পাহাড় আমার বাড়ি

হাসনাত শোয়েব



পাহাড় আসলে কি? পাহাড় আমার বাড়ি। আমার দুপুর বেলার খেলার মাঠ। পাহাড় একধরনের হ্যালুসিনেশন। পাহাড় আসলে শেষ পর্যন্ত আশ্রয়।
আমার স্কুল থেকে পাহাড় এবং সমুদ্র দুটোই দেখা যেতো। আমি কাছ থেকে দেখতাম সমুদ্র। দূর থেকে দেখতাম পাহাড়। দূর থেকে দেখতেই ভালো লাগতো। মাউথ অর্গান বাজিয়ে প্রতিদিন একটি কিশোর লাল পাহাড়ের দিকে চলে যেতো। এই দৃশ্য দেখে আমার কেবল কান্না পেতো। ছোট বেলায় এক দুপুরে নানু গল্প বলার ছলে বলেছিলো- ওই লাল পাহাড়ে থাকে এক বুড়ি। সে প্রতিদিন একটি ছেলেকে তার ঝোলায় পুরে নিয়ে যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে। সে থেকে আমার দূর থেকে পাহাড় দেখার অভ্যাস। দেখতে দেখতে ভাবতাম মাউথ অর্গান বাজানো ছেলেটি কি আর ফিরতে পারবে?
অনেকদিন ছেলেটিকে আর দেখি না। একদিন হঠাৎ দেখলাম মাউথ অর্গান বাজিয়ে আমিই চলে যাচ্ছি ধিয়াংয়ের দিকে। আহ! ধিয়াং। আমার ছোটবেলার দূর সম্পর্কের খেলার সাথী। যার চিবুক কখনো ছুঁতে পারিনি। তবু ধিয়াং আমার একরাশ মিথ্যে অহংকার। ধিয়াং আমাকে খুঁজে দিয়েছিলো বেতফুল আর আনারসের ঝুঁটি। ধিয়াংয়েই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম কনককে।
আচ্ছা পাহাড় মানে কী কেবল পাহাড়ের গল্প। পাহাড় মানে তো মাছের গল্পও হতে পারে। গল্পটা শুরু মূলত একটা অ্যাকুরিয়াম দিয়ে। আপনারা নিশ্চয় অ্যাকুরিয়ামের পাহাড় দেখেছেন। ও হ্যাঁ, দেখেন নি। আমি দেখেছি। একটি মাছ অনেক কষ্টে সে পাহাড়ের কাছে পৌঁছতে চেষ্টা করছে। আপনারাই বলুন তো সে মাছ কি আদৌ পাহাড়ের কাছে পৌঁছতে পারবে? আরো কিছুক্ষণ চোখ রাখতে পারেন অ্যাকুরিয়ামের দিকে কে জানে হয়তো পৌঁছে যেতেও পারে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য না পৌঁছতে পারলেও ক্ষতি নেই। গন্তব্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।
আবার ধরেন, পাহাড় মানে বাবার গল্পও বটে। আমাদের সংসারে বাবাকে পাহাড়ের সাথে তুলনা করা হয়। আমার বাবা নাই অনেকদিন। তাই আমার পাহাড়ও নাই। ভাবছি নিজেই একটা পাহাড় হয়ে যাব। ঘুমন্ত মানুষেরও বেঁচে থাকার জন্য নাকি একটা পাহাড়ের প্রয়োজন। কারো কারো ঘুমের ভিতর হানা দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখা যেতে পারে। কী বলেন?
এবার একটা ছোট্ট গল্প বলা যেতে পারে। গদ্যের ভিতর গল্প। সমস্যা নাই তো? থাকলেও আর কী করা। আমি বলি তবু; একবার মনে আছে হঠাৎ দেখি পাড়ার সবাই ছুটছে। আমি তো সবার বাইরে না। আমিও ছুটতে থাকি। দেখি একদল চীনা লোক হাফপ্যান্ট পরা রাস্তার মধ্যে সাদা সাদা কাগজ ফেলে চলে যাচ্ছে লাল পাহাড়ের দিকে। অনেক ভেবেও কূল পেলাম না কেনো তারা সাদা কাগজ ফেলে যাচ্ছে। অনেক পরে জেনেছিলাম এইসব কাগজ মূলত দিকচিহ্ন। পথ চেনার জন্য তারা এই কাজটা করে। সেদিন থেকে ধারণা আরো পোক্ত হলো যে লাল পাহাড় থেকে আসলে কেউ ফিরে না।

পাহাড় বললে আবার আমার গানের কথাও মনে আসে। আমার ফেলে আসা গিটারের কথা। না লিখতে পারা সে গান! ‘পাহাড়ের গন্ধ আমার নাকে মুখে’ অঞ্জনের এই গানের মতো অথবা ‘পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝরণা বলো’ বা ‘Country roads, take me home I belong,/West Virginia, Mountain mamma, take me home,/ Country roads.’ এসব শুনতে শুনতে আমিও একটা গান লেখার কথা ভাবতাম। অথচ আমার একটা লাইনও আজ অবধি লেখা হলো না। তবুও আমি জানি একদিন ঠিক ঠিক একটা গান লিখবো।
অবশেষে আমার পায়ের নিচে ভেঙ্গে যাচ্ছে ঘাস। বেলা শেষে ধিয়াং এর ঘোড়াগুলোও বাড়ি ফিরে যাবে। লাল পাহাড়ের ধারে যেখানে আমরা খুঁজে বেড়াতাম হরিণের ঘোলা চোখ। তারাও কত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। ধীরে ধীরে আকাশও যখন তার সবকটা ডানা গুটিয়ে নেয়, এবার আমার ঘরে ফেরার পালা।
দূর পাহাড়ের দেশে কেউ একজন গিটার হাতে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি কখনো যেতে পারিনি। ফিরে আসতাম দুচালা টিনের বারান্দায়। আমার মুঠো ভর্তি থাকত পাহাড় আর মুখে মাউথ-অর্গান। গিটার অথবা মাউথ-অর্গান কোনটাই আমি ঠিকমত শিখতে পারিনি, বাজাতেও পারিনি। আমি শুধু হাঁটতে চেয়েছিলাম। পায়ের নিচে কেবল মেঘ রেখে তার উপর দিয়ে হেঁটে যেতে চেয়েছিলাম লাল পাহাড় পর্যন্ত। লাল পাহাড় কখনো আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি। জানি আমাকে সেখানেই ফিরে যেতে হবে। কনক সেখানে একটা পৃথিবী হাতে নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে।