আই অ্যাম দেয়ার

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়



সে বসেছিল গল্প শোনাতে। তার নাকি হাড়গোড়ের ভেতর সেঁধিয়ে আছে ফসফরাসের গন্ধ। সে টের পায় খুব। যখন অনেক রাত্রে ওই চুড়োর ওপর কুয়াশার ভেতর দুলতে দুলতে একটা ছোট্ট ট্রেন আসে, অনেকদিনের জমে থাকা ঘুমগুলো কুড়িয়ে তুলে কাঁধের বস্তাবন্দি করে এক থুত্থুরে বুড়ো টুং টাং করে মাথা নাড়তে থাকে আর তার মস্ত ঢোলা আলখাল্লার ভেতর থেকে হু হু করে উড়ে আসে বরফের মত হিম বাতাস-- পাইনপাতা অর্কিডগুঁড়ো আর লাইকেনের গন্ধ মাখামাখি টক ঝাল বিষন্নতা নিয়ে---তখনই ওর পা’এর ভেতর ঘূর্নির মত ঘুরপাক খায় একেকটা ঢেউ। ফসফরাসের গন্ধ মাখা একটা ছেঁড়া নৌকো নাকি আঙুল বরাবর তেরচা হয়ে আটকে থাকে। পূর্নিমা রাত্রে হঠাৎ আঙুলগুলো জুড়ে যে অনেকটা পুচ্ছপাখনার মত হয়ে আসে, সেটাও সে বলছিল। এই পাকদণ্ডীর গায়ে উদাসীন পাথরের টুকরোয় সারা রাত ছেঁড়া কম্বলে মাথা ঢেকে ও স্পষ্ট দেখেছে ওই দূরে বড় বড় ঢেউ---উঠছেনামছেউঠছেনাম ছে---মিলিয়ে যাচ্ছে। আর তার মাথায় মাথায় কত যে রঙের খেলা, রাততারাদের ভেসে থাকা জোনাকি পোকার মত! তবে কি এই পাহাড়ের ঢেউগুলোয় সমুদ্র বাঁধা পড়ে আছে? ওকে জানতে হবে---আর সেই জন্য ও কি আরো ওপরের দিকে উঠে যাবে নাকি নেমে আসবে নিচের উপত্যকায়----সারা দিনরাত ভেবে ভেবেও সে বুঝে উঠতে পারেনা। শুধু মাথা নাড়ে। পুরোনো ঘড়িটার পেন্ডুলামের মত অনিশ্চয়তায়। ভেষজ বাষ্প ওঠে পাথুরে মাটির ভেজা সবুজ থেকে। লবণের গন্ধ। বাতাসের, মাটির, জলের নাকি অশ্রুর---ভুল হয়ে যায় তার। কিসের সম্পর্ক ওর এই শিলাখন্ডের দেশের সাথে? এই পাহাড় ঘেরা বসতির সাথে কি সম্পর্ক ওর? নাকি পাহাড় কথাটাই আসলে একটা সম্পর্ক? নাঃ—এ ভাবার মত ক্ষমতা ওর নেই। ফস্‌ফরাসের গন্ধটা এসে ওকে সব ভুলিয়ে দেয়। সে কখনো জানেনি এই পাহাড় আসলে সম্পর্কেরই অপর নাম। এই পাহাড় আসলে তীব্র এক প্রেম। অনন্য আকর্ষণের কুহক। প্রাপ্তির শিখরে উঠতে চাওয়ার চূড়ান্ত কামনা। তীব্রতম পাওয়ার মুহূর্তে উচ্চারণ করে ওঠা প্রিয়তম কবিতার লাইন, গেয়ে ওঠা গান। ভিজে ওঠা চোখের পাতা—হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণাও। এই পাহাড় ঘিরে রাখে কুয়াশার ওমে, বরফের শৈত্যে, আবিষ্কারের আনন্দে, অপ্রাপ্তির বেদনায়, ধসে পড়ার নিরাপত্তাহীনতায়, আকাঙ্ক্ষার মুগ্ধতায়। কেউ একে প্রেম নাম দাও, কেউ বা পাহাড়। আর তারপর বসে থাকা ঠায় পথের ধারটিতে। সম্পর্ক ফুরিয়ে গেলেও যেমন ফুরোয় না তার অস্তিত্বটুকু---! সে কখনো জানেনি। নাকি জেনেছিল বলেই ওর ডাকনাম “পাগল”! তা না হলে শুধু পাহাড়টুকু ছুঁয়ে থাকায় কি আনন্দ ওর? কোনও আরোহন-অবরোহণহীণ এই থেমে থাকা! দুরবীণ নেই, রুটম্যাপ নেই, ট্রেকিং জুতো নেই, অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই, পর্যাপ্ত শীতপোষাক নেই---তাহলে কি এই পাহাড়টাই আদৌ নেই ওর কাছে! ভালো করে লক্ষ্য করে গা শিউরে উঠেছিল---কী আশ্চর্য---একটা পা’ই তো আসলে নেই ওর! কিভাবে উঠে এসেছিল ও এইখানে---এই পিছল, খাড়া, সর্পিল, ঝুঁকিময় খাদের কিনারে কে বলে দেবে! ওই খাদের ঠিক মুখে উপড়ে পড়ে থাকা বিশাল বনস্পতি কি জানে? প্রকান্ড শিকড়বাকড়ের জট জটিলতা দশ আঙুলের মত বিছিয়ে রেখে কি গভীর আকুলতা একমুঠো মাটির কাছে মেলে রেখেছে। রোমে রোমে কী তীব্র কাঙালপনা, ছিন্নমূলের অনিকেত বিষাদ! পাহাড় জানে তাকে...। তাই পড়ে যেতে যেতেও আঁকড়ে ধরেছে তার শেষ স্পর্শটুকু।এই মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে থাকা, এক পা বাড়িয়ে রেখেও মরে যায়নি কেন গাছটা? ক্লোরোফিলহীন হয়নি কেন এখনো? সে দেখে ওই ওপ্‌রানো শিকড়ের ওপর রোজ সন্ধ্যাতারা এসে বসে থাকে। তার ওপর বড় বড় ফার্ণপাতা থেকে ঝপঝপ করে বৃষ্টিফোঁটার মত শিশির পড়ে। এই পঙ্গু গাছ, এই পঙ্গু সে আর এই চলনক্ষম বাতাসের অদ্ভুত লেখচিত্রে নিঃশ্বাসের ওঠানামায় নিঃস্বতা নেই কোনো। ও------ই নিচে ছোট্ট ছোট্ট মানুষজনের আসাযাওয়া, খেলনা গাড়ি, খেলনা বাড়ি---পুতুলের সংসার----এ পাহাড় সেই লিলিপুটের দেশের দিকে গালিভারের বিস্ময়েই তাকিয়ে থাকে...সে এই ঘোর নিয়েই ক্রমাগত পেন্ডূলামের মত মাথা নাড়াতে থাকে। ওর পায়ের নিচে বৃষ্টি পড়ে, মেঘ ওড়াউড়ি করে। ধাপে ধাপে ঝুমনাচ লাগে। রোদ্দুরের খোঁজে মাথা আরো আরো উঁচু করেই চলে দীর্ঘদেহী বনস্পতি---মোটা হতে থাকে ঝুলে থাকা লতাপাতা। সংসারের বাঁধন যেমন জড়াতে জড়াতে কুন্ডলীর মত গিলে ফ্যালে মানুষটাকেই, তেমনি ঢাকা পড়ে থাকা গাছের বাকলের নিচে থমকে থাকে ভেজা ঠান্ডা বাঁশির আওয়াজ।
সে সেসব জানেনা...কেবল ফসফরাসের গন্ধ পায়।
নাকি জানে বলেই ওর ডাকনাম পাগল হয়ে ওঠে...কে জানে!