যদিও পাহাড় আঁকা খুবই সোজা

ঊষসী কাজলী



যাতায়াতের পথেই যেন বসে আছে। যেতে আসতে লোকজনের চলিতি ফিরতি গুঁতো। সঙ্গে আবার ঝুঁকে সরি বলা। সরির মার গাঁড়িয়েছে। গজগজ করে যাচ্ছে স্বপন। কী ফালতু ট্রেন রে বাবা। অথচ বুবাই বলল ওড়িষা যাওয়ার জন্য জন-শতাব্দীই বেস্ট। একে তো কোমরের সাইজ ফিট করা যাচ্ছিল না, যেন তণ্বীদের মাপ নিয়েই তৈরি! তার উপর জানালার সিট পাওয়া যায়নি । ফোন করে আচ্ছাসে .. ধুস দিয়ে কি আর হবে! এখন তো আর বদলানো যাবে না। পয়সার কথা ভেবে এ সি তে কাটা গেল না। যাতায়াতের আরামটুকু এমন কী আর বড় চাহিদা! কোনো রকমে হাত টাকে শরীরের সাথে এঁটে স্বপন ঘুমোনোর চেষ্টা দিল। ... এ ছবি টারও কিছু হল না। কেন যে হল না! শালার পাবলিক। এখনও কি বাঙলা ছবির দর্শক তৈরি হয়নি। ঋত্বিক বাবু, তাঁর পরের অনেকেই যে নতুন জেনারেশানের কথা বলতেন তারা কই ? সিনেমা শিক্ষিত হলো না দেশটা! ছবি নিয়ে তার নতুন ভাবনা চিন্তার কথা লোকে মন দিয়ে শোনে। বাড়ি বয়ে এসে দেখেও যায় স্বপনের টুকরোটাকরা কাজ। কিন্তু মার্কেটে তার ছবি চলে না!! পয়সা ওঠে না। কনফিডেন্ট ছিল স্বপন নিজের ছবি নিয়ে। এত ডেডিকেশান যে মিমিকেও সময় দিতে পারেনি। একটা অন্তত ছবি লোক বুঝুক, বাজার টা ধরে নিক। তারপর......... তারপর সব। মিমি বলত, নাম টা বদলে নাও। স্বপন নাম খুব অচল। ঠিক মডার্ন নয়। শুনে স্বপনের হাসি পায়। ছোটখাট ঝামেলা থাকলেও দিয়ার জন্মের পর অব্দি তাদের স্বপ্নের মতন কেটেছে। যেন যাবতীয় সমস্যাই বিছানায় মিটিয়ে ফেলা যায়। এত মাখন মাখন দিন । উফ মার্চেই এত গরম!! ঘেমে যাচ্ছে খুব। অস্বস্তি হচ্ছে। ট্রেন দাঁড়িয়ে খড়্গপুরে।


বেশ কষ্ট করে উঠে টয়লেটে গেল স্বপন। আয়নায় নিজেকে দেখা হয়নি অনেকদিন । ইংরেজী অনার্স, বসিরহাট কলেজের উজ্জ্বল ছাত্র আজ ফুটো কড়ি। সিনেমা করবার ভূতে পেয়েছিল। ভূতে পাওয়া মানুষের জেদ ভীষন। অথচ এর চেয়ে মাস্টারস টা করে নিলেই কি ভাল করত? ট্রেন দুলে উঠল। হাতের জল চলকে পড়ল জুতোয়। চোখ সরিয়েই বা কী হবে আয়না থেকে। এলোমেলো চুলগুলো একদিকে সরিয়ে ঝপাঝপ জলের ঝাপটায় স্পষ্ট হল বছর সাঁইত্রিশের ক্লীন সেভড ইয়াং। ছেলেবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি কী যে টান। মাঝে মাঝে কবিতা লিখত স্বপন। কাউকে দেখাতে চাইত না। একবার বাবার কাছে ধরা পড়ে গিয়ে কবিতা শোনাতে হয়েছিল। সেকী লজ্জা! লজ্জায় কান লাল। সে সব মনে করে হেসে উঠতে গিয়ে খেয়াল এল ট্রেন চলছে। আর দরজায় কেউ ধাক্কা দিচ্ছে। সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে খুব। তবু বেরিয়ে আসতে হল। ট্রেন যাত্রায় কত কত মাঠ পেরোতে হয়, জলা পেরোতে হয়, ব্রিজ পেরোতে হয়। জনপদ পেরিয়ে নির্জ্জন ষ্টেশন ছাড়িয়ে কত কত বার কত কত যায়গায় যে মানুষ যায়। কেন যায় কেন আসে এই সব ভাবতে ভাবতে খিদে পাচ্ছে। ট্রেন ছুটছে কখনও ধীর। কখনও দ্রুত। সন্ধ্যে নেমে গেছে চারদিকে । দরজায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে অন্ধকার দেখছে স্বপন। অন্ধকারে অদ্ভুত আরাম থাকে। চোখ দ্বিধাহীন এলিয়ে নিতে পারে নিজেকে। একটা স্টেশনেরও নাম পড়া যাচ্ছে না। চায়ের গন্ধে বুক ভরে যায়। সবচেয়ে উপাদেয় আর প্রয়োজনীয় চাওলাকে স্বপন হাঁক দিয়ে ডাকে। চা নিয়ে আরাম করে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায় দরজায়।

দূরে নিজের সিটের পাশে বসা লোকটা ঘুমোচ্ছে ঘাড় কাত করে । তার পাশে মেয়েটা জানালার ধারে কানে হেডফোন লাগিয়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। ট্রেনে ওঠা থেকেই। এখন মেয়েটির মুখ খুব স্পষ্ট না হলেও দেখা যাচ্ছে। খুব আবেগের ভিতর থাকলে যা হয় সেই অভিব্যক্তি যেন ফুটে ফুটে বেরুচ্ছে। এই রকম একটা ক্যারেক্টারের কথা স্বপন কি কখনও ভেবেছে? ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে বেশ খানিকক্ষন। পা টাও ধরে আসছে। সিটে ফিরে আসা ছাড়া উপায় কী। ট্রেন ছেড়ে দিলে টি শার্ট টা বদলে নিতে গিয়ে ব্যাগ থেকে দুটো ডায়রী বেরিয়ে পড়ে। একটা কবিতার। অন্য টা দিনলিপি। শার্ট চেঞ্জ না করেই ডায়রীর পাতা ওলটাতে শুরু করে স্বপন। সেই ক্লাস ইলেভেনের ডায়েরী। রোজ রোজ দিনলিপি লেখার অভ্যেস তার নেই। খুব জোরালো ঘটনা বা অদ্ভুত দিনের কথা সে লিখে রাখত। পুরনো ডায়রী টা দিয়াই ভরে দিয়েছিল বাবার ব্যাগে। নবছরের মেয়ে টা এসব পড়ে দেখেছে। তা নিয়ে অবশ্য স্বপনের সমস্যা নেই। কিন্তু মিমি? এই ডায়েরিই সংসারে বিষ। সত্য কে সুন্দর বলতে গেলে যে দূরত্বের প্রয়োজন হয়, যে স্পেস দরকার হয়, সংসারে তা বড় একটা নেই। স্টেজের মানসী আলাদা। থিয়েটারের দুনিয়ার মানসী সংসারে কেবলই মিমি। আবার স্বপনও কি ইন্দ্রজিত ততখানি! এমন কিছু যা মিমির অসহ্য। এই ডায়েরী নিয়ে গত দু মাস ধরে কথা কাটাকাটি থেকে বাপের বাড়ি অবদি গড়িয়ে যাবে ভাবেনি স্বপন। স্বপনের প্রেমে পড়েছিল মিমিই। বসিরহাটের মতন মফস্বল শহরে খবর টা ছড়িয়ে গিয়েছিল দ্রুত। মিমির মাসি ডেকে পাঠান। পাকা কথা হয়ে থাকে। অনেক বাঁক পেরিয়ে পাকা কথারই জয় হয় প্রায় ন'বছর বাদে। বিজয়িনীর মতন স্বপনের ঘরে এসে ঢোকে মিমি। যেন রাজ্য আর রাজপুত্তুর দুইই হল। এখন কেবল কোমর বেঁধে সংসার। কোমর বাঁধতে গিয়ে স্বপনকেও বাঁধা পড়তে হয়েছে। নাম বদলানো নিয়ে সেকি বায়না। কিন্তু স্বপন রায়ের নাম অদ্রীশ সেন বা মনন মিত্র হলে কি সমস্যা মিটে যেত! পাতা গুলো ওলটায় স্বপন। আর ভাবতে ভাবতে ক্রমশ চলে যায় সমস্যার কেন্দ্রে গভীরে।

ডায়েরি যেন হাজারো খোয়াইসে আর ভাঙচুরে জমানো ডাঁই। স্বপনের প্রিয় আসবাব ছিল ঠাকুরদার আর্মচেয়ার। সুযোগ পেলেই সেখানে শরীর এলিয়ে দিত। যত দেশ বিদেশের আশ্চর্য গল্প সবই যেন ঠাকুরদার জিম্মায়। গরমের দুপুর গুলো কিছুতেই ঘুমাতে পারত না। ঠাকুরদা ছিল প্রিয় বন্ধু। ক্রমশ স্কুল আর মাঠের বন্ধুরা প্রিয় হয়ে এলে ঠাকুরদা কেমন ম্লান আর আবছা হয়ে যায়। দুম করে বাজ পড়ার মতন যেদিন শোনে ঠাকুরদা পুকুরে নাইতে গিয়ে পড়ে গেছে। পড়েই মরে গেছে। সেদিনকার কথা ডায়রীতে আছে খুব অল্প করে। এতো দূরত্ব টপকে কী করে সে পৌঁছাবে ঠাকুরদার কাছে? এই হাহাকার শব্দে সেদিন বুঝিয়ে তোলা যায়নি। ডিনার অডার করা ছিল। রুটি সবজি ডিমের ঝোল। খেতে খেতে পাতা ওলটায় স্বপন, অন্যমনস্ক। হাওয়া এসে লাগে মুখে। জানালার পাশে বসা মেয়েটি খুটখুট করে যাচ্ছে মোবাইলে। এই বয়েসের তুমুল আবেগ ঝড়ের মতো। ফার্স্ট ইয়ারে হাতে আসা নতুন মোবাইল। মিস কলের কী দিন ছিল সেসব। অজানা অচেনা একটি মেয়ের সাথে আলাপ হয়ে যায় ফোনেই। বোলপুরে থাকে আর নাম বলেছিল ঈশিতা। ফুটবল মাঠে রঞ্জন একদিন গল্পটা জেনে যায়। আর কী অদ্ভুত ভাবে দুজনেই মেয়েটিকে মিস করতে শুরু করে। নাটকে তার লিড রোল ছিল বাঁধা। আর ওদের বাড়ির পিছনে জলার পাড়ে জামরুল গাছে বসে কত কত আড্ডা। যেদিন খবরটা ফাঁস হয়ে যায়, মেয়েটা আদৌ বোলপুরে থাকে না , তার নাম ঈশিতা ও নয়, সেদিন স্বপন আর রঞ্জন অনেক্ষন মাঠে শুয়েছিল চুপচাপ। বাড়ি ফিরে একটা কবিতা লিখে ফেলে স্বপন। সেই রাত্রে খবর আসে রঞ্জন লাইনে ঝাঁপ দিয়েছে , সদর হাসপাতালে ভর্তি। দম আটকে আসা ওই রাত কীভাবে কাটিয়েছিল সে। খুব ভোরে রঞ্জনকে দেখতে যায়। চাদরের নিচের দিকটা চুপসানো, দাগ ধরা সাদা বালিশে রাখা রঞ্জনের মাথা স্থির। দেখেই চুপি চুপি ফিরে এসেছিল।

ক্লাসমেট মেয়েটির দিব্যি বিয়ে হয়ে গেছে। রঞ্জন পৌরসভার দেয়া হাত প্যাডেলের চেয়ারে করে গোটা বাজার ঘুরে বেড়ায়। পেপার পড়ে। যাকে তাকে বিড়ি চায়। ভয়ে নাকি কেন যে স্বপন দূর থেকে দেখে মিডফিলডার রঞ্জনকে। ডায়রীতে এসব ও লিখেছিল সে? কত দিনকার ডায়েরী। সব কি মনে আছে? মিমির রাগের কারণ গুলোও আছে হয়ত । ডায়রী জুড়ে। যেন দূরের ফ্রেম এক একটা। আলাদা করে সাজানো প্লটের শর্ট ডিভিশান ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছে স্বপন। ঘুমের ভিতরেও ডায়রী এসে হাত ধরছে। নিয়ে চলে যাচ্ছে বারাসাত। নিখিল মজুমদারের ভাড়া বাড়ি। বাঙলার অধ্যাপক। কবিতা লেখেন। লিটিল ম্যাগাজিন নিয়ে তখন স্বপনদের খুব মাতামাতি। মাঝে বিপদ ডেকে আনে আষাঢ়ের মেঘ। বৃষ্টির ছাদে শরীর ঢেলে দিয়েছিল প্রিয় অধ্যাপকের বৌ। মাথার ভিতর ঝর্না নিয়ে ফিরেছিল রাতে। যার অমোঘ টানে ঘুরে ফিরে আসতে হত তাকে, পেরোতে হত দুর্গম ভ্যাপসা সিড়ি। সব কিছুরই শেষ আছে। তবে সব শেষ নভেলের মতন নয়। অধ্যাপকের সেই ধাঁতানি আর লুঙ্গি তুলে ঘরে ঢুকে যাওয়া। ভোলা যায় না। কত কত বার হাসনাবাদ লোকাল বারাসত এলেই নেমে পড়তে ইচ্ছে করত। একবার, একবার অন্তত চললাম বলে আসা যেত! এর আগে পিছের প্রচুর গল্প অভ্যস্ত চিন্তায় ঘুরে ফিরে এলে সিগারেটের ধোঁয়ায় উড়িয়ে দেয় স্বপন। আর হার্ডওয়ার্কে নিজেকে ভরে দেয় সিনেমায়।
ভুবনেশ্বরে গাড়ি ঠিক করাই ছিল। উঠেই স্বপন গা এলিয়ে দেয়। সবই বুবাই ঠিক করে দিয়েছে। বুবাই খুব ভাল বন্ধু স্বপনের। কবিতা লেখার রেসারেসি তে নেমে যে কখনও মুখ ফিরিয়ে চলে যাবে না। বুবাই সেট আপ ম্যান। স্বপনের সব সেট বানায় বুবাই। মিমির সাথে চরম ঝামেলার দিনগুলোতে বুবাই তাকে নিজের চিলে ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে রাম খাইয়েছে। সকালে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। সঙ্গে আলুর দম আর কচুরি। মিমি এখন বাপের বাড়ি তে। শেষ ছবি টায় অনেক টাকা বেরিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বিরাট ধাক্কা। বুবাই না থাকলে যে তার কী হত। অথচ বুবায়ের সাথে কামু কাফকা নিয়ে কথা চলে না। ফেলিনি গোদারের ভক্ত তো সে নয়ই। তাকে এই ছুটির বন্দোবস্ত করে দিয়েছে বুবাই।

হু হু করে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে হাইওয়ে ধরে। সমুদ্রের খুব কাছে চলে এসছে স্বপন। মেঘ করে আছে আকাশ। মেয়েকে মনে পড়ছে। আজ দিয়ার বার্থডে। অথচ ফোন দিলেই ঝামেলা। ডায়েরী টা ব্যাগের ভিতর আছে। মনে পড়ছে মা আর বাবার একটা ফটোগ্রাফ। পুরীর সমুদ্রে। ঢেউ এসে বাবাকে খানিক হেলিয়ে দিয়েছে আর মা হাত ধরে আছে বাবার। কী প্রশান্তি। অনেক বার পাহাড়ে গিয়েছে স্বপন। বাবা মার সাথে, বন্ধুদের সাথে, একা একা ও। সমুদ্র ভাল লাগত না। আজ এই প্রথম সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড়কে খুব ছোট মনে হচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে সে চলে আসে বালিয়াড়িতে। ঢেউয়ের পরে ঢেউ। আসছে। আছড়ে পড়ছে। ফিরে যাচ্ছে। একই দৃশ্য। অবিরাম কিছু ভেঙে চলেছে। বালির উপর বসে থাকতে থাকতে সে বুঁদ হয়ে যাচ্ছিল। মেঘের গর্জন বাড়ছে। হয়ত বৃষ্টি নামবে। উঠে এসে ব্যাগ থেকে ডায়রী টা বের করে উলটে পালটে দেখে। টিলা নুড়ি আর জমানো ঢিবি। ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে সব। ড্রাইভার হাঁক দেয়। গাড়িতে উঠে আসতে বলে। বৃষ্টি শুরু হল। স্নান করতে হবে। খিদে পাচ্ছে খুব। গরম গরম ভাত চাই, মাছ ভাজা। বড় বড় ফোঁটা হয়ে বৃষ্টি নামছে। গাড়ি হোটেলের দিকে ফিরছে। আর নূতন করে একটা ছবির প্লট তৈরি হচ্ছে মাথায়।