিব্যক্তি সহ ...
“ থামুন আচার্য ! ... আমি জানি দেবভূমির বিধি ... কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে বিধি সর্ব সাধারণের জন্য সে বিধি রাজন্যদের জন্য নয় ... এই যাত্রার নাম ‘রাজ জট যাত্রা’ ..মা নন্দা-দেবী দর্শনে যাচ্ছে কোনও সাধারণ তীর্থযাত্রী নন ...কহ্নকুব্জরাজ !! সমারহো তো নিশ্চিত ! আর রানী!! এ যাত্রা তো তাঁরই জন্য , তিনি বাদ যাবেন কি করে !! ...”
রাজা যশধাওয়ালের এরূপ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে স্তম্ভিত হয়ে যান প্রধান পুরোহিত ... তাঁর মুখ আপমানে রক্তিম হয়ে ওঠে ...
“ কিন্তু রাজন ...এই নর্তকী-দল...!” পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আচার্য মন্দভার এক শিষ্য বলে ওঠেন ।
তার দিকে তীব্র তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রাজা আবার বলে ওঠেন ...
“আপনি কি জানেন না মহোদয় যে রাজা যেখানে গমন করেন তাঁর সঙ্গে তার রাজ উত্তরীয় ,অলংকার ,তার বিলাস-ব্যাসনও যায় !! ...”
এরপর আর কেউ কোন শব্দ উচ্চারণ করেন না সমবেত ব্রাম্ভনেরা । প্রধান পুরোহিত শুধু ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন রাজার দিকে, অনুচ্চস্বরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে ধীরে ধীরে শুধু বলেন ...
“ রাজন ... এ আপনার ঈপ্সা , আপনার মনোবাসনা ... রানী বালম্পার পিতৃরাজ্য নন্দা দেবীর ক্রোধে জর্জরিত ,তাই আপনি এই পবিত্র যাত্রার আয়োজন করেছেন । আমার কর্তব্য রাজা ও রাজ্যের মঙ্গল কামনায় যাতে কোন বিধিগত ত্রুটি না থাকে তাই দেখা ... কিন্তু এরপর এ শুধুই আপনার প্রমোদ ভ্রমণ হতে চলেছে বুঝতে পারছি তাই আমার অন্তিম পরামর্শ আপনাকে ... যাবতীয় দুর্যোগের জন্য ,অশুভ পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকবেন ... ” এতদূর বলেই দ্রুত পায়ে প্রধান পুরোহিত স্থান ত্যাগ করলেন । তারঁ বলে যাওয়া শেষ শব্দগুলি অপেক্ষা কক্ষে অনুরণিতহতে থাকল , প্রধান পুরোহিতের কন্ঠস্বরে এমন কিছু ছিলো যাতে রাজা যশধাওয়ালও স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত । তাঁর চেতনার গভীরে প্রথিত হয়ে রইল শব্দগুলি ... আচার্য মন্দভা কি তাঁকে অভিশাপ দিলেন !! ...নাকি এ তাঁর সতর্কবাণী ! সেইদিন থেকে প্রধান পুরোহিত আচার্য মন্দভাকে আর দেখতে পাননি রাজা যশধাওয়াল , এমনকি যাত্রা শুরু অন্তিম লগ্নেও নয় । কিন্তু দীর্ঘ –দুর্গম যাত্রাপথে মাঝে মধ্যেই ঘুরেফিরে সেদিনের প্রধান পুরোহিতের বলা কথাগুলি তাঁর মনকে বিচলিত করে চলেছে আবার পরক্ষনেই সহজাত রাজ রক্তের অহং তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে প্রবল আত্মবিশ্বাস ।

পর্বতে সন্ধ্যা বলে কিছু নেই , সরাসরি রাত্রি নামে । চরাচরে গাঢ় অন্ধকার নেমেছে । সব থেকে বড় শিবিরটি থেকে এখন স্পষ্ট মৃদঙ্গের মধুর লয় শোনা যাচ্ছে । শিবিরের ভিতরে মশাল রয়েছে , রয়েছে কাঠের অঙ্গারের অগ্নিকুণ্ড ,যাতে শিবিরের ভিতরে কিছুটা উত্তাপ থাকে । জমিতে জরির কাজ করা গালিচা পাতা, পিছনের দিকে একটি স্বল্প উচ্চ কাঠের পাটাতনের উপরে পুরু বিছানা ,জরির কাজ করা আবরণ শোভিত । বাঁ দিকে এক সারিতে বাদ্যকররা মগ্ন হয়ে মৃদঙ্গ ও সারেঙ্গীতে সুরেলা আবহ সৃষ্টি করেছে । তাদের সামনেই ফাঁকা অংশটায় জনা ছয় নর্তকী নৃত্য বিভঙ্গে হিল্লোল তুলেছে শরীরে । তাদের নৃত্যরত প্রচ্ছায়া কম্পমান মশালের আলোয় এক অদ্ভুত রহস্যময়তা সৃষ্টি করেছে । বিছানার আসনে অলস ভঙ্গীতে শুয়ে রয়েছেন রানী বালম্পা ,মহার্ঘ অঙ্গবস্ত্র , অলঙ্কার সজ্জিত । স্বাভাবিক রূপের ছটার সঙ্গে মিশেছে আসন্নপ্রসবার অপার্থিব এক বিভা । যাত্রার শ্রান্তি অতিক্রম করে রানী বালম্পার মুখ প্রশান্তি-স্নিগ্ধ ,তৃপ্ত । এক দাসী তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিশ্চল , তার সতর্ক লক্ষ্য শুধুই রানীর দিকে । বালম্পা বেশ উপভোগ করছেন বলেই মনে হচ্ছে । রাজন শিবিরেই রয়েছেন কাছেপিঠে কোথাও ,নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন পারিষদদের , তারা এবার যেন প্রস্তুত হয় আহারের পরেই আগামী যাত্রার জন্য ...
শিবিরের আরেক প্রান্তেও জমে উঠেছে অনভিজাত নাচুনিয়াদের আসর । এই ব্যবস্থা মূলত সৈন্য ও পারিষদের জন্যই । ধীরে ধীরে হ্রদ ঘিরে থাকা সুউচ্চ ত্রিশূল পর্বত মুখরিত হতে থাকে সারেঙ্গী –মৃদঙ্গ –পাখোয়াজের মূর্ছনায় ...নর্তকীদের আশ্চর্য নৃত্যে , সুরাচ্ছন্ন পারিষদ , সৈন্য দের প্রমোদোল্লাস প্রতিধ্বনিত হতে থাকে রুক্ষ পর্বত প্রাকারে ।
রাজা যশধাওয়ালও এতক্ষণে তাঁর শিবিরের নৃত্যাসরে যোগ দিয়েছেন রানীর সঙ্গে । এক ভৃত্য কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাঁকে এক সুদৃশ্য রজতপাত্রে কিছু ফলাদিসহ মদিরা পরিবেশন করতে লাগল । শিবির অভ্যন্তরে জমে উঠেছে চূড়ান্ত উৎসবের পরিবেশ । মহার্ঘ ও স্বাদু মদিরার ঘ্রাণ পরিবেশে মাদকতার স্তর আরও কয়েক প্রস্ত পুরু করে চলেছে । কয়েক পাত্র মদিরা পানের পর রাজা যশধাওয়াল বেশ উদ্বেগমুক্ত লাগছে । তূরীয় আনন্দে রানীর সঙ্গে রঙ্গ রস করতে লাগলেন , নর্তকীরা এবার ভীষণ উত্তেজক মুদ্রায় নৃত্য করতে লাগল , তারাও সম্ভবত এই মাদক পরিবেশের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে ... এক নর্তকী রাজার বেশ কিছুটা নিকটে এসে যোগিনী মুদ্রায় তাঁকে বিমোহিত করার প্রায়াস করতে লাগল , যদি রাজা যশধাওয়াল আজ তাকে কৃপা করে গ্রহণ করেন ... নর্তকী জানে রাজার নারী শরীর সৌখিনতা , তাছাড়া এখন তো উপোষীও ...
রাজা যশধাওয়ালের চোখও মদিরার প্রভাবে রক্তাভ , কামকাতর ...আঃ ... এই দুর্গম যাত্রার ক্লান্তি দূর করার একটাই পথ ...তিনি কামাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ওই উদ্ভিন্ন যৌবনা নর্তকীর দিকে , অদ্ভুত আশ্চর্য তার শরীরি বিভঙ্গ ! ... বিস্ময়কর তার সুগঠিত তনু ... সুডৌল কুচযুগল ... গুরু ছন্দমান নিতম্ব ... যেন আদর্শ ভোগের প্রতিমা !...
মুহূর্ত পার হয় । রানী বালম্পা তির্যক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন মদিরাচ্ছন্ন , কামকাতর রাজা যশধাওয়ালের দিকে । রানী জানেন এরপর কি হতে যাচ্ছে ... সামান্য বিচলিত বোধ করলেও এতে উনি যে অনভ্যস্ত নন তা ওনার দেহভাষা লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় । কিন্তু এমন কেন হচ্ছে ! একটা কেমন অস্থিরতা যেন দানা বাঁধছে ক্রমশ তার শরীরে ...!!
আর এক প্রান্তে প্রবল উল্লাসে মেতে উঠেছে পারিষদ্গন , সৈন্যরা ... নাচুনিয়াদের উদগ্র নৃত্যভঙ্গীমা উত্তেজনার পারদ চরম-সীমায় নিয়ে গেছে । নাচুনিয়ারা নৃত্যের তালে তালে একটা বৃত্তের সৃষ্টি করছে ...আবার ভেঙ্গে গিয়ে দুটি সমান্তরাল সরল রেখায় ফিরে যাচ্ছে । হঠাৎ একজন মত্ত অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পাঁজাকোলা করে এক নাচুনিয়াকে তুলে নিল, নাচুনিয়া মেয়েটি মৃদু বাধা দিতে লাগল । একটা হাস্যরোল বয়ে গেল বাকি দর্শকদের মধ্যে ... এবং একই ইচ্ছে সংক্রামিত হতে লাগল । অনেকেই প্রচণ্ড নেশায় , কামোদ্দীপক নৃত্যের প্রভাবে হিংস্র উল্লাসে চিৎকার করতে লাগল ... হ্রদের চতুর্দিকের পর্বত , তুষার প্রাচীর বিদীর্ণ হতে লাগল আমোদোল্লাসে উন্মত্ত যাত্রীদের সমবেত চিৎকারে ... নৃত্যের ছন্দে ...মৃদঙ্গের লয়ে ... সারেঙ্গীর সুরেলা সুরে ... ভেঙ্গে খান খান হয়ে যেতে লাগল তুষারাবৃত গাড়োয়াল হিমালয়ের অনন্তকালের নির্জনতা ... তার ভয়ংকর সুন্দর গাম্ভীর্য ।

আচমকা বাতাসের শিষের শব্দ পালটে যেতে লাগল মুহূর্তে । তীক্ষ্ণ আওয়াজ বদলে এক প্রচণ্ড গোঁ গোঁ শব্দ ভেসে আসতে লাগল দক্ষিণের ত্রিশূল পাহাড়ারের দিক থেকে । বাইরের যে নৃত্যের আসরে আমোদ উল্লাস চরমে পৌঁছেছিল , তা থমকে গেল মুহূর্তে ... পারিষদেরা , সৈন্যরা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে বোঝবার চেষ্টা করতে লাগল ঠিক কি ঘটছে ... কয়েক মুহূর্ত পার গুর গুর গুর গুর করে আওয়াজটা আরও আরও তীব্র হতে লাগল । এক পারিষদ একজনকে কি নির্দেশ দিতেই সে দ্রুত ছুটতে লাগল শিবিরের একদম মধ্যস্থলের দিকে ।
এদিকে রাজা যশধাওয়ালের শিবিরে তখনও নৃত্য-গীত চলছে । রানীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাসীটি লক্ষ্য করল রানী বালম্পার কপালে এই বরফ-শীতল পরিবেশেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে ...
“আপনি কি অসোয়াস্তি বোধ করছেন ! ... ” বলতে বলতে কপালের ঘাম সে মুছে দেয় ...
রানী নীরবে ‘হ্যাঁ’সূচক মাথা নাড়েন ... তাঁর শরীরে অস্থিরতা প্রচণ্ড বেড়ে গেছে , শরীরের নিচের দিকটা ভারী লাগছে , সন্তানসম্ভবা রানীর স্ফীত পেট ভীষণ শক্ত হয়ে উঠেছে ... ভিতরে প্রচণ্ড ভাবে কিছু পাক খাচ্ছে ...আঃ ...অসহ্য যন্ত্রণায় রানীর গা গুলিয়ে উঠছে...
দাঁড়িয়ে থাকা দাসী দ্রুত গিয়ে তুলনায় জ্যেষ্ঠ আর এক দাসীকে কিছু বলতেই সে ছুটে রানীর কাছে এলো । রানীর কপাল হাত দিল ...আর একটা হাত রানীর নাভিমূলে ...কয়েক মুহূর্ত পেরিয়ে যেতে যেতে সেই দাসীর মুখ ভীষণ উদ্বিগ্ন মনে হল ।
“ মহারাজা ...মহারাজ ...” প্রথমবারে মৃদু ডাকে রাজা যশধাওয়ালের কোন সাড়া না পেয়ে দ্বিতীয়বারে একটু বেশ জোরেই ডেকে ফেললো দাসীটি সেই মুহূর্তে মদিরাচ্ছন্ন , কামোদ্দীপ্ত রাজা যশধাওয়াল ... তীব্র ভ্রুকুটি নিয়ে ফিরে তাকালেন দাসীর দিকে ...
“ প্রভু ...সময় আগত ... রানীমা...রানীমা...আসন্নপ ্রসবা ... ”
রাজা যশধাওয়াল কয়েক ক্ষণ চিন্তা করলেন তিনি ঠিক শুনেছেন তো ! ...সে কি করে হয় ... এখনও তো বেশ কিছুদিন দেরী ... অন্তত রাজা পরিবারের ধাইমাতার তাই হিসেব ...চকিতে রানীর দিকে ফিরলেন । রানী বালম্পা তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছেন , এক দাসী ঘন ঘন তাঁর মুখ মুছিয়ে দিচ্ছেন । মুহূর্তে নৃত্য গীত বাদ্য স্তব্ধ হয়ে গেল রাজার ইশারায় । ততক্ষণে রাজপরিবারের ধাইমাতা উপস্থিত হয়ে গেছেন ... এবার সবাইকেই বাইরে যেতে হবে , এমনকি স্বয়ং রাজা যশধাওয়ালকেও – একথা রাজা নিজেও জানেন । রানীর বালম্পার মুখের দিকে তাকালেন রাজা , যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছেন রানী ... একবার যেন বুকটা কেঁপে উঠল রাজা যশধাওয়ালের। ধীরে তিনি শিবির থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পা বাড়ালেন । হঠাৎ পাশেই ,শিবিরের ঠিক কিছু দূরেই প্রচন্ডভাবে বেজে উঠল দুন্দুভি ...সঙ্গে তীব্র সিঙ্গার আওয়াজ ...রাজা , দাসীরা , বাদকেরা সবাই প্রচণ্ড চমকে উঠল ... একি ! এতো যুদ্ধের সংকেত ! কিংবা চরম কোন দুর্যোগের ... এদিকে অবিরাম বেজে চলা দুন্দুভির মাঝেই ভীষণ দ্রুততায় বাইরে বেরিয়ে এলেন রাজা । এবার দুন্দুভির প্রচণ্ড আওয়াজকে ছাপিয়ে শুনতে পেলে পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসা গোঁ গোঁ করে ভয়াবহ এক আওয়াজ ...আকাশের দিকে তাকাতে দেখলেন একটিও তারা দেখা যাচ্ছে না । এক পারিষদ ছুটে এলেন ...
“ মহারাজ ...ভীষণ বিপদ , তুষার ঝড় শুরু হয়েছে ত্রিশূল পর্বত শিখরে ... কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই নেমে আসবে নিচে হ্রদের দিকে ...আমাদের উচিত উত্তরদিকের পর্বতের গায় যত দ্রুত সম্ভব আশ্রয় নেওয়া , ওখানে বড় বড় শিলা খণ্ডের আড়ালে আমরা আশ্রয় নিতে পারি ...
রাজা এবার বিস্ফারিত ভাবে পারিষদের মুখের দিকে তাকান পর মুহূর্তে শিবিরের পর্দার ফাঁকদিয়ে প্রসব যন্ত্রণা কাতর রানী বালম্পার দিকে ... তুষার ঝড় ! ... না: এই আস্থায়ী শিবির তাকে রুখতে পারবে না ...তাহলে ! ...মুহূর্তে পারিষদকে সবাইকে উত্তরের পর্বতের পাথরের আড়ালে যাওয়ার নির্দেশ দিতে বলে শিবিরের ভিতরে ঢুকলেন ।
দিক বিদিক কেঁপে যেতে লাগল প্রচণ্ড শোঁ শোঁ গোঁ গোঁ তীব্র শব্দে ... যেন প্রলয় নেমেছে । তিন-শতাধিক যাত্রী যে যেমন পারলো হাতের কাছে যা পেল সংগ্রহ করে রুক্ষ পাথুরে পর্বতের গা বেয়ে উঠতে লাগল । তিনজন দাসী ও এক প্রহরী রানী বালম্পা যে কাঠের মঞ্চটিতে শুয়ে ছিলেন সেটিকে বহন করে নিয়ে চলেছে ...প্রচণ্ড গতিতে ঝোড়ো বাতাস বইছে এলোমেলো , এবং তার গতি ক্রমশ বেড়েই চলেছে ...বাতাসের সঙ্গে তীব্র গতিতে বয়ে আসছে তুষার কণা এবং ক্ষুদ্র পাথর কুচি ... গায়ে বিঁধে যাচ্ছে । কয়েকজন আর্তনাদ করে উঠল , কেউ একজন পড়ে গেছে পাথরের উপর বাতাসের ধাক্কায় ...চিকন আর্তনাদে মনে কোন নারী কিংবা শিশু ।
প্রচণ্ড বাতাসের শব্দে একে অন্যের কণ্ঠস্বর শোনা দুষ্কর । তারই মধ্যে এক প্রহরী রাজার কাছে এসে জানাল সে একটি গিরি গুহা দেখেছে আজ সকালেই আরও একটু উপরেই , রাজা যশধাওয়াল জিজ্ঞেস করতে সে অন্ধকারে সামনের দিকে নির্দেশ করল । রাজা নির্দেশ দিলেন রানীকে যেন ওই গুহাতেই নিয়ে যাওয়া হয় ...যেকোনো মুহূর্তেই রানী সন্তানের জন্ম দেবেন। তাঁকে জানানো হয়েছে রানীর গর্ভজল নিষিক্ত হতে শুরু করেছে...
অবশেষে সত্যই একটি গিরি গুহার সন্ধান পাওয়া গেল । রানীকে নিয়ে গুহার অভ্যন্তরে রাখা হল । কোনক্রমে একটি মশাল জ্বালানো গেছে । মশালের আলোয় প্রাচীন গিরি গুহার অমসৃণ দেওয়ালে এক প্রসব যন্ত্রনাকাতর নারী ও আরও দুই নারীর প্রচ্ছায়া এঁকে দিতে লাগল ... বাইরে পাথরের আড়ালে রাজা ,এক পারিষদ ও পুরোহিত বল্লদেভ স্তব্ধ ভাবে দেখতে লাগলেন নিচে হ্রদের ধারে তাদের শিবির ছত্রখান হয়ে গেছে ইতি মধ্যে , অনেকেই উঠে আসতে পারেনি...শুরু হয়েছে প্রচণ্ড তুষারপাত ।
কিছুক্ষণ পর গুহার অভ্যন্তর থেকে সদ্যজাত শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো । চরম বিধ্বংসের মধ্যে সদ্যজাতর কান্না এক অদ্ভুত পরিবেশের সৃষ্টি করল । আশ্চর্য ভাবে বাতাসের গতি কিছুটা কমে এল তখনই । না: এখন আর কয়েক মুহূর্ত আগের মতো শরীরের জড়ানো পশু চামড়ার আভরণ ভেদ করে হীমবাতাস বিঁধছেনা , কিছুটা তীব্রতা কমেছে । গুহার অন্দরে প্রবেশ করে রাজা দেখলেন রানী বালম্পা এক অদ্ভুত তৃপ্ততার আলো মুখে মেখে শুয়ে আছেন , রানীর শ্রান্ত –তৃপ্ত চোখের কোলের সিক্ততা এই প্রবল দুর্যোগের ,এই পেরিয়ে আসা অসহ্য গর্ভযন্ত্রণার সাথে সাথে বয়ান করছে সদ্য মাতৃত্বের অলৌকিক সুখ । কি আশ্চর্য ! বাইরে প্রবল দুর্যোগ তার ধ্বংসলীলা চালিয়ে সবকিছু ছত্রখান করে নির্মমতার চিহ্ন রেখে গেছে ...অথচ গুহার অন্দরে বিরাজ করছে এক অপূর্ব শান্তি !
চতুর্দিক অন্ধকার । শুধু গুহা কন্দরে কম্পমান মশালের আলো দেখা যাচ্ছে । নিদারুণ প্রলয়ের পর এক নিঃসীম নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে সমগ্র পরিবেশে । শিবির যেখানে ছিলো সেখানে এখন ধ্বংসস্তুপের পরিণত হয়েছে । সঙ্গের জিনিস পত্র , আগামী পথের রসদ কিছু সম্ভবত আর অবশিষ্ট নেই !
রাজা যশধাওয়াল ও আচার্য বল্লদেভ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে । গত কিছুক্ষণের অকস্মাৎ প্রলয় তাদের দুজনকেই হতবাক করে দিয়েছে । ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বোঝা যাচ্ছে না , এখন সম্ভব নয় ।
যাত্রীদের কজনই বা জীবিত আছে তাও দিনের আলো ফোটার আগে বোঝা সম্ভব নয় । এখনো আকাশ ঘোলাটে হলেও মনে হচ্ছে আপাতত দুর্যোগ কেটে গেছে ।
“ রাজন ... চলুন নিচে হ্রদের দিকে নামি , কিছু রসদ যদি এখনও অবশিষ্ট থাকে সংগ্রহ করি ...” বলে উঠলেন আচার্য বল্লদেভ ।
কয়েকমুহুর্ত রাজা আচার্যের মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে সম্মতি জানালেন , আচার্যের কথা যুক্তিযুক্ত , যতটুকু পাওয়া যায় ততোটুকুই লাভ ... যে কজন জীবিত যাত্রী রয়েছে তাঁদের নিয়েই তাঁকে যাত্রা সম্পূর্ণ করতে হবে করতেই হবে !
প্রহরীকে গুহার সামনে থাকার নির্দেশ দিয়ে রাজা যশধাওয়াল ও আচার্য বল্লদেভ সাবধানে নিচের দিকে নামতে লাগলেন । হ্রদের কাছাকাছি আসতে ওঁরা দেখতে পেলেন আরও কিছু ছায়ামূর্তি অন্ধকারে নেমে এসছে হ্রদের ধারে । কিছুই আর অবশিষ্ট নেই ! ... তুষার ঝড় নির্মমভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে গেছে জট যাত্রার অস্থায়ী শিবির ! ...দূরে হ্রদের জলে ভাসছে কিছু কাঠের পাটাতন , শিবিরের অবশিষ্টাংশ কিছু চাঁদোয়া। কিছুক্ষণ সমবেত ভাবে সন্ধানের পর দুটি বৃহৎ কাঠের বাক্স পাওয়া গেল পাওয়া গেল আরও কিছু ছোটখাটো বস্তু যা এই নিঃসহায় অবস্থায় যাত্রার কাজে লাগতে পারে বলে সংগ্রহে রাখা হলো ।
রাজা যশধাওয়াল , আচার্য বল্লদেভ ও অবশিষ্ট যাত্রীরা আলোচনায় ঠিক করলেন আর কয়েক প্রহর তারা পর্বতের শিলা খণ্ডের আশ্রয়ে থেকে দিনের আলো ফুটতেই রওনা হবেন । কারণ এখান থেকে এভাবে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি আরও বেশি ,কারণ তাঁরা যাত্রার বেশীরভাগ পথই অতিক্রম করে ফেলেছেন । পথে স্থানীয় গাড়োয়ালি অধিবাসীদের কাছ থেকে কিছু রসদ সংগ্রহ করা যেতে পারে বরং । তাঁরা ফিরতে লাগলেন নিজ নিজ আশ্রয়ের দিকে ।
আচমকা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে সবাই সচকিত হয়ে উঠল ! কি হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই তারা লক্ষ্য করলেন আকাশ আবার কখন ঘোলাটে হয়ে উঠেছে ... হ্রদের জলে একটা আলোড়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে । যেন জলে ভারি ভারি কিছু পড়ছে উপর থেকে ...এবং ক্রমশ তা হ্রদের এদিকে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে । কিন্তু একি ! এতো সাধারণ তুষারপাত নয় ! ...আকাশ ভেঙে নেমে আসছে বৃহৎ আকারের তুষার খন্ড ! চারিধারে প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়তে লাগল নানান আকৃতির বৃহৎ তুষার খন্ড । জীবিত যাত্রীদের মধ্যে এক গাড়োয়ালি বাহক আতঙ্কিত কন্ঠে চিৎকার করতে করতে বলতে লাগল ...এরকম তুষার পাত সে কোনদিনও দেখেনি ! নিশ্চয়ই নন্দা দেবী রুষ্ট হয়েছেন ...
রাজা যশধাওয়াল ,আচার্য বল্লদেভ দ্রুত উঠবার চেষ্টা করতে লাগলেন ,কোনক্রমে যদি তাঁরা গিরি গুহায় পৌঁছতে পারেন ... আচমকা এক আর্তনাদে রাজা চকিতে পাশে তাকিয়ে দেখলেন বল্লদেভ সজোরে পড়ে গেলেন পাথরের গায় , একটি বৃহৎ খন্ড আঘাত হেনেছে ওনার মাথায় । রক্তে ভেসে যাতে লাগল ভূমি ... রাজারও পিঠে এসে প্রচণ্ড গতিতে এসে একটি খন্ড আঘাত হানল । রাজা বসে পড়লেন হাঁটু মুড়ে ... ঐ ...ঐতো গুহামুখ দেখা যাচ্ছে ... চারিদিকে থেকে প্রচণ্ড আর্তনাদ ভেসে আসতে লাগল ... বল্লদেভের শরীর নিশ্চল পড়ে রয়েছে , প্রাণহীন ...আর একটু অতিক্রম করতে পারলেই রাজা পৌঁছতে পারবেন গিরিগুহায় ...ওখানে রয়েছে তাঁর রানী বালম্পা ...তাঁর সদ্যজাত সন্তান...
ঠিক এই সময়ে আরও একটি প্রচণ্ড শব্দ হলো যেদিকে ওঁরা উঠছিলেন তার ঠিক মাথার উপর , হুড়মুড় করে বরফের বিরাট একটা অংশ নেমে আসতে লাগল গুহার মাথার উপর । আহত ভূপাতিত রাজা যশধাওয়াল বিস্ফারিত হয়ে দেখলেন তাঁর চোখের সামনে গুহার মুখ ঢেকে যাচ্ছে ...কিছুক্ষণের মধ্যে গুহাটি অদৃশ্য হয়ে গেল বিপুল তুষারের আস্তরণে ...
প্রবল যন্ত্রণায় অসাড় হয়ে যাওয়া অবস্থায় রাজা যশধাওয়াল বুকে ভর দিয়ে পাথরের খাঁজে খাঁজে হাত দিয়ে তাঁর শরীরটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার শেষ চেষ্টা করতে লাগলেন ... অবিরাম তুষার খন্ড আছড়ে পড়তে লাগল তাঁর সর্বাঙ্গে ... তাঁর সুগঠিত শরীরের অস্থি-মজ্জা বীভৎসভাবে থেঁতলে যেতে লাগল ... অকস্মাৎ এক প্রচণ্ড আঘাত অনুভূত হল শিরে ...মুহূর্তে সব অন্ধকার হয়ে গেল ...
এখন দিনের আলো । পৃথিবীর নবতম প্রভাতের নবীন কিরণ ত্রিশূল পর্বতের তুষার শুভ্র গাত্রে প্রতিফিলত হচ্ছে । এই মুহূর্তে তার তুষার শরীর বেয়ে যেন গলানো সোনা চুঁইয়ে পড়ছে ! নির্জন গাড়োয়াল হিমালয় তার অভিজাত গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে । গিরি-শিখর আবৃত হ্রদটির নীল স্ফটিক-স্বচ্ছ জলের অধিকাংশই তুষারে পরিণত হয়েছে । চারিদিকে নিস্তব্ধতা । গতরাত্রের বিপর্যয়ের চিহ্নমাত্র ঢেকে গিয়েছে কয়েক প্রস্থ তুষারের আস্তরণ । হিমালয়ের কোলে অখণ্ড সৌন্দর্য নিয়ে নিশ্চুপ রয়ে গেছে অপরূপ গিরি হ্রদ – রূপকুন্ড । হ্রদের তীরবর্তী অঞ্চলে তুষার স্তরের নিচে রয়ে গেছে শুধু কয়েক শত রাজ জট যাত্রীর নিথর –হিমায়িত দেহ ।

**উপরের কাহীনিটি আঞ্চলিক গাড়োয়ালি লোকগাথা হতে সংগ্রীহিত ও অনুপ্রাণিত ।ঘটনাকাল আনুমানিক ১১৫০ সন । প্রায় হাজার বছর পরে ১৯৪২ সনে এক ইংরেজ বন-দপ্তর কর্মী হঠাৎই গাড়োয়াল হিমালয়ের ১৫৭৫০ ফুট উচ্চতায় অপূর্ব গিরি হ্রদ রূপকুন্ডে আবিষ্কার করেন অসংখ্য মানুষের প্রাচীন কঙ্কাল । যাদের অনেকেরই অঙ্গে তখন রয়ে গেছে কিছু অঙ্গ বস্ত্র ও অলংকার । জনমানবহীন নির্জন এই গিরি হ্রদে কিভাবে এতগুলি মানুষের কঙ্কাল এলো ! কাদেরই বা এই দেহাবশেষ ! এই রহস্য আজও অনুন্মোচিত । বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে এগুলি প্রায় ১২০০ বছরের প্রাচীন । রূপকুণ্ডের এই বিপুল কঙ্কাল ও হাড়ের দৃশ্য দেখা যায় বছরে শুধু একমাস , গ্রীষ্মের সময় । কোথা থেকে এই মানব কঙ্কালগুলি এলো , কাদেরই বা এগুলি এ নিয়ে অনেক কাহীনি রয়েছে । তারমধ্যে সবথেকে প্রচলিত স্থানীয় গাড়োয়ালি অধিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত একটি লোকগাথা থেকে এই কাহীনি বিন্যাস । এর কোন প্রামাণ্য সত্যা-সত্য নেই । মূল চরিত্র রাজা যশধাওয়াল ও রানী বালম্পা ছাড়া বাকি নাম কাল্পনিক । ঘটনাক্রম মূল গাথা হতে কাহীনির প্রয়োজনে নির্মিত । এর কোনো ঐতিহাসিক বাস্তবতা দাবী করছি না । হতেও পারে রূপকুণ্ডের এই কঙ্কাল সমাবেশের অনুন্মোচিত রহস্যের পিছনে রয়েছে এই কাহীনি । হিমালয়ের আরও অসংখ্য রহস্যের মতই ।

https://mufthansa.wordpress.com/tag/raja-jasdhawal-of-kanauj /
http://www.thedailybeast.com/articles/2013/12/01/india-s-mys terious-skeleton-lake.html
http://undiscoveredindiantreasures.blogspot.in/2012/05/roopk und-glacial-lake-of-skeleton.html
http://indiahikes.in/colorful-stories-nanda-devi-raj-jat-yat ra-roopkund-trek/
http://archives.digitaltoday.in/indiatoday/20031124/archaeol ogy.html