দুঃখের কথাগুলি ব্যথার পাহাড় হয়ে আছে

তমাল রায়

Earth and sky, woods and fields, lakes and rivers, the mountain and the sea, are excellent schoolmasters, and teach some of us more than we can ever learn from books.

ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় এই কথাটা প্রায়ই বলতেন আমাদের নরেন স্যার। আর তখন থেকেই ভাল লাগতো সমুদ্র, অরণ্য আর পাহাড়। পাহাড়ের সাথে সাথে সখ্যতা ছিল একটু বেশী। কেন জানি না। আসলে দাদু জীবিত থাকাকালীন প্রায়ই বলতেন – বেঁটেতে ভরে গেলো দেশটা। আর ভালো লাগে না বাঁচতে। এ কথা যে দৈহিক উচ্চতার নয় তা বোঝার বয়স তখন ছিল না তাই বুঝিওনি। পরে একটু বড়ে হয়েই তা বুঝেছিলাম। আর তখন থেকেই উচ্চতর হবার একটা আকাঙ্খাও ভেতরে লালন করতে শুরু করি। আমাদের তো নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার তাই খুব উঁচুতে ওঠার স্বপ্ন দেখা ছিলো বালখিল্যতার সমান। বরং আশপাশে যে সমস্ত ছোট পাহাড় আছে, যারা জাতে কুলীন নয়, যাদের দেখে লোকে নাক সিঁটকোয়, সে গুলোর প্রতিই কেমন জানি প্রেম জেগে উঠেছিলো। যারা আমাদেরই মত কিন্তু একটু উঁচু ,আর এই পাহাড়গুলোতে সময় পেলেই বাবা নিয়ে বেড়িয়ে পড়তো, আর এদের সাথেই জড়িয়ে গেছিল আমার, আমাদের জীবন সে কথা যদি কখনো সুযোগ পাই লিখে ফেলার ইচ্ছে আছে।
লাট্টু পাহাড়

তখন বসন্তকে আলাদা করে চিনতে শিখিনি। তবু সে হয়ত স্পর্শ করেই যেত। সকাল মানেই যে শুধু তা সকাল তা তো কখনো মনে হয়নি আমাদের। অনেক আলো আর অনেকটা বেঁচে থাকা। এমনই যে কোনো সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই দেখতাম প্রিয় কাকু ঘরে এসে বসে আছেন। বাবা কিছুটা বিরক্ত। কাজের সময়। অফিস বেরোবে তার মধ্যে বন্ধুর উদয়। ব্যস্ততা বাড়িয়ে ফেলতো প্রিয় কাকুকে দেখলেই। – ‘আরে তাড়াতাড়ি খাবার দাও। বেরোতে হবে তো’। অন্যদিন কিন্তু এ সময়ে বেরোন না এত সাত তাড়াতাড়ি। মা বুঝতেন। কি আর করবেন। যা হয়েছে তাই দিয়ে দিতেন তাড়ার চোটে। আর তা খেতে গিয়ে জিভ টিভ পুড়িয়ে একাকার। মা হাওয়া করছেন হাত পাখা দিয়ে গরম ভাত আর মাছের ঝোলের ওপর। বাবার মুখ দেখে বোঝাই যায় খুব বিরক্ত। মা কিছু বলছেন না। এতে অবশ্য প্রিয় কাকুর কিছু এসে যায় না। তিনি নির্বিকার মুখে চা খাচ্ছেন আর কাগজ পড়ছেন। আর মাঝে মাঝে বলছেন তার বন্ধুর উদ্দেশ্যে – ‘জানিস আজ জ্যোতি বাবু যা একটা ডোজ দিয়েছে না ইন্দিরাকে’। প্রিয় কাকু কম্যুনিস্ট, আর বাবারা পাঁচপুরুষ ধরে কংগ্রেসী। প্রিয় কাকু কিন্তু সে খবর রাখেন তবু তাকে এসব বলতেই হবে ছুঁড়ে ছুঁড়ে। বাবা বেরিয়ে গেলে প্রিয় কাকু এসে রান্না ঘরের কাছে বসবেন। কি এত গল্প কে জানে করবে। হ্যাঁ মার পান, সুপুরি বা টুকিটাকি যা দরকার তার খবর অবশ্য প্রিয় কাকুই রাখতেন, বাবার অত সময় কই। তো সেবার বসন্তে যাওয়া হল শিমূলতলা। নিম্নবিত্ত পরিবারের কর্পোরেশনের যা মাইনে তাতে আর কোথায়ই বা যাওয়া যায়। আর বাবার আর বন্ধু কই অগত্যা প্রিয় কাকুকেই সঙ্গে নিলেন বাবা। কুলি টুলি ও তো লাগে দিন পনেরো থাকা, মাল পত্র তো কম হয়নি। অগত্যা ধর্মের ষাঁড় প্রিয় কাকু। শিমুলতলা মানেই ভালো জল। পুরনো পরিত্যক্ত বাড়ি, আর লাল মাটির রাস্তা, নির্জন প্রকৃতি। মা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন তার হেম সেলাই এর জিনিসপত্র। বাবা আর প্রিয় কাকু তাস খেলায়। আমি আর টিঙ্কু মানে বোন বেরিয়ে পড়েছিলাম নিজেদের মতই। সে ছিলো বসন্ত সে আমরা বুঝি বা না বুঝি। কোকিল এর ডাক ভেসে আসছে, গাছে গাছে নতুন পাতা, বাতাসে কেমন একটা না জানা কষ্ট, মা সেলাই করছেন বাংলোর হাতায় বসে বাবা আর প্রিয় কাকু তাস খেলছেন, আমরা রাজ কোঠি পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম লাট্টু পাহাড়ে। আহ লাল মাটি দিয়ে তৈরী এমন পাহাড় তো কখনো দেখিনি আগে। মন খুশী খুউউব। এ যেন ঠিক পাহাড় নয় আমাদের মতই কেউ। যেন আমার না হওয়া ভাই। দিদুনের মুখে শুনেছিলাম আমার পর যে জন্মাতে এসেছিলো সে আমার ভাই, কি যেন হয়েছিলো ঠিক তা জানা নেই, কিন্তু সে আসেনি। আলো দেখেনি, জল, বাতাস। দিদুন বলেছিলো সকলে এসে পৌঁছয় না রে বাবু। বুঝিনি বিশ্বাস করেছিলুম। হয়তো তাই। দিদুন নেই। অনেক দিন। মা আছে, বাবা। আমি আর বোন টিঙ্কু। আর সে সবাই মিলেই তো এই শিমুলতলায়। ঝন্টু কাকু ছিলো বাংলোর কেয়ার টেকার। ভাত দেশী মুরগীর মাংস আর বড় বড় আলু ভেজে দিলো আর আমরা তা খেয়ে আবার বেরোলাম লাট্টু পাহাড়ে। বাবার উঠতে কষ্ট হচ্ছিলো। কিছুদিন হল বাবার খুব শ্বাসকষ্ট। সাথে রক্তে চিনি। মা খুব যত্ন করেন, তবু বাবা যেন খুশী নন। বাবাকে সুস্থ করতেই এবার শিমুলতলা। বাবা একটু উঠেই হাঁফিয়ে গেল, আর বসে পড়লো, মা তো বাবাকে ফেলে যাবে না। অতএব প্রিয় কাকুকে নিয়ে আমরাই উঠতে লাগলাম। বেশী উঁচু নয়। ওঠাই যায় আরামসে। আর ওপরে উঠলেই পুরো শিমুলতলা আমাদের নীচেই। উফ। কি আনন্দ। আমি আর টিঙ্কু দৌড়তে লাগলাম। খেয়াল করলাম একটু পরে প্রিয় কাকু চুপ করে বসে - কাকু কি হয়েছে? কাকু বললো না কিছু হয়নি রে বাবু। তোর বাবা এলো না। মা ও আসতে পারলো না। টিঙ্কু হুট করে বলে বসলো – তো কি হয়েছে দাঁড়াও আমি মাকে ডেকে আনছি। প্রিয় কাকু অপ্রস্তুত একেবারে। আরে না না । টিঙ্কু তো তখন এক দৌড়ে নীচে নামছে। আর পড়লো গড়িয়ে। না কিছু হয়নি। একটু সামান্য ছড়ে গেছে। বাবা দেখেছেন। হাঁফাতে হাঁফাতে কাছে এসেছেন। খুব বকছেন ওকে। আর ও বলছে – প্রিয় কাকু বললো – মা তোর বাবার জন্য উঠতে পারলো না ওপরে, তাই মাকে নিতে এলাম। বাবা মার দিকে তাকালো। কেমন একটা মুখ বিকৃত করে বলে উঠলেন – নাও রাধা এবার যাও। তোমার শ্যামের বাঁশি বেজে গেছে। মা সোজা উঠে দাঁড়ালেন। চোখ মুখ থম থম করছে। আর টিঙ্কুকে বেধড়ক মারতে লাগলেন। শেষ মেষ আমি আর প্রিয় কাকু নেমে এসে মার হাত থেকে টিঙ্কুকে বাঁচালাম। মা প্রিয় কাকুর দিকে একবারও তাকালেন না। ততক্ষণে সন্ধ্যে নেমে গেছে। বাংলোয় ফিরলাম। খানিকক্ষণ লুডো খেললাম, আর তারপর খেয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। সকালে উঠে দেখি প্রিয় কাকু নেই। কোথায় গেল কে জানে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম মা কোনো উত্তর করলেন না, বাবাকে কিছু জিজ্ঞেস করবার সাহস হয়নি। একটু পর দেখি টাঙ্গা এলো। আমাদের বাক্স প্যঁটরা সব গোছানো। আমরা ফিরে চলেছি কোলকাতা। আর দেখা হয়নি লাট্টু পাহাড়।

মা হেম সেলাই যেমন করতেন করছেন। সাথে রান্না বান্না আমাদের বড় করা। বাবা অফিস। আমাদের পড়াশুনা, কিন্তু আর কোনোদিন প্রিয় কাকু আমাদের বাড়ি আসেননি।
আর জানো টিঙ্কু কেন জানিনা ওখান থেকে ফিরে এসে প্রিয় কাকুর নাম দিয়েছিলো লাট্টু পাহাড়। যে আমাদেরই মত কোনো এক দিন সুখ জাগিয়ে হঠাৎ হারিয়ে যায়। না এটা আমার কথা নয়। টিঙ্কু লিখেছিলো তোমার দেখা পাহাড় রচনার লাস্ট লাইনে। ও তখন ক্লাস নাইন।

জয়চন্ডী

যাকে তুমি সুন্দর দেখে এগিয়ে গেলে সে হয়তো ততটা সুন্দর নয়। সে হয়তো তোমারই মত অনেক দুঃখ বুকে পাহাড় হয়ে গেছে। আদ্রা চক্রধরপুর ফার্স্ট প্যাসেঞ্জারে আমরা উঠে বসেছিলাম সেই রাত দশটায়। ট্রেন ধিক ধিক করতে করতে চলেছে। লাট্টু পাহাড় আর আমাদের যাওয়া হয়নি কখনো। সেবারে তো বেড়ানোটা ঠিকঠাক হলই না। তাই এবার আরো বছর খানেক পর আমরা পুরুলিয়ার পথে। এবার আর প্রিয় কাকু নেই। আমরাও তো বড় হয়ে গেছি অনেকটা। এই এক বছরে। বড়দের দেখে বড়ই তো হতে হয়। ভোর বেলা ট্রেন থামলো জয়চন্ডি পাহাড় স্টেশনে। বাবার শ্বাসকষ্ট আরো বেড়েছে। মা আরো কম কথা বলেন। হেম সেলাই এর জিনিসপত্র সাথে আনতে কিন্তু ভোলেননি। হয়তো ওই ছুঁচ সূতোই মার হয়ে কথা বলে। পাহাড়টা কি সুন্দর। ক’দিন আগে এখানে শ্যুটিং করে গেছেন সত্যজিত রায়। হীরক রাজার দেশের। ছবিতে সেই পাহাড় দেখেই আমরাই বায়না করেছিলাম বাবার কাছে, বাবা নিয়ে এসেছেন। আমরা যথারীতি ব্যগ ব্যাগেজ রেখে এক ছুট্টে পাহাড়ে। বেশ স্টেপ করা আছে শুরুর দিকটায়। তারপর নিজেকে উঠতে হবে। নিজেকেই তো উঠতে হয়। বাবা একথা প্রায়ই বলেন। কিন্তু বাবা কোথাও উঠেছেন? কে জানে। সময় হলে এ কথাটা বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। মুখ দেখে বুঝি লাট্টু পাহাড়ের পর থেকে বাবার মনের কোণে কি যেন একটা অপরাধ বোধের মেঘ জমেছে। বাবাও খুব একটা বলেন না। মা ও তেমন কিছু নয়। ওই একটু জরুরী কিছু কথা হয় বটে। টিঙ্কুর টিউশন ফিজ টা টেবিলের মাথায় রাখা রইলো। মা বললেন ঠিক আছে। মা বললেন চা দিয়েছি। বাবা উত্তর করলেন না। খেয়ে নিলেন। আজকাল আর বাবা অফিস যাবার আগে মাকে তাড়া দেন না। মা ও হয়তো পারেন না। কেবল আমাকে আর টিঙ্কুকে ডেকে বলেন বড় হতে হবে। অনেক লেখা পড়া শিখতে হবে। নইলে আমার মত জীবন হবে। টিঙ্কু জিজ্ঞেস করেছিলো - কেমন জীবন গো মা। মা উত্তর করেছেন, বড় হও বুঝবে।

মা আর পাহাড়ে ওঠেননি। নীচেই বসে ছিলেন পাহাড়ের। মেঘ দেখছিলেন। মেঘকে কিছু বলার ছিলো হয়তো মার। হয়তো কোনো খবর দেবার। কারোকে। প্রিয় কাকুকে? ইস এসব ভাবতে নেই। আমরা ওপরে এসে বসেছি। পাহাড় থেকে নীচটা ভারী সুন্দর দেখায়। হয়তো নীচ থেকেও ওপরটা একই রকম সুন্দর। কাছেই মা জয়চন্ডীর মন্দির সেখানে মা দুটো পুজো দিয়েছেন। একটা বাবা আমি আর টিঙ্কুর কল্যাণে। গোত্র শুনেই বুঝেছি। আর একটা যে কার জন্য কে জানে। বাবা আমাদের সাথেই ওপরে উঠছেন এবার। বাবাকে বোধ হয় ওপরে উঠতেই হত। অন্ততঃ বাবাকে তো তেমনটাই দেখেছি। কিন্তু ওই যে খুব সাধারণ আমরা। সে আক্ষেপ অবশ্য বাবার মুখ থেকে প্রায়ই শুনতাম। শোনো বাবু, স্কুলের মাঝের বেঞ্চে বসা ছাত্রদের কেউ চেনে না। হয় ফার্স্ট বেঞ্চার হও। অথবা লাস্ট বেঞ্চার। আমার মত হয়ো না।
আমরা কি বুঝতাম জানিনা। তবে এটা বুঝতে পারতাম যে অবস্থায় বাবা বেঁচে আছেন তা তার পছন্দের নয়। এবার বাবাও উঠছেন। হাঁফাচ্ছেন। থামছেন। আবার উঠছেন। কেন যে বাবাকে উঠতে হচ্ছে তা জানি না। টিঙ্কু বাবার পেছন পেছন আসছিলো মার নির্দেশে। বাবা বললেন তুমি যাও ওপরে একাই উঠতে হয়। টিঙ্কু ওপরে চলে এলো। মা নীচে সেলাই করছেন। কি? আমাদের ফুটি ফাটা সংসার? আমার আজকাল এসব মাথায় আসে ভালো। বাংলা স্যার নরেন বাবু সাহিত্যটা ভালো বোঝান আমার তো কবি হবার ইচ্ছে। শুনেছি কবি হলে খুব কষ্ট। যেমন রবি ঠাকুরের। বাবা কে দেখা যাচ্ছে না তো। এক দৌড়ে নীচে নামলাম দেখি বাবা বসে। যাক বাঁচলাম। বাবাও হাসলেন। খুব করুণ হাসি। খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা? জিজ্ঞেস করতে গেলাম। পারলাম না। দূরত্ব আছে তো। যদি রাগ করেন। আবার ওপরে আমরা। আকাশটা কি নীল। ওটা কিরে দাদা? এটা তো ঠিক পাহাড় নয় অনেকটা আমাদের মত। খুব সাধারণ। আর তার মাথায় প্রকৃতির নিজের কি অপরূপ কর্ম। পাহাড় গুলো কেমন ভাবে সেজেছে। যে মনে হচ্ছে...

বলতে যাবার আগেই দেখি একটা প্রবল শব্দ। আর নীচ থেকে মা চেঁচাচ্ছেন প্রাণপনে। নীচে নেমে দৌড়ে এসে দেখি বাবা পড়ে গেছেন পা স্লিপ করে। আমার হাতটা ধরলেন বললেন –‘..মাকে...’ না কথা শেষ হল না। বাবা নেই। আকাশটা নীল নয় যেন কালো হয়ে এলো। মা মুখ ঘুরিয়ে কাঁদছেন। দেখি মার সেলাই কাপড়ে তখন ফুটে উঠেছে-‘যে ভালো বাসে, সে ব্যথা বো...’ঝে টা আর সম্পূর্ণ হল না। যেমন সম্পূর্ণ হল না বাবার কথাও। মাকে কি দেখতে বলতে চেয়েছিলো বাবা? বাবা কি একই ভাবে মাকে ভালোবাসতেন? টিঙ্কু কাঁদছে আমাকে জড়িয়ে। আমি বড় হয়ে উঠছি।

একটু আগে পাহাড়ের নীচেই বাবাকে পোড়ানো হল। আমি পাহাড়টার মাথায় আবার। আমাকে তো ওপরে উঠতে হবে। বাবার অসম্পূর্ণ ইচ্ছে পূর্ণ করতেই হবে। মা আর টিঙ্কু অতিথিশালায়।

পাহাড়ের ওপরে দেখছি পাথর গুলো যেভাবে সাজানো, যা টিঙ্কুকে বোঝানো হল না, কোনো পুরুষ যেন মাথা নীচু করে ক্ষমা চাইছে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে। বাবা কি এখানেই আসতে চেয়েছিলেন। বাবারও কি ক্ষমা চাওয়ার ছিল? জয়চন্ডী পাহাড়। এরও হয়ে ওঠা হল না। অনেকটা বাবার মতই। ফিরে গিয়ে আমাকে লিখতে হবে। আর নরেন স্যারকে দেখাতে হবে। কোনো কোনো পাহাড়ের হয়ে ওঠা হয় না। যেমন জয়চন্ডী যেমন বাবা। আর যা কিছু দূর থেকে সুন্দর তা আসতে সুন্দর নয়। না জয়চন্ডীর নাম টিঙ্কু বাবা পাহাড় দেয়নি। মা কাঁদছিলেন আর বলছিলেন – ‘পাহাড় আর পাহাড়। জীবনটা আমার তছ নছ করে দিলো আমার’। মেঘ ঘনাচ্ছে বাইরে। বৃষ্টি আসছে অসময়ে। কেন কে জানে।
ফুলডুংরি

ব্যথা ভুবনে সব কিছুই কেমন নীল হয়ে থাকে। ব্যথা জমে জমে কখন যে পাহাড় হয়ে ওঠে। আর পাহাড় মানেই তো অনেক অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে প্রবল সমুদ্র মন্থনের মধ্য দিয়ে মাথা উঁচু করা। মাথা উঁচু করা খুব কষ্টের, তেমনটাই তো বলতেন বাবা। আর মাথা ঠায় উঁচু করে থাকা আরো কষ্টের। ওই যে দেখো বিনয় মজুমদার হেঁটে যাচ্ছেন হাতে হারিকেন নিয়ে ঠাকুর নগরের মেঠো পথে, কি প্রবল যন্ত্রণা বিনয়ের। ওই যে কিঙ্কর দা, রাম কিঙ্কর। মাথা উঁচু রাখতে গিয়ে মাথা নিয়েই তো সমস্যা, আর ব্যথাগুলো পাথরের ওপর খোদাই করে দিচ্ছেন, ঋত্বিক? মাথা উঁচু করতে গিয়ে কি করেননি? শেষ মেশ শ্রীনিকেতন রোডে পড়েছিলেন, একাই। বিদ্যাসাগর সেও তো এক পাহাড়ের নাম, সরে গেছিলেন আড়ালে। শুনতাম প্রিয় কাকুর কাছে এ সমস্ত গল্প। প্রিয় কাকু একদিন নিজেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন, বাবাও। মা তো কবেই মূক ও বধির। আমি রয়ে গেলাম। পাহাড় হবার মত ক্ষমতা আমার কখনোই ছিলো না। তবু কি জানি কেন এত ভালবেসে ফেললাম পাহাড়কে। আসলে নিজে না পারলেও মানুষ তো কোথাও গিয়ে উচ্চতার কাছে মাথা নীচু করে।

আমাদের তো কিছুই ছিলো না, না তেমন সকাল না রাত। যা ছিল একান্ত নিজস্ব গোপন অন্ধকার যাকে ছুঁয়ে ছিলো আমাদের ব্যথা ভুবন, আমার ফুলডুংরি। অপুর পথ ধরে কিছু একান্ত পথ হেঁটে তার কাছে পৌঁছতাম। সে ছিলো আমার গোপন প্রেমিকা, অথবা গোপন প্রেমের খেলাঘর। ফুলডুংরির মাথার ওপর আমরা একটা সকাল গড়েছিলাম, একটা নিজস্ব রাত। এক মিনিট স্থির হয়ে বসা, এক ইঞ্চি বুদ্ধ হয়ে ওঠা। বুদ্ধ আমরা হইনি কেউই। তবু স্থির প্রজ্ঞায় বেঁচে থাকা, অন্তত চেষ্টা...

লাট্টু পাহাড় অতীত, প্রিয় কাকুও। জয়চন্ডীতে বাবা এখনও মাথা নীচু করেই। মা বোবা হতে হতে কবেই লীন হয়ে গেলেন। টিঙ্কু পাড়ার এক চুনো মাস্তান কে বিয়ে করে সংসারী কুড়িতেই। পড়ে আছি আমি। গভীর বেদনা বুকে ফুল হয়ে ফোটে কোনো কোনো সন্ধেবেলায়। তেমনই এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় আলাপ হয়েছিলো রাগেশ্রীর সাথে। সে হাসলে শিউলি ঝরতো না, কিন্তু বুক চিরে কেন যে একটা যন্ত্রণা, সে কাঁদলে আমি কাঁদবো কি মাথার ভেতর তখন সব শূন্য, ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা, ইউরি গ্যাগারিন ঘুরে বেড়ায়। আমি জানতাম না অপার রহস্যমালা। সমুদ্রের ওপর উপুর্যুপরি ভেসে আসা সাদা মুকুট গুলো যে আসলে ফসফরাস তা যেমন অনেক পরে জেনেছিলাম তেমনই তো না জানা কত কিছুই ছিলো। কেন পা নিচে, আর মাথা ওপরে সে রহস্যই বা কে বলেছে কবে, কেন এত বড় আকাশটা মাথার ওপর কার কারো ছোট হয়ে আসে? রাগেশ্রী হাত ধরে বলেছিলো তোমায় আমি রহস্য শেখাবো। পায়ের তলায় মাটি নড়ে উঠেছিলো, আকাশ খানিকটা নড়ে চড়ে তারপর স্থির। ফুলডুংরি পাহাড়ের ওপর ও গড়ে দিয়েছিল আমার খেলনা নগর। আমায়। আমি হাতির পা ধরে উল্টে দিতাম, সিংহের পিঠে উঠে বসতাম, প্রবল, উচ্চতর হয়ে এভারেষ্টকেও চ্যালেঞ্জ দিতাম। আসলে এসব কিছুই হত না, এতো খেলনা নগর। অপুর পথ ধরে হেঁটেছিলো আমার হাতে হাত রেখে, আমি তখন লবটুলিয়ার জঙ্গলমহলে হারিয়ে গেছি চোখের সামনে দেখছি বনোয়ারি পাটোয়ারি, গনু মাহাতো, ধাতুরিয়া বালক বাঁশি বাজাচ্ছে, যুবক সত্যচরণ জঙ্গলের বুনো পুটুশের গন্ধে ম ম আশপাশ। বাতাসের মাঝে শরীর দিয়েছি মেলে, আর ওদিকে পা টিপে পা টিপে সত্যচরণের কাছে এসেছে ভানুমতী। রাগেশ্রীর হাত ধরে আমার অরণ্যচারী হওয়া। এই ফুলডুংরির মাথায় শুয়ে মাথার ওপর নীল আকাশ জুড়ে অজস্র নক্ষত্র, আর মুখের ওপর রাগেশ্রীর মুখ এগিয়ে আসছে, কেমন যেন এক গন্ধ আসছে, পাহাড় আর জঙ্গল মিলে মিশে কেমন মাদকতা মহুয়ার গন্ধ আসছে, আমি কি তবে সত্যিই পাহাড় হয়ে উঠলাম? অরণ্য কি বুকে নেশা ধরাল আর রাগেশ্রী? আহ এত সুখ বেঁচে থাকায়, পাগল লাগছে শরীর টলছে, বেঁচে থাকা সত্যি এক উৎসব, বাবা দেখে যাও তোমার বাবু...হয়ে উঠছে, মা তুমি কোথায়???

দেখে যাও তোমার বাবু ভাল আছে।

ভাল আর মন্দ এর মধ্যে এক সুদূর বিভাজন রেখা আছে। ভালগুলো আসে অনেক সময় পর পর। আর মন্দদের মধ্যে বোধহয় ভাবসাব বেশী নইলে তারা এভাবে আসে কেন দল বেঁধে। রাগেশ্রীকে ডাকতাম মন বলে। ও ছিলো তাই জীবনটা অনেকটা জীবন হয়ে উঠেছিলো, কোথা থেকে কি যে হল ঈষাণ কোণে কি যেন একটা ঝড় উঠলো, আর ও কোথায় যেন, কোথায় হারিয়ে গেল, কোন নিরুদ্দেশে?

চোখ থাকলে তবে তো অন্ধ বলবে লোক। অতএব আমি অন্ধও নই, কান থাকলে তবে তো লোক বলবে বধির। আমি বধিরও নই। জিভ থাকলে বলতো মূক, আমার তো জিভও নেই, বর্ণ হীন, গন্ধহী্ন, স্বাদহীন... বিষাদ ঢুকে পড়েছিল মাথার ভেতর, কি জানি কি করে, কেবল পাগলা ঘন্টির মত রাগেশ্রী, আমার মন ডাকলে তাকে আমি অগ্রাহ্য করতে পারতাম না,আর এবার ফুলডুংরি আসা ওর ডাকেই, কিন্তু ওকি সত্যি ডেকেছিলো? আর আমি দৌড়তে দৌড়তে অপুর পথ বেয়ে ফুলডুংরির পথে নিশি পাওয়া মানুষের মত...

আসার আগে আমি রাকা মাইন স্টেশনে লাইনে কান পেতে ছিলাম না মরতে নয়, লাইনে ট্রেন আসলে তো বোঝা যায়, যদি মন আসে। প্রায় ১৩কিমি হবে ওখান থেকে গালুডি হেঁটে এসেছি। সেখান থেকে কোনো ভাবে জল্পেশের মন্দির, আর তার পাশে অপুর পথ বেয়ে সোজা ফুলডুংরি। এ দীর্ঘ যাত্রা পথে আমার কোনো মাথা ছিলো না, কিন্তু প্রতীক্ষা ছিল, কোনো অনুভূতি ছিল না ছিলো অনুসরণ ছিলো যেভাবে দীর্ঘ ছ বছর...রাগেশ্রী ওরফে মন তানপুরা নিয়েই বসতো গানে, আমার হাতও কেন জানি না অজান্তেই তানপুরার মুদ্রায় অনবরত। একে ভালোবাসা বলে না উন্মত্ততা আমি জানি না...ঘোরানো পথ বেয়ে ওপরে উঠে এসেছি, এখন এ পাহাড়ের ওপর আমি একা, একে পাহাড় হয়তো বলবে না কেউই, তবু উঠতে হয়, আর যে কোনো উঠে আসাই তো পাহাড় চড়া। আলো নিভে গেছে মাথার ওপর মশারা গোল হয়ে হুউউউউম করছে, গা মাথা ছেঁকে ধরেছে মশার দল, আমার এ রক্তের আর কি মূল্য, শুষছে শুষে নিক, মন এখনও এলো না, মাথার ওপর একটা ক্ষয়াটে চাঁদ, তারা উঠছে একে একে অনেক। ওরা কেউ আমাকে দেখে হাসছে না। সব কেমন গম্ভীর, কি জানি কেন খুলে ফেলতে লাগলাম জামা, প্যান্ট, অন্তর্বাস, এখন এ পাহাড় যে আমার প্রেম তার মাথায় আমি একা আদুল, প্রাকৃতিক, কেউ আসছে না, কোথায় মন? মন তুমি কোথায়???? দূরে নীচের গ্রাম শহরটার বাড়ি গুলোতে আলো জ্বলে উঠছে। আমি হাঁ করে দেখছি, কত আলো কিন্তু বিন্দুবৎ। নিজের শরীরে হাত বোলালাম, প্রিয় তো, তাকে ছুঁয়ে দেখলে ক্ষতি কি। মন আসছে না, এখনো। বাবা পারেন নি, প্রিয় কাকা পারেনি, মা পারা আর না পারার মাঝখানে দঁড়িয়ে হঠাৎ একদিন ‘না’ হয়ে গেলেন। আমি? পারবো না? নীচে কিসের যেন শব্দ হল, তাহলে আসছে, আমার কান খাড়া, আবার শব্দ, না ও আসছে, কোথা থেকে যেন ওর গলার শব্দ ভেসে এলো, কি গো রাজকুমার কোথায়? মন আমাকে ‘রাজকুমার’ বলে ডাকতো। আমি সাড়া দিতে গেলাম কিন্তু কথা বলতে তো আমি ভুলে গেছি কেমন জানি একটা গোঁ গোঁ শব্দ হল। উঠে দাঁড়ালাম, কোথা থেকে যেন মন বলে উঠলো- তোমার শরীর জোড়া এতটা পুরষ, কি করে হয় গো, তুমি তো আমার পাহাড়। আর আমি সোজা মাথা উর্দ্ধ পানে, দু বাহু প্রসারিত, কানের পাশ দিয়ে পাহাড়ি বাতাস বয়ে যাচ্ছে, কোথা থেকে একটা বেড়াল ডেকে উঠলো তবে কি মন বেড়ালের ছদ্মবেশে, মন মন মন? কোথায় গেল বেড়ালটা? ঝাঁপ দিলাম একটা দুলতে থাকা ছায়া কে লক্ষ করে...

আমার কোনো সন্তানাদি ছিলো না কখনো, অথবা ছিলো। পাহাড় কে ভালোবেসেছিলাম, পাহাড় হতে চেয়েছিলাম, আর সেই পাহাড়গুলোর প্রতি ছিলো আমার প্রেম যারা আমার মত, বাবার মত, প্রিয় কাকুর মত। যাদের কখনোই ঠিক হয়ে ওঠা হয়ে উঠলো না। আসলে আমি এক খেলনা নগরের কেয়ার টেকার ছিলাম হয়ত বা।



অনেক পর, যদি কোনো পাহাড়প্রেমী আসে ফুলডুংরির পথে সে হয়ত খুঁজে পাবে আমার হাড় গোড়, ছেঁড়া খোড়া জামা, আর নেড়ে চেড়ে দেখলে বুঝবে তাতে আছে গুঁড়ো গুঁড়ো প্রস্তরখণ্ড। ভেতরে উচ্চতর হবার আকাঙ্খা না থাকলে কে আর কবে পাহাড় হতে পেরেছে। মা ডাকছেন। মনও ডাকছে, কে জানে কেউ বুঝবে কিনা এই পাহাড়িয়া মানুষগুলো আসলে প্রেমিক, তাদেরই দুঃখগুলো ব্যথা হয়ে পাহাড় হয়েছে।

পাহাড় হওয়া হয়তো হয়ে উঠলো না, কিন্তু ওই যে হিলারি সাহেব বলতেন – ‘It is not the mountain we conquer but ourselves.’। সে চেষ্টাটাই জীবন। অন্তত আমরা যারা নিতান্তই সাধারণ, অর্বাচীন, তাদের কাছে এর থেকে বড় সত্য আর কি আছে। এই যে এখন ঘুম আসছে দু চোখ বেয়ে, এবার এবার অন্তত পাহাড়, অন্তত এই সব ছোট পাহাড় হয়েই যাবো। যাদের কৌলীন্য নেই, আভিজাত্য নেই তবু তাদের সাধারণে পাহাড় বলেই ডাকে আদর করে।