অপেক্ষা...সন্ধ্যে...পাহাড়

অর্ঘ্য বন্দোপাধ্যায়



লাভা। কোত্থেকে এর ফুটে বেরনো অথবা স্বরক্ষেপণ। গড়ানো রাস্তা নেমে গেছে মনেসট্রির দিকে। একটা পাহাড়ী গঞ্জের জন্ম হচ্ছে আমার চোখের সামনে। ঝিরঝিরে অবিশ্রান্ত সন্ধ্যের আগে তার জন্মানো অথবা আমার চোখের...
ফোটজেনিক ট্রেকারে মেঘপাইনের কনটেক্সটে স্থানীয় যুগলের স্ন্যাপ শর্ট মিস করা আমি ফোন বুথের বারান্দায় ব্যাগেজ পাহারায়। ওরা গেছে ঘর দেখতে। ওরা মানে ইন্দ্র-অনির্বাণ। চারটের লাস্ট বাস মিস করে কোনমতে ডুম্বাডারা থেকে এখানে এসে নামলাম। এখন সাড়ে পাঁচটা। জুলাই। তুমুল বৃষ্টি হয়ে হয়ে উত্তর বঙ্গের এই গঞ্জটার গায়ে শ্যাওলার রঙ একেবারে বসে গিয়েছে। লোকে বলে পাহাড়। এখানে জুলাই মানে অক্লান্ত। মোনোটোনাস। জুলাই মানে সমস্ত রাস্তা বন্ধ, ধ্বস, মানে সাড়ে সাতটায় ডিনার। দুর্ভেদ্য মেঘে দমবন্ধ হয়ে আসছে। একমাত্র বন্ধু টিভি। নেপালি ব্রডকাষ্টিং চলছে আর তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ। দরজায় ঝুলন্ত রেনকোর্ট আর ধুপি বনের হৃদয়ে জুলাইয়ের ঘন ছায়া।
বিপ...বিপ...বিপ...কালিম্পু ং? বিপ...বিপ...
লাইন পাওয়া যাচ্ছে না। দুহাজার ফুট নীচের সদরে। কিছুতেই ...অনেক চেষ্টার পরও...তিন লামা। ফোনে কালিম্পং পাচ্ছে না। চিন্তিত। কিন্তু ফিরে যাবার সময় মেঘ লেগে পরিষ্কার চোখ। একটাই রঙদার বড় ছাতার নিচে তিনজন উজ্বল লামা। উমমমম...আমি পূর্ব জন্মের স্মৃতি মনে করতে চেষ্টা করতে থাকি। এখনো সেই সন্ধ্যেটা আমার সামনে নামেনি, নামছিল তার পূর্বাভাষ মাত্র। আর রাস্তা গড়িয়ে লোকজন। বাচ্চা, বুড়ো, হাফবুড়ো, স্কুলফেরতা, মহিলা, কুকুর, টাটাসুমো। বাড়িঘর নেমে গেছে নিচেদের দিকে আর উঠেও। বাড়ি ঘর দোকান টোকান। লাভা বাজারে আমার উইনচিটার ভিজছে, আমার চটি, আমার ছাতাও। আমি ভিজছি সাময়িক অভিকর্ষহীন গোলাপি উলের বলে ডুবে। আর কি বাঁচব না আমি? এ সন্ধ্যে যখন নামবে ততটা? মেঘ মেঘ আর মেঘ জুলাই চলছে। আয়ুহীন পায়ের আঙুল দেখতে আয়নার মতো। মেঘে শুধু গোলাপি বলের রেনু উড়ে বেড়ায়। আআহ...! আমার মৃত্যু এইসবের ভেতর এই আবছাবাড়ির বিভোর। ওই তো গোলাপি ফিরছে। হাতে সিডি। কি আছে ওতে? কোনো গান? সিনেমা ? গিয়েছিল তাই তার রেশ ছিল। তাই ধরে ফলো, এখন ফিরছ গোঁটাতে গোঁটাতে তোমার পরিধি, ব্যাস, ব্যাসার্ধ। আমি জ্যামিতি শিখি এস টি ডি বুথের এক্সটেনশনে।
আরও একটা সিগারেট হয়ে গেল। আরও মেঘ আর রেনু আরও জমে যাচ্ছে ভাঙ্গা চোরা পিচের রাস্তারা...হয়তো এখানে আমি একটা অস্তিত্ব। বিকেলের হুকিং পদ্ধতি দেখি মন দিয়ে। মহিলা হেসে কুটো। কেমন সব্রস্বতী পূজো মনে পড়ে। মনে পড়ে সকালের স্নান, পুজোর জোগাড়, আলপনা, নিকোন উঠোন, হিন্দি গানের মাইক আর স্কুলে স্কুলে সেইসব শাড়ি পড়া ইলেভেন টুয়েলভ।
‘’আমরা তো ভুলি নাই শহীদ
কখনো ভুলবো না
খুনে খুনে রাঙ্গা হইল
আন্ধার জেলখানা ‘’
(হেমাঙ্গ বিশ্বাস)
আমাদের সেকি যাওয়া সাইকেলে সাইকেলে এখনো এই লাভা বাজারে সন্ধ্যের মুখে টেনে ধরছে পা। এত পিপাসা পেয়েছে আগে তো বুঝিনি। আগে তার লেশ মাত্র ছিল। ভীষণ পিপাসা...স্মৃতির পিয়াস...
ওরা ফিরে এল, হোটেলর খবর পেয়েছে। যেতে হবে। তবু উত্তর দক্ষিন ঠিক করতে পারছে না। পছন্দের অনেকগুলো হয়ে গেছে। এবার কম পছন্দ বাদ দিতে আবার পীচে নামল।
আমি ঠায়। সামনের ঝম ঝম কমে আসছে। আলোও। সাত হাজার ফিট ওপরে সন্ধ্যের প্রোটনে ইলেকট্রনে মেঘ। জুলাই চলছে। কালিম্পং এর শেষ ট্রেকার আমাকে কি ফেলে গেলো শুধু নিকোটিনের সাহারায়? এও তো একলা ভাবাবে নিজের পাটিগণিত। রোঁয়া ওঠা রোদ্দুর পেরিয়ে, মাঠ ঘাট পেরিয়ে, আস্কারা পেতে পেতে খোলা আকাশের গায়ে আঁচড় কাটতে গেছে হাসি, টুকরো কথাবার্তা, চোখ চাওয়া...আর তারপর? অনেকটা টাউন পেরিয়ে, সাবারবান রেলওয়ের লাইন, মিউনিসিপ্যাল হাসপাতাল পেরিয়ে একটা লম্বা দৌড়...দৌড়তে দৌড়তে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ... কিলোমিটারের পর কিলোমিটার শুধু মাইন পাতা তাই আর থামা যাবে না...সব পেরিয়ে চলেছি...কোথায় চলেছি জানি না...এক শহর থেকে অন্য শহর...অন্য শহর থেকে আরেকটা অন্য জনপদে...আর অন্ধকার নামল অন্ধকার...অন্ধকার...অন্ধ কার! আমারই চোখের সামনে মিলিয়ে যাচ্ছি আমি আর অন্ধকার ক্রমশ বিন্দু হলে আমাকে আর দেখা যাচ্ছে না। শুধু শোনা যাচ্ছে মার গলা, উদ্বিগ্ন ‘’আর দুটো ভাত নিবি বাবা?’’
নেমে আসে ওরা। হোটেল ফাইনালাইজ হয়েছে। আর নেমে আসে যা যা আলোর বিপরীতে থাকে সেইসব। চা খেতে হবে, তো চা খাওয়া হোক। বিস্কুটও নেওয়া যাক। আহহহ! আরামের স্বাদু পান। একি!!! চা তো সাম্পানের সিনোনিম হয়ে গেল।
রাস্তারও মন ভাল নেই। কুকুরেরা তাকে ছেড়ে গেছে। মানুষেরও চলাচলে আবছা পায়েরা। একবুড়ো রকে বসে কিছু দেখে, কিছু কিছু মিস করে যায়। শীতালো লাভায় ঘড়বাড়ি আরও কাছাকাছি সরে এসে গোষ্ঠীজীবন শেখে সন্ধ্যের পর। আমরাও চলেছি মনেসট্রির রাস্তায় নেমে...লেপ ও কম্বলের আশ্রয়ের প্রত্যাশা। কখনো কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসছে টিভি নিউজ, সিনেমার ডায়ালগ, পি পি লজের আলো, আর হঠাৎ কোথা থেকে যেন চাঁদ উঠল...
...ও মোরি চন্দ্রমা আ আ
মোরি আখিও মে তরসায়ে
দিল হুম হুম করে
ঘাবড়ায়ে...

গোড়ালিতে স্ট্রেস দিয়ে নামতে নামতে আমরা একে একে অপূর্ব একা হতে থাকি আর ফিল করি আমাদের ভেতরে কোথাও সন্ধ্যে নামতে শুরু করে দিয়েছে।