হারানো বালিপাহাড়ের কথা

অগ্নি রায়



হাফ পেন্টুল জীবনের পকেট উপড়ে আনলে শুধু কিছু বালি ঝরে ঝরে পরছে। যা সোনালী, ক্ষনস্থায়ী, এবং বিদায়্মধুর। মাথায় সাবান ঘষে ঘষেও সেই বালিমুক্তি ঘটে না আমার। রাতে বালিশের পাশে তা চিক চিক করে। ঘুমের মধ্যে রোদ ওঠে। গব্বরের ছমছমে ডেরার রামগড়ে, কিলিমানজারোর বরফের গল্পে, টিনটিনের তিব্বত অভিযানে, ভূগোল বইয়ের সাদা কালো ব্লক প্রিন্ট-এ সেই রোদ এসে পড়ে। সোনার গুড়ো, বালিকণা, জোছনা, স্বপ্ন--- সব মিলে মিশে চিকচিক করতেই থাকে।
সকালে ইস্কুল বাস ধরার তাড়ায় চুল ঠিকমত আঁচড়ানোই দায়। চিরুনির দাড়ায় লেগে থাকে সেই অমূল্য বালুকণা।
কসবা, তিলজলা, গড়িয়া, ইস্টার্ন বাইপাস, হরিদেব্পুরের মত বেশ কিছু ফ্রীনজ এলাকায় তখনো ফাঁকা জমি বিস্তর। আজকের ফ্ল্যাট বিপ্লবের সে ছিল এক বর্ণপরিচয় যুগ। দেশ ছেড়ে আসা, বেকার ভাতার আধপেটা যাপন, নকশাল আন্দোলনের অস্থিরতা সামলে সুমলে মধ্যবিত্ত বাঙালি তখন মাঝ চাকরি জীবনে এসে পি এফ থেকে লোন করে সস্তায় জমি খুঁজে বাড়ি বানাচ্ছে এই সব জায়গায়। কোথাও জলা জমি ও ভরাট হচ্ছে। পুকুর চুরিও।
একটি বাড়ি তৈরী মানে পাড়ায় হইহই উত্সব। নতুন এক ঘটনা। পরিচিত ভিসুয়ালে একটা ডিসর্ডার। আইসপাইস খেলার অনন্ত সম্ভাবনা। নতুনতর আত্মগোপনের কোনাঘুপচি। অর্ধ সমাপ্ত সিড়ির তলার ঘনিষ্ঠতাও!
আমরা এবং আমাদের মত আরো অনেকে, যারা বয়েস যোগ্যতা সর্বার্থেই ছিলাম অকিঞ্চিত, যারা সভ্যতা প্রাচীন ইটের পাজার আড়ালে ডেকে নিয়ে যেতে পারিনি কাউকে, হাতে গুজে দিতে পারিনি সদ্য রিলিজ করা বেতাব, মিস্টার ইন্ডিয়া, সাগর-এর ম্যাটিনি টিকিট, অকালে চারমিনার টানার জন্য যাদের ধক ছিল তলানিতে, তাদের জন্য একটাই বোনানজা ছিল সেই সব সংকটে। পাহাড় হয়ে থাকা বালি! অথবা বালির পাহাড়! স্কুল ফেরৎ রিক্সা, জাহাজবাড়ি থেকে ইউ টার্ন নেবার সময় , এক এক দিন হটাতই পাহাড় দর্শন! দেখা যেত বাড়ির আশপাশে, পিছনের ফাকা জমিতে--- নতুন এক পাহাড় গজিয়েছে। সিমেন্টের বস্তা, ইট, সুরকি এসবও আসছে এক এক করে। বলা বাহুল্য এই সব পাহাড়ের মেয়াদ বেশিদিনের নয়। তা সে আর কোনো জিনিসটারই বা! দৈবাত কোনো বাড়ির একতলার ভিত বা ছাদ ঢালাই মাঝপথে পরে থাকলে, সেই পাহাড় আমাদের সঙ্গে থেকে যেত মাসের পর মাস ! সে যে কি উত্তেজনায় কাটত রাত। আরোহনের উত্তেজনা। পতনেরও কি নয়!
পুজো বড়দিন গ্রীষ্হের ছুটিতে বাঙালির বেড়াতে যাওয়ার যে যুগবাহিত বিনোদন, আমি বড় হয়েছিলাম তার থেকে অনেক দুরে। পাহাড় দূরস্থান, পর্যটনের উত্তম সুচিত্রা (পুরি - দার্জিলিং!) দর্শনও হয়নি কখনো। কাকা চাকরি নিয়ে বাকুড়া সদরে যাওয়ার ফলে, ওই শান্ত শিশিরের মত ঘুম ঘুম মফস্সলটিই ছিল একমাত্র ট্রাঙ্ক, হোল্ডঅল নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা। ব্যাস।
ফলে গ্রীষ্হ বা পুজোর ছুটির পর স্কুল খুললে, বন্ধুদের উত্তেজিত কুলু মানালি ভুটান লাছ্মান ঝুলার মত সুপার ডুপার নাগরাজ দের পাশে গুটিয়ে থাকতে হতো। কিছুতেই বলা যেত না আমিও গরমের ছুটিটা কাটিয়েছি পাহাড়েই! এই দ্যাখো আমার মুঠোভর্তি পাহাড়ের রং! মুখে বলতে না পারলেও মনে মনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম যে, হ্যা, আমারও পর্বতারোহন আছে. এবং সেটার জন্য রেলের টিকেট কাটতে হচ্ছে না, জামা গোছাতে হচ্ছে না , ঝকমারি নেই ! লোড শেডিং এর জাদুসন্ধায়, মা দিদা ঘুমোনোর ফাঁকে একলা দুপুরে, ছুটির জলখাবার শেষের সকালে-- ওই উচ্চাবচ টিলাগুলির উপর ব্যালান্স করতে করতে যতটা ওঠা, হড়কে গিয়ে নামা তার চেয়ে বেশি। দু হাতে বালি কাটতে কাটতে শুধুই গড়িয়ে পড়া । কখনো চিত হয়ে শুয়ে উপরে ঘুরন্ত কাক পক্ষী পেটকাটি চাদিয়াল শ্রীলংকার ম্যাপ ভেসে যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকা।
ডিনামাইট ফাটিয়ে পাহাড়ের গায়ে মোটর পথ বানানো হয়. বসে বিদ্যুতের তার, আধুনিক টাওয়ার। আর আমরা সেই নিজস্ব পাহাড়ে বাবু হয়ে বসে গর্ত খুড়তাম। আর খুড়তেই থাকতাম। তৈরী হত সুড়ঙ্গ। খনন থামত না, যতক্ষণ একদিকের সুড়ঙ্গ গিয়ে মিলছে পাহাড়ের ওপারে বসে থাকা বন্ধুর সুড়ঙ্গের সঙ্গে। গর্তের কাছে মুখ নিয়ে চিত্কার করে যার নাম ডাকলে, পথে ধাক্কা খেতে খেতে যা পৌছাত সম্পুর্ণ ভিন্ন ধ্বনি নিয়ে ওপারে। তারপর তার উত্তর ফিরে আসত পাহাড়ের হৃদয় ফাটিয়ে। কখনো সেই গর্ত বড় হলে মাথা গলিয়ে দেওয়া। তালগোল পাকানো অন্ধকার সেখানে। ইস্কুল থেকে পাওয়া লাল চিঠিটি একবার মাসাধিককাল ওই অন্ধকারে লুকিয়ে রেখেছিল ক্লাস নাইন-এ গাড্ডা পাওয়া পড়শি বাড়ির বাপিদা! সিমেন্ট এর সঙ্গে বালি মিশছে , ক্রমশ নেমে আসছে আমাদের পাহাড়ের উন্নতশির , আর বাপিদার টেনশনও ততো বাড়ছে। সেইসঙ্গে আমাদেরও।
ব্যাস, এখানেই শুরু, এখানেই শেষ। তবুও এই বা কম কি! শৈশব থেকে বয়সন্ধি জুড়ে যা কখনো বন্ধু, কখনো কষ্ট ভোলার হাতিয়ার, কখনো শেষ স্টেশন। জমিহারা, বাস্তুহারা, ভিটেহারাদের ট্রাজেডি তো ইতিহাস বিদিত। কিন্তু আমাদের মত এক একটা আস্ত পাহাড়হারা মানুষের নৈরাশ্য নিয়ে বুঝি কোনো গান লেখা হলো না আজও। যার বা যাদের প্রথম জীবনে ‘কোথাও যাবার কোনো কথা নেই / ভ্রমন কাহিনীগুলো নেশা’ -- তারা বুঝতে পারবেন ঠিক কি বলতে চাইছি।
এর অনেক, অনেক পরে, জীবনে প্রথম বার হিমালয়ে যাই। সারা রাত অন্ধকার জার্নির পর, সেই ভোরে কুয়াশা কেটে প্রথম শরীর দেখিয়েছিল পাহাড় বাস-এর উইন্ড স্ক্রিন মাতোয়ারা করে। আমার চোখে বালি এসে পড়ছিল খুব.....