বন্ধ সব দরজাগুলি

অলোকপর্ণা



আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঘরের পাখাটা কয়েক মাস ধরে আওয়াজ করছে ঘোরার সময়। কয়েক মাস বলেই- অভ্যেস। আর কোনো কিছু অভ্যেসে পরিণত হলে তাকে উপেক্ষা করা সহজ। যেমন এই দরজাটা,-
ছফুট উঁচু সাদা দরজা

কেলভিন, হব্‌স্‌ আর খানিক রিচার্ড পার্কার
কেলভিন আর হব্‌স্‌ বসে আছে পাশাপাশি। পিছন থেকে দেখলে মনে হবে দুজনেই খুব মন দিয়ে বৃষ্টি দেখছে। আসলে বৃষ্টি দেখছে ওদেরকে। বৃষ্টিকে না জানলে এইসব টুকরো টাকরা কমিক স্ট্রিপগুলো অজানা থেকে যায়। কেলভিন বলে,
“বৃষ্টি পড়ছে”, অথচ কথা বলে না।
“হুম্‌”, হব্‌স্‌ জবাব দেয়, অথচ কথা বলে না।
“আমাদের”, কেলভিন বলে, অথচ কথা বলে না।
“হুম্‌”, হব্‌স্‌ আবার জবাব দেয়, অথচ কথা বলে না।

আর বৃষ্টি পড়ে যায়, ওদেরকে।
এতসব বৃষ্টির পরে, একদিন কেলভিন এসে দাঁড়াবে তিনতলার ভিনদেশী একা বারান্দায়, হব্‌স্‌ তখন সমস্ত কিছুর উর্ধে। কেলভিন তাকাবে আকাশে। রোজকার মত সামনে ঝুলে আছে সপ্তর্ষিমন্ডল। কেলভিনের মনে হবে এতদিনে, ওটা আসলে কোন প্রশ্নচিহ্ন নয়, আলাদা আলাদা করে কয়েকটা পিরিয়ডের জমায়েত।
প্রশ্নগুলো সরল হতে থাকবে, কেলভিনের মনে পড়বে, হব্‌স্‌ বা রিচার্ড পার্কার, দুজনেই আদপে বেঙ্গল টাইগার।


ছফুট উঁচু সাদা দরজা ১

দরজাটাকে পিছনে ফেলে রেখে সোজা এগোলেই এন এইচ সেভেন। উপরে তাকিয়ে দেখো, পথ বেঁকে গেছে হায়দরাবাদের দিকে। কিন্তু তুমি এগিয়ে চলেছো, গোলাপি গোলাপি ফুলগুলো এমনি এমনি ফুটে গেছে, অথচ তুমি এগিয়ে চলেছো, আরেকটু এগোতেই সামনে কার্পেট, বাবু হয়ে দু হাত রেখেছো হাঁটুর উপর। তোমার সামনে, ছফুট উঁচু সাদা বন্ধ দরজা। কোথা থেকে এসে যেন হব্‌স্‌ ঠিক তোমার পাশে বসে পড়ল।
“ওপারে কি আছে?” হব্‌স্‌ বলে, অথচ কথা বলে না।
“বৃষ্টি”, জবাব দেয় কেলভিন, অথচ কথা বলে না।
“আমাদের পড়ছে?”, জানতে চায় হব্‌স্‌, অথচ কথা বলে না।
“না।” জবাব দেয় কেলভিন, অথচ কথা বলে না।
“তবে,” হব্‌স্‌ জানতে চায়, অথচ কথা বলে না।
“ঘুমোচ্ছে।”- কেলভিন হব্‌স্‌এর গলা জড়িয়ে ধরে, অথচ
কথা বলে না।

একদিন মাঝরাতে এরকমই এক ঘুম ভেঙে যাবে, উঠে বসে দেখবে, সামনে দাঁড়িয়ে আছে দরজাটা, যার ওই পারে তোমাদের বৃষ্টিরা সাধারণত ঘুমিয়ে থাকে।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঘরে পাখাটা কয়েক মাস ধরে আওয়াজ করছে ঘোরার সময়। এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলাম দরজাটার কাছে। ওর বুকে কান রাখলাম, হার্টবিট শোনা গেল। একটু পিছিয়ে এসে দরজাটার বুকে হাত রাখতে গিয়ে টের পেলাম, আমি কাউকে ছুঁই না।– না- কথা- বলতে- বলতে, না- খেলাচ্ছলে, না- ভুলবশত। তাই আমার ছোঁয়ার চেষ্টাগুলো এতটা আগন্তুক! নাহ্‌ সত্যিই, I just don’t touch anyone! বেশ অবাক হয়ে বিছানায় ফিরে এসে বসে পড়লাম। দরজাটা চুপ করে দাঁড়িয়ে তখনও। ভাবলাম, এইসব দরজাগুলো খোলার জন্য ছোঁয়াটা কি বাধ্যতামূলক?

আমার খানিক রিচার্ড পার্কার ও আমি

না, রিচার্ড পার্কার ফিরে তাকায়নি আমার দিকে। জঙ্গলে মিশে গিয়েছে নিয়মমত। রিচার্ড পার্কারকে ওরা লাইট পোস্টের নীচে শুইয়ে দিয়ে এসেছিল। আমি চেয়েছিলাম, বাগানের লম্বু গাছটা, যে কি না আমার বন্ধু ছিল, তার নীচে রিচার্ডকে শুইয়ে রাখা হোক। কিন্তু রিচার্ড লাইট পোস্টের নীচে মাটিতে মিশে গিয়েছে। রিচার্ড আমার দিকে তাকায়নি, চলে যাওয়ার আগে। আমার বাবাও তাকায়নি, গোলাপি শহরে আমায় ছেড়ে যাওয়ার আগে just বাসে উঠে গিয়েছিল, ১৭১ নং। আমি ভেবে নিই, যেরকম সাদা দরজার ওই পারটা নিয়ে ভেবে ফেলি অনেক কিছু, তেমনই, ভেবে নিই, একবার ফিরে তাকালে রিচার্ড পার্কার আর জঙ্গলে মিশে যেতে পারত না। রিচার্ড পার্কার আরেকটা সাদা দরজা হয়ে যেত।- বন্ধ।

পুজোর সময় বাড়ি যাবো, পাড়া আলোয় আলো। লাইট পোস্ট থেকে ঝরে পড়বে রিচার্ড পার্কার, আলো হয়ে। টের পাবো, বাগানের গাছের তলার চেয়ে লাইট পোস্টের নিচটা অনেক বেশি মহিমান্বিত।

ছফুট উঁচু সাদা দরজা ২

দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এই পারে, হব্‌স্‌এর গলা জড়িয়ে চোখ বুজে ভাবতে থাকি,
কত বৃষ্টিই না পড়ছে ওই পারে,
কত গন্ধ ছটফট করছে, এইপারে আসবে বলে,

বন্ধ দরজার অছিলায়, আমার কল্পনারা এভাবেই মেহফুস হয়ে যেতে