উত্তরণ

শৌনক চ্যাটার্জী



১)
“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ক্যামনে আসে যায়।”
ভাষায়-সুরে বাউল আর বাঁকের মুখে সুরটাও ছিল চড়া। আর আজ আবার ওরা কেউ লেবু লজেন্সও খায়নি। বলা ভালো বাচ্চাটা তো আর পাহাড়ি বাবা পায়নি। ওরা বলতে সাড়ে তিনজনের কথা বলছি যাদের এক, দুই, তিন একটু অন্য রকম ভাবছে। আর একজন একটু গৌণ এ গল্পে, ‘আরে উ সাব জিইইইইই, নাস্তা পানি ইয়াহা পেহি কর লিজিয়ে’। একটা ফ্রুটি, দুটো ফ্যান্সি চকলেট কেক, আর দুটো সিগারেট at random। তারপর আবার সেই চিরাচরিত চলা, ভাঙা, ওঠা, পড়া; তবে আজকের ঝাঁকুনিগুলোয় ঠিক কিন্তু অভ্যস্ত লাগছে না ওদের তিন জনকেই। একই মনের ভিন্ন বয়সের রাত্রি, বিকেল, সন্ধ্যা, দুপুর অদ্ভুত ভাবে মিলিত হয়ে গেছে ভয়ে আর শিহরণে। ওরা পরিষ্কার ভাবে বুঝে উঠতে যাবে ভয় আজ ওদের সঙ্গী হয়ে উঠবে এ পাহাড়ে, কিন্তু বাঁকের মুখেই......... থাক, সেটা নিয়ে ফোলানো ফাঁপানো কেঁদে কোঁকানো ঠিক উচিৎ হবে না। কেন সে প্রসঙ্গে ঢুকতে যাব না, যখন তা ব্যক্ত হওয়া শুধুই কিছু সময়ের অপেক্ষা।
ওই উড়ে যায় রক্তিম ঘোষ; দুই নারীময় জীবন, উদ্বেগ আর রাতের আগে বুজে আসা ক্লান্ত চোখযুগল, আর গা গুলিয়ে ওঠা আনন্দ- প্রাত্যহিক ৫০০০ আর বছর শেষে সবাই ভালো আছি এই Chevrolet এ চেপে পাতি স্পাইরাল পাহাড়। তবে আর চলা হল না, ‘উড়তেই চেয়েছিল রক্তিম’। আম্রপালি ঘোষের বিষয় অবশ্য sociology হলেও মনে প্রাণে উজার হয়েছিলো। তার প্রাণের স্পন্দনটা যাতে ঘোষোময় না হয়ে ওঠে তার প্রচেষ্টা। কিন্তু ওই যে আর দেখা যায় না- আম্রপালি তো পাহাড়ে এক বার ও............
বেড়ে ওঠা স্পন্দন-দাঁরাও গল্প অনেক বাকি। স্পাইরাল রাস্তার, এক ধাপ নীচ থেকে ওই যেন ওরা দেখে তারা খসা। চোখটা কচলে নেওয়ার মুহূর্তেই ওদের বৃত্তের হৃদয়ে স্পন্দন।
“প্লিজ কাঁদিস না তুই আজকের দিনে, বিশ্বাস কর একটুকুই আনন্দ বেঁচে আছে আমাদের জীবনে আর। জানিস ইচ্ছে আছে আমরা কত দুনিয়া ঘুরে আসব, কতটুকুনি যে পেরিয়ে এলাম; তুই আমাদের সঙ্গেই জন্নতের শেষ ধাপ পেরোবি।”
“এ দেশের ওপর আমাদের ভরসা নেই, শুধু মাটি টা যে আমাদের সেটুকুই মানি। কতটা দায়িত্ব......”
“কাস্ত্রো পারলো, আরনেস্তো চে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াল; আমাদের পরাধীনতার দিন শেষ হয়ে যাবে ঠিক আমাদের জেন টার মৃত্যুর সাথেই।”
“তাই আমাদের সাতজনের শেষ যৌথ হ্যালুসিনেসন ভ্রমণ কাহিনীর সাক্ষী হয়ে দাঁড়ালে তুমি। এরপর মোদের নিবেদিত প্রাণ, তুমিও চলছ কিন্তু আমাদের এই আপেক্ষিক ভ্রমণে, আমাদের বন্ধু হয়ে। নাম কি তোমার”
- স্পন্দন ঘো.........
“বাকিটা ওই প্রান্তে দাঁড়িয়ে বলবে। যেদিন হবে। আজকে শুধু তোমার নাম টুকুই প্রেরণা-উদ্দেশ্য ”
“ইউরেকা, তুমিই পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য, আমরা সাতজন ক্যাপ্টেন কণাদ ভরচাজ হতে রাজি আছি। তুই এদেশের হৃৎপিণ্ড, তুই ডাকবি কোন স্বরে??? ”
যে ছেলেটা ওদের মধ্যে প্রথম দেখেছিল ওই আট-দশ বছরের ছেলেটার অদ্ভুত অস্বাভাবিক আগমণ ও গান ধরে উঠলো-
“ বল বল বল সবে, শত বিনা বেণু রবে; ভারত আবার জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন ও লভে”
সমবেত ভাবে প্রতিধ্বনিত হওয়ারই ছিল-
“কর্মে মহান হবে, ধর্মে মহান হবে।”
অবিশ্বাস্য কিন্তু স্পন্দন একবারও কাঁদেনি। অতএব আবার পাহাড়ি রাস্তা ভাঙা শুরু সেই ৪০৭ গাড়িটার। আপাতত ওই লাগাও গাড়ি, মারো দম, আজ শুরু, আজ শেষ, মানালি কা হ্যায় ইয়ে স্টাফ, মস্তকে খেলে যাওয়া মেঘ, বরফ ভাঙা রামধনু ইত্যাদি দেখতে দেখতেই ঘুরে গেলো কিছু বছরেই কার্ল মার্কস, লেনিন, কবি সুভাষ,বিবেকানন্দ পড়ে ওঠা একটা ছেলের চোখের সামনে দিয়েই। পার্টি আন্ডারগ্রাউন্ড তখন। ও আসল দাগী, বাকিরা দেশদ্রোহী। দেশের ঘোষণা অবশ্য সাধারণ মানুষের মনের ভয়কে সাহসে উত্তরণ করানোর সময় চলা তো কি এমন ব্যাপার। এমারজেন্সি তো আগেও দেখেছে গণসংগীত- হোক কলরব দেখছে, তবে পারছে কি এখন? তবে স্পন্দন তো পারছে, ওকেই পারতে হবে-হচ্ছে। ও লড়ছে।


কিন্তু ধারে দাঁড়িয়ে খাদ দেখার অভ্যাস তো আর ওর কাছে নতুন কিছু নয়। থাকে শুধু স্মৃতি; সেটা না রাখতে শেখার শিক্ষাও পেয়ে গেছিল এই গল্পের গতিপথের মধ্যেই। আর রোহণ-খোকন-টিনারা প্রস্তুতই হয়েছিলো ওর জন্যে-গিরগিটি গিরগিটি মনোভাব দেখাবে বলে। টিপ্পনীর মত শোনালেও ও বুঝে গেছিলো-চামড়ার নেশা খুব ভয়ঙ্কর যতটুকু কাজে লাগে ততটুকুই। আর এক বিপদ হল, ধোঁয়া-জলে মাখা ভেসে যাওয়া দেশের হাওয়া। ওই হাওয়া খেয়ে যে হাজার হাজার জ্ঞানের ভিখারি রিহ্যাবিলেশন সেন্টারের কাঙাল হয়ে থেকে গেলো। ঋত্বিকের শরীরটা বোলপুর রোড এর গরমে আর ইলেক্ট্রিক সহ্য করে মুখে ফ্যানা এনে ফেললো। স্পন্দন সব জানত; কিন্তু স্পন্দন নামের বালকটি অবশ্য পুথিগত, ভিডিয়োগেমগত, রবীন্দ্রনাথ, আর্ট-ফিল্ম এই সব কচকচানিতে কোনোদিন ফাঁসেনি বা ফাঁসতে দেওয়া হয়নি। শুধু আর সরকারী বাপের বেসরকারি বেলেল্লা সন্তান- সেটা বোধয় ওর লিখনে ছিল না।
উঠে দাঁড়িয়েছে সে, খাদের বোধহয় বয়স হয়ে গেছে; খাদ নিজেই সরে গেছে সেই যুবকের বুক থেকে। যুবক আলাদা ভাবে লড়ছে, বোঝা যায় রণকৌশল উঁকি দেয় বুদ্ধির গড়ায় ক্ষমতার। যুবক বাঙালির মুখ, কেউ কেউ বলছে সে সততার কাচ্চি ঘানি, এ যুগের কাণ্ডারি, ‘ছোঁরাটার চলন বলন, সিগারেটটা খাওয়ার কায়দাটা দেখেছ; আরে, হাঁটুর বয়সী ছেলেমেয়েগুলো হঠাৎ এ দেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করেছে অদ্ভুতভাবে। আর থেকে থেকে বলে উঠছে ও নাকি চে গুয়েভারা। তবে এটা সত্যি ন্যূনতম অ্যাঙ্গেল থেকে হলেও ছেলেটাকে অন্যদের দলে ফেলা যাবেনা, ও বাকিদের মতো এতো সহজেই দরকচে যাবেনা, আর বাকিটা...honesty-র ধ্বজাটা তো সময় ই ওড়াচ্ছে ওরাই নামিয়ে নেবে। এদেশে তো কত honesty দেখে নিলাম।’ এই ধরণের কথা প্রাকৃতিক, যদি ESTABLISHMENT কে উড়িয়ে দেওয়ার সুর হাওয়ায় মিশিয়ে দেওয়া থাকে। স্পন্দন এসবে কান দিত না, তবে এসব যে চলছে সেই খবরটা ওর কানে আসার পথটা খুব একটা কঠিনও ছিলনা। তবে কি জানো, যে ছেলেটা খাদে পড়লনা, বাকি দুটোর মতো অস্বাভাবিক ইতি ঘটলনা, ৪০৭ এ বসে জীবনের নিয়ম মেনে নিলো; খাদ থেকে পার্লামেন্ট- জার্নিটাতো সহজ হবেনা ওর জানি, তবে এও তো এক উত্তরণ। ও, ইতিমধ্যে বলে দেওয়া শ্রেয় যে স্পন্দন জানিয়েছে তারা কোন রাজ্যের জন্য লড়বেনা। তাদের দাবি আকাশছোঁয়া আর দিল্লীও বেশি দুরে নেই তাদের কাছ থেকে। সারা ভারত চেগে ওঠা শেষবার কবে দেখেছিলাম আমার মনে নেই। এখন দেখতে পারছি, মানে অনুভব করতে পারছি এই যুদ্ধটা; কত শপথ বাক্যের ছড়াছড়ি, কত ইচ্ছের অঞ্জলি, বাকিদের জলাঞ্জলি, সব শেষে কারোর রাজা হয়ে যাওয়া, রক্ত গুলো মুছে হাত রাখে সিংহাসনে। কিন্তু এ যুদ্ধের শেষটা অন্য, এখানে আমরা সবাই রাজা, আর সিংহাসন রক্ত এইসব concept ভুলে যা আপাতত খালি জানবি যে পুরো দেশটাই সাজাতে হবে ওই লাল গোধূলির মতো, ওই লালে অনেক সম্পর্ক সহজ হয়ে যায়, আর রোজকার মনের উত্তরণ-অবতরণের সাক্ষি হওয়া যায়।
সব তো হল। কিন্তু সেই মানুষটি কেমন আছেন? না, ও সামাজিক ভাবে বা রাজনৈতিক ভাবে কেমন আছে তা জানতে কিঞ্চিত আগ্রহও দেখাচ্ছিনা। আসলে ওর মন কেমন আছে সেরম টা কেউ আজকাল আর ওকে জিজ্ঞেস করেনা। এটা স্পন্দন বুঝতে পারে, দুঃখ পায় কিন্তু যতই হোক এখন তার বড় হওয়ার সময়, কি নেই তা ভেবে ঠিক দুঃখ করতে ও পারবেনা। খালি ওর মনের একটু গভীরে চলে গেলে বুঝতে পারা যায় নদীটা কত খরস্রোতা। একের পর এক জলপ্রপাত, পাথুরে মাটি, ৩০০ ফুট নীচে পড়ে থাকা গাড়িটা যাকে ও একটি বারের জন্যও দেখেনি, শুনেছে। তো এবার বলো স্পন্দন, হতে পারে তুমি প্রধানমন্ত্রী হবে, শপথবাক্য পড়ার সময় যখন চিৎকার করে নিজের নামটা বলার সময় একবার ও কি তোমার গলা ভাঙবেনা? স্পন্দন অতি দ্রুতগতিতে বলে ওঠে ‘না...’ আর আওড়াতে থাকে বন্ধ ঘরের মধ্যে পাগলের মতো-
“Cowards die a many times before their death.
valiants never tastes of death but once.
the lion that liveth in me shall not bow down to a hermit liketh of you.
You may kill me a million times but I shall liveth all along in history.”
‘আমি ওই সাতজনের তৈরি। কিন্তু আমি ওদের জন্য চেয়েও কিছু করতে পারিনা। ওরা সত্যিই শহীদ হয়ে গেলো বেঁচে থেকেও। আমি শুধু অযথা পাথরের মতো চেয়ে রইলাম আর জুলিয়াস সিজার আওরালাম।’


২)
ঘামতে ঘামতে ঘুম থেকে উঠে আসে স্পন্দন ঘোষ। কি দেখল এটা সে, স্বপ্ন? সকাল হয়েছে, একটু হুঁশ ফিরতেই বুঝতে পারে যে এটা তারই জীবনের সত্যিকারের লাইনগুলো-একটু গোপনীয়, একটু uncensored, not to be telecasted কিন্তু তাও সে এটাকে অস্বীকার করতে পারবেনা স্পন্দন।
আগের রাতে দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পরে সেলিব্রেশন মাফিক হ্যালুসিনেসন টা সামান্য বেশি হয়ে গেছিলো। সাতজন এর স্মৃতি আজও দগদগে জীবন্ত ওর কাছে। হ্যালুসিনেসন নাকি তাদেরই স্মৃতিচারণ। এসব দেখে আমার এখনও মনে হয় স্পন্দনের পাদুটো মাটিতেই আছে, আর সে আদর্শ ভোলেনি। তবে ওর প্রোফাইলে আজকাল অনেক গুনাগুণই লেখা হয়ে থাকে। একবার দেখে নেবেন নাকি? আচ্ছা সময় কি বলছে ওর ব্যাপারে সেটা তো দেখে নিন।
স্পন্দন ঘোষ দেশের প্রথম বাঙালি প্রধানমন্ত্রী তাও আবার ২৭ বছর বয়সেই। বছর তেত্রিশের এই যুবক দ্বিতীয়বারের জন্যও নির্বাচিত, দেশের অধিকাংশ যুবক যুবতীর কাছে তিনি style icon, আবার অভিজ্ঞদের মতে তিনি নাকি দেশে একটা revolution ঘটিয়েছেন। তার জমানায় সুখের শেষ নেই, বাতাসে ভুরিভুরি স্বাধীনতার গন্ধ। বিরোধী থেকে বিলিতি কারো মুখেই তার সততা-অসততা নিয়ে এখনও কোনও কথা ওঠেনি ইত্যাদি ইত্যাদি............