সেটেলার

ফজলুল কবিরী



জিনিসটা খাড়া হয়ে আছে। তার দিকেই তাক করা। ভয় পায় সে। এই বুঝি দিল হান্দাইয়া। কোন বিপদ এসে পড়লো বুঝতে পারে না। লোকজনের ছুটোছুটি এখনো কমেনি। এদিক-ওদিক দৌড়ানোর চেষ্টা থামেনি। দোকানের ঝাঁপি বন্ধ করার হুড়োহুড়ি এখনো চোখে পড়ে। বাদাম-বিক্রেতা তড়িঘড়ি করে নিরাপদ কোনো স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। বাতাসে বারুদের গন্ধ। নাকে লাগে। পাহাড়ের অশান্ত বাতাস গায়ে ঝাপটা মারে। পুলিশ, বিজিবি আর সেনাবাহিনীর টহল শুরু হয়েছে আরো আগে। গোলমাল থামতে শুরু করবে এরপর। কিন্তু মং উচিং মারমা দাঁড়িয়ে আছে বন্দুকের নলের সামনে।

দাঙ্গা। পাহাড়ি-বাঙালি। ছাড় দেওয়া না দেওয়ার পুরনো লড়াই। বাঙালি অধিবাসীদের মনে মনে একটা গালি দেয়, শালা সেটেলার! বাপ-দাদার পাহাড়ি জনপদের শান্তি তারাই নষ্ট করেছে। একসাথে পড়ে। পাহাড়ের উৎসবের রঙিন দিনগুলোতে রং মারামারি করে। কিন্তু মাঝেমধ্যে শত্রু হয়ে ওঠে একে অপরের। বাঙালদের সাথে বন্ধুত্ব হয় না। তার সহপাঠী বরকতের বড় ভাইকে দেখেছে সংঘর্ষে সবার আগে থাকতে। কী হিংস্র মূর্তি নিয়ে এলোপাথাড়ি কুপিয়েছে। আগুন দিয়েছে অনেকগুলো দোকানে। দোকানের ভেতরেই ছিল সে। বাপের সাথে। তাদের অনেক পুরনো পাইকারি দোকান। পুরনো ব্যবসা। সবাই এক নামে বাবাকে চেনে। তার বাবাকেও অপদস্ত করেছে বাঙালিরা। ফাঁকতালে আটকা পড়েছিল সবাই। দোকানের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝাঁপি টেনে দেওয়ায় রক্ষা পেয়েছে। কী মনে করে আগুন দেয়নি। তাতেই রক্ষা। এভাবে কতদিন ঠেকানো যাবে জানে না। কারফিউ দিয়েছে প্রশাসন। সান্ধ্য আইন জারি হতে দেরী নেই। বালাঘাটা এলাকা থমথম করছে। মানুষ কমে আসছে ধীরে ধীরে। বাবার দিকে চোখ সরিয়ে নেয়।

নারায়ন মারমা নলটার দিকেই তাকিয়ে ছিল। শান্ত ও স্থির দৃষ্টিতে। সেনা সদস্যদের একজন তার দিকেই হয়তো নজর রাখছিল। বিষয়টা খেয়াল করেছে কি না বুঝা যায় না। আগ্নেয়াস্ত্রটা সরানোর কোনো লক্ষণ তার মধ্যে দেখা যায় না। মং উচিং মারমার বুকের ধড়ফড়ানি কমে না। বাবার সাথে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলছে একজন সেনা অফিসার। সন্তু লারমার গাড়ি বহরে হামলা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির লোকজনের সাথে বাঙালিদের সংঘর্ষ গোটা জায়গাটাকে রণক্ষেত্র বানিয়ে ফেলেছিল। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সম্মেলনে যোগ দিতে বান্দরবানে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা এসেছেন। বাঙালিরা গাড়ি বহরে হামলা করেছে। কোন্দল অনেকদিন ধরে চলছে। মাঝেমধ্যেই কেউ কেউ উসকানি দেয়। লাশ পড়ে। বাড়িতে আগুন লাগায়। তারপর একসময় থামে। কিছুদিন শান্ত থাকে। বোট চালায়। মাছ ধরে। জুমের ধান ঘরে তোলে। তারপর আবার রক্তপাত। আগুন। বাঙালিরা ভাবে সবাইকে ব্রাশ ফায়ারে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আদিবাসী বলে কেউ নেই।

সেনা-পুলিশের মুখোমুখি হওয়া নারায়ন মারমার জন্য নতুন কিছু নয়। এখন আর টানে না। বুক কাঁপে। সেই মনোবল আর নাই। নারায়ন মারমা যতদূর সম্ভব বিনয়ের সাথে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। তার দৃষ্টি শান্ত। টহলরত বাহিনী প্রত্যেকটা দোকানের সামনে গিয়ে অভয় দেয়। শান্ত থাকতে বলে। এমনটা তারা সবসময় করে না। সবার মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। সপ্তাহ খানেক আগে ব্রাশ ফায়ারে দুই জনকে হত্যা করার পর থেকেই উত্তেজনা। এর দিন দুয়েক পর আরও একটা লাশ পড়েছে। অনেকগুলো লাশ পড়েছে এই ক’দিনে। খাগড়াছড়িতে পড়েছে। রাঙামাটিতে পড়েছে। বান্দরবানে পড়েছে। পানছড়িতে ইউপিডিএফ-এর একজন খুন হলো। জনসংহতি সমিতির একটা লাশ পড়েছে। এমএন লারমা গ্রুপের। গেল পরশু রাতে বান্দরবানেই একটা খুনের ঘটনা ঘটলো। সন্ধ্যায় ইটভাটালাগোয়া চায়ের দোকানে চার-পাঁচ জন মুখোশধারী এসে বুকে গুলি চালিয়ে গেল। মড়া বাড়ছে। থামছে না। বিক্ষোভ হচ্ছে। বাতাস ভারী হচ্ছে বিক্ষোভের আগুনে। যুব ফোরাম মিছিল করে। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ মিছিল করে। হিল উইমেন্স ফেডারেশন মিছিল করে। প্রতিবাদ করে। বাঙালিদের সংগঠন সমঅধিকার আন্দোলনের নেতাকর্মীরাও মিছিল করে। পরস্পরকে দায়ী করে। অনেকদিন ধরে এই রক্তপাতের সাক্ষী প্রবীণ নারায়ন মারমা। পাহাড়ি জনপদ উত্তাল হতে দেখেছে সেই বৃটিশ আমল থেকেই।

তার বাবাও একসময় বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিল। সাতচল্লিশে যখন ভারত স্বাধীনতা পেল তখনো পার্বত্য এলাকা নিয়ে কোনো সুরাহা হয়নি। পাহাড়িদের মধ্যে খানিকটা অস্বস্তি তৈরি হয়। তারা সংশয়ে পড়ে। কেউ কেউ ধারণা করেছিল ভারতের সাথে সংযুক্ত হবে পাহাড়ি জনপদ। কেউ ভেবেছিল বার্মার সাথে যুক্ত হবে। প্রায় পঁচানব্বই ভাগ মুসলমান অধ্যুষিত পাকিস্তানের সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তাদের মাথায় ছিল না। সাতচল্লিশের পনেরোই আগস্ট রাঙামাটি জেলা প্রশাসনে ভারতের পতাকা উত্তোলিত হয়। বান্দরবানে উত্তোলিত হয় বার্মার পাতাকা। বোমাং সার্কেলের অধিকাংশ আদিবাসী ছিল মারমা। কিন্তু পরে তারা জানতে পারে পাকিস্তানই তাদের দেশ। ভারত ও বার্মার পতাকা উত্তোলন পাকিস্তান সরকার ভালোভাবে নিতে পারেনি। অবিশ্বাস ও ষড়যন্ত্রের অধ্যায়ের সূচনা তখন থেকেই। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে পাকিস্তান বিরোধী বলে প্রচার চালানো শুরু হয়। পুনর্বাসনের নামে শুরু হয় বাঙালিদের অনুপ্রবেশ।

ষাটের দশকে পার্বত্য অঞ্চলের মাটি সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খায়। পাকিস্তান সরকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হাজার হাজার পাহাড়ি জমি তলিয়ে দেয়। বাস্তুহারা হয়েছে অনেক স্বজন। কেউ তার হিসাব রাখেনি। ক্ষতিপূরণের অনেক গল্প তারা শুনত। কেউ তা হাতে পেয়েছে বলে শুনেনি। সরকারি লুটপাটের কথা তাদের কানে দুর্গম পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে মাঝেমধ্যে পৌঁছাতো। বাস্তুহারা মানুষের আর্তনাদের কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। অনেক পাহাড়ি পরিবারকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় পুনর্বাসনের নামে। যে বিদ্যুতের জন্য তাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, সেই বিদ্যুৎ তাদের চোখে আলো দেয়নি কোনোদিন। একাত্তরের যুদ্ধের সময় কেউ কেউ সুদিনের আশা করেছিল। কেউ কেউ বিপক্ষে গেলেন। চাকমা রাজা পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন। এখনো অনেক পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের ক্ষোভ চাপা রাখে না। সেই যে গেলেন রাজা, আর ফিরলেন না।

কেউ কেউ অবস্থা আরো খারাপ হওয়ার কথা মনে মনে ভাবতে শুরু করেছিল। ঘরপোড়া গরুর মতো ছিল তাদের দশা। অনেকে পরাধীনতার মুক্তি ঘটতে পারে ভেবে বাঙালির সশস্ত্র সংগ্রামে শরিক হয়েছিল। অনেক পাহাড়ি নারী ধর্ষিতা হয়েছিল। কেউ তার হিসেব রাখেনি। পুরুষরা সেসব নারীদের ঘরে জায়গা দেয়নি। স্বাধীনতার পর কোনো প্রত্যাশাই আর পূরণ হয়নি। সাংবিধানিক স্বীকৃতি তাদের নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি স্বাধীনতার পরপরই প্রতিষ্ঠা পায়। তাদের সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে শান্তিবাহিনী প্রতিষ্ঠা পায় তারও কিছুদিন পর। অধিকার আদায়ের কথা ভাবতে শুরু করে সবাই। ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকে পাহাড়ি জনপদ। জনপদের মানুষ। পঁচাত্তর সালের পর এই জনপদ আরো বেশি অশান্ত হতে শুরু করে। শান্তি বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেঁচে নেওয়াকেই যথার্থ মনে করে। সাতাত্তর সালে তারা মিলিটারি কনভয়ে হামলা করে। এরপর নিপীড়নের আরো নানা রকম কায়দা সেনাবাহিনীর হাত ধরে পাহাড়ে প্রবেশ করে।

নারায়ন মারমাকে সেনা সদস্যরা নানা রকম প্রশ্ন করে। তাদের মনে কী আছে তিনি বুঝতে পারেন না। কেউ কিছু বললো কি না বুঝতে পারছেন না। উসকানি দেওয়ার লোকের অভাব নেই। তিনি শান্ত ও স্থির থাকার চেষ্টা করেন। বাঙালিদের অনেকেই তাকে সুনজরে দেখেন না। ইটভাটার দিকে সেদিন মং উচিং যেতে চেয়েছিল। লাশটা শেষবার দেখতে যেতে চেয়েছিল। ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিল ছেলেকে। দুনিয়ার মানুষ এমনিতে তার পেছনে লাগছে। এখন আবার তার ছেলে যাবে মড়া দেখতে। সশস্ত্র সংগ্রামে তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে বাঙালিদের কেউ ভালোভাবে নেয় না। নেওয়ার কথাও না। এতদিন পরও কেউ বিষয়টাকে ভুলতে দেয় না। খোঁচায়। রক্ত ঝরায়। নানা রকমের কূটতর্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকা ছাড়া এখানকার বাঙালিদের পেটের ভাত হজম হয় না। আন্দোলনের সময় পার হয়েছে কত আগে। অস্ত্র জমা দেওয়ার সময় থেকে এসব অপবাদ মাথায় নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। সাতাত্তর সালে সেনাবাহিনীর সাথে একপ্রকার অঘোষিত যুদ্ধই শুরু হয়। শত শত পাহাড়ি যুবক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে থাকে। গুম হয় শত শত তরুণ। ক্ষোভ ও বিক্ষোভের আগুনে তারাও পুড়াতে থাকে অনেক বাঙালির শরীর। প্রতিশোধের বিকল্প আর কিছু ছিল না। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে অনেকগুলো গুচ্ছগ্রাম তৈরি হতে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে বাঙালি ছিন্নমূলদের এনে বসিয়ে দেওয়া হয় সেইসব আস্তানায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ পাহাড়িদের একদিন এসব মানুষ তাদের ভুমিতে সংখ্যালঘু করে দেবে এতটা তারা তখনো ভাবতে পারেনি। এটা ছিল সরকারের পলিসি। পাহাড়িদের সংখ্যালঘু বানিয়ে তাদের বিক্ষোভ ও সংগ্রামকে দমিয়ে রাখার কূটকৌশল। তারা সফল হয়েছে। তা-ই হলো শেষমেষ। এই কষ্টের ভাগ এখন আর কাউকে দেওয়া যায় না। উল্টা অনেকগুলো বাড়তি ঝামেলা প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হয়।

ইটভাটার লাশ নিয়ে সেনারা কথা বলবে তিনি ভাবতে পারেননি। তার আপন ভাইয়ের ছেলে। তার ভাইয়েরও মৃত্যু হয়েছিল অপঘাতে। সেনাবাহিনীর হাতে। দুই পরিবারে সম্পর্ক খুব উষ্ণ তা কেউ বলবে না। বাইরে থেকে দেখে কেউ এই কথা বলে না। তার ভাইয়ের ছেলেকে ফেরানো যায়নি। শান্তি চুক্তি অনেকের মতো সেও মানেনি। গোপনে ও প্রকাশ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ থেকে অনেকেই সরে আসেনি। ফল যা হওয়ার তাই হয়। মাঝেমধ্যে লাশ হয়ে ফেরে কেউ কেউ। গুম হয়ে যায়। মরার পরেও শান্তি দেয় না।

কথাটা কেউ জানিয়ে দিয়েছে। বুক ধক করে ওঠে। সেনারা নানা কথা জানতে চায়। কখনো প্রশ্ন করে। কখনো তথ্যের সম্ভাব্য সূত্রগুলো মেলানোর চেষ্টা করে। এই ভাবভঙ্গি খুব বেশিক্ষণ থাকবে তিনি আশা করতে পারেন না। তার নিরাসক্ত উত্তর তাদের সন্তুষ্ট করতে পারে কিনা বোঝা যায় না। পুলিশের হাতে আরও কিছুদিন উলটপালট খেতে হবে। মামলা হয়েছে। থানায় ছুটোছুটি হবে। ভাইয়ের ছেলে। অথচ নিজে একবার চোখের দেখা দেখতে যায়নি। নিজের ছেলেটাকেও যেতে দেয়নি। এই খুনের কালিমা কার গায়ে দাগ ফেলবে তিনি বুঝতে পারেন না। একটা শঙ্কা ভর করে মনে।

তাদের পৈত্রিক অনেক সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে বহু বছর আগে। দখল হয় চোখের পলকে। উদ্ধার প্রক্রিয়ায় এই গতি থাকে না। ফলে বেহাত যা হয়, তা পুনরায় ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা। পুলিশ বাগড়া দেয়। প্রশাসন বাগড়া দেয়। ইটভাটা থেকে শুরু করে বাজারের ইজারা সব বাঙালিদের দখলে। হ্রদের মাছেও আর পাহাড়িদের হিস্যা নাই। অস্ত্র জমা দিয়ে ভেবেছিল শান্তি আসবে। এখন মনে হয় মানুষ হিসেবে আত্মমর্যাদাও সেদিন বিসর্জন দিয়েছিল।

পুলিশের হাতেও আরো অনেক ভোগান্তি পোহাতে হবে এটা তার জানা। আরো ক’টা দিন তাকে পুরনো ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা সইতে হবে। ক্লান্তি ভর করেছে। শরীরটা কাঁপছে। পাহাড়ের অশান্ত বাতাস গায়ে ধাক্কা মারছে। পুত্রের দিকে এক পলক তাকায়।

মং উচিং মারমা দু’নলা বন্দুকটার দিকে এখনো আড়চোখে তাকিয়ে আছে। জিনিসটা খাড়া হয়ে আছে। তার দিকেই তাক করা।

বাইরে শেষ বিকেলের আলো চোখে পড়ছে। কারফিউ উপেক্ষা করে সে-আলো দেখছে এমন কাউকে নজরে পড়ে না।