পৃথিবীর স্তন

ফেরদৌস নাহার



আমার বয়স এখন দুহাজার বছর। আমি জেগেই থাকি, ঘুম খুব কম। দুহাজার বছর আগেও নিয়ম করে ঘুম হত বলে মনে হয় না। তখনকার মতো এখনো আমাকে সারারাত জাগিয়ে রাখে। কে যে ভেতরে কড়া নেড়ে ডেকে যায়, ওঠো চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী, চলো দেখবে চলো! সে ডাকে অবাক হইনি। বরং দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ার আগ্রহে, ঝোপঝাড় পেরিয়ে যেতে থাকি। মনে মনে ধরে নেই সমুদ্রের পাশে দিয়েই যাব, আর তখনই পেয়ে যাব পাহাড়ের দেহ। তার গায়ে হেলান দিয়ে বসে দেখব জলের বোতাম খোলা এবং বন্ধ হওয়া জোয়ার ভাটা। নিঃশ্বাস গাঢ় হবে। কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে আসবে। পাহাড়ের আলিঙ্গন বারবার শেখাবে, জগৎ জুড়ে পাহাড়ের রুপকথা। তখনো শুনতাম, এখনো শুনি।
এসব শুনতে শনতে এক একবার নিজেকে অচেনা মনে হয়, আবার খুব চেনা চেনা। একটু ঘুম ঘুম, একটু জেগে জেগে থাকা। কার সঙ্গে যাচ্ছি পাহাড়ের কাছে, কিইবা দেখব, কিছুই জানি না। তারপরও যাচ্ছি, যেতে হবে বলে। না গিয়ে পারি না বলে। আমার দুহাজার বছর ধরে এমনই তো চলছি। কে এক একজন ডাকছে আর আমি তার সাথে সাথে চলছি। মনে মনে বলছি, তোকে যে যেতে হবে! মুক্তি নেইরে পাগল, এ থেকে তোর মুক্তি নেই।
অনেকেই জানে না, কিন্তু আমি জানি- আমার চামড়ায় এখন প্রকৃতি জেগে আছে। শিকড় গজিয়ে মহিরুহ হয়েছে। পাতাগুচ্ছ দোল দিয়ে দিয়ে বলে চলছে অনেক কথা। বলছে সেসব কথা যা বারবার বলতে চেয়েছে এ ও সে। বলতে চাইলেও বলা হয়নি, বা বলা হলেও কেউ শোনেনি। কখনো সেসব মনে মনে বলা হল, কানে কানে বলা হল, রাজপথে, রেলস্টেশনে, জাহাজঘাটে- কতো না খানে। কিন্তু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে যখন বলেছি সেই একই কথাগুলো, আমার তারা কাছেই ফিরে ফিরে এসেছে, কেন যে তাকে প্রতিধ্বনি ডাকি! সেগুলো তো সত্যি, প্রতিধ্বনি নয়। হাজার হাজার বছরের অভিধা নিয়ে গেঁথে আছে পাহাড়ের বুকে।
পেরুর মাচু পিচু পাহাড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে প্রত্নপথের রাঙা ধুলো। ওই তো দূরে প্রায় আট হাজার ফিট উঁচুতে দেখতে পাচ্ছি ইনকাদের হারানো শহর। বয়ে চলা উরুবাম্বা নদীর পা ধুয়ে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পাহাড়ি ঝর্না। ইনকাদের পবিত্র জলধারা উরুবাম্বা নদী ঘিরে রেখেছে পুরো শহরটি। যার উপর দিয়ে দুরন্ত তেজি ইনকা পুরুষেরা তীর ধনুক আর বর্শা হাতে ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে। অঢেল শস্যসম্ভারের আনন্দ বন্যা চারদিকে, আর সকলের দেহে উল্কি আঁকা। সূর্য মন্দিরের ঘড়ির ঢং ঢং আওয়াজ এ-পাহাড় থেকে ও-পাহাড়ে হানা দিচ্ছে। তখনই, পাহাড় কেটে কেটে বানানো সিড়িগুলো ভেঙে সূর্যদেবর তুষ্টির জন্য, সূর্য মন্দিরে আত্মাহুতি দিতে চলেছে সতী রমনীরা। তা দেখে আমার এই দুহাজার বছরের পুরনো দেহও কেঁপে কেঁপে উঠছে! কী সাহসী, কী বলিষ্ঠ পায়ে তারা সারিবদ্ধ এগিয়ে চলছে। ওই যে ওদের ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলো জানালার শিক ধরে কাঁদছে, পুরুষেরা উল্লাস জানাচ্ছে। না না এ দৃশ্য কেন দেখছি? তারচেয়ে সবচেয়ে উঁচু চূড়ায় দাঁড়িয়ে পাখিদের খেলা দেখি। আমাকে খেলা দেখাতে এগিয়ে আসে এক প্রত্ন-জাদুকর। যে জানে আধিবৈদিক তন্ত্র, ধুলোকে নিমেষে সোনা করে দেয়, হয়তো সোনাকেও ধুলো। পাহাড়ের উপকন্ঠ থেকে ভেসে আসছে পুরুষ কণ্ঠের উচ্ছ্বাস এবং শিশুদের কান্না। জাদুকর তুমি কিছুই মুছিয়ে দিতে পার না, আমি চললাম।
ঈগলের ডানা ধরে ঝুলতে ঝুলতে চলে গেলাম আরো দূরে। দুশো কোটি বছরের ইতিহাস বয়ে চলছে যেখানে। অ্যারিজনার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। কলোরাডো নদীর দুই তীরে লাল শিলার পর্বতমালায় একদা দেখেছি আদিবাসী রেডইন্ডিয়ান পুয়েব্লো ও কোহোনিনা সম্প্রদায়। তাদের দশ হাজার বছরের পুরানো ভ্রম্যমাণ বসতিতে একদিন আমিও আতিথ্যগ্রহণ করেছিলাম। তখন কিন্তু পাহাড়গুলো সবুজ আর বৃক্ষাছায়ায় ভরে ছিল। খুব একটা মনে পড়ছে না এমন নিরেট পাথুরে পাহাড় সেদিন দেখেছিলাম কিনা। তারা পাহাড়ি হরিণ শিকার করে, আগুনে সেঁকে আমাকে অপ্যায়ন করেছিল। সেদিন আকাশে কী বিশাল চাঁদ, মানে ভরা পূর্ণিমা। আমাকে ঘিরে তারা নেচেছিল, গানও গেয়েছিল। মহুয়ার নেশায় দুলে দুলে পরস্পর প্রগাঢ় চুম্বনে উথাল পাথাল। যেদিন ফিরে এলাম, আবারো যেতে বলেছিল। আমিও কথা দিয়েছিলাম, যাব।
হঠাৎ একদিন দখলদার বাহিনী এসে তাদেরকে ঐ অঞ্চল থেকে নির্মমভাবে উৎখাত করে তাড়িয়ে নিয়ে চলল। এবার তারাই যেন পশুর দল, আর তাই তাদের জন্য বরাদ্দ করে রাখা সংরক্ষিত এলাকায় ছুটিয়ে ছুটিয়ে মারল। আমার সেইসব মহুয়া মাদলের বন্ধুরা, যারা একদিন আমাকে আবারো যেতে বলেছিল, এবার তারা তাদের নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখল পাহাড়ের গুহায় গুহায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঝরতে থাকল লালরং রক্তধারা। আমি গিয়েছিলাম, কিন্তু কোথাও তাদের খুঁজে পাইনি। হাজার বছর ধরে খুঁজে খুঁজেও হারিয়ে ফেলা বন্ধুদের কেউকেই আমি পাইনি। শুধু দেখেছি রক্তবর্ণের পাহাড় আর শুনেছি কলোরাডো নদীর অব্যক্ত কান্না-ধ্বনি।
প্রকৃতির বিস্ময়কর রূপ দেখে মুগ্ধ ভ্রমণ পিপাসুরা। তারা কি জানে, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন পাহাড়গুলো কেন এত লাল? কাদের রক্ত নিয়ে আজ তারা এতটা লহিত বরণ? সূর্যোদয় হয়, সূর্যাস্ত যায়। টকটকে গাঢ় রঙের ক্যানভাসে আঁকা থাকে আদিবাসী ইন্ডিয়ানের রক্তাক্ত ঋণ। আমি কেঁপে উঠি, ইচ্ছে করে চিৎকার করে বলি- পুয়েব্লো ও কোহোনিনা সম্প্রদায়ের বন্ধুরা, আমি তোমাদেরকে দেখছি। কেউ শুনুক আর নাই শুনুক, আমি প্রতিনিয়ত শুনতে পাচ্ছি তোমাদের হাসি-কান্নার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি গ্রান্ড কেনিয়ান আকাশে বাতাসে।
‘মোর গাঁয়ের সীমানার পাহাড়ের ওপারে
নিশীথ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি
কান পেতে শুনি আমি বুঝিতে না পারি
চোখ মেলে দেখি আমি দেখিতে না পারি
চোখ বুজে ভাবি আমি ধরিতে না পারি
হাজার পাহাড় আমি ডিঙুতে না পারি’
মাঝে মাঝে ভাবি, তাহলে কি কথাগুলো পৌঁছাচ্ছে না কারো কাছে? বারবার বলি, বারবারই ফিরে আসে। যতবার, ততবার। যেন এও এক খেলা, মানুষ জন্মের বিষয়-আশয় জড়ানো এক একটি খেলা। আসলেই যেতে চাই হাজার পাহাড় ডিঙিয়ে। হতে পারে খাগড়াছড়ি রাঙামাটি বান্দরবান। হতে পারে আরো দূরের কোনো পাহাড়ি অঞ্চল, যার নাম কখনোই শুনিনি। কে যেন আঘাত করছে সেখানেও, কারা যেন সব ভেঙে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে, দাউ দাউ করে জ্বলছে খাগড়াছড়ির মহাজনপারা। পুড়িয়ে দিচ্ছে মাঘি পূর্ণিমার চাঁদ, বৈসাবি, বিজু উৎসব, সব সব সব। পাহাড়ি বনে পড়ে আছে ধর্ষিতা আদিবাসী নারীর দেহ। আর তখন কেবল নিশী পাওয়া রাতের কষ্ট-প্রতিধ্বনি আমাকে তাড়া করে ফেরে। চেনা চেনা সুরটিকে কিছুতেই আর চিনতে পারছি না। কেবল নিশীথ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি। যা কিনা ভেসে আসছে পাহাড়ের ওপার হতে। যেখানে চাঁদের গাড়িতে চড়ব বলে একদিন অপেক্ষা করেছিলাম। যেখানে বৃষ্টির শব্দ দাবানলের মতো ফুঁসে ফুঁসে অন্যরকমের ভাষা শুনিয়েছিল, যা এ-জীবনে কখনোই শুনিনি। সারারাত বুনোবৃষ্টির আদিম শব্দ জাগিয়ে রেখেছিল আমাকে। সেই সেখান থেকে ভেসে আসছে পাহাড়ি গোঙানি, ধর্ষণের চিৎকার, আগুনের উত্তপ্ত শিখা, টুকরো টুকরো ছিন্ন-ভিন্ন আর্তনাদের সাথে মুণ্ডুহীন বুদ্ধের পায়ের শব্দ।
মাটিরং অথবা সবুজ পাহাড় সকলে দেখেছে। কিন্তু তারই ভেতর লুকিয়ে থাকা এক একটি নির্মম ইতিহাস। পৃথিবী কি চোখ মেলে দেখে? সে দিন ছিল শরতের নরম প্রহর, ল্যাটিন আমেরিকার আমাজান বনাঞ্চল আর সর্বোচ্চ পর্বতশিখর নেভাদো সাজামার দেশে, এক বিরল যোদ্ধাকে বলিভিয়ার সামরিক জান্তা এবং আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বন্দি অবস্থায় হত্যা করল। তাঁর বুলেট বিদ্ধ দেহের সঙ্গে কত ছবিই না তুলেছিল তারা। তাঁর পরনে ছিল জলপাই পোশাক। নিদারুণ ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ প্রতিকূল সময়ের লড়াকু পর্বত। চে চে বলে চিৎকারে বন-বনান্তর, পাহাড়-পর্বত কত না কান্না ঝরিয়েছিল সেদিন। কেউ তা না শুনুক আমি এখনো, এই দুহাজার বছর ধরে একটানা শুনে চলছি, ফুরায় না।
সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু পাহাড়ের মৃত্যু নেই- যাবার সময় তিনি তাই জানিয়ে গিয়েছিলেন। তা না হলে তাঁকে হত্যা করার ঊনচল্লিশ বছর পর, সেই বলেভিয়ার আন্দেস পাহাড় থেকে নেমে আসা একজন অধিকার বঞ্চিত আদিবাসী নেতা ইভো মোরালেস, সাম্রাজ্যবাদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কী করে নিজ হাতে তুলে নিলেন তার জন্মভূমির বৈঠা। চে গুয়েভারা এভাবেই ফিরে ফিরে আসেন বারবার প্রতিবার। পাহাড়ের প্রতিধ্বনি হয়ে নয়, সমগ্র পাহাড় হয়ে।
পশ্চিমের পাহাড়ে যখন সন্ধ্যা নামে, মানে- সূর্য অস্তো যায়, কেউ কি জানে, সে সময় একটি লহিত রং ঘোড়া টগবগ করে ছুটতে ছুটতে পাহাড়ের খুব কাছাকাছি এসে চলার গতিটা কমিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে ডুবে যেতে থাকে তারই অন্তরালে। আসলে সে কোথায় যায়, জানি। সে যায় নিজেরই ভেতর, যায় তিব্বতের সারিবদ্ধ দালাই লামার ভেতর। টকটকে আপেলরঙা গালের ছোটো ছোটো চোখের গেরুয়া বসনের ভেতর। পাহাড়ের ঘ্রাণ নিয়ে যারা খেলা করে, গান গায়, সূর্যকে প্রণাম করে, জীবনের আলো দেখে পাহাড়ে পাহাড়ে, যারা খুব অনভ্যস্ত বাইরের এই মেকি পৃথিবী সম্পর্কে, সূর্য যাদের সত্যিকারের সখা।
ঠিক আমি প্রথম যেভাবে জেনেছিলাম মাটির পৃথিবী, সে-ই আমাদের মা। কোলে করে দোলায় হাসায় ভালোবাসায়। মাগো তোমার কোলে মাথা রেখে কবে শুয়েছিলাম, কবে প্রাণ ভরে ঘুমিয়েছিলাম মনে নেই। এই যে আমাকে যে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে সে কী জানে, দুহাজার বছর পরে খুঁজে পেয়েছি পৃথিবীর স্তন। কাছের কিংবা দূরের সব পাহাড়গুলো তাদের নির্যাস তুলে দিতে দিতে এ-দেহের রক্তে সঞ্চারিত করছে জীবন। আবার জীবনের আঘাতগুলো ঢেকে রেখেছে সযতনে। তাদের বিশুদ্ধ শিখর বৃন্তে ঠোঁট রেখে উত্তাপ নিয়েছি, পান করেছি অমৃতের সুধাধারা।
পাহাড়, তোমায় পৃথিবীর স্তন করে গড়েছে প্রকৃতি। আজ চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী, সবচে’ আগে ভাসছ তুমি- পৃথিবীর স্তন।