কেউ পাহাড় কাটতে এলে আমরা হয়তো তার মাথা কেটে ফেলব

সরকার আমিন



পাহাড় সব সময়ই আমাকে খুব টানে। কারণ পাহাড়ে উঠলে নিজেকে আমার খানিকটা বৃহৎ লাগে। মনে হয় বেশ উচ্চতায় ওঠা গেল। আরেকটু চেষ্টা করলেই আকাশ ধরতে পারব।

চেরাপঞ্জিতে গিয়ে মাতাল হয়ে পড়েছিলাম যখন দেখলাম আমি যে পাহাড়টায় দাঁড়িয়ে আছি তা থেকে মাইল খানেক নিচে মেঘ। মেঘ রোলিং করে করে উপরে উঠছে আর আমার পা উর, বুক, মুখ ও চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। নিজেকে আমার মনে হয়েছিল মেঘের বরপুত্র। বৃষ্টির গুপ্তপ্রেমিক। একটা গোপন চাঞ্চল্য আমাকে গ্রাস করল। আমি এর মধ্যে আবার আবিষ্কার করলাম রোদকে। মেঘের চিপায় পড়ে সে বার বার রূপ-বদল করছিল। একবার হচ্ছিলো ধুসর, একবার কমলা আরেকবার আবছা জলপাইরঙা। মেঘের তুমুল মাস্তানির মুখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, নিজেকে মনে হয়েছিল মুখ-বধির বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। দেখছি কিন্ত বলতে পারছি না। শুনছি কিন্ত বলার শক্তি রহিত। বান্দরবনের থানছি যাবার পথে আমি বহুবার থেমেছি। দৃষ্টি আমাকে বলেছে তিষ্ঠক্ষণকাল। অন্ধের মতো চোখ খুলে রেখেছি ভাসমান মেঘগুলোর উপর। কী তীব্র কামনা জাগাতে জাগাতে তারা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে দিগন্তের যৌনরেখা ধরে। কী তার অর্ন্তদাহ। যেন সে ঘরপোড়া গরু। পালাচ্ছে দগ্ধ পোড়া ক্ষেত থেকে। তাকে তাড়া করছে কোন সোমন্ত ডাকাত। বলা আবশ্যক সবই আমি দেখতে পেয়েছি পাহাড়ের সৌজন্যে। পাহাড় আর মেঘ পরস্পর যেন লাইলা ও কৃষ্ণ। পর ধর্মের। কিন্ত চারিত্রিক মাদকতা তাদের একাকার করে দিতে আগ্রহী। তবু আছে দূরত্বের ধাবমান বিভক্তি।
.
মাও সেতুঙ বলেছিলেন এক বোকা বুড়োর গল্প। পাহাড়ের কারণে তার বাড়িতে নিত্য অন্ধকার লেগেই ছিল। সূর্যের আলো পড়ত না বাড়িটাতে। রোদগ্রাসী পাহাড়টাকে সেই বুড়ো অপসারণ করতে লেগে গেল। কোদালে বুড়ো মাটি কাটে। তার ছেলেরা গিয়ে বিস্মিত স্বরে বলল, ‘বাবা এসব কি করছো? এভাবে তুমি পাহাড় কেটে শেষ করতে পারবা?’ বুড়ো উত্তর দিল। ‘তা পারব না। কিন্ত শুরুটা তো করে দিলাম। এরপর তোমরা পাহাড় কাটবে। তোমার সন্তানেরা পাহাড় কাটবে। দেখবে একদিন এই পাহাড়টা থাকবে না। আমাদের বাড়ি রোদে রোদে উজ্জ্বলতর হবে।’ মাও পাহাড় চিত্রকল্পটাকে বদ্ধতার আর পাহাড় কাটাটাকে মনে করেছিলেন লড়াই এর প্রতীক। চীনে পাহাড়ের অভাব নাই। একটা দুইটা কাটা যেতেই পারে। কিন্ত আমাদের কাটার মতো যথেষ্ট পাহাড় নেই। তাই পাহাড় আমাদের কাছে নমস্য। পাহাড় আমাদের কাছে দৃঢ়তা আর স্থিতির প্রতীক। কেউ পাহাড় কাটতে এলে আমরা হয়তো তার মাথা কেটে ফেলব।
.
পাহাড়কে আমি মনে করি আমার চেতনার ঘোড়া। সে ধাবমান নয় বটে। মেঘ সে দায়িত্ব পালন করে। তাই আমি মেঘ আর পাহাড়কে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে পারি না।