উড়ান

পিয়াল রায়



পাহাড়ের চেনা বুকে মুখ গুঁজে
পেয়ে গেছি তীর্থের আশ্রয়
কোনোদিকে তাকাবো না আর
তোমাতেই লীন হোক শেষটুকু ক্ষয় ...

যখনি তোমার কথা মনে পড়েছে , মনে পড়েছে বিশেষ দিনটির কথা । না না কোন বিশেষ একটা দিনের কথা বলা বোধহয় ঠিক হল না । তোমার সাথে প্রতিদিনের মিলমিশ তো শুরু সেই দিনটির অনেক আগে থেকেই । সেই কোন শুক্লা দ্বাদশী অথবা ত্রয়োদশী - ঠিক করে মনে পড়েনা নির্ধারিত দিনক্ষণ । তখন এমনি চৈত্রমাস । বসন্তের হাওয়ায় চারিদিকে সজনের হাল্কা ছিপছিপে বীজ । রৌদ্রদগ্ধতা কেন যেন সে বছর বসন্তকে করতে পারেনি কাবু । ফলে কুজন ছিল আরও সুমিষ্ট । তোমাকে পেয়েছিলাম আমি । সেদিন প্রিথিবির বুকে অমৃতধারা যেন পুণ্যতোয়া স্রোতস্বিনী আকাশগঙ্গা হতে । তোমার ত্রিকোণ বুকে পাহাড়ের তিব্র ঘ্রান । অথচ আশ্চর্য তখনো আমি পাহাড়
দেখিনি । গত জন্মের স্মৃতিই কি ভেসে এল রূপ - রস - গন্ধ - স্পর্শ নিয়ে ? তাইই হবে ।

যখন বুকের ওপর মাথা রেখে শুতাম , চুলে হাত বোলাতে বোলাতে শুনিয়েছ সত্তরের অবাক কাহিনি । চিনের চেয়ারম্যানের আমাদের চেয়ারম্যান হয়ে ওঠার গল্প । সে দশক মুক্তির দশক । জোয়ান পুরুষেরা শাসক শক্তির গ্রাস থেকে স্বপ্নকে বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে বনে - জঙ্গলে । তখন তোমার সবে ষোল পেড়িয়ে সতেরো । পুলিশের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে ওদের খাবার সরবরাহ করতে তুমি । সযত্নে বাঁচাচ্ছিলে আন্দোলন । কিন্তু পারলেনা নিজেকে রক্ষা করতে । পরপর চারটে গুলি তোমার পেটের পেশীতে । এরপর মাসাধিক কাল লড়াই মৃত্যুর সাথে। কুয়াশা মাঝে মাঝে ঘিরে ফেলে পাহাড়কে তবু কুয়াশা তো চিরকালীন সত্য নয় - সত্য হয়ে ওঠে অনমনীয় পাহাড়ের উপাখ্যান । পুলিশ তোমাকে ছেড়ে দেয়নি শেষ পর্যন্ত । বিপ্লবীদের নাড়িনক্ষত্র জানতে চালিয়েছিল মাআত্রাহিন অত্যাচার । ডান পায়ের কড়ে আঙ্গুল না থাকাটা ভয়ঙ্কর কাহিনি এখনো নিরবে বয়ান করে । কতবার চোখে জল এসেছে আমার তুমি কাঁদতে দাও নি । কারন তুমি মনে কর মেয়েরা হবে আগুনের মত আর আগুন কখনো কাঁদতে শেখেনি ।

বারবার মন কে বুঝিয়েছি তোমার কথাই ঠিক । চোখের জল দুর্বলতার লক্ষণ । তবু কই ? পারিনি তো বোঝাতে । কেন যেন বারবার মনে হয়েছে আগুনের পূর্ণ সমর্পণ তো জলের কাছেই । সেখানেই আগুনের সুখ । কেঁদেছি লুকিয়ে লুকিয়ে । যন্ত্রণা ছিল তোমার মত হতে না পারার । মনে মনে আমি তোমার মত হতে চেয়েছি বরাবর । পোশাকে আগুন লেগে গেলে জীবন বাঁচানোটাই যেখানে জরুরি সেখানে পোশাকের মহার্ঘ্যতার জন্য শোক হাস্যকর । আতঙ্কে পাথর হতে হতে শুনেছি দেওয়াল পোড়ার সময়েও তোমার সুললিত কণ্ঠে চণ্ডীদাসের যোজন বিস্তৃত মিঠাস পোড়া পিঠের জ্বলন যন্ত্রণার তোয়াক্কা না করেই --
সই কত না ধরিব হিয়া
আমার বঁধুয়া আনবাড়ি যায়
আমারি আঙিনা দিয়া ...
পাহাড়ের বুকে কত না উদ্ভিদ রয়েছে বিশল্যকরণী হয়ে । জীবনে - মৃত্যুতে - আগুনে - নিবৃত্তিতে । কত না ভাষাচিত্র ব্যঞ্জনাময় ধুয়ো তুলে প্রবহমান । দাবানলের সাধ্য কি পুড়িয়ে রাখ করে সেসব অমুল্য সম্পদ ।

আমি জলাভুমি দেখেছি , কর্দমাক্ত দলদল দেখেছি , পাঁক গন্ধে পাক দিয়ে উঠেছে নাড়িভুঁড়ি অথচ আমি ঈশ্বরের তৈরি পাহাড় দেখিনি । আসলে তখনো আমার পাহাড় দেখার কোন সম্ভাবনা গড়ে ওঠেনি । ইস্কুলের বইতে প্রথম পরিচয় পাহাড়ের সাথে । বিশ্বাস কর ছবিতে চোখ - মুখ - চশমা এঁকে দিতেই পাহাড় হয়ে গেল তোমার মুখ । তারপর থেকেই এ আমার অতি প্রিয় খেলা হয়ে উঠল । যেখানেই পাহাড়ের ছবি দেখতাম চোখ - মুখ - চশমা এঁকে তুমি বানিয়ে ফেলতাম । পাহাড়গুলো মনে মনে নিশ্চয়ই হিংসে করতো তোমাকে অথবা আমার স্পর্ধায় বেকুব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো চুপচাপ । বেচারা ওরা তো জানতো না পাহাড়ের সবটুকু নিয়েও তুমি স্থবির হয়ে যাওনি কখনো ।

আজ আর কোন কবিতা পড়বো না । শব্দাবলি আজ নিতান্তই হাল্কা অসহিষ্ণু ।আজ সেই বিশেষ দিন । দীর্ঘ চব্বিশ কিম্বা সাইত্রিশ কিম্বা একষট্টি বছর পর । সময় গণনা ঢেউ তুলে মিলিয়ে গেছে কবেই । যেদিন প্রথম পাদদেশে আছড়ে পড়েছিল দিকশূন্য আর তুমি হাতে তুলে নিয়েছিলে দৃঢ়তার গনগনে কাঠকয়লা । হাসপাতালে কত ঘুমহীন রাত ভালবাসার মানুষের কপালে শুশ্রূষার স্পর্শ রেখে । বাড়ির উত্তর - পূর্ব কোণে জেগে থাকতো পবিত্র নিমফুলের সুবাস । তুমি গুনে গুনে ঠিক বলে দিতে কতগুলো তারা জন্মাল । নিমগাছ সব শুনে সুরেলা ফুলগুলোকে নিয়ে ঝিলমিলিয়ে উঠত । তুমি ওকে চুপি চুপি ডুবো জাহাজের গল্প শোনাতে । কান্নার মত শোনাত । তাই শুনে গাছটা শিউরে উঠে সাম্লাতে চাইত ফুলগুলোকে । এক অন্য আকাশ জ্বালিয়ে রাখতাম আমি তোমার জন্য সোনার পিলসুজে ।


শরীরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা জেগে থাকে । ঘনশ্যাম পটুয়ার নিখুঁত কারুকার্যে জেনে যায় পৃথিবীর বেবাকজন । গত অক্টোবরে পারিবারিক রিইউনিয়নে আমরা দোল খেলেছিলাম । ক্যালিফরনিয়া থেকে , বার্লিন থেকে , বাংলাদেশ থেকে নানা মাপের , নানা ওজনের , নানা বয়সের ফুলঝুরিদের রঙের হাট বাড়িটাকে রেখেছিল গমগমে । রাঙ্গাকাকিমা বাষট্টি বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন বলে উৎসব করেছিলাম আমরা । মেরিদি শফিক জামাইবাবুর ভালোমানুষি নিয়ে মজা করেছিল এন্তার । চাঁদনীর অপার আনন্দ আটপৌরে দিনগুলোতে উজার করে ঢেলেছিল সঙ্গীত । বংশীর মায়াধ্বনি বিবশ আমাদের হৃদয় শুনতে পায়নি আগ্নেয়পাহাড়ের উপক্রম । অন্তরের আগুন অল্প অল্প গ্রাস করে নিচ্ছিল তোমায় টের পাইনি সময়ে । যেদিন পেলাম সেদিন সুবর্ণরেখায় কলার মান্দাস ভেসেছিল । থেমে গেছিল পূর্বমেঘের সারিগান । আগুন বর্ষণ করতে করতে নিরক্ত হয়েছিল পাহাড়ের হৃদস্পন্দন । সেদিন কেউ আর কারো দিকে তুলছিল না দোষারোপের আঙুল । দক্ষ শিল্পের মত বিরহের বন্দিশ ছড়িয়ে পড়ছিল পটকাহিনিতে ভর করে ।

সে কোন মন্ত্রপূত সকাল যখন স্বেচ্ছায় জমি ছেড়ে দিয়েছিলে ওদের আর সঙ্গে সঙ্গে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তোমার উপর । কালো জল ছুঁড়ে বন্দি করেছিল তোমার চেতনা । তারপর দেশ বিদেশের অনেক পাহারই তো দেখা হল । মজার ব্যাপার হল প্রতিবারই বরফ ছুঁয়ে থাকা পাহাড় কখন যেন তোমার মুখ হয়ে গেছে । চরাই উৎরাই ভেঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে খাদের দিকে তাকিয়ে কতবার বুক কেঁপে উঠেছে অজানা আশঙ্কায় । তোমার ছায়াশরীর তখন পাহাড়চূড়ায় সোনারঙের আহ্বান সাজিয়েছে । ভুলিয়ে দিয়েছে অক্টোবরের বেদনা ।
সেই বেদনায় নিরব মিছিল মুখ
পাহাড়ের মত উঁচু হতে হতে
পাহাড়ের মত উঁচু হতে হতে
দুহাত ভরিয়ে দিয়েছে ঋদ্ধ শিখারূপ ।



শিউলি গাছটা অনেক বড় হয়ে গেছে । ভরামাসে আমি ওকে জল দিই সন্ধ্যার ঠিক মন কেমনের আলোয় । জানি সময় এলেই সব যুদ্ধ শেষ করে ফুলে ফুলে ভরে উঠবে গাছটা । তুমি আবার সেদিন ফিরবে আমার কোলে । সেই বিশেষ দিন লেখা থাকবে ফুরফুরে মুক্তির হাওয়ায় হাওয়ায় -- মা ।