নত হই প্রতি প্রতি বার

নীতা বিশ্বাস।



ঝুমঝুমি বাজিয়ে রাত নামায় বৃষ্টি। দৌড়ে এসে জানালা খুলি, যেন আমাকেই খুলি। দৃশ্য, শ্রবণ, স্পর্শ, আমার সমস্ত সত্ত্বা খুলে খুলে অবাক তাকিয়ে থাকি জানালা ছুঁয়ে থাকা ফার্ণলতায় গা-ঢাকা অন্ধকার পাহাড়টার একলা নিঝুমে। দেখি ভিজছে সে। বুনো সবুজের আঙরাখা মনে মনে খুলে দিয়ে তার ভেজাকান্নার রক্ত দেখতে পেয়ে যাই। ডিনামাইটে উড়িয়ে দেওয়া তার ছিন্ন- বিছিন্ন প্রত্যঙ্গ কেঁদে ওঠে আমাকে দেখে।
নিপূণ চাকচিক্যের বাহারি হোটেল। পাহাড়ে কুড়ুল মেরে খানিকটা সমতল। মাঝখানে রঙমাখা মেয়ের মত সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুরন্ত কুমারী সুন্দরী হোটেল। মরসুমী ফুলের কৌশলী কেতা ভিবজিওর দিয়ে ওদের কান্না-মুখ ঢেকে রেখছে। জানলা দিয়ে ট্যুরিস্টদের বাড়ানো হাত দিব্যি ওদের মলেস্ট করতে পারে। কোনো কোনো সম্বেদী হাত ওদের ভালোবেসে ছুঁয়ে দিলে ফার্ণ আর পাহাড়ি ফুলেরা ঝুঁকে এসে গল্প জুড়ে দেয় সুখ দুঃখের। সারা রাত কান্নার মত বৃষ্টি ঝরে। সকালে দ্যাখো কান্না মুছে ঝকঝকে রোদেলা হাসি নিয়ে হাই- হ্যালো-গুডমর্নিং এর হাত বাড়িয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে তোমারই জন্য। তিন তলার ল্যান্ডিং থেকে লাজে লাজানো কাঞ্চণজংঘা পিক --– অ’ সাম। যে আমায় এই অসামান্যকে দেখালো, তার পাথরভাঙা অঙ্গে কান পেতে সারারাত কান্না শুনতে পেয়েছি। দেওয়ালে দেওয়ালে সে কান্না ঠিকরে পড়ে আমার রাতজাগা চোখে বিষন্ন ছড়ায়। এভাবেই বিশাল’কে আমরা ভেঙে, আঘাতে টুকরো করে, ছারখার করে... বন্য-সৌন্দর্য (inner beauty) কে ধ্বংসের অবলীলায় সো-কল্ড চোখ-সৌন্দর্যের গালচে পাতি। মন্দির বানাই। হোটেলের পসরা সাজাই। রূপোবতী প্রকৃতিকে মৃত্যুর বিসর্জনে ঠেলে দিয়ে রৌপ্যরাশির চোখঝলসানো সওদাগিরি ক্যারিশ্মায় আমরা পাগলপারা। সেয়ানা পাগল যারে বলে। বিশালের চরণতল থেকে তার শিখরের সাবলাইমে পৌঁছানো...? হয়না আজকাল। ধর্মের ঘটগুলো সত্য ত্রেতার চেয়েও কলিযুগের কলঙ্কিত সময়েই বেশি ভরা যে...। প্রকৃতির উচ্চতাকে প্রতিনিয়ত খর্ব করে ভেঙে উড়িয়ে গুঁড়িয়ে হিমাচলের পাহাড়ে জাগ্রত তীর্থের নাম করে আমরা নয়নাদেবীর মন্দির বানাই, লোকালয়ের সওদা ঘর দোকানপাট, পুজাসামগ্রীর নিপাট বেচাকেনা। ধর্ম (তথাকথিত) যেখানে অধর্মের চরমে গিয়ে টাকা দিয়ে টিকিট কাটা লাইনে জলদি ও আরামের ‘ভগবান দর্শণে গিয়ে মেশে। আমরা স্বস্তি শান্তি আর গর্বের দোলায় দোল খাই। সমতল থেকে চারহাজার ফিট ওপর পর্যন্ত টাকার রাস্তা বিছিয়ে ‘ধম্ম’ সওদা করি। দেখতে যাই সীতাপীঠ। হিমাচলের পঞ্চদেবী --- নয়না দেবী, জ্বালাদেবী, চিন্তাপূর্ণী দেবী, দেবী বজ্রেশ্বরী, দেবী চামুন্ডা। ফাঁকে ফাঁকে দেখে নিই ক্ষেত্রপাল ভৈরব, গণপতি, হনুমান, ভৈরব উনমত্তেশ্বর। তুষারশুভ্র ধৌলাধার—এক অমিত সৌন্দর্যের পর্বতপ্রকৃতি, তছনছে ব্যবসামন্দির বানাই। কাহিনী তৈরি করি। টাকা কামাবার ট্যুরিস্ট স্পট। রাজস্থানের কুন্তলগড়, ত্রিপুরার উনকোটি।
তো এভাবে আমি পাহাড়ের ধ্বংস দেখি। ধংসের পাহাড় দেখতে পাই। মুখে রঙ মেখে দাঁড়িয়ে থাকা ঝলমলে দুঃখ দেখি। ধর্মের নামে অধর্ম দেখি। পর্বতের পার্বত্য ক্যারেক্টার খুন করে, তার লাশের ওপর সাজানো লাশ্যময় দোকানপাট দেখে আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। দেব দেবীর স্তবের অসম্ভব দিয়ে লোক ঠকানো ভক্তিআফিম গেলানোর চমৎকার দেখে নিজেকে খিস্তি দিই।

এইসব ঊনকোটি চৌঁষট্টি পুণ্যার্জনের তীর্থভ্রমন সেরে গর্বিত অহংকৃত আমি যখন হঠাৎ করে সেই মহীমময় মানুষটির কাছে এসে দাঁড়াই, তখন, বিষ্ময়ে দেখি, কোনো পাহাড়ীউচ্চতার তীর্থস্থানকেই তাঁর থেকে বড় মনে হয়না। কেন? কেন মনে হয়না! মনে হয়নার কারন তিনি যা কিছুই করেন, তা বেঁচে থাকা দুঃখী মানুষদের জন্য করেন, কোনো নিঃসাড় নিস্প্রাণ পাথরের মূর্তির ওপর দুধ জল ঘি ঢালবার স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নয়। নিজেই হাজারটি (ভড়ং নয়) তীর্থস্থান শরীরে মনে মননে কর্মে বহন করেন। তিনি, হ্যাঁ তিনি নিজেই তীর্থ ভুমি। তিনি একাই একটি ইন্সটিটিউসন।
# আমার মনে হয় প্রত্যেক মানুষের বুকের ভেতর একটা নিজস্ব পাহাড় থাকে। কেউ তাকে লালন করে, কেউ তাকে বহন করে। বহনে যন্ত্রনা থাকে। লালনে সমৃদ্ধি। সে সমৃদ্ধির সাথে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধি ছাপের নোটের কোনো সম্বন্ধ থাকেনা। থাকেনা কোনো স্বার্থগন্ধ। থাকে ভরা বুকের বহন-যন্ত্রণা। যন্ত্রণাই শুধু? না। সে এক আনন্দযন্ত্রণা। সে যন্ত্রণা কী যে মধুময়! মানুষ মাত্রই বুকের এই পাথর নিয়ে জীবনের রোজনামচার নামতা লেখে, নামতা পড়ে। তার মধ্যে কিছু উদ্ধত বুক শুধু নিজেকে নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকতে পারেনা। সেখানে অনেকজনের জীবনের, যাপনের কষ্টকে লাঘবের দুর্লভ চিন্তায় নিজেকে জড়ানোর দায়বদ্ধতা অনুভব করে। এই দায় মেটাতে তাঁর জীবন অর্থ পথযন্ত্রণাকে বাজী রাখে। অসীম স্নেহে, আপার বেদনায় সমাজের দুরাচার, কুসংস্কার, বৈষম্য, অবিমৃশ্যকারিতা সরাবার সম্মার্জনী নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিশাল ময়লার ঝুড়ি নিজের মাথায় বহন করে আগুনে ফেলে পুড়িয়ে দেদার ছাই করে ফেলতে চান। কাজে নেমে পড়েন। শুধু নিজের সদিচ্ছা কে পুঁজি করে। কুসংস্কারমুক্ত সুস্থ সুন্দর সূর্যালোকিত শিক্ষিত সমাজ- জীবনের উজ্জ্বল তাঁকে জড়িয়ে থাকে। এই মানুষটিকেই আমি পাহাড়ের বিশালতায় অনুভব করি। তাঁর কাছে নতজানু হই বার বার। তিনি আমার কাছে এক পরিধিহীন অসীম। এই পাহাড়ে তেত্রিশ কোটি দেবতাদের কেউ ঠাঁই পায়না। ঠাঁই পায়না তাঁদের কাছে নিবেদনের ভন্ড উপাচার। শিবলিঙ্গের ওপর সোনার চোখ খোদাই করার ভন্ড অশ্লীলতা। একান্ন পিঠের মাহাত্মে ভ্রমণ না করে তিনি সাধারণ মানুষের বুকপাথরের এক নির্জন পরিব্রাজক। হ্যাঁ, তিনি। সেই এঁড়ে বাছুর, সেই যশুরে কৈ। সেই বীরসিংহের সিংহ।

তাঁর কর্মজীবনে (মোটামুটি ১৮৪০ বা ৪১)পা রাখবার সময়টায় বঙ্গীয় সমাজে দু-মুখী খেলা চলছিল। যেন একটা দড়ি টানাটানি খেলা। দড়ির একমুখে ছিল মধ্যযুগীয় ধর্মীয় কুসংস্কার, নীচতা, মধ্যযুগীয় বিলাসিতা এবং অলসতা ও অন্যদিকটায় নবজাগরণের নতুন যুক্তিবাদী মানবতাবাদী চেতনা। এই দুই বিপরীতমুখী টানাপোড়েনের মাটিতে দাড়িয়ে একজন কুলীন রক্ষণশীল ব্রাহ্মনের বেশবাসের অন্তরালে যে দুঃসাহসিক প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে তিনি তাঁর জীবনধারার সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছিলেন তা ছিল কল্পনাতীত, এবং তাঁর চরিত্র, যে চরিত্র প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় সুখী ছিলনা, অতৃপ্ত ছিল। যে চরিত্র প্রচলিত সমাজব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে ‘মিসফিট’ মনে করতো, সেই চরিত্র বিশ্লেষণে একটা দারুণ সত্য আমাদের কাছে ফুটে ওঠে যে সারা জীবন ধরে তিনি সমাজের জন্য যে কাজগুলো করে গেছেন তা কোনো ভাবাবেগের বশবর্তী হয়ে নয়। তা ছিল সমাজের কাছে নিজেকে ভীষন ভাবে দায়বদ্ধতার উদাহরণ। এই দায়বদ্ধতাই, (যা অ্যাভারেজ মানুষের মধ্যে ছিলনা), তাঁকে দিয়ে একটার পর একটা সমাজ সংস্কারমূলক কাজ করিয়ে নিয়েছে। কি কি করেছেন তিনি যা তাঁকে পাহড়ের উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে! যা করেছেন আমরা গড়পড়তা সাধারণ বাঙালিরা তার ঝুঁকি নিতে বস্তুত ভয় পাই। লোকদেখানো লেকচারবাজীকে দূরে সরিয়ে রেখে, অগ্র-পশ্চাত বিবেচণার নজরদারী সিকিওরিটিগার্ডের বর্মের আড়ালে মঞ্চকাঁপানো নাটকীয়তা বর্জন করে নিঃশব্দে কাজ কাজ আর কাজের মধ্যে দিয়ে পরিবর্তণের বাস্তব দেখতে ‘একলা চলো’র পথ স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন। শরীরে মনে পাহাড়ের বিশালতা না থাকলে এ কি ভাবা যায়?

তো মধ্যযুগে সমস্ত জ্ঞান’কে কুক্ষিগত করে রাখবার একটা অদ্ভুত প্রবণতা ছিল। ছাপা বই’য়ের বিরুদ্ধে রীতিমত campaign করা হোত। তাঁর দায়বদ্ধতা ও যুক্তিধর্মী মননশীলতা তাঁকে এই সত্যটি দেখিয়েছিল যে ছাপাখানাই কোনো সমাজের তথা দেশের অগ্রগতির পরিচয় বহন করে। কারন তা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত। শিক্ষাকে প্রায়োরিটি দিয়ে তখনকার মাটিতে দঁড়িয়ে কি দুঃসাহসিক মানসিক শক্তিতে তিনি প্রেস খুলেছিলেন, ভাবা যায়! যা ভাবা যায়না তা সফল ভাবে করে দেখানোর নামই ঈশ্বর চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। আবার দেখি, শিশুপাঠ্য বইয়ের অভাব ও প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁর মাথাতেই প্রথম এসেছে। সে সময়ে জ্ঞানী গুণী মানুষের অভাব তো ছিলনা! কিন্তু এমন মানুষের অভাব ছিল যিনি মায়ের মত মমতায় শিশুর প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা গুলোকে প্রধাণ্য দিয়ে মায়েরই মত আজীবন লড়ে যেতে পারেন। বৃষ রাশির জাতক তিনি বৃষ’র মতই একগুঁয়ে লড়াকু মনোভাব নিয়ে অন্তরালে থাকা তথাকথিত ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় গুলিকে খুঁজে বের করেছেন এবং সমাধানের প্রাধাণ্য দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে শিশুপাঠ্য বইএর অভাবে শিশুর জিজ্ঞাসা এবং পড়বার আগ্রহ কিভাবে মার খায়। যার জন্য তাঁর কলম থেকে প্রসূত হয়েছিল ‘বর্ণপরিচয়’ বোধোদয় কথামালা আখ্যাণমঞ্জরী ঋজুপাঠ চরিতাবলী ইত্যাদির মত পাঠ্যপুস্তক। বস্তুতঃ, তাঁর পান্ডিত্য তো শুধু এইসব বই রচনা করবার মত ক্ষীণ ও সীমাবদ্ধ ছিলনা। ইচ্ছে করলেই তো তিনি তাঁর কলম-প্রতিভায় অনেক পান্ডিত্য-ভরা গভীর গম্ভীর সাহিত্যের পশরা সাজিয়ে আঁত্মশ্লাঘা আর সম্মাণের আর রয়্যালটির ঊচ্চ চুড়ায় বসে থাকতে পারতেন অনায়াসেই! তবু তিনি নিজের কলম-সফলতার রাশ টেনে ধরেছিলেন কেন? কেননা, ভাবতে আশ্চর্য লাগে, তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি অনুভব করেছিলেন যে বাংলাভাষার কাঠামো অত্যন্ত দূর্বল। সেই সময়কার বাংলাভাষাকে সুসংস্কৃত, সহজবোধ্য ও সুন্দর করে তোলার ভীষণ প্রয়োজন। যে ভাষা সহজবোধ্য নয় সেই ভাষায় রচিত বই কি করে সাধারণের কাছে পৌঁছাবে --- এই বাস্তব সত্যটি তাঁর কাছেই কেন ধরা পড়ে! তাঁকেই কেন নাড়িয়ে দেয়! দেয় এইজন্যই যে তিনি আগাগোড়া সমাজ-সচেতন মানুষ। তিনিই বুঝেছিলেন যে, প্রাথমিক স্তর থেকে সচেষ্ট না হলে বাংলা ভাষাকে বাঙালির কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপায় নেই। কোনো ভাষাকে দাঁড় করাতে গেলে তার একটা ব্যাকরণগত ভিত চাই, এই মুল সত্যটিও তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর রচণা গুলি তাই ভাষানির্মাণভিত্তিক রচনা। নামের আগে পন্ডিত উপাধিকে তিনিই অবহেলায় সরিয়ে রাখতে পারেন যিনি সমাজ-সচেতনাকে, দাম্ভিক আঁত্ম-সচেতনার ঊর্ধে স্থান দিতে পারেন। এই পর্বততর উচ্চতার অন্য নাম বিস্ময়। বিদ্যাসাগর পর্বতটির গভীর বোধ ও আত্মত্যাগ আমাদের কী অতল ভাবে ঋণী করেছে!

না। আমি এখানে দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরের গুণগাথার কীর্তন আঁকতে বসিনি। লোকে বলে থাকেন, বিদ্যাসাগর মানুষটি বজ্রের ন্যায় কঠোর আর একসাথে কুসুমের মত কোমল। তিনি নির্জলা একাদশীর বাল-বিধবাদের দুঃখ দেখে কেঁদে ভাসতেন। তিনি নাকি আগ্রাসী জোয়ারের উন্মত্ত দামোদর সাঁতরে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন। মাতৃভক্তির উদাহরণের তন্বিষ্ঠ! আসলে এসব গসিপ ও অতি-উক্তি একজন প্রকৃত মানুষকে অলৌকিক মাহাত্ম দেবার কারচুপী, যা আমাদের দেশের জনগণ বেশ ভালোই জানেন ও পারেন। সত্যিকারের মনুষ্বত্বর মধ্যে যেসব কোয়ালিটিস থাকা দরকার, তা সত্য হয়ে উঠতে দেখলেই মানুষ নামধারি আমরা তাঁদের ওপর অলৌকিকতার স্ট্যাম্প মেরে দিই। অথবা তার সততা কে সন্দেহ করে মিথ্যের জালে বন্দি করে জেলের ঘানি টানাই। অথবা মিথ্যে রটনার ভেল্কিবাজীতে ভস্ম বানিয়ে ছদ্ম উদারতায় রেনকোজির মন্দিরে মিথ্যে স্থাপন ও রোপন করি। এসব করি নিজেদেরকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে। আসলে তিনি জীবনে যা যা করেছেন তা দু-চারদিনের বাহাদুরির আবেগপ্রসুত হাততালি পাবার চমক দেখানো নয়। সমাজের জন্য যা করেছেন সেগুলি সুদূরপ্রসারী কর্মকান্ডের এক বিশাল মাত্রা যার প্রত্যেকটি আশ্চর্যভাবে ইনটারলিংক্‌ড। বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের মধ্যে একসাথে কতগুলি যুক্তিবাদী চিন্তা কাজ করছিল তা মোটা মাথায় সহজে ঢোকেনা। এবং মাথায় ঢোকাতে পারলে আশ্চর্য হতে হয়। কিংবা আশ্চর্য বলে তাঁর মত বৃহৎ আঁত্মশক্তির কাছে কিছুই ছিল না। বিধবা বিবাহ প্রবর্তণের কথাই ধরা যাকনা। এখানেও তাঁর সমাজ চিন্তা কী গুরুত্বপূর্ণ! শুধু যে বিধবা মেয়েদের মুখ চেয়ে আর সুখ চেয়েই তিনি এরজন্য লড়ে গেছেন, তা কিন্তু সম্পূর্ণ সত্য নয়। এর পেছনেও তাঁর প্রখর যুক্তিবাদী মন কাজ করেছে। সে সময়ের সবচেয়ে ঘৃণ্য যে প্রথাটি সমাজে চেপে বসেছিল তার নাম কৌলীন্য প্রথা, এ তো সবাই জানেন। এর ফলে বিধবা, বিশেষ করে বালবিধবার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে চলেছিল। এর ফলস্বরূপ এক বিষময় সমস্যা সমাজকে পচন ও পতনের মুখে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে ব্যাভিচার, ভ্রূণহত্যার মত ব্যপার গুলো অবাধে চলতো। আর এর ফল ভোগ করতে হোত সেই বিধবা মেয়েটিকেই। তাকে ভোগ করবার অনেক ভদ্রমহোদয় ছিল কিন্তু উদ্ধার করবার কেউ ছিলনা। এই ঘুনধরা সমাজ যে একটা মেরুদন্ডহীন জাতীর সৃষ্টি করে চলে যুগ যুগ ধরে, --- এই বিষময় গভীর সত্যটি একমাত্র তিনিই বুঝতে ও ধরতে পারেন, সমাজ ও মানুষকে যিনি গভীর ভাবে ভালবাসেন। হিউম্যানিস্ট ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাই তৎকালীন এবং ভবিষ্যতের এই ভাঙনের ভীষণ কে দেখতে পেয়েছিলেন। আজ একুশ শতকের রাজনীতি-সর্বস্ব সমাজ তথা রাষ্ট্রব্যাবস্থায় সমাজকল্যাণ, মানবপ্রীতি ইত্যাদি শব্দ গুলো দেশ-নেতাদের মুখোশ হয়ে উঠেছে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঢাক-ঢোল- আড়ম্বরের অন্তরালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের হাতিয়ার স্বরূপ সাম্প্রদায়িক উস্কানিকেই ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে আন্তর্জাতিক শিশুবর্ষে শিশুমৃত্যুর হার, শিশুশ্রমিকের সংখ্যা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, যেখানে আন্তর্জাতিক নারী-বর্ষে সর্বাধিক সংখ্যক নারী পণ নির্যাতন ধর্ষন ও শ্লীলতাহানীর শিকার হন, যেখানে ১৮ / ১৯ শতকের বাবুকালচারের স্থান নিয়েছে পূজা- কালচার--- সেই সমাজব্যবস্থায় বিদ্যাসাগর রামোহনের মত মানুষের ব্যাতিক্রমী চিন্তাধারা ও সুদূরপ্রসারী আর্ষ দৃষ্টি কি আজ প্রতিপদে অন্য আরো বিদ্বজ্জনের অক্ষমতা, সমাজ-সচেতন-বিমুখ মানসিকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়না? আজ নারীজাগরণের জোয়ারে দিক বিদিক ভরে যাচ্ছে। এই নারীজাগরণের ও নারীমুক্তির প্রথম পদক্ষেপ কি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্ত্রী-শিক্ষা আন্দোলন এবং সহবাস সম্পর্কীয় বিধিনিষেধের মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠেনি? এ’রকম একজন নিঃস্বার্থ চিন্তাবিদ মানুষ তো পাহাড়ের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যান বলে আমার মনে হয়। তাঁর শিক্ষাচিন্তাও কি কম প্রাসঙ্গিক! যে কালে সংস্কৃত আর আর্‌বী ভাষাই শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম ছিল এবং যা মুষ্টিমেয় কয়েকজনেরই করায়াত্ম ছিল, সাধারন মানুষ যা বুঝতে পারতো না, সেই ভাষায় লক্ষ্যহীন বিদ্যা শিক্ষা দিয়ে এক একজন টুলো পন্ডিত আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন মৌলবী তৈরি করা হোত, তা তৎকালীন ও ভবিষ্যৎ সমাজের পক্ষে কতখানি ক্ষতিকর ছিল বা হতে পারতো তাও তিনিই ভেবেছিলেন তাঁর সেই বৃহৎ মস্তিষ্কের সৌজন্যে। ওই সব ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রদান কে অস্বীকার করে যদি তিনি ইংরাজী ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান দর্শণ ও গণিত শিক্ষার পক্ষপাতি হয়ে থাকেন তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি কতখানি ছিল! কারন সংস্কৃত ও আর্‌বী ভাষাও সাধারণ বিদ্যার্থী দের মাতৃভাষা ছিলনা, ইংরাজী ভাষাও বাঙালির মাতৃভাষা ছিলনা। সেক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভান্ডারটি যে ইংরাজীভাষায় ছিল সেটাই গ্রহন করা কি উচিত বিবেচণার কাজ ছিল না? দেশিয় ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধ ভালবাসা আর অন্ধ অনুরাগের (যা ২১শে আর ১৯শের বাঁধাধরা দিন দুটিতে বাঙালিদের ছদ্ম- মুখরিত করে তোলার মঞ্চকাঁপানো সেলিব্রেসন) বশবর্তী হয়ে তিনি সেই অবলম্বনহীন শিক্ষা ব্যবস্থা কে কিছুতেই সমর্থন করেননি। এর জন্য সেই যুক্তিপ্রবণ মানুষটিকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরাজের দালালের তকমা পেতে হয়েছে। তার জন্য ব্যথা হয়তো পেয়েছেন, কিন্তু ব্যথা বা আঘাত কে প্রশ্রয় দিয়ে এস্কেপিস্ট হননি। বস্তুত, শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় লক্ষ্যটি ছিল মাতৃভাষার উন্নতি তাঁর শিক্ষাপরিকল্পনার মূল কথা। Notes on Sanskrit College ( 1852) এর ২৬ টি স্তবক ভালোভাবে দেখলে এই পর্বতপ্রতিম মানুষটির চিন্তন- গভীরতার সান্নিধ্য পাই, যেখানে প্রথমেই তিনি বলেছেন, “বাংলা দেশে শিক্ষার তত্ত্বাবধানের ভার যাঁরা নিয়েছেন তাঁদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করা।“ অর্থাৎ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আত্মপ্রতিষ্ঠার দিক~টা সর্বদা তাঁর চিন্তায় ছিল।। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য তিনি যতগুলি পরিকল্পনা পেশ করেছেন তাতে পাশ্চাত্য বিদ্যার সাথে ভারতীয় শিক্ষার সমন্বয়ের সুর টি ধ্বনিত হয়েছে।

শৈশবের দারিদ্র যন্ত্রণা নিয়ে বড় হওয়া (প্রকৃত অর্থেই বড় হওয়া), সারা জীবনব্যাপী সমাজ-কল্যাণ এর জন্য নিজেকে নিঃস্বার্থে বিলিয়ে দেওয়া ও ক্ষয় করা, রক্ষণশীল কর্তা ব্যক্তিদের কটুক্তি এমন কি লাশ ফেলে দেবার হুমকি সহ্য করেও নিজের কাছে যা ঠিক ও যথার্থ মনে হয়েছে তার প্রতি অবিচল নিষ্ঠায় পাহাড়ের মতই অবিচল থাকা, --- কে পারে!! তাঁর মত? কী দরকার ছিল তাঁর সারা জীবনকে এভাবে নিঃস্বার্থে এবং নিঃশর্তে দেশের, সমাজের জন্য খরচ করা? কী দরকার ছিল বাংলাভাষার উন্নতির জন্য এতবড় ত্যাগ স্বীকারের? সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার বেদান্ত, স্মৃতি ও ন্যায় অধ্যয়ন করেছেন। ‘হিন্দু ল কমিটি’ তাদের দেওয়া শংসা পত্রটিতে ঈশ্বরচন্দ্র নামের পরে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি টি দিয়েছিল। বিদ্যার সাগর ছিলেন তিনি, কি দরকার ছিল তাঁর সমাজের মানুষের দুখ-যাতনা বয়ে বেড়াবার? কি প্রয়োজন ছিল তাঁর করুণাসাগর হবার? এইখানেই তাঁর ব্যতিক্রমী মেরুদন্ডের কথা, ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের দিকটি আমরা দেখতে পেয়ে যাই। সাধারণ অ্যাভারেজ পারসোনালিটি বা গড় ব্যক্তিত্ব, যা সমাজের প্রচলিত নিয়ম ও সংস্কারের সাথে অভ্যস্থতার বন্ধনে বাঁধা পড়ে থাকে, যুগ যুগ ধরে প্রচলিত (কু) সংস্কারের যুক্তিগ্রাহ্যতা সম্বন্ধে প্রশ্ন তোলেনা বা তোলার কথা কল্পনায়~ও স্থান দেয়না,--- সেই চিরাচরিত আবহমান স্রোতের বিপরীতে উজান ঠেলে যাওয়ার মত মেরুদন্ডের জোর একমাত্র সেই মানুষেরই থাকে, মানব ও সমাজকল্যাণের শঙ্খ টি যাঁর হাতে থাকে। এই কল্যানশঙ্খধ্বণিতে সকলকে সচকিত করে, সমস্ত সংকীর্ণতার বেড়া ভেঙে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর নামক পর্বত~টি সাধারণ মানুষ কে আলিংগন করেছেন। আসলে বৃহৎ তিনিই যিনি সাধারণের সমতলে নেমে আসতে লজ্জিত, কুন্ঠিত হন না।

আজ আমরা অনেক পলিটিকাল ইজ্‌ম নিয়ে বড়ই আত্মগর্বে ফুলে থাকি। কিন্ত সব ইজ্‌ম্‌ এর মূলকথা ও শেষকথা যে “মানবিকতা”, এই যথার্থ এবং মুল্যবান বোধ টা কি আমাদের মধ্যে জাগাতে পেরেছি? বিদ্যাসাগর, আমার পরম আরাধ্য মানুষটি, এইসব তথাকথিত কোনো ইজ্‌ম্‌ এর ধার ধারেন নি, কোনো বাঁধা ধরা গতের দড়িতে নিজেকে বেঁধে রাখার সংকীর্ণতায় থাকেননি। এই বোধ তাঁর অন্তরসঞ্জাত। বিস্ময়ের অতল আমাকে স্তম্ভীত ক’রে যখন আমি তাঁর ‘উইল’পত্রটি দেখি। কি দেখেছি তাতে! দেখেছি এক সুউচ্চ মনের অসীম। দেখেছি তাঁর আত্মীয় অনাত্মীয় নির্বিশেষে প্রকৃত অভাবী ও দুস্থ জনের জন্য নির্দিষ্ট মাসোহারার ব্যবস্থা। এমন অনেক মানুষ এদের মধ্যে আছেন যাদের সংগে তাঁর কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিলনা, ছিল সেই সম্পর্ক যা একজন প্রকৃত সম্বলহীন দুস্থ মানুষের সাথে একজন স্বার্থ-চিন্তাশূন্য দাতার যে আত্মিক আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকে। গ্রামের অনাথ ও নিরূপায় মানুষের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল তাঁর দানপত্রে। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরেও প্রতিটি বিধবাবিবাহের জন্য ১০০ টাকা ব্যয় বরাদ্দ তাঁর উইলে নির্দেশিত ছিল। কে তঁকে মাথার দিব্যি দিয়েছিল, তখনকার পচা গলা সমাজ কে শুদ্ধ করবার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে? দিব্যি দিয়েছিল তাঁর ভেতরের ‘আমি’, তাঁর জাগ্রত চেতনা। কে শোনে এই ‘আমি’র কথা? কেউ কেউ শোনে। যার হৃদয়ে এক বিশাল স্পর্শকাতর অথচ নিষ্ঠ হৃদ-পাহাড় আছে, যে পাহাড় দৃঢ-সংকল্পে অনড়,—সে শোনে। শোনে এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে, নিজের অস্তিত্ব কে তুচ্ছ করে। গঞ্জনার হ্যাপা, খুনের হুমকি। তাতে কি? তিনি তো পাহাড়ের মহিমায়। এসব ঝঞ্ঝা এসে ধাক্কা খেয়ে নিজেই ফিরে যায়। তাঁকে সংকল্প থেকে নাড়াতে পারেনা। শিখরে শিখা নিয়ে ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার নোংরা আর নোংরামো গুলোকে সবাই অবহেলায়... অথচ তিনি আত্মঁবিশ্বাসে , পাশে পাশে আইনি স্বীকৃতির জন্য চটি ক্ষইয়ে ফেলেন। তাঁকে দেখতে হলে অনেক উঁচু পর্যন্ত মাথা তুলতে হয়, যেখানে আমার আইসাইট পৌঁছোয় না। হিমালয়ের উচ্চতা মাপতে পারেন রাধানাথ শিকদার, কিন্তু বিদ্যাসাগরের উচ্চতা কোনো মিটার কিলোমিটারের ইউনিট দিয়ে মাপা যায় না। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ পরিবেশেও তিনি আলোকিত এবং স্পষ্ট। মানুষকে করুণার চোখে নয়, এক পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেছেন। কোনো সীমা’ই তাঁকে আবদ্ধ করতে পারেনা। ধারণের যতেক যন্ত্রণা নিয়ে তিনি শুধু হেঁটে চলেন, সংগে থাকে তাঁর বিখ্যাত ঝ্যাঁটা গাছাটি। কোন জনা তাঁর মত ভাবতে জানে, বইতে জানে, সইতে জানে! না, আমি খুঁজে পাইনা। পলিটিক্যাল স্টান্ট দেবার অনেক জন কে পাওয়া যায়, কিন্তু কোনোরকম আসনলোভ কে অস্বীকার করে, কিছু পাবার প্রত্যাশা না করে, শুধু দিয়ে যাওয়ার এই অসামান্য উচ্চতা কে সেলাম করি হাজার বার। যদিও এইসব সেলাম প্রনাম কুর্ণিশ কে পরোয়া করার বান্দা তিনি নন। সাগরের ঝঞ্ঝা, ক্যটেরিনা- হুদহুদ-সুনামী কে পাত্তা না দিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমাজের সুস্থতা নিয়ে ভেবে গাছেন। সব চোখ থাকা অন্ধ দের চোখ খুলে দিতে ছেয়েছেন। আমরা অন্ধই থেকে গেছি। মৌলবাদি পন্ডিতমন্ডলী রক্তচোখে তর্জনী তুলেছে তাঁর দিকে। বিষ্ঠাপরিবৃত সমাজের গন্ধই আমরা ভালোবেসেছি। বিষ্ঠা পরিষ্কার করা মানুষটিকে চাঁড়াল নমোশুদ্রজ্ঞানে তাচ্ছিল্য করেছি। আবার বাগদী চাঁড়াল বিধবা দের রাতের শয্যায় ভোগ করতে ছাড়িনি। এদের জন্য জীবনভোর ল’ড়ে যাবার জখম এবং অঙ্গীকার নেওয়ার বেপরোয়া --- তিনিই পারেন।
#
আমরা দু-হাত ভরে নিয়েছি ত্তাঁর কাছ থেকে, বদলে ঠকিয়েছি তাঁর মত মানুষকে, বঞ্চনা করেছি, বিষন্ন করেছি, একলা করেছি। শেষ জীবনটায় এই সমাজোন্নতিপাগল মানুষটি দারুণ অভিমানে একলা একটি দ্বীপের নির্জনে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। গভীর সমুদ্রের উথাল পাথালের মধ্যে এক বাতিঘর হয়ে আমাদের পথ দেখানোর জন্য তিনি এসেছিলেন। আমরা চিনতে পারিনি তাঁকে। ‘পাহাড়’ কে কি সম্পূর্ণ করে কেউ চিনতে পারে, বুঝতে পারে! প্রাপ্তির ঘরে পরিধিবিহীন শূন্যতা নিয়ে আশরীর এক বিবিক্ত যন্ত্রণা এক~টি পাহাড়ই বইতে পারে। আমাকে তাঁর কাছে প্রণত হতে হয় বার বার।


ঝুমঝুমি বাজিয়ে রাত নামায় বৃষ্টি। দৌড়ে এসে জানালা খুলি, যেন আমাকেই খুলি। দৃশ্য, শ্রবণ, স্পর্শ, আমার সমস্ত সত্ত্বা খুলে খুলে অবাক তাকিয়ে থাকি জানালা ছুঁয়ে থাকা ফার্ণলতায় গা-ঢাকা অন্ধকার পাহাড়টার একলা নিঝুমে। দেখি ভিজছে সে। বুনো সবুজের আঙরাখা মনে মনে খুলে দিয়ে তার ভেজাকান্নার রক্ত দেখতে পেয়ে যাই। ডিনামাইটে উড়িয়ে দেওয়া তার ছিন্ন- বিছিন্ন প্রত্যঙ্গ কেঁদে ওঠে আমাকে দেখে।
নিপূণ চাকচিক্যের বাহারি হোটেল। পাহাড়ে কুড়ুল মেরে খানিকটা সমতল। মাঝখানে রঙমাখা মেয়ের মত সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুরন্ত কুমারী সুন্দরী হোটেল। মরসুমী ফুলের কৌশলী কেতা ভিবজিওর দিয়ে ওদের কান্না-মুখ ঢেকে রেখছে। জানলা দিয়ে ট্যুরিস্টদের বাড়ানো হাত দিব্যি ওদের মলেস্ট করতে পারে। কোনো কোনো সম্বেদী হাত ওদের ভালোবেসে ছুঁয়ে দিলে ফার্ণ আর পাহাড়ি ফুলেরা ঝুঁকে এসে গল্প জুড়ে দেয় সুখ দুঃখের। সারা রাত কান্নার মত বৃষ্টি ঝরে। সকালে দ্যাখো কান্না মুছে ঝকঝকে রোদেলা হাসি নিয়ে হাই- হ্যালো-গুডমর্নিং এর হাত বাড়িয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে তোমারই জন্য। তিন তলার ল্যান্ডিং থেকে লাজে লাজানো কাঞ্চণজংঘা পিক --– অ’ সাম। যে আমায় এই অসামান্যকে দেখালো, তার পাথরভাঙা অঙ্গে কান পেতে সারারাত কান্না শুনতে পেয়েছি। দেওয়ালে দেওয়ালে সে কান্না ঠিকরে পড়ে আমার রাতজাগা চোখে বিষন্ন ছড়ায়। এভাবেই বিশাল’কে আমরা ভেঙে, আঘাতে টুকরো করে, ছারখার করে... বন্য-সৌন্দর্য (inner beauty) কে ধ্বংসের অবলীলায় সো-কল্ড চোখ-সৌন্দর্যের গালচে পাতি। মন্দির বানাই। হোটেলের পসরা সাজাই। রূপোবতী প্রকৃতিকে মৃত্যুর বিসর্জনে ঠেলে দিয়ে রৌপ্যরাশির চোখঝলসানো সওদাগিরি ক্যারিশ্মায় আমরা পাগলপারা। সেয়ানা পাগল যারে বলে। বিশালের চরণতল থেকে তার শিখরের সাবলাইমে পৌঁছানো...? হয়না আজকাল। ধর্মের ঘটগুলো সত্য ত্রেতার চেয়েও কলিযুগের কলঙ্কিত সময়েই বেশি ভরা যে...। প্রকৃতির উচ্চতাকে প্রতিনিয়ত খর্ব করে ভেঙে উড়িয়ে গুঁড়িয়ে হিমাচলের পাহাড়ে জাগ্রত তীর্থের নাম করে আমরা নয়নাদেবীর মন্দির বানাই, লোকালয়ের সওদা ঘর দোকানপাট, পুজাসামগ্রীর নিপাট বেচাকেনা। ধর্ম (তথাকথিত) যেখানে অধর্মের চরমে গিয়ে টাকা দিয়ে টিকিট কাটা লাইনে জলদি ও আরামের ‘ভগবান দর্শণে গিয়ে মেশে। আমরা স্বস্তি শান্তি আর গর্বের দোলায় দোল খাই। সমতল থেকে চারহাজার ফিট ওপর পর্যন্ত টাকার রাস্তা বিছিয়ে ‘ধম্ম’ সওদা করি। দেখতে যাই সীতাপীঠ। হিমাচলের পঞ্চদেবী --- নয়না দেবী, জ্বালাদেবী, চিন্তাপূর্ণী দেবী, দেবী বজ্রেশ্বরী, দেবী চামুন্ডা। ফাঁকে ফাঁকে দেখে নিই ক্ষেত্রপাল ভৈরব, গণপতি, হনুমান, ভৈরব উনমত্তেশ্বর। তুষারশুভ্র ধৌলাধার—এক অমিত সৌন্দর্যের পর্বতপ্রকৃতি, তছনছে ব্যবসামন্দির বানাই। কাহিনী তৈরি করি। টাকা কামাবার ট্যুরিস্ট স্পট। রাজস্থানের কুন্তলগড়, ত্রিপুরার উনকোটি।
তো এভাবে আমি পাহাড়ের ধ্বংস দেখি। ধংসের পাহাড় দেখতে পাই। মুখে রঙ মেখে দাঁড়িয়ে থাকা ঝলমলে দুঃখ দেখি। ধর্মের নামে অধর্ম দেখি। পর্বতের পার্বত্য ক্যারেক্টার খুন করে, তার লাশের ওপর সাজানো লাশ্যময় দোকানপাট দেখে আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। দেব দেবীর স্তবের অসম্ভব দিয়ে লোক ঠকানো ভক্তিআফিম গেলানোর চমৎকার দেখে নিজেকে খিস্তি দিই।

এইসব ঊনকোটি চৌঁষট্টি পুণ্যার্জনের তীর্থভ্রমন সেরে গর্বিত অহংকৃত আমি যখন হঠাৎ করে সেই মহীমময় মানুষটির কাছে এসে দাঁড়াই, তখন, বিষ্ময়ে দেখি, কোনো পাহাড়ীউচ্চতার তীর্থস্থানকেই তাঁর থেকে বড় মনে হয়না। কেন? কেন মনে হয়না! মনে হয়নার কারন তিনি যা কিছুই করেন, তা বেঁচে থাকা দুঃখী মানুষদের জন্য করেন, কোনো নিঃসাড় নিস্প্রাণ পাথরের মূর্তির ওপর দুধ জল ঘি ঢালবার স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নয়। নিজেই হাজারটি (ভড়ং নয়) তীর্থস্থান শরীরে মনে মননে কর্মে বহন করেন। তিনি, হ্যাঁ তিনি নিজেই তীর্থ ভুমি। তিনি একাই একটি ইন্সটিটিউসন।
আমার মনে হয় প্রত্যেক মানুষের বুকের ভেতর একটা নিজস্ব পাহাড় থাকে। কেউ তাকে লালন করে, কেউ তাকে বহন করে। বহনে যন্ত্রনা থাকে। লালনে সমৃদ্ধি। সে সমৃদ্ধির সাথে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধি ছাপের নোটের কোনো সম্বন্ধ থাকেনা। থাকেনা কোনো স্বার্থগন্ধ। থাকে ভরা বুকের বহন-যন্ত্রণা। যন্ত্রণাই শুধু? না। সে এক আনন্দযন্ত্রণা। সে যন্ত্রণা কী যে মধুময়! মানুষ মাত্রই বুকের এই পাথর নিয়ে জীবনের রোজনামচার নামতা লেখে, নামতা পড়ে। তার মধ্যে কিছু উদ্ধত বুক শুধু নিজেকে নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকতে পারেনা। সেখানে অনেকজনের জীবনের, যাপনের কষ্টকে লাঘবের দুর্লভ চিন্তায় নিজেকে জড়ানোর দায়বদ্ধতা অনুভব করে। এই দায় মেটাতে তাঁর জীবন অর্থ পথযন্ত্রণাকে বাজী রাখে। অসীম স্নেহে, আপার বেদনায় সমাজের দুরাচার, কুসংস্কার, বৈষম্য, অবিমৃশ্যকারিতা সরাবার সম্মার্জনী নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিশাল ময়লার ঝুড়ি নিজের মাথায় বহন করে আগুনে ফেলে পুড়িয়ে দেদার ছাই করে ফেলতে চান। কাজে নেমে পড়েন। শুধু নিজের সদিচ্ছা কে পুঁজি করে। কুসংস্কারমুক্ত সুস্থ সুন্দর সূর্যালোকিত শিক্ষিত সমাজ- জীবনের উজ্জ্বল তাঁকে জড়িয়ে থাকে। এই মানুষটিকেই আমি পাহাড়ের বিশালতায় অনুভব করি। তাঁর কাছে নতজানু হই বার বার। তিনি আমার কাছে এক পরিধিহীন অসীম। এই পাহাড়ে তেত্রিশ কোটি দেবতাদের কেউ ঠাঁই পায়না। ঠাঁই পায়না তাঁদের কাছে নিবেদনের ভন্ড উপাচার। শিবলিঙ্গের ওপর সোনার চোখ খোদাই করার ভন্ড অশ্লীলতা। একান্ন পিঠের মাহাত্মে ভ্রমণ না করে তিনি সাধারণ মানুষের বুকপাথরের এক নির্জন পরিব্রাজক। হ্যাঁ, তিনি। সেই এঁড়ে বাছুর, সেই যশুরে কৈ। সেই বীরসিংহের সিংহ।

তাঁর কর্মজীবনে (মোটামুটি ১৮৪০ বা ৪১)পা রাখবার সময়টায় বঙ্গীয় সমাজে দু-মুখী খেলা চলছিল। যেন একটা দড়ি টানাটানি খেলা। দড়ির একমুখে ছিল মধ্যযুগীয় ধর্মীয় কুসংস্কার, নীচতা, মধ্যযুগীয় বিলাসিতা এবং অলসতা ও অন্যদিকটায় নবজাগরণের নতুন যুক্তিবাদী মানবতাবাদী চেতনা। এই দুই বিপরীতমুখী টানাপোড়েনের মাটিতে দাড়িয়ে একজন কুলীন রক্ষণশীল ব্রাহ্মনের বেশবাসের অন্তরালে যে দুঃসাহসিক প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে তিনি তাঁর জীবনধারার সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছিলেন তা ছিল কল্পনাতীত, এবং তাঁর চরিত্র, যে চরিত্র প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় সুখী ছিলনা, অতৃপ্ত ছিল। যে চরিত্র প্রচলিত সমাজব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে ‘মিসফিট’ মনে করতো, সেই চরিত্র বিশ্লেষণে একটা দারুণ সত্য আমাদের কাছে ফুটে ওঠে যে সারা জীবন ধরে তিনি সমাজের জন্য যে কাজগুলো করে গেছেন তা কোনো ভাবাবেগের বশবর্তী হয়ে নয়। তা ছিল সমাজের কাছে নিজেকে ভীষন ভাবে দায়বদ্ধতার উদাহরণ। এই দায়বদ্ধতাই, (যা অ্যাভারেজ মানুষের মধ্যে ছিলনা), তাঁকে দিয়ে একটার পর একটা সমাজ সংস্কারমূলক কাজ করিয়ে নিয়েছে। কি কি করেছেন তিনি যা তাঁকে পাহড়ের উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে! যা করেছেন আমরা গড়পড়তা সাধারণ বাঙালিরা তার ঝুঁকি নিতে বস্তুত ভয় পাই। লোকদেখানো লেকচারবাজীকে দূরে সরিয়ে রেখে, অগ্র-পশ্চাত বিবেচণার নজরদারী সিকিওরিটিগার্ডের বর্মের আড়ালে মঞ্চকাঁপানো নাটকীয়তা বর্জন করে নিঃশব্দে কাজ কাজ আর কাজের মধ্যে দিয়ে পরিবর্তণের বাস্তব দেখতে ‘একলা চলো’র পথ স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন। শরীরে মনে পাহাড়ের বিশালতা না থাকলে এ কি ভাবা যায়?
#
তো মধ্যযুগে সমস্ত জ্ঞান’কে কুক্ষিগত করে রাখবার একটা অদ্ভুত প্রবণতা ছিল। ছাপা বই’য়ের বিরুদ্ধে রীতিমত campaign করা হোত। তাঁর দায়বদ্ধতা ও যুক্তিধর্মী মননশীলতা তাঁকে এই সত্যটি দেখিয়েছিল যে ছাপাখানাই কোনো সমাজের তথা দেশের অগ্রগতির পরিচয় বহন করে। কারন তা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত। শিক্ষাকে প্রায়োরিটি দিয়ে তখনকার মাটিতে দঁড়িয়ে কি দুঃসাহসিক মানসিক শক্তিতে তিনি প্রেস খুলেছিলেন, ভাবা যায়! যা ভাবা যায়না তা সফল ভাবে করে দেখানোর নামই ঈশ্বর চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। আবার দেখি, শিশুপাঠ্য বইয়ের অভাব ও প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁর মাথাতেই প্রথম এসেছে। সে সময়ে জ্ঞানী গুণী মানুষের অভাব তো ছিলনা! কিন্তু এমন মানুষের অভাব ছিল যিনি মায়ের মত মমতায় শিশুর প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা গুলোকে প্রধাণ্য দিয়ে মায়েরই মত আজীবন লড়ে যেতে পারেন। বৃষ রাশির জাতক তিনি বৃষ’র মতই একগুঁয়ে লড়াকু মনোভাব নিয়ে অন্তরালে থাকা তথাকথিত ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় গুলিকে খুঁজে বের করেছেন এবং সমাধানের প্রাধাণ্য দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে শিশুপাঠ্য বইএর অভাবে শিশুর জিজ্ঞাসা এবং পড়বার আগ্রহ কিভাবে মার খায়। যার জন্য তাঁর কলম থেকে প্রসূত হয়েছিল ‘বর্ণপরিচয়’ বোধোদয় কথামালা আখ্যাণমঞ্জরী ঋজুপাঠ চরিতাবলী ইত্যাদির মত পাঠ্যপুস্তক। বস্তুতঃ, তাঁর পান্ডিত্য তো শুধু এইসব বই রচনা করবার মত ক্ষীণ ও সীমাবদ্ধ ছিলনা। ইচ্ছে করলেই তো তিনি তাঁর কলম-প্রতিভায় অনেক পান্ডিত্য-ভরা গভীর গম্ভীর সাহিত্যের পশরা সাজিয়ে আঁত্মশ্লাঘা আর সম্মাণের আর রয়্যালটির ঊচ্চ চুড়ায় বসে থাকতে পারতেন অনায়াসেই! তবু তিনি নিজের কলম-সফলতার রাশ টেনে ধরেছিলেন কেন? কেননা, ভাবতে আশ্চর্য লাগে, তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি অনুভব করেছিলেন যে বাংলাভাষার কাঠামো অত্যন্ত দূর্বল। সেই সময়কার বাংলাভাষাকে সুসংস্কৃত, সহজবোধ্য ও সুন্দর করে তোলার ভীষণ প্রয়োজন। যে ভাষা সহজবোধ্য নয় সেই ভাষায় রচিত বই কি করে সাধারণের কাছে পৌঁছাবে --- এই বাস্তব সত্যটি তাঁর কাছেই কেন ধরা পড়ে! তাঁকেই কেন নাড়িয়ে দেয়! দেয় এইজন্যই যে তিনি আগাগোড়া সমাজ-সচেতন মানুষ। তিনিই বুঝেছিলেন যে, প্রাথমিক স্তর থেকে সচেষ্ট না হলে বাংলা ভাষাকে বাঙালির কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপায় নেই। কোনো ভাষাকে দাঁড় করাতে গেলে তার একটা ব্যাকরণগত ভিত চাই, এই মুল সত্যটিও তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর রচণা গুলি তাই ভাষানির্মাণভিত্তিক রচনা। নামের আগে পন্ডিত উপাধিকে তিনিই অবহেলায় সরিয়ে রাখতে পারেন যিনি সমাজ-সচেতনাকে, দাম্ভিক আঁত্ম-সচেতনার ঊর্ধে স্থান দিতে পারেন। এই পর্বততর উচ্চতার অন্য নাম বিস্ময়। বিদ্যাসাগর পর্বতটির গভীর বোধ ও আত্মত্যাগ আমাদের কী অতল ভাবে ঋণী করেছে!

না। আমি এখানে দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরের গুণগাথার কীর্তন আঁকতে বসিনি। লোকে বলে থাকেন, বিদ্যাসাগর মানুষটি বজ্রের ন্যায় কঠোর আর একসাথে কুসুমের মত কোমল। তিনি নির্জলা একাদশীর বাল-বিধবাদের দুঃখ দেখে কেঁদে ভাসতেন। তিনি নাকি আগ্রাসী জোয়ারের উন্মত্ত দামোদর সাঁতরে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন। মাতৃভক্তির উদাহরণের তন্বিষ্ঠ! আসলে এসব গসিপ ও অতি-উক্তি একজন প্রকৃত মানুষকে অলৌকিক মাহাত্ম দেবার কারচুপী, যা আমাদের দেশের জনগণ বেশ ভালোই জানেন ও পারেন। সত্যিকারের মনুষ্বত্বর মধ্যে যেসব কোয়ালিটিস থাকা দরকার, তা সত্য হয়ে উঠতে দেখলেই মানুষ নামধারি আমরা তাঁদের ওপর অলৌকিকতার স্ট্যাম্প মেরে দিই। অথবা তার সততা কে সন্দেহ করে মিথ্যের জালে বন্দি করে জেলের ঘানি টানাই। অথবা মিথ্যে রটনার ভেল্কিবাজীতে ভস্ম বানিয়ে ছদ্ম উদারতায় রেনকোজির মন্দিরে মিথ্যে স্থাপন ও রোপন করি। এসব করি নিজেদেরকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে। আসলে তিনি জীবনে যা যা করেছেন তা দু-চারদিনের বাহাদুরির আবেগপ্রসুত হাততালি পাবার চমক দেখানো নয়। সমাজের জন্য যা করেছেন সেগুলি সুদূরপ্রসারী কর্মকান্ডের এক বিশাল মাত্রা যার প্রত্যেকটি আশ্চর্যভাবে ইনটারলিংক্‌ড। বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের মধ্যে একসাথে কতগুলি যুক্তিবাদী চিন্তা কাজ করছিল তা মোটা মাথায় সহজে ঢোকেনা। এবং মাথায় ঢোকাতে পারলে আশ্চর্য হতে হয়। কিংবা আশ্চর্য বলে তাঁর মত বৃহৎ আঁত্মশক্তির কাছে কিছুই ছিল না। বিধবা বিবাহ প্রবর্তণের কথাই ধরা যাকনা। এখানেও তাঁর সমাজ চিন্তা কী গুরুত্বপূর্ণ! শুধু যে বিধবা মেয়েদের মুখ চেয়ে আর সুখ চেয়েই তিনি এরজন্য লড়ে গেছেন, তা কিন্তু সম্পূর্ণ সত্য নয়। এর পেছনেও তাঁর প্রখর যুক্তিবাদী মন কাজ করেছে। সে সময়ের সবচেয়ে ঘৃণ্য যে প্রথাটি সমাজে চেপে বসেছিল তার নাম কৌলীন্য প্রথা, এ তো সবাই জানেন। এর ফলে বিধবা, বিশেষ করে বালবিধবার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে চলেছিল। এর ফলস্বরূপ এক বিষময় সমস্যা সমাজকে পচন ও পতনের মুখে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে ব্যাভিচার, ভ্রূণহত্যার মত ব্যপার গুলো অবাধে চলতো। আর এর ফল ভোগ করতে হোত সেই বিধবা মেয়েটিকেই। তাকে ভোগ করবার অনেক ভদ্রমহোদয় ছিল কিন্তু উদ্ধার করবার কেউ ছিলনা। এই ঘুনধরা সমাজ যে একটা মেরুদন্ডহীন জাতীর সৃষ্টি করে চলে যুগ যুগ ধরে, --- এই বিষময় গভীর সত্যটি একমাত্র তিনিই বুঝতে ও ধরতে পারেন, সমাজ ও মানুষকে যিনি গভীর ভাবে ভালবাসেন। হিউম্যানিস্ট ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাই তৎকালীন এবং ভবিষ্যতের এই ভাঙনের ভীষণ কে দেখতে পেয়েছিলেন। আজ একুশ শতকের রাজনীতি-সর্বস্ব সমাজ তথা রাষ্ট্রব্যাবস্থায় সমাজকল্যাণ, মানবপ্রীতি ইত্যাদি শব্দ গুলো দেশ-নেতাদের মুখোশ হয়ে উঠেছে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঢাক-ঢোল- আড়ম্বরের অন্তরালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের হাতিয়ার স্বরূপ সাম্প্রদায়িক উস্কানিকেই ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে আন্তর্জাতিক শিশুবর্ষে শিশুমৃত্যুর হার, শিশুশ্রমিকের সংখ্যা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, যেখানে আন্তর্জাতিক নারী-বর্ষে সর্বাধিক সংখ্যক নারী পণ নির্যাতন ধর্ষন ও শ্লীলতাহানীর শিকার হন, যেখানে ১৮ / ১৯ শতকের বাবুকালচারের স্থান নিয়েছে পূজা- কালচার--- সেই সমাজব্যবস্থায় বিদ্যাসাগর রামোহনের মত মানুষের ব্যাতিক্রমী চিন্তাধারা ও সুদূরপ্রসারী আর্ষ দৃষ্টি কি আজ প্রতিপদে অন্য আরো বিদ্বজ্জনের অক্ষমতা, সমাজ-সচেতন-বিমুখ মানসিকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়না? আজ নারীজাগরণের জোয়ারে দিক বিদিক ভরে যাচ্ছে। এই নারীজাগরণের ও নারীমুক্তির প্রথম পদক্ষেপ কি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্ত্রী-শিক্ষা আন্দোলন এবং সহবাস সম্পর্কীয় বিধিনিষেধের মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠেনি? এ’রকম একজন নিঃস্বার্থ চিন্তাবিদ মানুষ তো পাহাড়ের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যান বলে আমার মনে হয়। তাঁর শিক্ষাচিন্তাও কি কম প্রাসঙ্গিক! যে কালে সংস্কৃত আর আর্‌বী ভাষাই শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম ছিল এবং যা মুষ্টিমেয় কয়েকজনেরই করায়াত্ম ছিল, সাধারন মানুষ যা বুঝতে পারতো না, সেই ভাষায় লক্ষ্যহীন বিদ্যা শিক্ষা দিয়ে এক একজন টুলো পন্ডিত আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন মৌলবী তৈরি করা হোত, তা তৎকালীন ও ভবিষ্যৎ সমাজের পক্ষে কতখানি ক্ষতিকর ছিল বা হতে পারতো তাও তিনিই ভেবেছিলেন তাঁর সেই বৃহৎ মস্তিষ্কের সৌজন্যে। ওই সব ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রদান কে অস্বীকার করে যদি তিনি ইংরাজী ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান দর্শণ ও গণিত শিক্ষার পক্ষপাতি হয়ে থাকেন তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি কতখানি ছিল! কারন সংস্কৃত ও আর্‌বী ভাষাও সাধারণ বিদ্যার্থী দের মাতৃভাষা ছিলনা, ইংরাজী ভাষাও বাঙালির মাতৃভাষা ছিলনা। সেক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভান্ডারটি যে ইংরাজীভাষায় ছিল সেটাই গ্রহন করা কি উচিত বিবেচণার কাজ ছিল না? দেশিয় ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধ ভালবাসা আর অন্ধ অনুরাগের (যা ২১শে আর ১৯শের বাঁধাধরা দিন দুটিতে বাঙালিদের ছদ্ম- মুখরিত করে তোলার মঞ্চকাঁপানো সেলিব্রেসন) বশবর্তী হয়ে তিনি সেই অবলম্বনহীন শিক্ষা ব্যবস্থা কে কিছুতেই সমর্থন করেননি। এর জন্য সেই যুক্তিপ্রবণ মানুষটিকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরাজের দালালের তকমা পেতে হয়েছে। তার জন্য ব্যথা হয়তো পেয়েছেন, কিন্তু ব্যথা বা আঘাত কে প্রশ্রয় দিয়ে এস্কেপিস্ট হননি। বস্তুত, শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় লক্ষ্যটি ছিল মাতৃভাষার উন্নতি তাঁর শিক্ষাপরিকল্পনার মূল কথা। Notes on Sanskrit College ( 1852) এর ২৬ টি স্তবক ভালোভাবে দেখলে এই পর্বতপ্রতিম মানুষটির চিন্তন- গভীরতার সান্নিধ্য পাই, যেখানে প্রথমেই তিনি বলেছেন, “বাংলা দেশে শিক্ষার তত্ত্বাবধানের ভার যাঁরা নিয়েছেন তাঁদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করা।“ অর্থাৎ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আত্মপ্রতিষ্ঠার দিক~টা সর্বদা তাঁর চিন্তায় ছিল।। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য তিনি যতগুলি পরিকল্পনা পেশ করেছেন তাতে পাশ্চাত্য বিদ্যার সাথে ভারতীয় শিক্ষার সমন্বয়ের সুর টি ধ্বনিত হয়েছে।
#
শৈশবের দারিদ্র যন্ত্রণা নিয়ে বড় হওয়া (প্রকৃত অর্থেই বড় হওয়া), সারা জীবনব্যাপী সমাজ-কল্যাণ এর জন্য নিজেকে নিঃস্বার্থে বিলিয়ে দেওয়া ও ক্ষয় করা, রক্ষণশীল কর্তা ব্যক্তিদের কটুক্তি এমন কি লাশ ফেলে দেবার হুমকি সহ্য করেও নিজের কাছে যা ঠিক ও যথার্থ মনে হয়েছে তার প্রতি অবিচল নিষ্ঠায় পাহাড়ের মতই অবিচল থাকা, --- কে পারে!! তাঁর মত? কী দরকার ছিল তাঁর সারা জীবনকে এভাবে নিঃস্বার্থে এবং নিঃশর্তে দেশের, সমাজের জন্য খরচ করা? কী দরকার ছিল বাংলাভাষার উন্নতির জন্য এতবড় ত্যাগ স্বীকারের? সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার বেদান্ত, স্মৃতি ও ন্যায় অধ্যয়ন করেছেন। ‘হিন্দু ল কমিটি’ তাদের দেওয়া শংসা পত্রটিতে ঈশ্বরচন্দ্র নামের পরে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি টি দিয়েছিল। বিদ্যার সাগর ছিলেন তিনি, কি দরকার ছিল তাঁর সমাজের মানুষের দুখ-যাতনা বয়ে বেড়াবার? কি প্রয়োজন ছিল তাঁর করুণাসাগর হবার? এইখানেই তাঁর ব্যতিক্রমী মেরুদন্ডের কথা, ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের দিকটি আমরা দেখতে পেয়ে যাই। সাধারণ অ্যাভারেজ পারসোনালিটি বা গড় ব্যক্তিত্ব, যা সমাজের প্রচলিত নিয়ম ও সংস্কারের সাথে অভ্যস্থতার বন্ধনে বাঁধা পড়ে থাকে, যুগ যুগ ধরে প্রচলিত (কু) সংস্কারের যুক্তিগ্রাহ্যতা সম্বন্ধে প্রশ্ন তোলেনা বা তোলার কথা কল্পনায়~ও স্থান দেয়না,--- সেই চিরাচরিত আবহমান স্রোতের বিপরীতে উজান ঠেলে যাওয়ার মত মেরুদন্ডের জোর একমাত্র সেই মানুষেরই থাকে, মানব ও সমাজকল্যাণের শঙ্খ টি যাঁর হাতে থাকে। এই কল্যানশঙ্খধ্বণিতে সকলকে সচকিত করে, সমস্ত সংকীর্ণতার বেড়া ভেঙে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর নামক পর্বত~টি সাধারণ মানুষ কে আলিংগন করেছেন। আসলে বৃহৎ তিনিই যিনি সাধারণের সমতলে নেমে আসতে লজ্জিত, কুন্ঠিত হন না।

আজ আমরা অনেক পলিটিকাল ইজ্‌ম নিয়ে বড়ই আত্মগর্বে ফুলে থাকি। কিন্ত সব ইজ্‌ম্‌ এর মূলকথা ও শেষকথা যে “মানবিকতা”, এই যথার্থ এবং মুল্যবান বোধ টা কি আমাদের মধ্যে জাগাতে পেরেছি? বিদ্যাসাগর, আমার পরম আরাধ্য মানুষটি, এইসব তথাকথিত কোনো ইজ্‌ম্‌ এর ধার ধারেন নি, কোনো বাঁধা ধরা গতের দড়িতে নিজেকে বেঁধে রাখার সংকীর্ণতায় থাকেননি। এই বোধ তাঁর অন্তরসঞ্জাত। বিস্ময়ের অতল আমাকে স্তম্ভীত ক’রে যখন আমি তাঁর ‘উইল’পত্রটি দেখি। কি দেখেছি তাতে! দেখেছি এক সুউচ্চ মনের অসীম। দেখেছি তাঁর আত্মীয় অনাত্মীয় নির্বিশেষে প্রকৃত অভাবী ও দুস্থ জনের জন্য নির্দিষ্ট মাসোহারার ব্যবস্থা। এমন অনেক মানুষ এদের মধ্যে আছেন যাদের সংগে তাঁর কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিলনা, ছিল সেই সম্পর্ক যা একজন প্রকৃত সম্বলহীন দুস্থ মানুষের সাথে একজন স্বার্থ-চিন্তাশূন্য দাতার যে আত্মিক আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকে। গ্রামের অনাথ ও নিরূপায় মানুষের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল তাঁর দানপত্রে। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরেও প্রতিটি বিধবাবিবাহের জন্য ১০০ টাকা ব্যয় বরাদ্দ তাঁর উইলে নির্দেশিত ছিল। কে তঁকে মাথার দিব্যি দিয়েছিল, তখনকার পচা গলা সমাজ কে শুদ্ধ করবার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে? দিব্যি দিয়েছিল তাঁর ভেতরের ‘আমি’, তাঁর জাগ্রত চেতনা। কে শোনে এই ‘আমি’র কথা? কেউ কেউ শোনে। যার হৃদয়ে এক বিশাল স্পর্শকাতর অথচ নিষ্ঠ হৃদ-পাহাড় আছে, যে পাহাড় দৃঢ-সংকল্পে অনড়,—সে শোনে। শোনে এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে, নিজের অস্তিত্ব কে তুচ্ছ করে। গঞ্জনার হ্যাপা, খুনের হুমকি। তাতে কি? তিনি তো পাহাড়ের মহিমায়। এসব ঝঞ্ঝা এসে ধাক্কা খেয়ে নিজেই ফিরে যায়। তাঁকে সংকল্প থেকে নাড়াতে পারেনা। শিখরে শিখা নিয়ে ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার নোংরা আর নোংরামো গুলোকে সবাই অবহেলায়... অথচ তিনি আত্মঁবিশ্বাসে , পাশে পাশে আইনি স্বীকৃতির জন্য চটি ক্ষইয়ে ফেলেন। তাঁকে দেখতে হলে অনেক উঁচু পর্যন্ত মাথা তুলতে হয়, যেখানে আমার আইসাইট পৌঁছোয় না। হিমালয়ের উচ্চতা মাপতে পারেন রাধানাথ শিকদার, কিন্তু বিদ্যাসাগরের উচ্চতা কোনো মিটার কিলোমিটারের ইউনিট দিয়ে মাপা যায় না। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ পরিবেশেও তিনি আলোকিত এবং স্পষ্ট। মানুষকে করুণার চোখে নয়, এক পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেছেন। কোনো সীমা’ই তাঁকে আবদ্ধ করতে পারেনা। ধারণের যতেক যন্ত্রণা নিয়ে তিনি শুধু হেঁটে চলেন, সংগে থাকে তাঁর বিখ্যাত ঝ্যাঁটা গাছাটি। কোন জনা তাঁর মত ভাবতে জানে, বইতে জানে, সইতে জানে! না, আমি খুঁজে পাইনা। পলিটিক্যাল স্টান্ট দেবার অনেক জন কে পাওয়া যায়, কিন্তু কোনোরকম আসনলোভ কে অস্বীকার করে, কিছু পাবার প্রত্যাশা না করে, শুধু দিয়ে যাওয়ার এই অসামান্য উচ্চতা কে সেলাম করি হাজার বার। যদিও এইসব সেলাম প্রনাম কুর্ণিশ কে পরোয়া করার বান্দা তিনি নন। সাগরের ঝঞ্ঝা, ক্যটেরিনা- হুদহুদ-সুনামী কে পাত্তা না দিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমাজের সুস্থতা নিয়ে ভেবে গাছেন। সব চোখ থাকা অন্ধ দের চোখ খুলে দিতে ছেয়েছেন। আমরা অন্ধই থেকে গেছি। মৌলবাদি পন্ডিতমন্ডলী রক্তচোখে তর্জনী তুলেছে তাঁর দিকে। বিষ্ঠাপরিবৃত সমাজের গন্ধই আমরা ভালোবেসেছি। বিষ্ঠা পরিষ্কার করা মানুষটিকে চাঁড়াল নমোশুদ্রজ্ঞানে তাচ্ছিল্য করেছি। আবার বাগদী চাঁড়াল বিধবা দের রাতের শয্যায় ভোগ করতে ছাড়িনি। এদের জন্য জীবনভোর ল’ড়ে যাবার জখম এবং অঙ্গীকার নেওয়ার বেপরোয়া --- তিনিই পারেন।

আমরা দু-হাত ভরে নিয়েছি ত্তাঁর কাছ থেকে, বদলে ঠকিয়েছি তাঁর মত মানুষকে, বঞ্চনা করেছি, বিষন্ন করেছি, একলা করেছি। শেষ জীবনটায় এই সমাজোন্নতিপাগল মানুষটি দারুণ অভিমানে একলা একটি দ্বীপের নির্জনে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। গভীর সমুদ্রের উথাল পাথালের মধ্যে এক বাতিঘর হয়ে আমাদের পথ দেখানোর জন্য তিনি এসেছিলেন। আমরা চিনতে পারিনি তাঁকে। ‘পাহাড়’ কে কি সম্পূর্ণ করে কেউ চিনতে পারে, বুঝতে পারে! প্রাপ্তির ঘরে পরিধিবিহীন শূন্যতা নিয়ে আশরীর এক বিবিক্ত যন্ত্রণা এক~টি পাহাড়ই বইতে পারে। আমাকে তাঁর কাছে প্রণত হতে হয় বার বার।






ঝুমঝুমি বাজিয়ে রাত নামায় বৃষ্টি। দৌড়ে এসে জানালা খুলি, যেন আমাকেই খুলি। দৃশ্য, শ্রবণ, স্পর্শ, আমার সমস্ত সত্ত্বা খুলে খুলে অবাক তাকিয়ে থাকি জানালা ছুঁয়ে থাকা ফার্ণলতায় গা-ঢাকা অন্ধকার পাহাড়টার একলা নিঝুমে। দেখি ভিজছে সে। বুনো সবুজের আঙরাখা মনে মনে খুলে দিয়ে তার ভেজাকান্নার রক্ত দেখতে পেয়ে যাই। ডিনামাইটে উড়িয়ে দেওয়া তার ছিন্ন- বিছিন্ন প্রত্যঙ্গ কেঁদে ওঠে আমাকে দেখে।
নিপূণ চাকচিক্যের বাহারি হোটেল। পাহাড়ে কুড়ুল মেরে খানিকটা সমতল। মাঝখানে রঙমাখা মেয়ের মত সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুরন্ত কুমারী সুন্দরী হোটেল। মরসুমী ফুলের কৌশলী কেতা ভিবজিওর দিয়ে ওদের কান্না-মুখ ঢেকে রেখছে। জানলা দিয়ে ট্যুরিস্টদের বাড়ানো হাত দিব্যি ওদের মলেস্ট করতে পারে। কোনো কোনো সম্বেদী হাত ওদের ভালোবেসে ছুঁয়ে দিলে ফার্ণ আর পাহাড়ি ফুলেরা ঝুঁকে এসে গল্প জুড়ে দেয় সুখ দুঃখের। সারা রাত কান্নার মত বৃষ্টি ঝরে। সকালে দ্যাখো কান্না মুছে ঝকঝকে রোদেলা হাসি নিয়ে হাই- হ্যালো-গুডমর্নিং এর হাত বাড়িয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে তোমারই জন্য। তিন তলার ল্যান্ডিং থেকে লাজে লাজানো কাঞ্চণজংঘা পিক --– অ’ সাম। যে আমায় এই অসামান্যকে দেখালো, তার পাথরভাঙা অঙ্গে কান পেতে সারারাত কান্না শুনতে পেয়েছি। দেওয়ালে দেওয়ালে সে কান্না ঠিকরে পড়ে আমার রাতজাগা চোখে বিষন্ন ছড়ায়। এভাবেই বিশাল’কে আমরা ভেঙে, আঘাতে টুকরো করে, ছারখার করে... বন্য-সৌন্দর্য (inner beauty) কে ধ্বংসের অবলীলায় সো-কল্ড চোখ-সৌন্দর্যের গালচে পাতি। মন্দির বানাই। হোটেলের পসরা সাজাই। রূপোবতী প্রকৃতিকে মৃত্যুর বিসর্জনে ঠেলে দিয়ে রৌপ্যরাশির চোখঝলসানো সওদাগিরি ক্যারিশ্মায় আমরা পাগলপারা। সেয়ানা পাগল যারে বলে। বিশালের চরণতল থেকে তার শিখরের সাবলাইমে পৌঁছানো...? হয়না আজকাল। ধর্মের ঘটগুলো সত্য ত্রেতার চেয়েও কলিযুগের কলঙ্কিত সময়েই বেশি ভরা যে...। প্রকৃতির উচ্চতাকে প্রতিনিয়ত খর্ব করে ভেঙে উড়িয়ে গুঁড়িয়ে হিমাচলের পাহাড়ে জাগ্রত তীর্থের নাম করে আমরা নয়নাদেবীর মন্দির বানাই, লোকালয়ের সওদা ঘর দোকানপাট, পুজাসামগ্রীর নিপাট বেচাকেনা। ধর্ম (তথাকথিত) যেখানে অধর্মের চরমে গিয়ে টাকা দিয়ে টিকিট কাটা লাইনে জলদি ও আরামের ‘ভগবান দর্শণে গিয়ে মেশে। আমরা স্বস্তি শান্তি আর গর্বের দোলায় দোল খাই। সমতল থেকে চারহাজার ফিট ওপর পর্যন্ত টাকার রাস্তা বিছিয়ে ‘ধম্ম’ সওদা করি। দেখতে যাই সীতাপীঠ। হিমাচলের পঞ্চদেবী --- নয়না দেবী, জ্বালাদেবী, চিন্তাপূর্ণী দেবী, দেবী বজ্রেশ্বরী, দেবী চামুন্ডা। ফাঁকে ফাঁকে দেখে নিই ক্ষেত্রপাল ভৈরব, গণপতি, হনুমান, ভৈরব উনমত্তেশ্বর। তুষারশুভ্র ধৌলাধার—এক অমিত সৌন্দর্যের পর্বতপ্রকৃতি, তছনছে ব্যবসামন্দির বানাই। কাহিনী তৈরি করি। টাকা কামাবার ট্যুরিস্ট স্পট। রাজস্থানের কুন্তলগড়, ত্রিপুরার উনকোটি।
তো এভাবে আমি পাহাড়ের ধ্বংস দেখি। ধংসের পাহাড় দেখতে পাই। মুখে রঙ মেখে দাঁড়িয়ে থাকা ঝলমলে দুঃখ দেখি। ধর্মের নামে অধর্ম দেখি। পর্বতের পার্বত্য ক্যারেক্টার খুন করে, তার লাশের ওপর সাজানো লাশ্যময় দোকানপাট দেখে আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। দেব দেবীর স্তবের অসম্ভব দিয়ে লোক ঠকানো ভক্তিআফিম গেলানোর চমৎকার দেখে নিজেকে খিস্তি দিই।

এইসব ঊনকোটি চৌঁষট্টি পুণ্যার্জনের তীর্থভ্রমন সেরে গর্বিত অহংকৃত আমি যখন হঠাৎ করে সেই মহীমময় মানুষটির কাছে এসে দাঁড়াই, তখন, বিষ্ময়ে দেখি, কোনো পাহাড়ীউচ্চতার তীর্থস্থানকেই তাঁর থেকে বড় মনে হয়না। কেন? কেন মনে হয়না! মনে হয়নার কারন তিনি যা কিছুই করেন, তা বেঁচে থাকা দুঃখী মানুষদের জন্য করেন, কোনো নিঃসাড় নিস্প্রাণ পাথরের মূর্তির ওপর দুধ জল ঘি ঢালবার স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নয়। নিজেই হাজারটি (ভড়ং নয়) তীর্থস্থান শরীরে মনে মননে কর্মে বহন করেন। তিনি, হ্যাঁ তিনি নিজেই তীর্থ ভুমি। তিনি একাই একটি ইন্সটিটিউসন।
# আমার মনে হয় প্রত্যেক মানুষের বুকের ভেতর একটা নিজস্ব পাহাড় থাকে। কেউ তাকে লালন করে, কেউ তাকে বহন করে। বহনে যন্ত্রনা থাকে। লালনে সমৃদ্ধি। সে সমৃদ্ধির সাথে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধি ছাপের নোটের কোনো সম্বন্ধ থাকেনা। থাকেনা কোনো স্বার্থগন্ধ। থাকে ভরা বুকের বহন-যন্ত্রণা। যন্ত্রণাই শুধু? না। সে এক আনন্দযন্ত্রণা। সে যন্ত্রণা কী যে মধুময়! মানুষ মাত্রই বুকের এই পাথর নিয়ে জীবনের রোজনামচার নামতা লেখে, নামতা পড়ে। তার মধ্যে কিছু উদ্ধত বুক শুধু নিজেকে নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকতে পারেনা। সেখানে অনেকজনের জীবনের, যাপনের কষ্টকে লাঘবের দুর্লভ চিন্তায় নিজেকে জড়ানোর দায়বদ্ধতা অনুভব করে। এই দায় মেটাতে তাঁর জীবন অর্থ পথযন্ত্রণাকে বাজী রাখে। অসীম স্নেহে, আপার বেদনায় সমাজের দুরাচার, কুসংস্কার, বৈষম্য, অবিমৃশ্যকারিতা সরাবার সম্মার্জনী নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিশাল ময়লার ঝুড়ি নিজের মাথায় বহন করে আগুনে ফেলে পুড়িয়ে দেদার ছাই করে ফেলতে চান। কাজে নেমে পড়েন। শুধু নিজের সদিচ্ছা কে পুঁজি করে। কুসংস্কারমুক্ত সুস্থ সুন্দর সূর্যালোকিত শিক্ষিত সমাজ- জীবনের উজ্জ্বল তাঁকে জড়িয়ে থাকে। এই মানুষটিকেই আমি পাহাড়ের বিশালতায় অনুভব করি। তাঁর কাছে নতজানু হই বার বার। তিনি আমার কাছে এক পরিধিহীন অসীম। এই পাহাড়ে তেত্রিশ কোটি দেবতাদের কেউ ঠাঁই পায়না। ঠাঁই পায়না তাঁদের কাছে নিবেদনের ভন্ড উপাচার। শিবলিঙ্গের ওপর সোনার চোখ খোদাই করার ভন্ড অশ্লীলতা। একান্ন পিঠের মাহাত্মে ভ্রমণ না করে তিনি সাধারণ মানুষের বুকপাথরের এক নির্জন পরিব্রাজক। হ্যাঁ, তিনি। সেই এঁড়ে বাছুর, সেই যশুরে কৈ। সেই বীরসিংহের সিংহ।

তাঁর কর্মজীবনে (মোটামুটি ১৮৪০ বা ৪১)পা রাখবার সময়টায় বঙ্গীয় সমাজে দু-মুখী খেলা চলছিল। যেন একটা দড়ি টানাটানি খেলা। দড়ির একমুখে ছিল মধ্যযুগীয় ধর্মীয় কুসংস্কার, নীচতা, মধ্যযুগীয় বিলাসিতা এবং অলসতা ও অন্যদিকটায় নবজাগরণের নতুন যুক্তিবাদী মানবতাবাদী চেতনা। এই দুই বিপরীতমুখী টানাপোড়েনের মাটিতে দাড়িয়ে একজন কুলীন রক্ষণশীল ব্রাহ্মনের বেশবাসের অন্তরালে যে দুঃসাহসিক প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে তিনি তাঁর জীবনধারার সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছিলেন তা ছিল কল্পনাতীত, এবং তাঁর চরিত্র, যে চরিত্র প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় সুখী ছিলনা, অতৃপ্ত ছিল। যে চরিত্র প্রচলিত সমাজব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে ‘মিসফিট’ মনে করতো, সেই চরিত্র বিশ্লেষণে একটা দারুণ সত্য আমাদের কাছে ফুটে ওঠে যে সারা জীবন ধরে তিনি সমাজের জন্য যে কাজগুলো করে গেছেন তা কোনো ভাবাবেগের বশবর্তী হয়ে নয়। তা ছিল সমাজের কাছে নিজেকে ভীষন ভাবে দায়বদ্ধতার উদাহরণ। এই দায়বদ্ধতাই, (যা অ্যাভারেজ মানুষের মধ্যে ছিলনা), তাঁকে দিয়ে একটার পর একটা সমাজ সংস্কারমূলক কাজ করিয়ে নিয়েছে। কি কি করেছেন তিনি যা তাঁকে পাহড়ের উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে! যা করেছেন আমরা গড়পড়তা সাধারণ বাঙালিরা তার ঝুঁকি নিতে বস্তুত ভয় পাই। লোকদেখানো লেকচারবাজীকে দূরে সরিয়ে রেখে, অগ্র-পশ্চাত বিবেচণার নজরদারী সিকিওরিটিগার্ডের বর্মের আড়ালে মঞ্চকাঁপানো নাটকীয়তা বর্জন করে নিঃশব্দে কাজ কাজ আর কাজের মধ্যে দিয়ে পরিবর্তণের বাস্তব দেখতে ‘একলা চলো’র পথ স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন। শরীরে মনে পাহাড়ের বিশালতা না থাকলে এ কি ভাবা যায়?

তো মধ্যযুগে সমস্ত জ্ঞান’কে কুক্ষিগত করে রাখবার একটা অদ্ভুত প্রবণতা ছিল। ছাপা বই’য়ের বিরুদ্ধে রীতিমত campaign করা হোত। তাঁর দায়বদ্ধতা ও যুক্তিধর্মী মননশীলতা তাঁকে এই সত্যটি দেখিয়েছিল যে ছাপাখানাই কোনো সমাজের তথা দেশের অগ্রগতির পরিচয় বহন করে। কারন তা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত। শিক্ষাকে প্রায়োরিটি দিয়ে তখনকার মাটিতে দঁড়িয়ে কি দুঃসাহসিক মানসিক শক্তিতে তিনি প্রেস খুলেছিলেন, ভাবা যায়! যা ভাবা যায়না তা সফল ভাবে করে দেখানোর নামই ঈশ্বর চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। আবার দেখি, শিশুপাঠ্য বইয়ের অভাব ও প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁর মাথাতেই প্রথম এসেছে। সে সময়ে জ্ঞানী গুণী মানুষের অভাব তো ছিলনা! কিন্তু এমন মানুষের অভাব ছিল যিনি মায়ের মত মমতায় শিশুর প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা গুলোকে প্রধাণ্য দিয়ে মায়েরই মত আজীবন লড়ে যেতে পারেন। বৃষ রাশির জাতক তিনি বৃষ’র মতই একগুঁয়ে লড়াকু মনোভাব নিয়ে অন্তরালে থাকা তথাকথিত ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় গুলিকে খুঁজে বের করেছেন এবং সমাধানের প্রাধাণ্য দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে শিশুপাঠ্য বইএর অভাবে শিশুর জিজ্ঞাসা এবং পড়বার আগ্রহ কিভাবে মার খায়। যার জন্য তাঁর কলম থেকে প্রসূত হয়েছিল ‘বর্ণপরিচয়’ বোধোদয় কথামালা আখ্যাণমঞ্জরী ঋজুপাঠ চরিতাবলী ইত্যাদির মত পাঠ্যপুস্তক। বস্তুতঃ, তাঁর পান্ডিত্য তো শুধু এইসব বই রচনা করবার মত ক্ষীণ ও সীমাবদ্ধ ছিলনা। ইচ্ছে করলেই তো তিনি তাঁর কলম-প্রতিভায় অনেক পান্ডিত্য-ভরা গভীর গম্ভীর সাহিত্যের পশরা সাজিয়ে আঁত্মশ্লাঘা আর সম্মাণের আর রয়্যালটির ঊচ্চ চুড়ায় বসে থাকতে পারতেন অনায়াসেই! তবু তিনি নিজের কলম-সফলতার রাশ টেনে ধরেছিলেন কেন? কেননা, ভাবতে আশ্চর্য লাগে, তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি অনুভব করেছিলেন যে বাংলাভাষার কাঠামো অত্যন্ত দূর্বল। সেই সময়কার বাংলাভাষাকে সুসংস্কৃত, সহজবোধ্য ও সুন্দর করে তোলার ভীষণ প্রয়োজন। যে ভাষা সহজবোধ্য নয় সেই ভাষায় রচিত বই কি করে সাধারণের কাছে পৌঁছাবে --- এই বাস্তব সত্যটি তাঁর কাছেই কেন ধরা পড়ে! তাঁকেই কেন নাড়িয়ে দেয়! দেয় এইজন্যই যে তিনি আগাগোড়া সমাজ-সচেতন মানুষ। তিনিই বুঝেছিলেন যে, প্রাথমিক স্তর থেকে সচেষ্ট না হলে বাংলা ভাষাকে বাঙালির কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপায় নেই। কোনো ভাষাকে দাঁড় করাতে গেলে তার একটা ব্যাকরণগত ভিত চাই, এই মুল সত্যটিও তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর রচণা গুলি তাই ভাষানির্মাণভিত্তিক রচনা। নামের আগে পন্ডিত উপাধিকে তিনিই অবহেলায় সরিয়ে রাখতে পারেন যিনি সমাজ-সচেতনাকে, দাম্ভিক আঁত্ম-সচেতনার ঊর্ধে স্থান দিতে পারেন। এই পর্বততর উচ্চতার অন্য নাম বিস্ময়। বিদ্যাসাগর পর্বতটির গভীর বোধ ও আত্মত্যাগ আমাদের কী অতল ভাবে ঋণী করেছে!

না। আমি এখানে দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরের গুণগাথার কীর্তন আঁকতে বসিনি। লোকে বলে থাকেন, বিদ্যাসাগর মানুষটি বজ্রের ন্যায় কঠোর আর একসাথে কুসুমের মত কোমল। তিনি নির্জলা একাদশীর বাল-বিধবাদের দুঃখ দেখে কেঁদে ভাসতেন। তিনি নাকি আগ্রাসী জোয়ারের উন্মত্ত দামোদর সাঁতরে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন। মাতৃভক্তির উদাহরণের তন্বিষ্ঠ! আসলে এসব গসিপ ও অতি-উক্তি একজন প্রকৃত মানুষকে অলৌকিক মাহাত্ম দেবার কারচুপী, যা আমাদের দেশের জনগণ বেশ ভালোই জানেন ও পারেন। সত্যিকারের মনুষ্বত্বর মধ্যে যেসব কোয়ালিটিস থাকা দরকার, তা সত্য হয়ে উঠতে দেখলেই মানুষ নামধারি আমরা তাঁদের ওপর অলৌকিকতার স্ট্যাম্প মেরে দিই। অথবা তার সততা কে সন্দেহ করে মিথ্যের জালে বন্দি করে জেলের ঘানি টানাই। অথবা মিথ্যে রটনার ভেল্কিবাজীতে ভস্ম বানিয়ে ছদ্ম উদারতায় রেনকোজির মন্দিরে মিথ্যে স্থাপন ও রোপন করি। এসব করি নিজেদেরকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে। আসলে তিনি জীবনে যা যা করেছেন তা দু-চারদিনের বাহাদুরির আবেগপ্রসুত হাততালি পাবার চমক দেখানো নয়। সমাজের জন্য যা করেছেন সেগুলি সুদূরপ্রসারী কর্মকান্ডের এক বিশাল মাত্রা যার প্রত্যেকটি আশ্চর্যভাবে ইনটারলিংক্‌ড। বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের মধ্যে একসাথে কতগুলি যুক্তিবাদী চিন্তা কাজ করছিল তা মোটা মাথায় সহজে ঢোকেনা। এবং মাথায় ঢোকাতে পারলে আশ্চর্য হতে হয়। কিংবা আশ্চর্য বলে তাঁর মত বৃহৎ আঁত্মশক্তির কাছে কিছুই ছিল না। বিধবা বিবাহ প্রবর্তণের কথাই ধরা যাকনা। এখানেও তাঁর সমাজ চিন্তা কী গুরুত্বপূর্ণ! শুধু যে বিধবা মেয়েদের মুখ চেয়ে আর সুখ চেয়েই তিনি এরজন্য লড়ে গেছেন, তা কিন্তু সম্পূর্ণ সত্য নয়। এর পেছনেও তাঁর প্রখর যুক্তিবাদী মন কাজ করেছে। সে সময়ের সবচেয়ে ঘৃণ্য যে প্রথাটি সমাজে চেপে বসেছিল তার নাম কৌলীন্য প্রথা, এ তো সবাই জানেন। এর ফলে বিধবা, বিশেষ করে বালবিধবার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে চলেছিল। এর ফলস্বরূপ এক বিষময় সমস্যা সমাজকে পচন ও পতনের মুখে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে ব্যাভিচার, ভ্রূণহত্যার মত ব্যপার গুলো অবাধে চলতো। আর এর ফল ভোগ করতে হোত সেই বিধবা মেয়েটিকেই। তাকে ভোগ করবার অনেক ভদ্রমহোদয় ছিল কিন্তু উদ্ধার করবার কেউ ছিলনা। এই ঘুনধরা সমাজ যে একটা মেরুদন্ডহীন জাতীর সৃষ্টি করে চলে যুগ যুগ ধরে, --- এই বিষময় গভীর সত্যটি একমাত্র তিনিই বুঝতে ও ধরতে পারেন, সমাজ ও মানুষকে যিনি গভীর ভাবে ভালবাসেন। হিউম্যানিস্ট ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাই তৎকালীন এবং ভবিষ্যতের এই ভাঙনের ভীষণ কে দেখতে পেয়েছিলেন। আজ একুশ শতকের রাজনীতি-সর্বস্ব সমাজ তথা রাষ্ট্রব্যাবস্থায় সমাজকল্যাণ, মানবপ্রীতি ইত্যাদি শব্দ গুলো দেশ-নেতাদের মুখোশ হয়ে উঠেছে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঢাক-ঢোল- আড়ম্বরের অন্তরালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের হাতিয়ার স্বরূপ সাম্প্রদায়িক উস্কানিকেই ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে আন্তর্জাতিক শিশুবর্ষে শিশুমৃত্যুর হার, শিশুশ্রমিকের সংখ্যা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, যেখানে আন্তর্জাতিক নারী-বর্ষে সর্বাধিক সংখ্যক নারী পণ নির্যাতন ধর্ষন ও শ্লীলতাহানীর শিকার হন, যেখানে ১৮ / ১৯ শতকের বাবুকালচারের স্থান নিয়েছে পূজা- কালচার--- সেই সমাজব্যবস্থায় বিদ্যাসাগর রামোহনের মত মানুষের ব্যাতিক্রমী চিন্তাধারা ও সুদূরপ্রসারী আর্ষ দৃষ্টি কি আজ প্রতিপদে অন্য আরো বিদ্বজ্জনের অক্ষমতা, সমাজ-সচেতন-বিমুখ মানসিকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়না? আজ নারীজাগরণের জোয়ারে দিক বিদিক ভরে যাচ্ছে। এই নারীজাগরণের ও নারীমুক্তির প্রথম পদক্ষেপ কি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্ত্রী-শিক্ষা আন্দোলন এবং সহবাস সম্পর্কীয় বিধিনিষেধের মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠেনি? এ’রকম একজন নিঃস্বার্থ চিন্তাবিদ মানুষ তো পাহাড়ের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যান বলে আমার মনে হয়। তাঁর শিক্ষাচিন্তাও কি কম প্রাসঙ্গিক! যে কালে সংস্কৃত আর আর্‌বী ভাষাই শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম ছিল এবং যা মুষ্টিমেয় কয়েকজনেরই করায়াত্ম ছিল, সাধারন মানুষ যা বুঝতে পারতো না, সেই ভাষায় লক্ষ্যহীন বিদ্যা শিক্ষা দিয়ে এক একজন টুলো পন্ডিত আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন মৌলবী তৈরি করা হোত, তা তৎকালীন ও ভবিষ্যৎ সমাজের পক্ষে কতখানি ক্ষতিকর ছিল বা হতে পারতো তাও তিনিই ভেবেছিলেন তাঁর সেই বৃহৎ মস্তিষ্কের সৌজন্যে। ওই সব ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রদান কে অস্বীকার করে যদি তিনি ইংরাজী ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান দর্শণ ও গণিত শিক্ষার পক্ষপাতি হয়ে থাকেন তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি কতখানি ছিল! কারন সংস্কৃত ও আর্‌বী ভাষাও সাধারণ বিদ্যার্থী দের মাতৃভাষা ছিলনা, ইংরাজী ভাষাও বাঙালির মাতৃভাষা ছিলনা। সেক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভান্ডারটি যে ইংরাজীভাষায় ছিল সেটাই গ্রহন করা কি উচিত বিবেচণার কাজ ছিল না? দেশিয় ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধ ভালবাসা আর অন্ধ অনুরাগের (যা ২১শে আর ১৯শের বাঁধাধরা দিন দুটিতে বাঙালিদের ছদ্ম- মুখরিত করে তোলার মঞ্চকাঁপানো সেলিব্রেসন) বশবর্তী হয়ে তিনি সেই অবলম্বনহীন শিক্ষা ব্যবস্থা কে কিছুতেই সমর্থন করেননি। এর জন্য সেই যুক্তিপ্রবণ মানুষটিকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরাজের দালালের তকমা পেতে হয়েছে। তার জন্য ব্যথা হয়তো পেয়েছেন, কিন্তু ব্যথা বা আঘাত কে প্রশ্রয় দিয়ে এস্কেপিস্ট হননি। বস্তুত, শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় লক্ষ্যটি ছিল মাতৃভাষার উন্নতি তাঁর শিক্ষাপরিকল্পনার মূল কথা। Notes on Sanskrit College ( 1852) এর ২৬ টি স্তবক ভালোভাবে দেখলে এই পর্বতপ্রতিম মানুষটির চিন্তন- গভীরতার সান্নিধ্য পাই, যেখানে প্রথমেই তিনি বলেছেন, “বাংলা দেশে শিক্ষার তত্ত্বাবধানের ভার যাঁরা নিয়েছেন তাঁদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করা।“ অর্থাৎ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আত্মপ্রতিষ্ঠার দিক~টা সর্বদা তাঁর চিন্তায় ছিল।। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য তিনি যতগুলি পরিকল্পনা পেশ করেছেন তাতে পাশ্চাত্য বিদ্যার সাথে ভারতীয় শিক্ষার সমন্বয়ের সুর টি ধ্বনিত হয়েছে।

শৈশবের দারিদ্র যন্ত্রণা নিয়ে বড় হওয়া (প্রকৃত অর্থেই বড় হওয়া), সারা জীবনব্যাপী সমাজ-কল্যাণ এর জন্য নিজেকে নিঃস্বার্থে বিলিয়ে দেওয়া ও ক্ষয় করা, রক্ষণশীল কর্তা ব্যক্তিদের কটুক্তি এমন কি লাশ ফেলে দেবার হুমকি সহ্য করেও নিজের কাছে যা ঠিক ও যথার্থ মনে হয়েছে তার প্রতি অবিচল নিষ্ঠায় পাহাড়ের মতই অবিচল থাকা, --- কে পারে!! তাঁর মত? কী দরকার ছিল তাঁর সারা জীবনকে এভাবে নিঃস্বার্থে এবং নিঃশর্তে দেশের, সমাজের জন্য খরচ করা? কী দরকার ছিল বাংলাভাষার উন্নতির জন্য এতবড় ত্যাগ স্বীকারের? সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার বেদান্ত, স্মৃতি ও ন্যায় অধ্যয়ন করেছেন। ‘হিন্দু ল কমিটি’ তাদের দেওয়া শংসা পত্রটিতে ঈশ্বরচন্দ্র নামের পরে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি টি দিয়েছিল। বিদ্যার সাগর ছিলেন তিনি, কি দরকার ছিল তাঁর সমাজের মানুষের দুখ-যাতনা বয়ে বেড়াবার? কি প্রয়োজন ছিল তাঁর করুণাসাগর হবার? এইখানেই তাঁর ব্যতিক্রমী মেরুদন্ডের কথা, ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের দিকটি আমরা দেখতে পেয়ে যাই। সাধারণ অ্যাভারেজ পারসোনালিটি বা গড় ব্যক্তিত্ব, যা সমাজের প্রচলিত নিয়ম ও সংস্কারের সাথে অভ্যস্থতার বন্ধনে বাঁধা পড়ে থাকে, যুগ যুগ ধরে প্রচলিত (কু) সংস্কারের যুক্তিগ্রাহ্যতা সম্বন্ধে প্রশ্ন তোলেনা বা তোলার কথা কল্পনায়~ও স্থান দেয়না,--- সেই চিরাচরিত আবহমান স্রোতের বিপরীতে উজান ঠেলে যাওয়ার মত মেরুদন্ডের জোর একমাত্র সেই মানুষেরই থাকে, মানব ও সমাজকল্যাণের শঙ্খ টি যাঁর হাতে থাকে। এই কল্যানশঙ্খধ্বণিতে সকলকে সচকিত করে, সমস্ত সংকীর্ণতার বেড়া ভেঙে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর নামক পর্বত~টি সাধারণ মানুষ কে আলিংগন করেছেন। আসলে বৃহৎ তিনিই যিনি সাধারণের সমতলে নেমে আসতে লজ্জিত, কুন্ঠিত হন না।

আজ আমরা অনেক পলিটিকাল ইজ্‌ম নিয়ে বড়ই আত্মগর্বে ফুলে থাকি। কিন্ত সব ইজ্‌ম্‌ এর মূলকথা ও শেষকথা যে “মানবিকতা”, এই যথার্থ এবং মুল্যবান বোধ টা কি আমাদের মধ্যে জাগাতে পেরেছি? বিদ্যাসাগর, আমার পরম আরাধ্য মানুষটি, এইসব তথাকথিত কোনো ইজ্‌ম্‌ এর ধার ধারেন নি, কোনো বাঁধা ধরা গতের দড়িতে নিজেকে বেঁধে রাখার সংকীর্ণতায় থাকেননি। এই বোধ তাঁর অন্তরসঞ্জাত। বিস্ময়ের অতল আমাকে স্তম্ভীত ক’রে যখন আমি তাঁর ‘উইল’পত্রটি দেখি। কি দেখেছি তাতে! দেখেছি এক সুউচ্চ মনের অসীম। দেখেছি তাঁর আত্মীয় অনাত্মীয় নির্বিশেষে প্রকৃত অভাবী ও দুস্থ জনের জন্য নির্দিষ্ট মাসোহারার ব্যবস্থা। এমন অনেক মানুষ এদের মধ্যে আছেন যাদের সংগে তাঁর কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিলনা, ছিল সেই সম্পর্ক যা একজন প্রকৃত সম্বলহীন দুস্থ মানুষের সাথে একজন স্বার্থ-চিন্তাশূন্য দাতার যে আত্মিক আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকে। গ্রামের অনাথ ও নিরূপায় মানুষের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল তাঁর দানপত্রে। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরেও প্রতিটি বিধবাবিবাহের জন্য ১০০ টাকা ব্যয় বরাদ্দ তাঁর উইলে নির্দেশিত ছিল। কে তঁকে মাথার দিব্যি দিয়েছিল, তখনকার পচা গলা সমাজ কে শুদ্ধ করবার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে? দিব্যি দিয়েছিল তাঁর ভেতরের ‘আমি’, তাঁর জাগ্রত চেতনা। কে শোনে এই ‘আমি’র কথা? কেউ কেউ শোনে। যার হৃদয়ে এক বিশাল স্পর্শকাতর অথচ নিষ্ঠ হৃদ-পাহাড় আছে, যে পাহাড় দৃঢ-সংকল্পে অনড়,—সে শোনে। শোনে এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে, নিজের অস্তিত্ব কে তুচ্ছ করে। গঞ্জনার হ্যাপা, খুনের হুমকি। তাতে কি? তিনি তো পাহাড়ের মহিমায়। এসব ঝঞ্ঝা এসে ধাক্কা খেয়ে নিজেই ফিরে যায়। তাঁকে সংকল্প থেকে নাড়াতে পারেনা। শিখরে শিখা নিয়ে ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার নোংরা আর নোংরামো গুলোকে সবাই অবহেলায়... অথচ তিনি আত্মঁবিশ্বাসে , পাশে পাশে আইনি স্বীকৃতির জন্য চটি ক্ষইয়ে ফেলেন। তাঁকে দেখতে হলে অনেক উঁচু পর্যন্ত মাথা তুলতে হয়, যেখানে আমার আইসাইট পৌঁছোয় না। হিমালয়ের উচ্চতা মাপতে পারেন রাধানাথ শিকদার, কিন্তু বিদ্যাসাগরের উচ্চতা কোনো মিটার কিলোমিটারের ইউনিট দিয়ে মাপা যায় না। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ পরিবেশেও তিনি আলোকিত এবং স্পষ্ট। মানুষকে করুণার চোখে নয়, এক পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেছেন। কোনো সীমা’ই তাঁকে আবদ্ধ করতে পারেনা। ধারণের যতেক যন্ত্রণা নিয়ে তিনি শুধু হেঁটে চলেন, সংগে থাকে তাঁর বিখ্যাত ঝ্যাঁটা গাছাটি। কোন জনা তাঁর মত ভাবতে জানে, বইতে জানে, সইতে জানে! না, আমি খুঁজে পাইনা। পলিটিক্যাল স্টান্ট দেবার অনেক জন কে পাওয়া যায়, কিন্তু কোনোরকম আসনলোভ কে অস্বীকার করে, কিছু পাবার প্রত্যাশা না করে, শুধু দিয়ে যাওয়ার এই অসামান্য উচ্চতা কে সেলাম করি হাজার বার। যদিও এইসব সেলাম প্রনাম কুর্ণিশ কে পরোয়া করার বান্দা তিনি নন। সাগরের ঝঞ্ঝা, ক্যটেরিনা- হুদহুদ-সুনামী কে পাত্তা না দিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমাজের সুস্থতা নিয়ে ভেবে গাছেন। সব চোখ থাকা অন্ধ দের চোখ খুলে দিতে ছেয়েছেন। আমরা অন্ধই থেকে গেছি। মৌলবাদি পন্ডিতমন্ডলী রক্তচোখে তর্জনী তুলেছে তাঁর দিকে। বিষ্ঠাপরিবৃত সমাজের গন্ধই আমরা ভালোবেসেছি। বিষ্ঠা পরিষ্কার করা মানুষটিকে চাঁড়াল নমোশুদ্রজ্ঞানে তাচ্ছিল্য করেছি। আবার বাগদী চাঁড়াল বিধবা দের রাতের শয্যায় ভোগ করতে ছাড়িনি। এদের জন্য জীবনভোর ল’ড়ে যাবার জখম এবং অঙ্গীকার নেওয়ার বেপরোয়া --- তিনিই পারেন।

আমরা দু-হাত ভরে নিয়েছি ত্তাঁর কাছ থেকে, বদলে ঠকিয়েছি তাঁর মত মানুষকে, বঞ্চনা করেছি, বিষন্ন করেছি, একলা করেছি। শেষ জীবনটায় এই সমাজোন্নতিপাগল মানুষটি দারুণ অভিমানে একলা একটি দ্বীপের নির্জনে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। গভীর সমুদ্রের উথাল পাথালের মধ্যে এক বাতিঘর হয়ে আমাদের পথ দেখানোর জন্য তিনি এসেছিলেন। আমরা চিনতে পারিনি তাঁকে। ‘পাহাড়’ কে কি সম্পূর্ণ করে কেউ চিনতে পারে, বুঝতে পারে! প্রাপ্তির ঘরে পরিধিবিহীন শূন্যতা নিয়ে আশরীর এক বিবিক্ত যন্ত্রণা এক~টি পাহাড়ই বইতে পারে। আমাকে তাঁর কাছে প্রণত হতে হয় বার বার।