এক পাহাড়িয়াকে সামনে রেখে

প্রশান্ত গুহমজুমদার



পাহাড় নিয়ে দুটো শব্দ বলার আগেই নৈতিকতার প্রশ্ন উঠে আসে আমার সামনে। নীতিগত ভাবে পাহাড় বিষয়ে কথনের কোন অধিকারই তো আমার নেই। যেহেতু পাহাড় মানেই এক উত্তুঙ্গ এক আকার, প্রাচীন এবং স্থিতধী। আমি বাচাল এবং অর্বাচীন বললেও কিছুই বলা হয় না। খর্ব সম্ভবত সঠিক শব্দ।
ফলত তার কাছে যাওয়া বা ভাববিনিময় করার স্পর্ধা কোন দিনই আমার হয় নি। অথচ পাহাড়কে সামনে রেখে চিরকাল সাদা পথে হাঁটার খুব সাধ। সে হল কি হল না সে কথা এখানে অবান্তর। রবীন্দ্রনাথ যে দূরত্ব থেকে বঙ্কিমচন্দ্রকে দেখে বিস্মিত এবং আপ্লুত হয়েছিলেন, তার থেকেও বহু যোজন দূর থেকে তাকে দেখি আমি আর ছোট মাথাটা রোগা ঘাড় ভেঙে আরো নিচু হয়ে আসে। সে এত সুন্দর এমন বিশাল আর ভাবগম্ভীর! আমার মনুষ্যজন্ম কেন এমন হল না! তা হলে এমন জ্ঞানী আর সুধীর প্রাণের কাছে দাঁড়ানোর একটা সুযোগ পেতাম! এই বোধ থেকেই পাহাড় বিষয়ে কৌতূহল, আমার মানস ভ্রমণ। সে কেমন, সে কি প্রকারে এমন, তার একা থাকার মন্ত্র কি, আদৌ কি তার একাকীত্ব বোধ আছে, সে একা নাকি তার বহু স্বজন, এমন নানাবিধ অবোধ প্রশ্ন কিশোরবেলা থেকেই। আর তাই হাতে কলম বা পেন্সিল আর সাদা কাগজ, এঁকে চলেছি পাহাড়। একটা দুটো না, সারি সারি আর তার পিছন থেকে উঠে আসছে দিবাকর।
বেশ কিছু বছর এই ধরাধামে হাঁটাচলা করার সুবাদে দেখেছি, এই পাহাড়েরও কিন্তু একটা সমাজব্যবস্থা আছে। তা বেশ বিস্তৃত এবং বেশ সুসংহত। তাদের বর্ণাশ্রম প্রথা আছে। ঢিপি পাহাড়, টিলা পাহাড়, মেজ পাহাড়, সেজ পাহাড় এবং পাহাড়। গিরি, কেউ বা মালা কিংবা শ্রেণী। পরস্পরের মধ্যে জলচল নেই। আর মানুষের সঙ্গে এই আকারবিশেষেই আত্মীয়তা। মানুষের সমাজের সঙ্গে ঢিপি পাহাড়ের এক নিবিড় যোগ আছে। শিশুমানব সে সব চূড়ায় ওঠে, খেলা করে, উঁচুনিচু বোধ তৈরি করে নেয় নিজের নিজের মত। ঢিপি-ও সে সব উপভোগ করে, কখনো সখনো পাকঘরের পাশে এসে জায়গা করে নেয় দু দন্ড বিশ্রাম করে নেওয়ার ইচ্ছায় কিংবা স্বপ্নে এসে ইচ্ছাপূরণ করে। টিলা কাছেপিঠেই থাকে। সময়বিশেষে তাঁর কাছে মানুষের ভ্রমণ। মেজ অথবা সেজ পাহাড় সামান্য কর্তা গোছের। সে যে আছে, মাঝে মধ্যে নানান কর্মকান্ডের মধ্যে দিয়ে জানান দেয়। হয়ত তার কোলের কাছে মানুষ দারাপুত্র নিয়ে ঘুমিয়ে আছে, হুড়মুড় কিছু পাথর শরীর থেকে সে নামিয়ে দিল ঘুমন্ত সংসারের উপর কিংবা তার মনে হল, মানুষ বেশিবেশি দৌড়চ্ছে, পথের উপর নামিয়ে রাখল কিছু বেমক্কা অলঙ্কার। আর পাহাড়! সে তো পাহাড়ই! সে যে কোন সুদূরের বাসিন্দা, অভ্রংলেহী! তাকে অনুভব করা যায়, স্বপ্নে বহুবার তার মাথায় পা রাখা যায়, অভিমানের পতাকা তোলা যায়, কিন্তু স্পর্শ করা যায় না, অন্তত আমার মত বামনের তো সে নিছকই উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার অহংকার।
মানুষ কিন্তু স্বভাবগুণে সব পাহাড়ের কাছেই যায়। উচিত অনুচিতের প্রশ্নই নেই। মানুষ বড় ক্রীড়াপ্রবণ তো। কত রকম খেলাই না সে আবিস্কার করেছে। আকাশচারী হওয়ার খেলা, অন্তরীক্ষে হাঁটার খেলা, নতুন নতুন পথ ভেঙে পাহাড়ের মাথায় ওঠা। আর এই ওঠা মানেই তো এক পরিবর্তন। ভাল পরিবর্তন খারাপ পরিবর্তন। যা হয় আর কি! তো মানুষ অতো তোয়াক্কা করেছে কবে! সে মন্দ ভালো দু রকমেই ঘোরাফেরা করে, যাতায়াত করে পরিবর্তনে। খেলা করে। ভালবাসা প্রার্থনা করে।
পাহাড়ের ভালবাসা কিছু বিচিত্র। নিস্পৃহতার সঙ্গে মাখামাখি ভিবজিওর। অন্ধকারের পাশাপাশি টলটলে আহ্বান। আছে অথবা নেইও। এক তুমুল বাস্তবতা অথচ যেন অবয়বহীন। সে মুখর, আবার অকারণ মূক। তখন দশ বাঁও মেলে না, বিশ বাঁও মেলে না। এই রহস্যময়তাই ক্রীড়াপ্রবণ মানুষকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। ঐ ভালবাসার কাছে দাঁড়ানো ব্যতীত আর্ত মানুষের আর কোন পথ খোলা থাকে না সামনে। সে যায়। অশেষ বিরহের সমাপ্তি উদ্‌যাপনে।পাহাড় কি অপেক্ষা করে! করে বোধহয়। নতুবা পাদদেশে ব্যাকুল সে মনুষ্যপ্রাণের উপস্থিতিতেই তাঁর সমগ্র অস্তিত্বে কেন বেজে ওঠে এমন মৃদঙ্গ! কিন্তু অপেক্ষা আর গ্রহণ তো এক নয়। পাহাড়েরও তো খেলায় মন যায়। সে তখন কিছু ছাড়ে, কিছু রেখে দেয়। যখন রাখে, যখন সে অকৃপণ নয়, মানুষ যায়, উঠতেই থাকে, মুগ্ধ হয় অহরহ, কখনো বা জয়ের আনন্দ তাকে গ্রাস করে। পতাকা তুলে সে ফিরে আসে। ভালবাসা আর পাওয়া হয় না তাঁর। ঐহিক তাকে টেনে নেয় বুকে আবার। পাহাড় ফিরিয়ে দিয়েছে তাকে।আর যে পাহাড়ের ভালবাসার নিবিড় পেয়ে যায়, তার আর ফেরা হয় না এই পুরনো পৃথিবীতে। পাহাড় সে আকুল প্রাণকে বড় যত্নে রেখে দেয়। নিজের করে, হৃদয়ের খুব কাছে। আমরা ভাবি, সে হতভাগ্য বুঝি হারিয়ে গেল। নিষ্ঠুর পাহাড় তাকে ঘরে ফিরতে দিল না আর। সে তখন কিন্তু ঘুমিয়ে আছে তার দ্বিতীয় ঘরের উষ্ণ সান্নিধ্যে। হায় সে স্বাদ আমার কোনদিনই পাওয়া হবে না।
আরেক পাহাড়ের সন্ধান আমি পেয়েছি। সে নেহাতই ব্যতিক্রম। বিরল এক অস্তিত্ব। নীরবে তাঁর গড়ে ওঠা। সারা শরীর তাঁর সদা হরিৎ আর শিশুর অনাবিল বড় হয়ে ওঠা তাঁর কোলেপিঠে। তাঁর কেবল নিরলস জেগে থাকা আর অনুপম লালন। সে এক স্বপ্ন দেখার দেশ। স্বপ্ন দেখানোর অবারিত অঞ্চল। সেখানে ফিরিয়ে দেওয়া নেই। আহ্বান আছে। হরেক পাখিদের। সে অবিকল্প পাখিপুরাণ। উচ্চতা তাঁর গরিমা নয়, দূরত্ব সর্বতো পরিত্যাজ্য। সুতরাং সে পাহাড় ভাল। সে ভালপাহাড়ে যাওয়ার চিরন্তন বাসনা আমার। তাঁর ভাবনার নীরব অনুসারী। সে আমার একান্ত শ্লাঘা।