ঈশ্বরের বাঁশি

মিতুল দত্ত



আমি আর পাহাড়ে যাব না
সাঁওতাল মেয়ের ছদ্মবেশে
আমি আর বাজাব না মল
পুরুষ, তোমার জন্মজল
তৃষ্ণায় চাইব না আমি আর
ও জলের নিহিত প্রপাত
আমাকে নিভিয়ে দিচ্ছে রোজ
জ্যোৎস্নালোক, ফিরেও দেখব না
হাতে ধরা ওই হাত কার
যদিও নির্ভুল সেই নাচ
ক্রমশ পাথরে তুলবে ঝড়
দুলে উঠবে দূর বনস্থলী
ক্ষরণের অন্ধ, বোবা গলি
আমি আর জন্মে মাড়াব না
আমি আর পাহাড়ে যাব না

সে এক পাহাড়ে পাওয়া কারিগর, তার যাবতীয় স্বপ্ন আর লিবিডো দিয়ে বানিয়েছিল মা দুগ্গার বুক। সেই বুকের দিকে পাঁচদিন ধরে চেয়ে থাকতে থাকতে, আমাদের হেমন্তের ছেলেদের ঘুমের মধ্যে আছড়ে পড়ল ভাদ্রমাসের আলুথালু গঙ্গা। শিবঠাকুরের জটা থেকে সটান। ভিজে, বিব্রত বিছনা থেকে নামতে নামতে নামতে, তারা সবাই একবাক্যে বললে, দূর শালা! তখন সেই নদী-নালা উপচোনো বুক নিয়ে মা দুগ্গা আর কী করে, পৃথিবীর গায়ে চাপিয়ে দিয়ে সেই লিবিডোপ্রবণ কারিগরের মুন্ডুপাত করতে করতে চলে গেল কৈলাসে। সেই থেকে পৃথিবীর বুককে আমরা পাহাড় বলে ডাকি।

কিন্তু, এ পাহাড় সে পাহাড় নয়। এ তো সদ্য গজানো, বারো-তেরোবেলার কিশোরী-বুকের মতো। তাও যে কত আবিষ্কার সে রেখে দিয়েছে ওইটুকুর মধ্যে! আমরা ষোলোটা লোক, ষোলোটা চৌকি থেকে নেমে তাকে খুঁজতে বেরিয়েছি। ষোলোকলা পূর্ণ করব বলে। বিকেল তখন শেষ। আমাদের পা, মহুয়ায় টলছে। আনন্দ না নাচ, কী একটা পাচ্ছে যেন। চাঁদের আলোয় গান পাচ্ছে খুব। গেয়ে উঠতে উঠতে, গেয়ে উঠতে উঠতে, আমরা শুনতে পেয়ে যাই। বাঁশি। আমরা হাঁটতে শুরু করি। যেদিকে বাঁশি বাজছে। যেদিকে জন্ম হচ্ছে, সুরের।

তাও তো এখনও আমি তোমার কথা বলিনি। তোমার সামনে দাঁড়ালে মনে হত, যেন পাহাড়ের কাছে এসেছি। তোমার গায়ে কত হাজার বছরের বনজঙ্গল, নদী, হাওয়া আর জ্যোৎস্নার গন্ধ পেতাম যে। কত পাথর কেটে কেটে, পাথর কেটে কেটে, আমি পৌঁছোতে চেয়েছি তোমার কাছে। বলতে চেয়েছি, এবার একটু চুপ করো বাপু। পাহাড়ের কি এত কথা বলা সাজে? তুমিই না বলেছিলে, চুপ করে থাকতে জানলে ঈশ্বরের বাঁশি শোনা যায়!

বাঁশির উৎসের দিকে চলে যাচ্ছি আমরা। দোলপূর্ণিমার দুধ-ঢালা আলোয়, পৃথিবীর কিশোরীবেলার দুধ না-আসা বুকের ঢাল বেয়ে গড়াতে গড়াতে। আমাদের পার্থিব, আঁশটে, ছাদের তারে শুকোতে দেওয়া, ঘেমো আন্ডারওয়্যারের মতো মানবজনম, চলে যাচ্ছে অপার্থিবের দিকে। বাঁশির সুর স্পষ্ট হয়ে আসছে। মাদলের বোল। সাঁওতাল মেয়েদের হাতে হাত জড়িয়ে নেচে উঠছি আমরা। নেচে উঠছে, ডুরে শাড়ি পরা, বিনুনি-দোলানো পাহাড়, বনস্থলী।

এই চাঁদের আলোর মধ্যে একদিন মিশে যাবে আমাদের নশ্বরতা। সেদিনও কি বাঁশি বাজবে কোথাও? যে বাঁশি, সারাজীবনে হয়তো একবারই বেজে ওঠে। তা যদি ঈশ্বরের নাও হয়, তবু?