এক

নীলাদ্রি বাগচী



সীমান্তে তো কাঁটাতারও বোনা হচ্ছে। পাশের বাসায় উলের সোয়টারও। উষ্ণতা ভাগ হচ্ছে, জুড়ে যাছে। তাতে এই তিরতিরে সন্ধ্যার কি যায় আসে? একা একা চা দোকানে এইভাবে বসে থাকলে লোকে কি ভাবে? যা ভাবে ভাবুক। পেয়ালার পর পেয়ালা চা তো আসলে অপেক্ষা। মফস্বল অপেক্ষায় আছে। একদিন হবে। শহর ভরে যাবে ভিন শহরের মানুষে। দোকানে দোকানে পশরা রেখে আর কুল পাবে না দোকানদার। মহল্লার নিচু নিচু টিনের চালের বাড়িগুলো সব মাথায় পাকা ছাদ নিয়ে দোতালা তিনতালা পাঁচতালা হবে। এই যে নর্দমার ওপর আড়ে চৌকি পেতে কোনমতে দাঁড়িয়ে থাকা চা দোকান, এটা টি স্টল হয়ে যাবে। মেশিন থেকে চা বের করে মোটা কাগজের কাপে হাতে তুলে দেবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কেউ। এই আধাবুড়ো চা দোকানি আর বিচ্ছিরি বাংলা মদের গন্ধ- এ সব থাকবে না। ওই যে ছেলেটা সারাদিন হ্যান্ডবিল বিলি করার ফাঁকে একবার মাঠে গিয়ে প্র্যাকটিস করে নিয়েছে ফাস্ট বোলিং, ওর ট্র্যাক সুটে লেগে থাকা রোদ্দুর আর মাঠের গন্ধ এইভাবে বোঝা যাবে না। তখন ক্লাব স্পন্সর পেয়ে যাবে। লোগোর ঝলমল আসবে ওর শরীর থেকে। ভাঙ্গা সাইকেল নিদেনপক্ষে দেড়শ সিসি পালসার হয়ে যাবে। পায়ে থাকবে ব্র্যান্ডেড ফ্লিপফ্লপ, এই হাওয়াই নয়।

হেসে ফেললে? আমি কেন, এই শহরের গলি, চোরাগলি, ছাতিম গাছ, সেট্রেনিলার ঝোপ, কুয়োতলা, বাঁধানো পুকুর পাড় সবাই অপেক্ষা করছে। আমরা অপেক্ষা করছি একের। যে এক আমাদের হতাশ জীবনের ব্রেক ইভেন পয়েন্ট বুঝে সেটাকে ঝালাই করে আরও একটু লম্বা করে দেবে। তার বহর এত চওড়া হবে যে উন্নয়ন তক্তায় গোটা শহর পাবে স্বস্তির শান্তি। আটটা বাজতে না বাজতে ঝাঁপ ফেলা দোকানগুলো দের রাত অবধি ব্যবসার আনন্দ পাবে। শহরের, আমাদের, যেখানে যার যতটুকু আই সি সমস্যা আছে সেগুলো কে সে বদল করে, সারিয়ে ঝকঝকে করে ফেলবে। শহরের পুরনো সার্কিট ফেলে দিয়ে সে হবে নতুন সার্কিট। লাগাতার চলবে শহর। আমরাও চলবো। চা খুপরিতে বসে বাতিলের দলে নাম লেখানো লোকজন এত ব্যাস্ত হয়ে উঠবে যে হাঁফ নেবার ফুরসত পাবে না। মন্দিরের ঘণ্টা তো শুনতে পাচ্ছ না, পেলে বুঝতে, একের প্রার্থনায় সমবেত মানুষের আর্তি। আরতির শিখা যদি দেখতে পেতে বুঝতে পারতে এক কতটা শক্তি রাখে, কিভাবে সে জ্বলে ওঠে আলো আর ইচ্ছের স্বরূপে।

আমি কিন্তু ততটুকু যতটুকু তুমি আমাকে পড়তে পাচ্ছ। আমি ততটুকু যতটুকু তুমি আমাকে মধ্যেমধ্যে শুনতে চাও। ক্যারিব্যাগের খড়মড় আর অধৈর্য ইলেক্ট্রনিক হর্ন ছাড়া যেরকম তোমাকে আমি কিছু ভাবি না। ভেবেই পাইনা। তোমার গন্ধ বুঝি না, স্পর্শ তো নয়ই। কেবল অক্ষর আর আচমকা শব্দ। এক কিন্তু সেরকম নয়। এক একটা বিষয়, জ্যান্ত, খুব গম্ভীর আর লাজুক বিষয়। আমরা, যারা এই মফস্বলে থাকি তারা কিন্তু কখনো প্রকাশ্যে চিৎকার করে এক নিয়ে কথা বলি না। ওই যে খানিক দূরে ছেঁড়া টায়ার আর বাতিল প্লাস্টিকে আগুন লাগিয়ে বসে আছে কিছু লোক, ওরা এক নিয়ে আলোচনা করছে। কারন ওদের ওই উবুড় হয়ে বসা, এ ওর দিকে না তাকিয়ে গলা না তুলে আলোচনা- ষড়যন্ত্র যেন, এই হল এক নিয়ে কথা বলার সবচে ভালো পদ্ধতি। আমি আজই দু জায়গায় এইভাবে এক নিয়ে আলোচনা করেছি। আগুন ছিল না, কিন্তু এরকম এ ওর ছায়ায় হুমড়ি খেয়ে বসাটা ছিল। দু তিনটে নতুন কথাও শুনলাম আজ। কাউকে বল না কিন্তু এক মনে হয় রওনা দিয়েছে আমাদের দিকে। কাল ভোরে নাকি মেসেজ ঢুকেছে নগর পিতার ইন বক্সে। তিনি যাদের বলেছেন তাদের কাছ থেকে শুনেছে এমন লোক যাকে বলেছিল সে নাকি নিজে এই কথা বুড়োকে বলেছে। বুড়োর সাথে আমার দেখা হয় নি। সে তার শাকের দোকান গুটিয়ে তখন চলে গিয়েছিল। যারা শুনেছিল তারাই বলল আমাকে।

অনেক কিছু বলে ফেললাম। আমরা বলি না। ভালো ঘটার আগে বলতে নেই ভালো হবে। মন্দ হয়ে যায় যে। কিন্তু তুমি তো আমার আর একটা ভালো তাই তোমাকে বলে ফেললাম। একটু খুঁতখুঁত করছে যদিও। তুমি কিছু মনে কর না কিন্তু। তুমি তো ভালোই চাও, তাই না? এই শহরের ভালো, আমার ভালো, আমাদের ভালো। খানিক আগেই আঁজলা ভরে জল দিয়েছি রাস্তায়। এখনও ভিজে ভিজে। ওইখানে আমি কিন্তু একটু আছি, যেরকম তোমার চোখে আর কানে। ওই একটু থাকাই অনেক থাকা হয়ে উঠবে আর ক দিনে। এক রওনা দিয়েছে। চা দোকানে বসে আর সন্ধে আমাদের কাটাতে হবে না। এত ব্যাস্ত হয়ে উঠবো চা খাওয়ার সময়ই পাব না। রাস্তায় পা পড়বে না। উড়ে উড়ে কাজ করবো সারাদিন। বাইকটা সারারাত বারান্দায় হাঁপাবে। এত খাটাবো যে ওকে। এক এলে তো আমার কিছু করার থাকবে না কাজ ছাড়া।

ওই ওরা ডাকছে আমাকে। আগুনের ওখানে। যেতে হবে। ঠাণ্ডা লাগিও না। আসছি।