রংধনু-মাছপাখি: পাহাড়ের পথ বিভ্রম

নুরেন দূর্দানী



সারা রাত্রি ঘুমিয়ে আবার ঘুমোই। স্বপ্নিল মুহূর্তে পাহাড়ের চূড়ায় পা ঝুলিয়ে বসে মেঘকে মুঠোবন্দি করি। পৃথিবীর সব গল্প সারি সারি পাহাড়ের গায়ে জাহাজ হয়ে ভিড়ছে। প্রশ্ন-উত্তর ইকো হয়ে বাতাসে ভাসছে। আমার খুব করে জানতে ইচ্ছে করে পাহাড়ের শৈশব-কৈশোরের গল্প। তার কিছু আগেই ভোরের ঘুম ভেঙ্গে, কু-ঝিকঝিক শব্দের বিলাপে পাহাড়ের পাতালে প্রবেশ করেছে রেলগাড়ি।

পালানোর রাস্তা তবে পাহাড়ে গিয়ে ঠেকেছে। পথের উৎস শেষে, কত রক্ত আগুনের মতো দপাদপি করে নিভে যাচ্ছে। কতটা শান্ত থাকলে শান্তি অনুভব হবে জানা নেই। তবে পুরোনো অভ্যেস, পৃথিবীর বুকে যে সিঁড়ি পথ তা ডিঙ্গাতে যত ভয়। আমিও নাছোড়বান্দা। সমাপ্তির কোন ছন্দ জুড়োয়নি বরং গল্প বলি চোখ বন্ধ করে...


শ্রীমঙ্গল।
বাংলোর ব্যালকনিতে সন্ধ্যার টিমটিম আলো। দিদা আর কাকুর সন্ধ্যার পর রোজকার হাঁটার অভ্যেস। তুমি সেখানে অদৃশ্য অতিথি, আমি সুখতারা আর খেলার সাথি খুকুমনি। ব্যালকনির প্রবেশ পথে একটা ইজি চেয়ার, জ্যৈষ্ঠের। এখানে পরিচয়ের পালা শেষ!
সন্ধ্যার বাতাসে কাঁঠালচাপা আর ভেজা শুকনো পাতার ঘ্রাণ। বড় বড় লিচু গাছ বাংলোর বাগানে। ঝোপে ঝিঁঝিঁর ডাক। খুকুমনি আর আমি কাকুর হাত ধরে হাঁটি। দিদা কত গল্প বলে যায় আর আমরা অন্ধকারে দিদার আঁচল ধরে উঁকি টুকি খেলি। কাকু আর দিদাও গল্প বলে ওদের মত করে, কোন এক লাল পাহাড়ের। ততক্ষণে লিচু গাছের অন্ধকারে জোনাক পোকা মিটমিট করে নাচে। দিদা আর কাকু জ্যৈষ্ঠের নাম বলে কেমন চুপ করে থাকে। খুকুমনি জোনাক পোকার ধরবার বায়না করে। তারপর...... তারপর স্মৃতিপথের সেই সন্ধ্যার দৃশ্যে অন্ধকার!

পাহাড়ের ঘোর নিয়ে বসে থাকি ঘুমে। তরঙ্গের ফুঁতে উড়ে যায় চুল। গল্প ফুরোয়নি।
শ্রীমঙ্গলে বৃষ্টি শেষে, ফড়িঙবেলার কোন এক উত্তপ্ত দুপুর। জুতো-চটি ছিলো না পায়ে। দ্যুতিদের চারতলার ছাদ দিদার পিছু পিছু উঠে যাই। তখনই পা পুড়ে ছাই। নিজস্বতায় সহ্য হয় নিজ থেকে অন্যায়!
আমি আর রোদ্দুর খেলে যাই। দিদা ভেজা কাপড় নিংড়ে মেলে দিচ্ছে। বালতির তলার পানি, আমি দু'হাত ভিজিয়ে খেলি। দিদার অগোচরে ভেজা কাপড় মুখে ঘষে রোদ্দুরকে আরাম দেই। হঠ্যাৎ দিদার চিৎকার 'ঐ দেখ, সর্বনাশ! সর্বনাশ!'
আতঙ্কিত রোদ্দুর আর আমি। দিদার আঙ্গুল কম্পাস বরাবর তাকাতেই দেখি, দূরবর্তী সবুজ পাহাড়ের কান্নার জলে ভিজছে হাতি আর এক ঝাঁক রংধনু-মাছপাখি!


মধ্যাহ্ন

পাহাড় এবার ছুঁই ছুঁই। ঝরা পাতার মৌসুম। বিকেলের হাওয়ায় লাল পাহাড়ের দেশে ডুবে যাচ্ছে কমলা সূর্য। প্রাণ ভোমরা বাঁচতে শিখছে সবুজ অরণ্যে। অথচ নিয়ম করে প্রত্যেকদিন একটু একটু করে অরণ্যের রঙ বদলায়। পথের বাঁকে জীবনও থেমে নেই। কত যুদ্ধ না লেগেছে এঘরে ওঘরে। আপন ঘর সেখানেও বৃত্ত গড়েছে।
ক্ষতের চিহ্ন ঢেকে দিতেই তবে মহুয়ার হাওয়ার ধুলো উড়ে। যে হাত বুঝতে চায় কান্নার রঙ, সে হাত যে বোঝেনি ক্ষতের মৃত্যু। এই হয়তো উঁচু নিচু দুর্গম পথ। নিঃশ্বাসের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে ক্রমশ ধেয়ে আসা রাত। খসে পড়ছে সুখপাখির পালক। ঝরা পাতার পথ নৈঃশব্দে অতিক্রম করে সাপ। পাহাড়চূড়ার শেষ আলোয় উড়ে যায় দূরগামী সবুজ টিয়া। নম্রতার উত্তাপে বরফগলা জল কেঁদে ওঠে। অন্তিম স্পর্শে পরিণতির পথ তবে মুক্তঝরা ঝর্না। গোপন নাম পাহাড়ের কান্না!


অপরাহ্ণ

যে গল্পটা যোগাযোগ এর বাইরে বলে বর্হিভূত সেই গল্পটা অদৃশ্যলোকে তোমার হোক। রাতের আকাশের রংধনু ঘেঁষেছে। এখানে সোডিয়ামের আলো নেই। শুধুই পাশাপাশি ছায়া। অকৃত্রিম শৈশব যার কেটেছে নাটাইয়ের সূতো ছিঁড়ে প্রত্যাখানের। তার কৈশোর গড়েছে পালা বদলের সীমান্ত জুড়ে। কোকিলের ডাকেই তবে ধ্যান জুড়ে প্রেম। ক্লিক ক্লিক ফ্রেমের হাসি মুখ যখন নৈঃশব্দের কান্নায় রূপ নেয়; তুমিও বুঝি আয়নার পিছনে মুখ লুকাও। তবে এসো, গোপন আলিঙ্গনে আমরা পুতুল খেলি মুখোশের আড়ালে।

মৃত নগরের বুকে কান পাতলে হাহাকার জড়ানো বিচ্ছেদের সুর, নুপূরের খিলখিল হাসি। আর পাহাড়ের বুকে কান পাতলে অনুভূতির গল্পের বুনন মিশ্রিত … তবে এবার কাগজের নৌকো ভাসাই ইথারে ইথারে। পৃথিবীর কক্ষপথে গেঁথে দেই চরকি ফুল। বাতাবিলেবু বনে শুয়ে রঙ্গিন কাগজে চিঠি লিখি আপন সুখ তারার কাছে। অতঃপর উত্তরবিহীন ঠিকানায় খুশি মনে ফানুস উড়াই। সব ভুল কুচি কুচি করে উদযাপন করবো জন্মগত উৎসব। পৃথিবীর আকাশে নামছে সহস্র রঙের ঝিকিমিকি কোলাহল। হিম হিম বাতাসের মেঘ আসছে... ভুলো না পাহাড়ের পথের বিভ্রম!
শুনছো; কেউ ডাকছে......