‘ইতি তোমার কুয়াশা’

বিজয় দে




তখনও ‘পাহাড়’ দেখিনি। চুল-কাটার সেলুনে টানানো ক্যালেন্ডারের ছবির রংবাহারি পাহাড় আর ক্কচিৎ কখনও বায়োস্কোপে দ্যাখা বা শোনা এক ঝলক,যেমন,পাহাড়ের প্রেক্ষাপটে ( হোক না সাদাকালো) কিশোরকুমার-প্রণীত্‌ সুপারহিট ‘ম্যাঁয় হু ঝুমঝুম ঝুমরু ফক্কার/ ঘুংরু বন্‌কে ঘুমু ম্যাঁয় ইয়ে প্যায়ার কা গীত শুনাতা চলা মঞ্জিলপে মেরি নজর / ম্যাঁয় দুনিয়াসে বেখবর বীতি বাতোঁপে ধূল উড়াতা চলা’ ( পুরো গানটি প্রায় মুখস্ত ছিল এক সময়, কেননা আমার পুরোনো পাড়ায়, যেখানে আমরা থাকতাম, তার পাশের বাড়ির এক অতি ভদ্র ও বিনয়ী দাদার একমাত্র প্যাশন ছিল এই গানটি চব্বিশ ঘন্টা চিৎকার করে গাওয়া, বছরের পর’ বছর। পরে যখন ছবিটি ,দেখি তখন অবশ্যি গান নয় , মনে ধরে গেল ট্রেনের জানালার ফ্রেমে বাঁধা, ফটোযেনিক মধুবালার মুখ । এই মুখ তো শুধু মুখ নয়,যেন মুখের ভাষায় লেখা পূজোর ছুটি বা মুখমন্ডলে জেগে-ওঠা শিশুউদ্যান! পাহাড়প্রদেশে প্রথম ঢোকার যে যুবতী-আনন্দ তা’র সমস্তটাই যেন মধুবালার চোখেমুখে, যা এই মুখ ছাড়া অন্য কা্রো মুখে আজও দেখিনি ) কিম্বা কখনও আমাদের স্কুলের পাহাড়-ফেরৎ বন্ধুর মুখ থেকে শোনা বিখ্যাত টয়-ট্রেন যাত্রা (আচ্ছা, ট্রেনে কি বাথরুম আছে? আচ্ছা , ট্রেনে হিসি করলে নাকি অন্য কারও মাথায় গিয়ে পড়ে?) এবং আরও বিখ্যাত সূর্যোদয়-বিশেষজ্ঞ টাইগার-হিল। তো, এই হচ্ছে আমার জ্ঞান বা পাহাড়-সম্পর্কিত দৌড়।
বন্ধুদের জানপহেচান পাহাড় মানে দার্জিলিং আর কালিম্পং (সিকিম-গ্যাংটক তো সেদিনের ছোকরা) আর ক্যালেন্ডার-বায়োস্কো ের পাহাড় মানে কাশ্মীর-টাশ্মীর, ইত্যাদি । তখনকার নিয়ম-অনুযায়ী ,যে ক্লাসে ফার্স্ট হয় আর যে কলকাতা দার্জিলিং একবার ঘুরে এসেছে, তারা দু’জনেই একই ধরনের সেলিব্রিটি। আমি এর কোনওটাতেই নেই, সুতরাং একটা হীনমন্যতাতো ছিলই।
আমি ‘পাহাড়’ দেখিনি ,তার মানে, এটুকু বলা যায়। আমাকে ‘দ্যাখানো‘হয়নি , তার মানে আমাকে দ্যাখানোর ‘ইচ্ছা’ বা ‘সামর্থ্য’ কারোর হয়নি , তার মানে, আমি এখন এভাবে ভেবে নিচ্ছি ,আসলে তখন আমার পাহাড় দ্যাখার ‘বয়স’ই হয়নি । জুতোমোজা তো পড়তে শিখলাম ,এই সেদিন!


পাহাড় দেখিনি ।‘ কাঞ্চনজঙ্ঘা’ও তো দেখিনি। না, কোনও তুষারধবল পীক-পয়েন্টের কথা হচ্ছেনা। এখানে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ মানে, বলা বাহুল্য, ‘প্রাচ্যের ’ লংম্যান’ সত্যজিত রায়। তিনিও তো তখন ‘পাহাড়’ হয়ে উঠেছেন প্রায়। ষাট দশকের প্রথমভাগে তৈরি , সাদাকালো-যুগে বাংলা রঙিন, ভাবা যায়না ,যখন মুক্তি পায়, তখন আমি স্কুলে , নাক টিপলে তখনও দুধ বেরোয়,এরকম অবস্থা, কিন্তু এটা তো ভুলিনি , যা তখন হাওয়ায় হাওয়ায় শুনেছিলাম ,আমাদের এই মফস্বল শহরে ,’কাঞ্চনজঙ্ঘা’ দ্যাখার পর’ সিনেমা-হল থেকে বেরিয়ে এসে বড় বড় লোকেরা নাকি বলাবলি করছিলো , ধুসস্‌ শালা , পয়সাটাই জলে গেল !
পয়সা জলে গেল?এর মানে কী? কেন বলেছিলো ? ওরা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’’র কাছে কী চেয়েছিলো? আর এটা জানতে আমাকে বহু বছর অপেক্ষা করতে হোলো । ততদিনে আমার ১১ কি ২১ বার পাহাড় ভ্রমণ হয়ে গেছে। আসলে এটা বুঝতেই সময় লাগলো , পাহাড় মানে শুধু মাটি-পাথর-ঝর্না-জঙ্গল সহ সরাইখানার সমবেত চিৎকৃত উচ্চতা নয় ,চক্‌চকে পিকচার-পোস্টকার্ডও নয় । তাহলে ? তাহলে পাহাড় মানে কি মুন্ডুখানা মাঙ্কিটুপিতে ঢুকিয়ে অজস্র ঢাকের গর্জন ’ দুগ্‌গা মাঈকি জয়। দুগ্‌গা মাঈকি জয়’? ,
ভাগ্যিস আগে দেখিনি , পরিণত বয়সে প্রথম ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ দেখে যা মনে হোলো ,পাহাড় দেখতে আমরা যাই , নাকি পাহাড় আমাদের দ্যাখে ,আরে পাহাড় তো এখানে নিছক দর্শকমাত্র, অন্তত এই ফিল্মে, মানুষের ভেতরের হৃদকুয়াশা, ঘিলুর ভেতরে চোরা-কুয়াশা, মেঘ থেকে ভেসে আসা প্রেমপত্রের শেষ লাইন ‘ইতি তোমার কুয়াশা’, বুক-সেলফে সাজিয়ে রাখা বেস্ট-সেলার ‘কুয়াশানামা’ এবং নদীর ওপরে ভাসমান ‘কুয়াশাসমগ্র’ , এই সব টুকিটাকি নিয়ে রচিত হয় সে এমন এক কুয়াশা-অপেরা , যা দেখতে দেখতে ,দেখতে দেখতে ,পাহাড়ও এক সময় হাই তোলে, তারপর’ ক্লান্ত ক্লান্ত ক্লান্ত, বাথরুমে যায় ,তারপর আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

আমার ধারণাতে এটা ছিলনা , ‘ পথের পাঁচালি’র ‘সর্বজয়া’ করুণা বন্দোপাধ্যায় ‘কাঞ্চনজঙ্ঘয়’য় এসে অভিজাত (ছবি বিশ্বাস) ইন্দ্রনাথ চৌধুরীর (পাঁচটি কোম্পানীর চেয়ারম্যান) ঘরণী লাবণ্যপ্রভা চৌধুরী হয়ে আছেন। এটি একটি হাবা ধারণা, সন্দেহ নেই। অভিনেত্রী তো সব কিছুই হতে পারেন। কিন্তু আমি কেন যে সর্বক্ষণ ‘সর্বজয়া’কে দেখে গেলাম! সেই দুই চোখের মায়া, সেই দুই চোখের ভেতরে লুকিয়ে রাখা কান্না, এই নিয়েই স্বামীসংসারঘরগেরস্তি র নিরুচ্চার তদারকি! যিনি সতেরো দিনে একবারের জন্যও পাহাড়প্রকৃতির দিকে মুখ তুলে তাকাননি । আর যখনতিনি সত্যি সত্যি তাকালেন , তখন সেই ‘তাকানো’ হৃদয়-উৎসারিত গান হয়ে নেমে এলো । অব্জারভেটরি হিল-য়ের বেঞ্চিতে বসে যখন গাইতে থাকলেন (কন্ঠঃ অমিয়া ঠাকুর)’এ পরবাসে রবে কে হায়, তখন যেন পাহাড়ের কোলে আর অবজারভেটরি হিল নেই,যেন খুলে গেল শান্তিনিকেতনের উপাসনাগৃহ। আর সত্যি কথা বলতে কি, এই গানটি গাইতেই তো তার কলকাতার কোলাহল থেকে এতদূরে নির্জনতায় আসা ! এই গান যখন শেষ হয় তখন আমার কাছে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ও যেন শেষ হয়ে যায়। কুয়াশা সরে গিয়ে শৃঙ্গ দ্যাখা দিল কিনা ,তার খবর কে রাখে !
একজন ব্যর্থ পাহাড়-প্রেমী হিসেবে আমার অবদান এটুকুই ,আমি এখন মনে মনে যা যা করতে পারি ,সেটুকু লিখে রাখতে পেরেছি । প্রথমে,দার্জিলিং অবজারভেটরি হিল’য়ে পৌঁছে একটা শ্বেতপাথরের ফলক স্থাপন করলাম। এবং ফলকে ওপরে কালো কালিতে সযত্নে লিখলাম
যিনি সর্বজয়া তিনিই ল্যাবণ্যপ্রভা এবং এই সেই বেঞ্চ , যেখানে বসে শ্রীমতী করুণা বন্দোপাধ্যায় ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণকালে এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি গেয়েছিলেন (কন্ঠ; শ্রীমতী অমিয়া ঠাকুর) ‘এ পরবাসে রবে কে হায়। কে রবে এ সংশয়ে সন্তাপে শোকে।। হেথা কে রাখিবে দুখভয়সঙ্কটে – তেমন আপন কেহ নাহি এ প্রান্তরে হায় রে।‘
(যদি ইংরেজীতে লেখা হয় তবে চলচ্চিত্রটির সাব-টাইটেলকৃত গানের অনুবাদটিও রাখা যেতে পারে
I do not belong to this world of exile no one can bear to be thus filled with doubt this never ending torment this grief in this strange land who will be my keeper? who will spare me from pain, from fear ,from anguish there is no one who can reach to my heart in this vast empty wilderness I am alone)




না , আমার পয়সা জলে যায়নি। কিন্তু অন্য কিছু নয় ,ওপরের এই লেখাটিকি কিছু ফুংফাং মনে হচ্ছে? তাহলে নিবেদন এই যে , লেখাটিকে বরং একটি বৃহৎ প্রেমপত্র হিসেবেই ধরে নিন। মানুষের তো কত কিছুরই লেখার ইচ্ছে হয় ! সম্বোধনে পাহাড় থাকুক বা না-থাকুক কিম্বা প্রেম থাকুক বা না-থাকুক , চিঠির শেষটা যদি এ্রকম হয়,তাহলে হয়তো এই লেখাটা আপনাদের কাছে পৌঁছোবে। জয় কাঞ্চনজঙ্ঘা !
ইতি তোমার কুয়াশা