সহ্যাদ্রি

সাগুফতা শারমীন তানিয়া



আমার প্রথম পাহাড়-দেখা কবে? মনে করতে গিয়ে কেবল মনে পড়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন-সম্প্রচারিত মুভির একটা দৃশ্য, মেলিকভের ‘লেজেন্ড অফ লাভ’ এ রুশ ফরহাদকে বিদায় বলতে বলতে পাহাড়ের বৃষ্টিছায় অঞ্চলের ঢাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে ক্রন্দনোন্মুখ শিরিঁ। বাতাসে ফরফরিয়ে উড়ছে তার দীর্ঘ পরিচ্ছদের অংশ।

লোকে জিজ্ঞেস করে, পাহাড় আর সমুদ্র এই দুইয়ের ভিতরে কোনটা তোমার পছন্দ? আমার আসলে দিগন্তে উভয়কেই পছন্দ, কাছ থেকে কোনোটিই নয়। সাঁতার জানে না যে, হাঁটুজলে নেমেও যে নাকাল হয় তার জন্যে সমুদ্র একটি বিভীষিকার নাম। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে যার গোড়ালি থেকে কেন্দ্রাভিগ ভয় ছুটতে থাকে হৃদপিন্ডের দিকে, তার কাছে পাহাড়ের সৌন্দর্য্য যাই থাক, ক্যালেন্ডারের পাতায় বা দিকচক্রবালে পাহাড় দেখেই সে তুষ্ট থাকবে। পাহাড়ে আরোহন, পাহাড়ে বসবাস, পাকদন্ডী থেকে দেখা দৃশ্য, ঝোরার অঝোর ধারায় ঝরে যাওয়া এইসবকিছু আস্বাদনের পথে একটি বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়ায় উচ্চতার প্রতি ভীতি। অতএব, নির্বিকল্পভাবে আমার প্রিয় ছিল সমভূমি, আউশ-আমনের ক্ষেত, ফসল তুলবার পর নাড়াপোড়া মাঠে দাঁড়িয়ে ওড়ানো ঢাউস ঘুড়ির বোঁ বোঁ শব্দ, সুসমতল আঙিনা, ঘেরা দেয়া বারান্দা এবং নাকবারান্দার সামনের সামান্য সোপান।

যা হয়, এমনি সব পারিপার্শ্বিকের কারণে আমার মন ছিল বাঁধনহারা, শেখর বসুর ইয়েতির উপাখ্যানের সঙ্গী, স্টিভেন কালাহানের সাথে ৭৬ দিন অতলান্তিকে ভেসে থাকা জলচর। সকালের স্কুল ধরতে ভাত খেয়ে যারা রওনা হতো, ভরন্ত পিপের মতন টৈটুম্বুর মন আর চোখভর্তি স্বপ্ন, অথচ তেমন কোনো রোমাঞ্চের দেখা হবার সম্ভাবনা আপাততঃ সুদূর, আমি সেই শিশু ছিলাম, সেই কিশোর (অনেককাল পরে পরিতোষযোগে আবিষ্কার করেছি এমনি নিশ্চেষ্ট গৃহপালিত জীবের হৃদয়ে অন্তর্গত রোমাঞ্চের খেলা নিয়ে বুদ্ধদেব বসুও বহুকাল কাটিয়েছেন, জেনে সংখ্যাগরিষ্ঠের আমোদবোধ করেছি)। বলতে দ্বিধা নেই একরকমের চেনা মালভূমিতে প্রায় পুরো জীবনই কাটিয়ে ফেলতাম হয়তো আমি, যদি না কুড়ির পর থেকেই একরকমের অসহ্য ‘অন্য কোনোখানে’ যাবার তৃষ্ণা আমাকে তাড়া করতো। ব্যক্তির বিকাশবিরোধী সামাজিকতাগুলি, দিবসশর্বরী কেবল ‘বসুধার ক্ষুদ্র খন্ড’ নিয়ে এই সাতচারা খেলা আমার অসহনীয় লাগতে শুরু করেছিল, আমি পরিত্রাণকামনা করেছি প্রথমতঃ নিজের কাছে।

শৈশবে আমার দেখা পাহাড় ছিল রমনা ‘শিশুপার্ক’এ, রেসকোর্সের সব ইতিহাস বুঁজিয়ে দিয়ে ল্যান্ডস্কেপ করে মাটির একটুখানি টিলা করা হয়েছিল, তাতে ঘুরপথে ওপরে ওঠা যেত, টিলার ওপর কিছু ছোটখাট গাছগাছড়া আর ঘোরালো পথটুকুতে খুচরো ফুলের ঝোপ। সেখানেও মন খুলে ছুটোছুটি করা যেত না, ছেলেধরার ভয়ে মা হাত ছাড়তে দিতেন না। সব কলাবতীর ঝাড়ের পেছনেই থলে-কাঁধে একটি দুষ্টলোক বসে আছে আমাকে ধরবার জন্যে- এই কল্পনা আনন্দ বা স্বস্তি কিছুই দেবার মতো নয়। ফলে এই পাহাড়ের সাথে আমার মন দেয়ানেয়া হয়নি।

গানের ইস্কুলে আমার প্রথম শেখা গান, “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ”, ‘সাপুড়ে’ ছবিতে কানন দেবীর গাওয়া নজরুলগীতি। গানটায় কিছু লাইন ছিল, “চিতাবাঘ মিতা আমার, গোখরো খেলার সাথী/ সাপের ঝাঁপি বুকে ধরে সুখে কাটাই রাতি”, এই শব্দগুলি কিছু কল্পদৃশ্য সাথে করে বয়ে আনতো, সেটা বেশ মজা লাগতো মনে আছে। কট্টর মুসলিম পরিবারে বিয়ে হয়েছিল বলে আমার মা আমাকে রেয়াজ করতে দিতেন আড়ালে, সবাই অফিসে চলে গেলে, দাদা-দাদী গ্রাম থেকে বেড়াতে এলে যেন কিছুতেই রেয়াজ না করি সেই অনুনয় করেছিলেন মনে আছে। আমি সেই কথা রাখতে পারিনি, শৈশবের চাঞ্চল্যবশতঃ গেয়ে ফেলেছিলাম দাদীর সামনে, “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ...” আমার বৃদ্ধা নিদন্ত দাদী চুপ করে শুনেছিলেন আর গানশেষে তারিফের সুরে বলেছিলেন, কবির কল্পনা কত মধুর, পাহাড় আকাশে হেলান দিয়ে আছে! ঐ একটি গানে আমার প্রকাশ্যে গানের রেয়াজ করবার বাধা দূর হয়ে গেছিল, আলস্যবাধা অবশ্য তারপরেও বহাল ছিল। আকাশে হেলান দেয়া কালো পাহাড়, তার কোল থেকে নেমে আসা সফেন ঝরণা, ঝরণার পাদদেশে খেলুড়ে ভেড়ার ছানাদের চকিত দৌড় আর হলদে ড্যানডেলিয়নে আলো হয়ে থাকা মাঠ এইসব দেখতে আমাকে আরো অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

যাই হোক, এরপরের অনেকগুলি বছর পাহাড় বলতে আমি কেবল জেনেছি ক্যালেন্ডারে সুদৃশ্য বরফঢাকা শৃঙ্গ কিংবা রডোডেনড্রনগুচ্ছে আচ্ছন্ন পাহাড়ের ছবি। নীল জলাভূমির ওপারে নীলতর পাহাড়, তার ওপর ঝুঁকে পড়া নরম নীল মেঘেদের পরত। বার্ষিক পরীক্ষার সময়ে সেইসব দৃশ্যের নিচের তারিখগুলিতে বেশি বেশি দাগ পড়তো। আমাদের বাড়িটা সেকালে ছিল কয়েকটি করাতকলের কাছে, গাছ কাটবার সময় যে গুঁড়ি জমতো মাটিতে, সেই কাঠের গুঁড়ি পলিথিনের থলেতে করে বাড়ি এনে শিরিষের আঠায় জ্বাল দিয়ে মিশিয়ে তা দিয়ে চমৎকার পাহাড়পর্বত বানাতাম আমরা। একটু নরম থাকতে তাতে গেঁথে দিতাম কামিনীর পাতাশূন্য ডাল- দেখতে দেখাত পর্নমোচী গাছেদের সারির মতন; কাঠগুঁড়ি-শিরিষের মিশ্রণটা শক্ত হয়ে যাবার পর তাতে পোস্টারকালার দিয়ে বসাতাম তুষার, পাহাড়ের ঢালের বনানী।

ভূগোল ক্লাসে তদ্দিনে পাহাড়ের রকমফের পাঠ্য হয়েছে। কোনোটি ভূপৃষ্ঠের কুঞ্চনে জেগে উঠেছে, কোনোটি হিমবাহের ক্ষয়ে, কোনোটি অগ্ন্যুৎপাতের কারণে, কোনোটি সমুদ্রের তলদেশের ভূ-আলোড়নের পর জেগে উঠেছে। শিখেছি সিয়েরা নেভাদার নাম, শিখেছি ভিসুভিয়াস-ফুজিয়ামার নাম, জার্মানীর ব্ল্যাকফরেস্টের নাম, আল্পসের নাম- কোন দ্রাঘিমায় কোন কোন পর্বতমালা সভাসদসমেত আসন পেতেছেন। শিখেছি হিমালয় একদিকে আমাদের সমতলে বৃষ্টি বইয়ে দিচ্ছে, আরেকদিকে তার বৃষ্টিছায় অঞ্চলে গভীর বৈরাগ্যে জেগে উঠেছে গোবি মরুভূমি- তার বুকে প্রাণের পুরনো চিহ্ন বলতে ডাইনোসরের ডিম; সকল পর্বতমালার একদিকে ফুল-ফসল-নদী-সরোবর আর আরেকপাশে নিষ্ফলা মরু অঞ্চল- মরুচর লোকে বলে মরু বিভাজিত করে আর জল এক করে দেয়। সেকালে বাংলাদেশ টেলিভিশন তার ‘মুভি অফ দ্য উইক’ এ দেখাচ্ছে ‘স্নোজ অফ কিলিমানজারো’- কিলিমানজারোর পশ্চিমের বরফাচ্ছন্ন শৃঙ্গের কাছে একটা লেপার্ডের বিশুষ্ক-শিলীভূত মৃতদেহ পড়ে আছে, এত ওপরে কেন লেপার্ডটা গেছিল তার হদিশ মেলে না, গ্রেগরি পেক আর এভা গার্ডনারকে দেখে তখন হৃদপিন্ড থেকে কেন্দ্রাতিগ রক্তের ফোয়ারা ছুটছে পায়ের তলা অব্দি।

উরাল পর্বতমালার দিকের লোককথা মেশা গল্পের বই ‘মালাকাইটের ঝাঁপি’ দিয়ে পাভেল বাঝোভ মুগ্ধ করে রেখেছিলেন আমাদের কৈশোর। তামা-পাহাড়ের ঠাকরুন আসলে শব্দের ছদ্মবেশে অ্যানিমেশনের অপূর্ব কাজ- পাথর যেমন করে গিরগিটি হয়ে যায়, গিরগিটি থেকে আবার বিনুনিবাঁধা রূপসী রুশী নারী- তারপর আবার গিরগিটি হয়ে শরশর করে সরে যায়। খনিশ্রমিক আর তামার খনির পাহাড়ের সাথে আমার প্রাথমিক পরিচয় ঘটিয়েছিল সেই বইটি। আহা, পাহাড় মানে অচেনা বিপদ, পাহাড় মানে লোকান্তরে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় খোদাইশিল্পী পুরুষ, পাহাড় মানে যাদুর আঙুল ছুঁইয়ে গজিয়ে তোলা রাশি রাশি রত্ন আর খনিজ।

দূর থেকে আমি সত্যিকারের পাহাড় দেখেছি জাফলং এ, দূরের শিলং শহরের দিকে তাকিয়ে, পিয়াইন নদীর বরফগলা হিম জলে পা ডুবিয়ে। দূর থেকে আল্পস দেখেছি প্লেনের জানালা দিয়ে, উছলে উঠছে হ্রদের ঝিলিমিলি আর দিলখুশ পর্বতরাশি। কাছ থেকে পাহাড় দেখেছি কাম্ব্রিয়াতে, দেখে চোখ জুড়িয়ে গেছে। তামার খনি ছিল পাহাড়ে পাহাড়ে, আজো সেখানকার নববিবাহিত দম্পতিদের বিয়ের পর ঘুরিয়ে আনা হয় খনি অঞ্চল। লার্চ গাছে সবুজ পাতা এলে সেখানে জলে ‘চার’মাছ ধরা দেয়, দিনে বিশটির বেশি ধরা যায় না, সরপুঁটির সমান বড় মাছ। জলে আরো ঘোরে সবুজ বুটিদার পাইকমাছ, মুখে ঘড়েল হাসি। পাহাড় ভরা মরা ঝনঝনে ফার্ন। গাছের পরনে তামাটে-গোলাপি পাতা, তার শোভা ফুলের চেয়ে বেশি। সবুজ- নীলচে সবুজ- বোতল সবুজ সব গাছেদের ভিতর হঠাৎ ফিকে গোলাপি- ম্যাজেন্টা- কমলামেশা গোলাপি ফুলের ফোয়ারা, নাম তার আজালিয়া। মাঠময় হলদে আর্কটিক পপি- হলদে বাটারকাপ- হলদে ড্যানডেলায়ন। সেই গন্ধক-হলুদ মাঠে নাক ডুবিয়ে হলুদ উষ্ণতার ভাপ নিচ্ছে কৃষ্ণাননা ধুলিরঙা ভেড়ার পাল। তাদের বসন্তকালীন বাছাদের গোলালো শৃঙ্গোদ্গমপূর্ব মাথা আর ঘাড় ঠেসে আছে ঠাসবুনোটের কালো কোঁকড়া রোমে, ভিজে ত্যানার মতো লেজ। কালো শ্লেটপাথরের ওপর অফুরান বয়ে চলেছে ঝরনা, তার আশপাশে ঘাসের মাঠ। গভীর সবুজ বন পাহাড়ের গায়ে, সবুজাভ নীল হ্রদ আর সবজেটে শাদা আকাশ। সে আকাশে হেলান দিয়ে দিকরেখা ঢেকে দেয়া পাহাড়, পাহাড়গুলি গোইয়্যার আঁকা দানোর মতো বিশাল, তাদের শৃঙ্গ প্রায়শই ঢেকে যায় ধূসর খেয়ালী কুয়াশায়। পাহাড়ের কোলে মাঝে মাঝে ধূসর পাথর লাফিয়ে ওঠে, বোঝা যায় ওটা বুনো খরগোশ।
পাহাড় মানে ভিনসেন্টের রোদেলা পাহাড়, পাহাড় মানে পল সেজানের মেদুর পাহাড়। পাহাড় মানে হিরোশিগের জাপানি ছবিতে জানালায় গুঁড়ি মেরে বসা শাদা বেড়াল, বাইরে তাকিয়ে দূরের দিগন্তের বিশাল পর্বতের শৃঙ্গ ছুঁয়ে উড়ে যাওয়া বলাকা দেখছে।

আর পাহাড় ছিলেন আমার মা, সহ্যাদ্রি। ‘সহ্যাদ্রি’ নামটা একটা গল্পে পেয়েছিলাম, মানে সহ্যের পাহাড়। সে পাহাড়ের দুই ঢালই বৃষ্টিবিধৌত- অন্ততঃ আমার শৈশবের চোখে তাই ধরা দিত। আর সব বাড়িতে যেমন থাকে, পর্বতমালার মতন বিপুল মা- তার আলিঙ্গন, তার স্নেহের গুহা আর উষ্ণ প্রস্রবণ, তার শাসন, তার বহিঃশত্রুর কাছ থেকে প্রতিরক্ষা- এর সবই ছিল তাঁরও। সে পর্বতমালা ডিঙিয়ে অভিযাত্রীর রোখ নিয়ে মরুভূমি খুঁজতে যাইনি কখনো, ছিল নিশ্চয়ই (ভূগোল তো তাই বলে), সে মরুতেও ছিল প্রাচীন ডাইনোসরের পেড়ে রেখে যাওয়া ডিম, মা তা জানান দিতেন না কখনো।

আরেকটি পাহাড়ের ঢালু কিনারের মাঝ দিয়ে চলে গেছে রেখা তার নাম ‘লিনিয়া নিগ্রা’, দাঁড়ানো অবস্থায় বিপুল উদরের কারণে পায়ের আর কিছুই দৃশ্যমান নয়, ঘাড় গুঁজে অদ্ভূত আকারের জীবে পরিণত হয়ে যাচ্ছে মেয়েটি, প্রিয়জনদের হৃদয়ের দক্ষিণাভিক্ষা করছে তার আপাত-সৌন্দর্য্যহানির যাতনা, তার স্থাবরপ্রায় চলাচল। অথচ কেবল মা জানে, ‘দ্য হিলস আর অ্যালাইভ’, এই পাহাড়ের গুহায় বাস করে এক আশ্চর্য্য শাবক, মনের মাঝারে মন্ডাকার ইচ্ছে হয়ে ছিল যে এতদিন। জগতের এই একান্ত আনন্দসভায় একদা আমারও নিমন্ত্রণ জুটেছিল, সকল গর্ভিনী নারীর ভিতরে যে সুর ঘাই মেরে উঠে জানান দেয়- এসেছি, তা শুনেছি আমি। পাহাড়ের মতো প্রাচীন সেই সুর। তার প্রতিধ্বনি রক্তের ঝুমঝুমিতে চলিষ্ণু থাকে এক জীবন।