ত্রয়ী

আসমা চৌধুরী



পাহাড় ঠেলা

অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে থাকা জারুল গাছটায় প্রায়ই ধাক্কা খায় সন্ধ্যার বাতাস। না, এখানে তেমন গাছপালা নেই। কয়েকটি চায়ের দোকান, প্রশ্রাবের জায়গা আর খুঁজতে বের হওয়া মানুষের মুখ।

জিয়া একটি অদৃশ্য কুড়াল দিয়ে কাটতে থাকে হিসেবের ডালপালা। পিঁপড়েগুলো থুথুর ভেতরে ডুবে যাচ্ছে, ধুলো উড়ছে। জারুলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস নিয়ে একটা কাতর শব্দ বের করে, শালা। বাদামি মাফলারটা ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে চিকন করে তুলে ওর মনে হয় এইবার ঘর ছাড়তে হবে।

মহিষের একটা শিং সারাদিন হৃদপিন্ডের ভেতরে উঠছে নামছে। আর একটা প্রকান্ড বোয়ালমাছের বড়শি ঝুলে আছে পরিবারের সদস্যগুলোকে বিঁধে রাখবে বলে।

সারাদিন কেটে যায় কাগজ কলম আবেদন আর নানা ঠিকানায়।খুঁজতে থাকে সম্ভব অসম্ভব। নিঃশব্দ দুপুরবেলা জারুলগাছটা ছাপাখানা হয়ে ওঠে। যেদিক ফেরানো যায় সেদিকই ছবি হয়ে যায়। জিয়া,চায়ের গন্ধে উতলা হয়ে গাছটিকে বলে, তুই সব জানিস।

কয়েকটি ছেলে এদিকে থাকে পেপারওয়েটের মত জায়গা দখল করে নিঃশব্দে। যেন পাহারা দেয় পাড়া। কিছু অপরিচিত যুবক ওদের কাছে আসে, একটু দূরে দাঁড়ায় আবার ফিরে যায়।

ছেলেগুলি কখনো উজ্জ্বল কখনো মলিন মুখে চা দোকানের টুলে সময় কাটায়। জিয়ার মনে হয় একটা গোপন অস্থিরতা ওরা কিনে রাখে নিজেদের পকেটে। জিয়া দোটানায় ভোগে ওদের সাথে হাত মেলানো যায় কি না। টেকনাফ হয়ে কিছু নিষিদ্ধ ঔষধ চোখের আড়ালে এখানে চলে আসে। ওরা এসবের জিম্মাদার। চলছেও বেশ।

জিয়া কাঠের টুকরোর মত ছড়িয়ে যায়।আবার কুড়িয়ে ওঠায়, নিজের ভেতরে গোছায়। আবার হারিয়ে ফেলে কোন আদি নেই অন্ত নেই। যারা পিঠে হাত রাখছে তারাও জানে না উঠবার মত আজ আর শক্তি নেই তার। পাহাড় ঠেলছে নিরন্তর।
মায়ের হার্টে পাঁচটি ব্লক। ডাক্তার বলছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা শুরু করতে হবে। কাকলি তাড়া দিচ্ছে কবে বিয়ে করবে?

জিয়া কাউকে বলতে পারছে না ওদের প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে। চাকরিটা আর নেই।


আমি

শহরের মানুষগুলো ঘাম কিনতে বের হয়েছে। দূর থেকে দেখে রুমালে মুছে ফেলি দাসত্ব। এই মুছে ফেলা আবিষ্কার করতে লেগে গেছে অনেক বিরতি অনেক হিসেব। কেউ যে পাশে থাকে না এসব জেনেও আর লাভ লোকসান নেই। জীবন তো কোন এক বিন্দুতে লিখে রাখে না অভিশাপ। মুছতে মুছতে জেনে যেতে হয় মুখোশের মুখ।
রাত বেড়ে যায়, ঘুমের চোখে ছিপি এঁটে খুলে দেই বর্ষাকাল। না ফেরা অনেক কিছুর মত হারিয়ে ফেলেছি চেনা সিঁড়ি, পথের ঘর, আর্শীবাদের হাত।

এখন দোকানের লোকদের সাথে অবলীলায় দরকষাকষি করি, বুঝে নেই হিসেব, বুঝে নেই ঠকামীগুলো। কিছু চেহারা কখনোই বিপরীত কিছু আশা করে না। এই যেমন আমি বারবার ঠকি। যেমন ঠকেছি তার কাছে। সে মানে আমার সঙ্গী। সোনার ডিমপাড়া হাঁস ভেবে এতদিন পুষেছে। আমি ভাবলাম পরস্পরের দিনযাপন, মিলিত উৎসব।

যখন ছেড়ে গেল, অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে থেকেছি। তাকিয়ে থেকেছি সর্বশেষ সংবাদটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে। সে আজ আর আমার কেউ নয়। আমি একা...
উঠোনভরা আকাশ ভেঙে, জ্যোৎস্নার পোশাক খুলে, সম্পূর্ণ উদোম আমি ছুটে যাচ্ছি। আজ আর নিজের হাত, পা, চোখ চিনতে পারি না। পাথর ভেঙে, পাথর সরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি দূর পর্বতে। ঐ খানে স্হিত হব। যে বাঁশি কৃষ্ণ বাজায়, সেই সুর আমিও জানি।

অতিক্রম

নেমে এলো নিঃশব্দ রাত্রি। পাহাড় উড়িয়ে চাপা পড়ে অনুভব, অন্ধকারে জেগে ওঠে পাহাড়ের ঘুম। পাহাড় কাঁধে নিয়ে মরে যায় বেঁচে থাকা। এখন নিজেকে লুকানোর খেলা ও ফাঁদ নতুন মুদ্রায় আসবে। পাড়ার কুকুরগুলোও ঘেউ করে ওঠে না এখানে। সবকিছু নিয়মের চেয়ে আলাদা, মানুষগুলোও। খোপকাটা ঘরগুলোতে একটানা গানের উচ্ছলতা রাগী যৌবনের কথা বললেও, আজকাল এসবেও কোন টান আসে না রক্তে। বরং কান রক্ষার প্রয়োজনে সবাই কানে আঙুল দিয়ে পালায়। তাসলিমা এইবেলার মত বাচ্চাটাকে বুকের দুধ খাওয়াতে বসেছে। এমনিতেই চরম বিরক্তি, বাচ্চার মায়ের রেট অনেক নিচে। পেটভরা মরণ ক্ষুধা। ওর পায়ের কাছে একটা লাল ব্রেসিয়ার ভাঁজ করে রাখা। কিছু প্রসাধনীও। বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে এখনই সাজতে বসবে। কিছু পুরানো মানুষ এখনো আসে ওর কাছে। ক’দিন ধরে কোমর আর পায়ের হাঁটুতে বেশ ব্যথা। মনে মনে গালি দেয় শুয়োর শরীরটাকে। মাঝের ঘরের সাথীর শরীরটা ভেসে ওঠে চোখে। তাসলিমা প্রশ্ন করে নিজেকে, শরীরই যদি উপায় তবে তা এমন হল কেন? কেন বারবার সে হারিয়ে ফেলে সেলাইয়ের সূতা। চুল ঠিক করে আয়নাটা ধরেছে চোখের সামনে। চোখের নিচে বেশ গর্ত হয়ে কালো হয়ে আছে। এখানটায় ভালোকরে রং মাখতে হবে। কান পেতে শোনে পাশের ঘরের ফিসফাস শব্দ। ঘুমন্ত ছেলেটা একটু নড়ে ওঠে। ওকে মাসির কাছে রেখে আসতে হবে দশ টাকা ভাড়ায়। কেউ বুঝে ওঠার আগেই ঝড়ো বাতাসের সাথে শুরু হয়ে যায় বৃষ্টি। ক্রুদ্ধ চ্যাচামেচি আর চিৎকার শুরু হয়। তাসলিমার গলা চিড়ে বেরিয়ে আসে শাপ শাপান্ত। কেউ কি আসবে আর এই ঝড় জলে? উঠে দাঁড়ায় ফের।আয়নায় রেখে আসে মলিন মুখ। দ্রুত বদলে নেয় নিজেকে, নিশ্চয়ই কেউ আসবে। কোমর কঁকিয়ে ওঠে, হাঁটু টনটন করে। বাচ্চাটার জন্মের পর এসব লেগে আছে। গোপন ইচ্ছেটা ধাঁ করে জেগে ওঠে। সামান্য জমা হলে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান দেবে। ছেলেটা বড় হবে। কেউ আসে দরজায়। পা তুলতে পারছে না। ঝুম বৃষ্টি, হয়তো কেউ এসেছে হয়তো কেউ না। কুকুরের মতো জিব বের করে শক্তি ফিরিয়ে আনে। উঠে যাচ্ছে অদৃশ্য শক্তিতে, উঠে যাচ্ছে....