হাতছানি

ধীমান চক্রবর্তী



ছোটবেলা থেকেই আমি খুব ভীতু। পড়াশুনোর বই দেখলেই পাহাড় প্রমাণ ভয় হত। একদিন দুর থেকে দেখি বাবা ডাকছে আয়...আয়। এগিয়ে যেতেই মেঘ আর স্তুপ স্তুপ পৃথিবী। কেমন যেন স্বর্গ মনে হল। নাভির প্রতিফলিত আলো। ঐ আলো বেহস্তের নদী হয়ে উঠলো। ছুঁয়ে দেখলাম ছোট্ট কালো তিল।রঙিন জীবন। খুজতে থাকলাম। এখানেই, রামধনু থাকে। দেখি পায়ের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে। হারমোনিয়াম বাজিয়ে কি যেন গাইছে এই দুপুরবেলা। আসলে রামধনুরও তো কিছু গান আছে, আবহাওয়া আছে।
মনে নেই ডাকপিওন নিমন্ত্রনের চিঠি দিয়ে গেছিল কীনা। গাছ ও সবুজ আলো বাঁশি বাজাচ্ছে। ঐ তো চাঁদ। কোলে বসিয়ে কত গল্প বলি। সে খালি পাহাড়ের গল্প শুনতে চায়। পিচকিরি, আঙুরলতা, টিয়াপাখির এগারো লাইন- কিছুই সে শুনতে চায় না। সেসময় আমার কোনও মুখোশ ছিল না। কিন্তু শীতকাল। উঁকি দিয়ে দেখি ঠান্ডা হাওয়ার সাথে বোনা হচ্ছে অনেক জামাকাপড়। তবে কি এটা কোনো তাঁতঘর? যার পাশেই সাতজন পাখি খুলে বসেছে বিশ্ববিদ্যালয়। তাহলে চম্পা কোথায় গেলো-ভাবতে ভাবতে দেখি ছায়া লম্বা হচ্ছে গ্রামাফোনের ভিতর। আর তুমি এই সমস্ত শীতকালটা পাখি হয়ে পাখির ভিতর কাটালে। পাথর হয়ে ঠিক পাথরের ভিতর কাটালে।
ভিসিটিং আওয়ারসে দেখতে যাই পাহাড়কে। গিয়ে কেউ মুখোশ খুলে রাখে, রাখতে চায়। মুখোশ থাকলে খোদাই করা যায় না।অজন্তা,উনকোটি বা আলতামিরা হয় না। এখানে এসে কয়েকজন শিলার সাথে ষোল ঘুঁটি বাঘ চাল খেলতে বসি। বারবার হেরে যাই। ইদানিং মনে রাখার ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। খুব আনন্দ হয়। এবার হয়তো রেখে যেতে পারবো এমন টেক্কা ফেলা আঙুল আর এই শরীর। ভাবি পাথর কাটার সময় তাদের কি পাহারা দিয়েছিল পরীদের দোপাট্টা,রুমঝুম ঘাঘরা? একটা মুখোশ পছন্দ হয়, তাকে শহরে নিয়ে এসে টাঙিয়ে রাখি ট্রামলাইনের মধ্যাহ্নে, চোখের কাজলে।
দূরে কেউ ড্রাম বাজাচ্ছে। বাজাচ্ছে কুয়াশা আর মেঘ। সামনে গেলে আলো। নেমে এলো বাড়ির ছাদে। কমলা কিমবা আপেল হতে পারে। ওদের সাথে গল্প করতে করতে জেনে নিই। ওয়াশিং মেশিনে প্রতিধ্বনি কিভাবে কেচে নিতে হয়। মার খুব কাপড় কাচার বাতিক।মুখ মনে পড়ে।কংক্রিটে বেছানো কয়েক ফালি রোদ্দুর হলেই সমস্ত ছাদ জুড়ে সাদা আর রঙিন কাপড়, মেঘের সামনে পর্দা। যেহেতু চোখ এখন অনেক ভালো বোধ করছে, কিছু কিছু দেখতে পাই। রাস্তায় পড়ে থাকা চশমা টের পেয়েছে আমার উপস্থিতি। পাথরে পাথরে কারা যেন লিখে গেছে সাপলুডোদের সম্মেলনের কথা। এবার কি তবে নেমে যেতে হবে? প্রতিবিম্বের ইস্কুল তবে একা একা দাঁড়িয়ে থাকবে আমার প্রতীক্ষায়!
মন খারাপ হলে পাহাড় সিটি দিয়ে অন্যদের ডাকে। না হলে ই-মেল করে। রাত্রিবেলা ব্রাশে পেস্ট লাগাতে গেলে দেখি, মুখের ভিতর সাদা সাদা অনেক টিলা। সাফ লাগাই পরিষ্কার করি। হঠাৎ একজন জোকার একটা আয়না নিয়ে সাজিয়ে রাখে আমার সামনের দেওয়াল। দেখি, নেমে আসছে দাদা- সে ঐ একবারই গেছিল আমাদের সাথে। ধূসর আলো তার দুহাত বাড়িয়ে হেঁটে চলেছে কাঠের বাড়ির দিকে। অপেরা হবে। নায়িকা আসবে চন্দ্রবিন্দুর ভেতর থেকে। বিজ্ঞাপনের বড় বড় পায়ে দুলে উঠবে দুব্বাঘাস,মার্বেল, ছোট্ট পাঁচজন নুড়ি-পাথর। আজ দাদার ভাঙাচোরা ছায়া নেমে এল ঐ আয়নার ভিতর থেকে।
যেখানেই গেছি আমার সাথে সাথে হেঁটে পাহাড়। আর ভয়। যা কখনো ঘটবে না হয়তো, তা নিয়েও ভয়। এই যাওয়াও তো একরকম অভ্যাস। আর অভ্যাস তো কখনো বদলায় না। তেপান্তর পেরিয়ে বহুদিন ওর সাথে রুমালচোর খেলেছি। ছোটবেলায় একবার ঠাকুমার পালঙ্কের তলায় ঢুকে এক দুঃখী পাহাড়কে দেখেছিলাম। আজও মাঝে মধ্যে ওর করুণ মুখ মনে পড়ে। কিভাবে যেন দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল। আমি হাত জবুলিয়ে অনেক আরাম দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। যেমন শালগাছে ঘুঙুর টাঙিয়ে দিই।
আজ আমায় দেখে আবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাশে বসে ওর পিঠ থেকে স্কুলব্যাগ খুলে দিই। গল্প করতে করতে বোঝার চেষ্টা করি নতুন জীবনের মানে।দেখি ওর চোখে অনন্ত গাছ আর সবুজ। মানুষ যাতে সুস্থ হয়ে ওঠে সেই শুভ কামনা জানিয়ে রোদ ফেলা রাস্তা। লম্বা ফিল্মের ভিতর থেকে উড়িয়ে দিই দুজনের অনেক রঙ আর স্বপ্ন। হেসে উঠি পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে। কতদিন পর আবার হাস্লাম। সবই তো এই পৃথিবীর জন্য। তার আর আমার না দেখা পৃথিবী। তারপর দুজন দুজনের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি।