পাহাড় প্রমাণ জীবন দর্শন:ফ্রেডরিকনিৎসে

সীমা চৌধুরী



“On the mountains of truth you can never climb in vain: either you will reach a point higher up today, or you will be training your powers so that you will be able to climb higher tomorrow.” সত্যের পাহাড়ে আরোহণের সময় ব্যর্থতার কোনো অবকাশ নেইঃ হয় আজ তোমার উত্তরণ হবে আরো উঁচু কোনো বিন্দুতে, অথবা তা তমাকে শক্তিশালী করে তুলবে আগামীতে আরো উচ্চতর কোনো বিন্দুতে উত্তরণ লক্ষ্যে।।
যিনি সনাতন মূল্যবোধ ও বিশ্বাস পরিত্যাগ করে অনায়াস দক্ষতায় আরোহণ করতে প্রয়াসী হন সত্যের পাহাড়ে; তাঁর জীবনদর্শন মানবিকতা কেও অতিক্রম করে অনুধাবন করতে সচেষ্ট হয় এক স্বাধীন আনন্দ অনুভূতির। অনুসন্ধান করে চলে মুক্তির। তাই প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজকের সন্তান হয়েও স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারেন, “যদি খ্রিষ্টধর্ম মানে হয় এক ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনার প্রতি আস্থা, আমার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এর অর্থ যদি হয় মুক্তির প্রয়োজন আমি েকে আগলে রাখতে রাজি।” ইনিই হলেন নিৎসে, ফ্রেডরিক নিৎসে। যিনি ধর্ম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, “ঈশ্বরের মৃত্যু”।
১৮৫৫ সালে তাঁর পরম ধার্মিক বোন এলিজাবেথ কে লেখা চিঠিতে তিনি লিখছেন, “মানুষের পথ বিভক্ত: যদি তুমি আত্মার শান্তি ও আনন্দ কামনা কর তাহলে তুমি বিশ্বাস কর; আর যদি সত্যের অনুরাগী হও তাহলে অনুসন্ধান কর।”
(“Hence the ways of men part: if you wish to strive for peace of soul and pleasure, then believe; if you wish to be devotee of truth then enquire..”)
সত্য কে জানার জন্য, ‘মুক্ত শক্তি’ আর ‘বিশুদ্ধ ইচ্ছাশক্তি’-র আনন্দকে উপলব্ধি করবার জন্য যে কোনো মূল্য দিতে তিনি প্রস্তুত। তিনি একাকী হেঁটে চলেন নির্জন, নিস্তব্ধ, অভিশপ্ত মৃত্যু উপত্যকায়। শুনতে পান নিঃশব্দের প্রতিধ্বনি। বলে ওঠেন “যন্ত্রণা ....যা আমাদের দর্শনের চূড়ান্ত গভীরতার দিকে ঠেলে দেয়, আর খসিয়ে দেয় সমস্ত ছদ্মবিশ্বাস,যেখানে আমরা স্থাপন করেছিলাম মানবতা। আমার সন্দেহ আছে যন্ত্রণা আমাদের উপকার করে কিনা, কিন্তু আমি জানি তা আমাদের গভীরতা দেয়।” ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ক্ষত বিক্ষত আত্মায় রোপিত হয় বিষণ্ণতার বীজমন্ত্র। আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন ‘বিষণ্ণ দার্শনিক’ শোপেনহাওয়ারের ‘will’-এ।
শোপেনহাওয়ারের ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাজ উইল অ্যান্ড আইডিয়া’র বিমূর্ত বিষণ্ণতা গ্রাস করে তাঁকে। শোপেনহাওয়ারের মতবাদ(Doetrine),যা কিনা নিৎসের কাছে পাশ্চাত্য বৌদ্ধিকতা ছাড়া আর কিছু নয়, সেখান থেকে তিনি শিখলেন কিভাবে বিচ্ছিন্নকরণ সম্ভব নিজেকে ইপ্সা আর কামনা থেকে, কিভাবে নিজেকে দেখা যায় অনেকটা দূর থেকে। উপনীত আত্মোপলব্ধির প্রথম স্তরে। শুরু হলো সত্যের পাহাড়ে আরোহণের প্রথম পদক্ষেপ।
শোপেনহাওয়ারের প্রভাব নিৎসের উপর ছিল সুদূরপ্রসারী। সেটা তিনি স্বীকারও করেছিলেন নির্দ্বিধায়। “শোপেনহাওয়ার অ্যাজ এডুকেটর” প্রবন্ধে নিৎসে স্পষ্টভাবে জানালেন,শোপেনহাওয়ার হলেন সেই অতিসীমিত চিন্তাশীল দার্শনিকদের মধ্যে একজন যাঁদের তিনি শ্রদ্ধা করেন। শোপেনহাওয়ারের মতই তিনিও অনুরাগী ছিলেন ফরাসী দার্শনিক লা রোশেফুকোর। রোশেফুকো সম্পর্কে বলেছিলেন, “তিনি হলেন মনোবিশ্লেষণের সেই গুরু যিনি অন্ধকারেও লক্ষ্যভেদ করতে পারেন।”
দিনটা ছিলো ১৫ই অক্টোবর ১৮৪৪। লাইপজিগের কাছে প্রুশিয়ার রোকেনে ধর্মযাজক কার্ল লাডউইগ নিৎসের ঘরে জন্মাল এক পুত্র সন্তান। সেদিন প্রুশিয়ার তৎকালীন সম্রাট চতুর্থ ফ্রেডরিক উইলিয়ামের উনপঞ্চাশতম জন্মদিন। তাই সম্রাটের নামানুসারে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজক তাঁর সন্তানের নাম রাখলেন ফ্রেডরিক।কে জানত, ধর্মযাজকের এই ছেলেই একদিন ঘোষণা করবে ‘ঈশ্বরের মৃত্যু’র।সৃষ্টি করবে ইতিহাস।
শৈশবে পিতৃহারা হন নিৎসে।তাঁর যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স তখনই মস্তিষ্কের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণত্যাগ করলেন কার্ল নিৎসে।নিঃসঙ্গ একাকী পথ চলার সেই বোধহয় শুরু। নিৎসে মূলত লালিত পালিত হতে থাকলেন মাতামহের তত্ত্বাবধানে। আর সেই সঙ্গে সঙ্গী হয়ে উঠল শিলার, নোভালিস, হফম্যান, শোপেনহাওয়ার আর রোশেফুকোর দর্শনের বই। ভয়ঙ্কর খাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন এক আগ্রাসী বিষণ্ণতায়। স্বপ্ন দেখলেন অনন্ত মহাজীবনের। খাদের কিনারা থেকে ফিরে এলেন ‘মুক্তশক্তি’ আর ‘বিশুদ্ধ ইচ্ছাশক্তি’রঅনির্বাণ মশাল হাতে। আর সেই আগুনের তাপে গলে গেলো সহস্র বছরের জমে থাকা স্তুপীকৃত বরফের চাই।
মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে বাজেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ল্যাসিক্যাল ফিলজফির চেয়ার প্রফেসর পদে অধ্যাপনা শুরু করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করা কালীনই প্রকাশ করলেন তাঁর প্রথম বই “ট্রাজেডির জন্ম”(The birth of Tragedy)। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হল অ্যাপোলোনীয় ও ডায়োনিজীয় ভাবনার। নিৎসে বোঝালেন, শোপেনহাওয়ারীয়ান জাজমেন্ট অনুসারে সমস্ত কিছুর প্রাথমিক অভিব্যক্তি হল সঙ্গীত।
গ্রীক অতিকথার দুই দেবতাকে নতুন করে আবিষ্কার করলেন তিনি। প্রথমজন হলেন ডাওনিসাস। যিনি মদ ও হর্ষোচ্ছাসের দেবতা। সমুচ্চপ্রান শক্তির উদ্গাতা।সঙ্গীত নৃত্য ও নাট্যকলার দেবতা। আর দ্বিতীয় জন হলেন অ্যাপোলো। তিনি হলেন শান্তি ও অবকাশ, ভাবগম্ভীর যুক্তিশীলতা, দার্শনিক স্থিতাবস্থা, স্থাপত্য- ভাস্কর্য শিল্প ও মহাকাব্যের দেবতা। এক নতুন আলোকে স্থাপিত হল অ্যাপোলোনীয় ও ডায়োনিজীয় ভাবনার সুসংবদ্ধ মেলবন্ধন।
ডায়োনিজীয় চিন্তাধারাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন নিৎসে। দ্বিধাহীন ভাষায় ঘোষণা করলেন, সক্রেটিস উপলব্ধিই করতে পারেননি ডায়োনিজীয় ভাবনার। তিনি শুধু বুঝেছিলেন অ্যাপোলোনীয় আবেগকেই। একই তত্ত্বে নিৎসে যাচাই করতে চেয়েছিলেন অন্যান্য দার্শনিকদেরও। শোপেনহাওয়ার ছাড়া এই মাপদন্ডে কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এই ডায়োনিজীয় আবেগের প্রভাব তাঁর ওপরে এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, ফসিমা ভাগনার-কে লেখা প্রেমপত্রে স্বাক্ষর করলেন ডাওনিসাস নামে। এক দিব্যোন্মাদের অনন্ত জীবন প্রবাহ কে অনুসন্ধান করবার আবেগঘন প্রয়াস।
চিরনিঃসঙ্গ তিনি। সেই শৈশব ও তারুণ্য থেকেই নিঃসঙ্গতাই তাঁর চিরসঙ্গী। শুধু শোপেনহাওয়ার আর অল্প কিছুদিনের জন্য রিচার্ড ভাগনার ছিলেন তাঁর বান্ধব। সঙ্গীতকার ভাগনার থাকতেন বাজেলের কাছাকাছি ট্রিবশনে। একটা সময়ে যথেষ্ট অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে নিৎসে ও ভাগনারের মধ্যে। তাঁর ‘ট্র্যাজেডির জন্ম’ বইতে নিৎসে যেমন ভাগনারকে অভিহিত করেছিলেন ‘নতুন যুগের দেবদূত’ বলে তেমনি ভাগনারও বইটিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এক মহাগ্রন্থ বলে।
এই নিঃসঙ্গতা নাকি বা হয়তো আত্মপ্রেম,দার পরিগ্রহ করা থেকেও বিরত রেখেছিল তাঁকে। ১৮৮২-র গ্রীষ্মে বান্ধবী লু সালোমের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। কিন্তু গ্রীষ্মের উত্তাপ পারেনি নিৎসের এই প্রেমে উষ্ণতা আনতে। নিৎসের প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন সালোমে। সে বছরের শীতেই সম্পর্কেও আসে শীতলতা যার অনিবার্য ফলশ্রুতি বিচ্ছেদ।
শরীর ভাঙ্গতে শুরু করলো। ততদিনে ছেড়ে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি। এক নতুন উপলব্ধির শুরু হল, শক্তিই অনন্ত সুখ। সৃষ্টি হল ‘দাস স্পোক জরাথ্রুস্ট’।নিৎসের জরাথ্রুস্ট বয়ে আনল নতুন ভাবনার দিশা। আবির্ভাব হল য়্যবেরমেনশ(ubermensch)-এর। ইংরেজি পরিভাষাতে যার অর্থ হল ‘সুপারম্যান’ বা ‘ওভার ম্যান’ বা ‘সুপারহিউম্যান’। জরাথ্রুস্ট- বলেছিলেন, “আমি তোমাদের সুপারম্যান শেখাচ্ছি। সে মানুষকে অতিক্রম করে যাবে। তাকে অতিক্রম করবার জন্য তুমি কি করছ?(I teach you over man. Man is something that shall be overcome. What have you done to overcome him? )”
নিৎসেবিশ্বাস করতেন সুপারম্যান- এর পক্ষেই সম্ভব বিশাল জীবন প্রবাহকে অনুসন্ধান করবার। তাঁর সঠিক মূল্যায়ন করবার। কারণ সে নির্ভর করে প্রবল ইচ্ছাশক্তির ওপর। অনন্ত সংগ্রামের মাধ্যমে একমাত্র মানুষই পারে জীবনের জয়গাঁথা গাইতে। পাথরের দেবতার পক্ষে তা সম্ভব নয়।
পাশ্চাত্যের প্রায় সমস্ত দার্শনিকের চিন্তাপদ্ধতির মধ্যে নিৎসে খুঁজে পেয়েছেন শুধু সীমাবদ্ধতা। কান্ট, হেগেল, ডেকার্তে, প্লেটো, মিন, স্পিনোজা কেউ বাদ যাননি। অনন্ত মহাজীবনের চরম মূল্যায়নে এরা প্রত্যেকেই ব্যর্থ।
১৮৮৯-এর জানুয়ারি মাস থেকে মানসিক অবসাদ গ্রাস করল তাঁকে।তারতম্য শুরু হল মানসিক ভারসাম্যের ও। দীর্ঘ সময় ধরে মাইগ্রেনের যন্ত্রণা আর অ্যাসিডিটিতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে যেতে লাগলেন। প্রতারণা শুরু করলো দৃষ্টিশক্তি। ডিনামাইট যেমন চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলে পাহাড়ের শিলা; মানসিক অবসাদও খান খান করে দিতে থাকলো তাঁকে।
ঈশ্বরের মৃত্যু ঘোষণা করে আবাহন করেছিলেন এক নতুন শক্তির; চিত্রায়িত করেছিলেন ঈশ্বরহীন এক আধুনিক মহাজীবনের প্রতিচ্ছবি। তাঁর আত্মকথা ‘একে হোমো’(Ecce Homo)(১৯৮৮) তে তিনি স্পষ্ট লিখলেন, “যেসব মূল্যবোধকে উপাসনা করা হয়েছে তার উল্টোটাই মানুষের অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ আর ভবিষ্যতের মহৎ আবিষ্কারকে নিশ্চিত করতে পারে।” চিন্তাধারার নিজস্বতাই তাঁকে করে রেখেছিল চিরনিঃসঙ্গ। তিনি একাকী; কিন্তু অনন্ত শক্তির অধিকারী। যখন সুস্থ থেকেছেন তাঁর ভাবনা, তাঁর মেধা, তাঁর চিন্তাপদ্ধতি পাহাড়ের চূড়ার মতই গগনচুম্বী হয়েছে।
অবশেষে ১৯০০ সালের ১৫ই অক্টোবর থেমে গেল পথ চলা। যে সত্যের পাহাড়ে একাকী আরোহণ তিনি শুরু করেছিলেন শোপেনহাওয়ারের বিষণ্ণতাকে সাথে নিয়ে; অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে, পথ দেখালেন ক্ল্যাসিকাল ফিলজফি থেকে পোষ্ট মডার্ন ফিলজফিতে উত্তরণের। দিশা দেখিয়ে গেলেন এক নতুন ভাবনার, এক নতুন চিন্তাধারার। তাঁর চিন্তাধারা যেন পাহাড়ের বাঁধভাঙা খরস্রোতা নদীর মতই দুর্দম, দুর্বিনীত। পাহাড়ের মতই তিনি নিঃসঙ্গ, পাহাড়ের মতই তিনি বিশাল, যা কিনা অবলীলায় ম্লান করে দেয় মহাকাব্যিক বিশালতাকেও।দ
“পাহাড়ের ধূসর স্তব্ধতায় শান্ত আমি,
আমার অন্ধকারে আমি
নির্জন দ্বীপের মতো সুদূর, নিঃসঙ্গ।”