পাহাড়

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়



কচিবেলায় গল্প শুনতো দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদারের হাড়ের পাহাড়, কড়ির পাহাড়ের। সত্যি বলছে নাকি? না বোধ হয়! তখনো তো অনেক বাকি বড় হয়ে ভ্যাসিলি ভ্যসিলিয়েভিচ ভেরেশছাগিনের উপর লিখতে গিয়ে তাঁর বিখ্যাত যুদ্ধবিরোধী ছবি ‘অ্যাপোথিওসিস অভ ওয়্যার’-এ কঙ্কালের পাহাড় তথা পিরামিড দেখা। কিন্তু সে তো অনেক পরের কথা। ইতিমধ্যে নিতান্ত ছোটোবেলায় সে বুঝে গেছে পাহাড় মানে মহান, জমাটবাঁধা, আত্মমগ্ন স্তব্ধতা। ট্রেনে বেড়াতে যাওয়ার সময় বাংকে ঘুমিয়ে রাত পার করে ভোর না হতে হতেই দূরের মাঠপারে সিল্যুট নিয়ে হাজির হতো ওরা, রেললাইনের ধারে, ট্রেনের গতি ধার করে’। ‘দেখ্, দেখ্, পাহাড়, সত্যিকারের!’ সমতলের শিশুদের আনন্দ ছুঁয়ে যেতো সমতলের অসমদের — বড়দের, বৃদ্ধদের। গম্ভীর মুখে চোখদুটো কেবল হাসতো তাঁদের। ট্রেন থেকে নেমে যেতে চঞ্চল হোতো পা! উড়িষ্যার, ঝাড়খণ্ডের বর্ডারে। বেলা বাড়তেই খেলা বাড়তো ওদের। কতকগুলো রাম-টেকো, কতকগুলো ঘাসে বা গাছে ঢাকা। ‘ইস! নামা যেতো যদি?’ তার পর পরোটার মধ্যে আলুচচ্চড়ি পুরে, রোলের ঠাকুদ্দাদের স্বাদ নিতে নিতে পাহাড় দেখা। এর পরে ইস্কুলে ফিরে শিখতে হবে পাহাড় হচ্ছে ক্ষুদ্র পর্বত। এই সব পাহাড়-পর্বত ছাড়াও বাড়ি ফিরে তিনটে মাদুর আর চারটে হ্যারিকেন নিয়ে বাবার কাছ থেকে শোনা যাবে, শিখবে পাহাড়ের আরো কত্তো নাম! অগ, অদ্রি, অচল, গিরি, নগ, পন্নগ, ভূধর, মহীধর, শিখরী, শৈল, শৃঙ্গবান, শৃঙ্গী, শৃঙ্গধর, আরো কত কি! ক্লাস ফাইভের অ্যানুয়ালি পরীক্ষায় অরবিন্দ গণ বাংলায় দশ নম্বর টেক্কা দিয়ে ফাস্ট হয়ে গেল। মাস্টারমশাই মাথায় গাঁট্টা মেরে বললেন, বজ্জাৎ আর কবে নিজেকে চিনবি! কি করে বোঝাবে স্যারকে যে সে পাহাড়ে মজে আছে? তার পায়ের ছোঁয়া পেতে ওরাও আকুল! এর মধ্যে ক্ষিতিধর, মেদিনীধর, পৃথিবীধর, ধরাধর টেনে এনে নাম ধরাধরি করে লাভ কী তার! তো বাংলার স্যার যতটুকু বাকি রাখলেন, ছোটপণ্ডিতমশাই তাতে রেগে বললেন, ওসব তো সংস্কৃত শব্দ! নিখিল তার কতটুকু জানে? ক্ষ্ণাধর, ভূভৃৎ, গোধ্র, গোভৃৎ এসব বলেছে? ওর চোখ ফেটে জল আসে কি এতে? এলে! আর তো কয়েক বছরের মধ্যে ভূগোল স্যারের হাতে পড়ে’ ‘গণ্ডশৈল, স্তূপপর্বত, ভঙ্গিলপর্বত, ক্ষয়জাতপর্বত, সঞ্চয়জাতপর্বত’-এর মধ্যে হারিয়ে যাবে পাহাড়ের স্বপ্ন।
যেতোও, যদি না ক্লাস নাইনে বড় পণ্ডিতমশাই সংস্কৃতর ক্লাসে বলে বসতেন, ‘অস্ত্যুত্তরস্যাং দিশি হিমালয়ো নামো নগাধিরাজঃ’, একদম বেজে গেলো যে পাহাড়! কি যে টানলো! মনে হোলো ধিঙ্গিপদকে বলে পাহাড়ের হাওয়াবাড়িতে নিয়ে যেতে। তখনো বাড়ির কিন্নরদলের এক একটি তারা খসা শুরু হয়নি। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের দিকে এগোতে গিয়ে প্রতিবেশি ট্রেকার দাদার কাঠমাণ্ডু থেকে ইয়াংরিখোলার টাটকা ছবিগুলো ঔজ্জ্বল্য হারায়নি। পাহাড়ের সম্বন্ধে ছোটোপণ্ডিত মশায়ের আর একটা না বলা প্রতিশব্দ — পাষাণস্তূপ— গেড়ে বসেনি। তখনো পাহাড় মানে পৃথুশেখর। বেদনা, বিরহ আছে পাহাড়ে, পাহাড়িয়া সুরে। বিরক্তি নেই। ‘শাশুড়ী নাগিনী, ননদী বাঘিনী, রাধার কান্নার সুর পাহাড়ী রাগিণী’ (রাজকৃষ্ণ রায়)। পাহাড় বাঙালি জীবন থেকে বহু দূরের বলেই সে সবেতে পাহাড় দেখে, পুকুরের মাটি উঁচু করা পাড়েও, বসতির লোভে — ‘পোখরি পাহাড়ে তুলিও ঘর’। ‘সমুদ্রের স্বাদ’ গল্পের নায়িকার মতো।
কিন্তু কলকাতায় এমন নকল পাহাড় কোথা? বেঙ্গালুরু থেকে ‘নানিহাল’ কাটাতে আসবে নাতি। আব্দার পাহাড় দেখাতে হবে। সে বলেও দিয়েছে হ্যাঁ। পারবে দেখাতে? কথা রাখতে? ভেবেও রেখেছে, বাইপাসের ধারে পি.সি. চন্দ্রের হাতে একটাকায় ছেড়ে দেওয়া উঁচু করা, মাটি হয়ে যাওয়া, আবর্জনার সৌন্দর্যায়িত স্তূপকেই দেখিয়ে দেবে না হয়! অথবা টাটা সেণ্টার দেখালে কই হয়, বা এমন আরো কোনো আকাশচুম্বী! জয়েস তাঁর ফিনেগান্‌স ওয়ে বইতে এদের সম্বন্ধেই বলেছিলেন না — ‘hierarchitectitoploftical’!
নইলে কলকাতায় পাহাড় মানে! পাথুরে কলকাতা! কী পাথর, কী পাথর! আর কী দূর! সঞ্জীবচন্দ্রের দেখা আপাতঃনিকট পালামৌয়ের থেকেও! ‘কাজের বেলায় কাজী, কাজ ফুরোলে পাজী’, এখানে তার নীরেন চক্কোত্তির মতো অনন্ত প্রবাস, ‘যেখানে পা ফেলবি, তোর মনে হবে, বিদেশে আছিস।/ এই তোর ভাগ্যলিপি। ... কাপড় সরিয়ে কেউ বুকের রহস্য দেখাবে না(প্রবাসচিত্র)’। জলে যাবি পাথর, পাহাড়! বর্ষাকালে! ‘যেখানে দুর্দান্ত বৃষ্টিতে ঝর্নাগুলো ব্যতিব্যস্ত’, শেষের কবিতায়! আর দিদির কলেজের খাতায়, শেষ পাতায়! কি জানি কী ভেবে লিখে রেখেছিলো বোকা দিদিটা! কলকাতার কোন্ ন্যাড়া, সঞ্জীবচন্দ্রের, নাকি রবীন্দ্রনাথের, মতো — ‘কাছে থেকে দূর রচিল’ — কোন্ পাহাড়ে ওকাম্পোর মতো মরীয়া জল খুঁজেছিল। দূর! ন্যাড়া পাহাড়ে কি জল থাকে? সব পাহাড় কি প্রবোধ সান্যালের হিমালয়ের মতো ‘দেবতাত্মা’! দূরে থাকে, লোভ দেখায়, কাছে এলে পিষে দেয়। কত দিদি ঋত্বিকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র নীতার মতো গলা চিরে নিঃশব্দ চেঁচিয়েছে— চেরাপুঞ্জি! একখানা মেঘ গোবি-সাহারায় ধার দিতে পারো? নাকি মান যায়, পাহাড়! আর তার পরে ‘কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে। (রবীন্দ্রনাথ, ‘প্রশ্ন’)’ দিদিরা সুনীলের মতো বলতে পারেনি, ‘কলকাতা আমার বুকে বিষম পাথর হয়ে আছে/ আমি এর সর্বনাশ করে যাবো-/ আমি একে ফুসলিয়ে নিয়ে যাবো হলদিয়া বন্দরে’ (‘আমি ও কলকাতা’)?
আমি তাই আর পাহাড় ভালোবাসি না। ঘেণ্ণা! পাহাড়প্রমাণ বিদ্যে, পাহাড়প্রমাণ চিন্তা, পর্বতপ্রমাণ অহঙ্কার নিয়ে আমি সুনীলের মতো ‘নাকের বদলে নরুন পেলাম’ ঢঙে বলতে চাই না—
অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ।
... কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না।
... যদি তার দেখা পেতাম,
দামের জন্য আটকাতো না।
আমার নিজস্ব একটা নদী আছে,
সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে।
কে না জানে, পাহাড়ের চেয়ে নদীর দামই বেশী।
পাহাড় স্থানু, নদী বহমান।
তবু আমি নদীর বদলে পাহাড়টাই
কিনতাম।
কারণ, আমি ঠকতে চাই। (‘পাহাড় চূড়ায়’)
ঠকা, ঠকানো! আরে দূর! পাহাড়কে দূরে, পৃথক রাখবি, বোকা! তাকে দেখে এমিলি ডিকিনসনের মতো বলবি!
Ah, Tener¬iffe!
Retreat¬ing Moun¬tain!
Pur¬ples of Ages — pause for you —
Sun¬set — reviews her Sap¬phire Reg¬i¬ment –
Day — drops you her Red Adieu!
Still — Clad in your Mail of ices –
Thigh of Gran¬ite — and thew — of Steel –
Heed¬less — alike — of pomp — or parting
Ah, Tener¬iffe!
I’m kneel¬ing — still – (‘Ah, Tener¬iffe’)
সত্যি ভাবছিস দ্রষ্টা, দৃষ্টি, আর দৃশ্য এতই আলাদা! আমি পাহাড় দেখি আমার বাধায়। সে বাধা কাটতে দেখি প্রেমিকাশরীরে। মেয়ে কবি ডিকিনসন পাহাড়ে দেখেন গ্র্যানাইট ঊরু, ইস্পাতী পেশী। আমি কিন্তু জানি বুঝি মরমী হাতের ছোঁয়ায় পাহাড় গলে যাবে, গ্যারি স্নাইডারের উইনিটা পাহাড়ের মতো। দাবি করতে পারি —
তুমি যে বলেছিলে গোধূলি হলে
সহজ হবে তুমি আমার মতো,
নৌকো হবে সব পথের কাঁটা,
কীর্তিনাশা হবে নমিতা নদী! (‘একটি কথার মৃত্যুবার্ষিকী’)

যদি স্থূলহস্তাবলেপে নষ্ট না করে ফেলি প্রেমিকাশরীর, তবে গ্যারি স্নাইডারের ইউনিটা পাহাড়ের মতো, হাতের আদরে গুলিয়ে যাবে কোথায় প্রেমিকাশরীর আর পাহাড়ের শুরু ও শেষ,
What my hand fol¬lows on your body
Is the line. A stream of love
of heat, of light, what my
eye las¬civ¬i¬ous
licks
over watch¬ing
far snow-dappled Uin¬tah moun¬tains.
Is that stream
Of power. What my
hand curves over, fol¬low¬ing the line.
“hip” and “groin”
Where “I”
fol¬low by hand and eye
the swim¬ming limit of your body.
As when vision idly dal¬lies on the hills
Lov¬ing what it feeds on.
soft cin¬der cones and craters;
–Drum Hadley in the Pinacate
took ten min¬utes more to look again–
A leap of power unfurl¬ing:
left, right-right–
My heart beat faster look¬ing
at the snowy Uin¬tah Moun¬tains.
What “is” within not know
but feel it
sink¬ing with a breath
pusht ruth¬less, surely, down.
Beneath this long caress of hand and eye
“we” learn the flow¬er¬ing burn¬ing,
out¬ward, from “below” (Gary Snyder, ‘Beneath my Hand and Eye the Dis¬tant Hills, Your Body’)
আর তৃপ্ত নিজেকে বলবো —
ওইটুকু নিয়ে তুমি বড় হও,
বড় হতে হতে কিছু নত হও
নত হতে হতে হবে পৃথক পাহাড়,
মাটি ও মানুষ পাবে, পেয়ে যাবে ধ্রুপদী আকাশ।
আমি আর কতোটুকু পারি ?
এর বেশি পারেনি মানুষ। (হেলাল হাফিজ, ‘পৃথক পাহাড়’)।

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়