পাহাড়ী বাঁকের চুপকথা

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়



ট্রেনের জানলা দিয়ে প্রথম পাহাড় দেখেছিলাম। মেঘ ছাড়াও আকাশের অত ওপরে আরও কিছু হয়... ধূসর নীল... বিস্তৃত। তারপর পাক খেতে খেতে ওপরে ওঠা... নিচে নামতে নামতে সমতলকে মেঘের নিচে চলে যেতে দেখা। সে অবশ্য একেবারে অন্য কথা। আসলে, পাহাড়ের কাছে প্রথমবার যাওয়ার আগে একটা অন্যরকম কল্পিত প্রতিচ্ছবি ছিল। পাহাড়কে ছুঁতে চেয়েছিলাম, স্পর্শ নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম হিমালয়ের। তবে সে চেতনা বা বোধের কোনও গম্ভীর ব্যাখ্যা আবশ্যক নয়... হবেও না বোধহয়। বরং তাকে আপাতত নাবালকের স্বপ্ন বলেই ধরে নিই, অঙ্কের 'এক্স' ধরার মত...হাতে থাকুক। তারপর, সেই হিমালয়কে স্পর্শ করার ইচ্ছে... ঘুমিয়ে ছিলাম ওই নিয়ে... জেগে ছিলাম ওই নিয়ে। তারপর পাহাড়ে ওঠার পথ। উঠছি...ঘুরতে ঘুরতে উঠছি... উঠতে উঠতে ঘুরছি। প্রথম জানা, সোজা পথে ওপরে ওঠার ব্যবস্থা নেই... ঘুরতে ঘুরতে উঠতে হয়। যাকে দূর থেকে চিনেছিলাম,আকাশ ঢাকা পাহাড়। পথে ঘুড়তে ঘুড়তে শুধু তার পাথরের দেওয়াল ছুঁতে পেলাম, যার পাথর ফাটিয়ে ফাটিয়ে গাছ বেরিয়েছে... বেরিয়ে এসেছে তাদের শেকড়। ওই পাথরের দেওয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়েই পাহাড় চিনেছি। একপাশে পাথুরে দেওয়াল, আর এক পাশে গভীর খাদ... এদের দু'পাশে নিয়েই উঠতে হবে, নামতে হবে। তারপর, কয়েকদিন ছিলাম... ওই পাহাড়েরই এখানে ওখানে। দেখলাম নামতে নামতে একসময় থামতে অসুবিধে হয়...উঠতে উঠতে পায়ে টান ধরে, বুকের ওঠানামা দ্রুত হয়। সমতলের অভিজ্ঞতার কাছে সেসব একেবারেই নতুন ছিল সেদিন। অথচ, আজও বুঝি... পুরনো হয়নি, হওয়ার নয়।
তারপর মেয়াদ ফুরোতে আবার ফিরে এসেছিলাম সমতলে। হিমালয় কে যেভাবে ছোঁব ভেবেছিলাম, তা আর হয়নি। মেঘের আড়াল থেকে মাঝে মাঝে দেখা দেওয়া কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেছিলাম... অনেএএএক দূর। 'দূর' যে বাস্তবে কত দূর হ'তে পারে, তাও সেই প্রথম চেনা।
তারপর সমতলে... যাদের স্বপ্নটার কথা জানিয়েছিলাম, তারা মাঝে মাঝে হেসে প্রশ্ন করত - "কি রে? হিমালয়কে ছুঁতে পেরেছিলি?"
আর আজকাল, আমিও মাঝে মাঝে অবচেতনে নিজেকে জিজ্ঞেস করে ফেলি... কি রে? পাহাড়টাকে ছুঁতে পেরেছিলি?... আর নিজেকে?

--- --- ---

একরকম চিহ্ন থাকে, বিশেষ একরকমের রোড-সাইন... বুঝে নিতে হয়, হেয়ারপিন বেণ্ড। ওখানে চালকের থামা বারণ। ঘোরা পথে উঠতে উঠতে একসময় আর থামার অনুমতি আর অবকাশ থাকে না। একটা বিপজ্জনক চড়াইয়ে একটানা ঘুরে একধাপ ওপরের রাস্তা উঠে যাওয়া... ঠিক ইংরেজী বর্ণমালার ‘U’ কে উলটে দিলে যেমন হয়, কিংবা অশ্বক্ষুর চুম্বক। যেখানে তুমি উলটে যাও, কিংবা চুম্বকের মত আকর্ষণ তৈরী হয়ে পথের বাঁকে... তাকে হেয়ারপিন বলে চিনেছে পাহাড়। না... পাহাড় কি চিনেছে? তা জানি না... তবে এই সব সাইনবোর্ড যারা লাগিয়ে দিয়ে গেছে... তারা নিশ্চয়ই চিনেছে সব বাঁকগুলো হাড়ে হাড়ে। তাই পথের ঘুরপাকে... ফিরে ফিরে আসা এই হেয়ারপিন বেন্ড, আর এই সাইনবোর্ড... কেন জানো? বিপদ-সংকেত। দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা বড়ই প্রবল সেখানে। অথচ, এ সব কিছুই যেন হঠাৎ করে একদিন নজরে পড়ল। হঠাৎ করেই যেন বিপজ্জনক বাঁকের সামনে এসে সচেতন হ’তে দেখলাম একদিন গাড়ির চালককে। যেমন মাঝে মাঝে আমরাও সচেতন হয়ে উঠি। সেই প্রথম চড়াই ঘুরে ঘুরে ওঠার সময়েও কি এমন হেয়ারপিন বেন্ড ছিলো না? ছিল নিশ্চয়ই... অথচ তখন সমতলকে ক্রমে নিচে নেমে যেতে দেখার মধ্যে বেশি আগ্রহ ছিল। বেশি আগ্রহ ছিল, পাথর বেয়ে গড়িয়ে পড়া পাহাড়ী নদীর ধারা দেখার। আসলে বোধহয়, তখন সাবধান হওয়া কাকে বলে তাই-ই জানতাম না। অথচ এখন, উঠতে উঠতে একটা-দুটো-তিনটে করে গুণতে থাকি। চেনা পাহাড়ের ক’টা বাঁক, তাও মুখস্থ হয়ে যায়। চালকের হাতে স্টিয়ারিং... আমি তো চালক নই! তবুও এক পাশ থেকে এক পাশ জাঢ্যের তালে হেলতে হেলতে গুণে যাচ্ছি। উলটোদিক থেকেও কাউকে সেই এক সচেতনতা নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে দেখছি একই সাবধানী বাঁকের তাৎক্ষণিকতায়।
আসলে, যাওয়ার মাঝে ওই স্টিয়ারিং-এর ওপর সাবধানে প্যাঁচ দেখতে দেখতে একটা কথা এতদিনে বেশ বুঝে গেছি - পাহাড়, তার বুকে রাস্তা কাটা হেয়ারপিনের বাঁক... এগুলো ছিলো আর থাকবে। কেবল যাত্রাপথ আমার। সেই পথে যেতে আসতে কিছুক্ষণের জন্য হেয়ারপিন-এর সঙ্গে মুখোমুখি... খাদ, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গভীর জঙ্গল... উলটনো চুম্বক, আর তার আকর্ষণ পার করে এক অনন্ত শূন্যতা। অথচ সেখানে কেউ দু’দণ্ড দাঁড়িয়েছে, এমন দেখিনি কখনও। ইচ্ছে, আর সাহস... এর মধ্যে কোনটা যে বেশি ফাঁকি দেয়... বোঝার আগেই উলটো দিক থেকে আসা অন্য গাড়ি হাঁক দেয় ‘পথ ছাড়ো’। যাত্রাপথ কে নিজের ভাবার সান্ত্বনাও নৈঃশব্দে বিলীন হ’তে দেখি যান্ত্রিক ‘সব ঝুট হ্যায়’ সাবধানবাণীর পর। আসলে এইসব কিছুই আমার নয়... হয়ত কোনওকিছুই আমার নয়। তাই পাহাড়ের কাছে বার বার আসা... আর ফিরে যাওয়া সমতলে... কাঁধ-ঘষা ভিড়ে। একটা হেয়ারপিন বাঁক থেকে আর একটা হেয়ারপিন বাঁক গুণে গুণে। তবুও যে কেন ‘হয়ত’-টা সরিয়ে ফেলতে এত মায়া হয়!

--- --- ---

গভীর রাতেও পাহাড় জেগে থাকে... জেগে থাকে খাদ, উপত্যকা... আর হেয়ারপিনগুলো। হেয়ারপিন থেকে অল্পদূরেই যে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, বাঁকের আড়ালে তা চোখেও পড়বে না... যদি না হেডলাইট দু’টো জ্বালানো থাকে। আর খাদের খুব কাছে একটা মানুষ। সেও পাহাড়ী অন্ধকারের ক্যানভাসে কালচে নীল, শুধু ঠোঁটের কাছাকাছি লালচে আগুনটা জোনাকীদের থেকে আলাদা... কৃত্তিম। গাড়ির ভেতরেও স্পন্দন নেই। নিথর। কোনো কোনো মানুষ তো নিজেই নিজের চালক। হাতে স্টিয়ারিং নিয়ে নিজেকেই হেয়ারপিন সামলে সামলে এগোতে হয়, খাদ থেকে সচেতন দূরত্ব রেখে। নিজের হাতে দায়িত্ব থাকলে, বোধহয় নিজের ইচ্ছে মত রাতের অন্ধকারে পাথুরে দেওয়ালের ধারে গাড়িটাকে এই ভাবেই থমকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়। মাঝে মাঝে আঁধারও সাহসকে এমন একটা ধাক্কা দেয়, যা আলোয় থেকে মানুষ ভাবতেই পারবে না। জ্বলতে জ্বলতে আগুন, প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে একটু একটু করে ঠোঁটের কাছাকাছি আসে... ছাইগুঁড়ো ভেসে যাওয়া হাওয়ায়। গাঢ় নীল আকাশের ক্যানভাসে কাস্তের মত চাঁদ... আর জনপদের নিভু নিভু লন্ঠনের মত ছড়িয়ে থাকা একমুঠো তারা। সেদিকে তাকিয়ে ফ্ল্যাশব্যাকের পর ফ্ল্যাশব্যাক... যে দু’টো চোখ দেখছে, শুধু সেই চোখেই ধরা আছে ভেসে চলা মুহূর্তগুলো। আগুনের অন্তিম স্পর্শ মেখে সিগারেটের অবশেষটুকু ঝাঁপিয়ে পড়ে... খাদের অন্ধকারে। অন্ধকারে হাত দু’টোর দিকে তাকালেও মনে... কত কালি মাখা, স্তরের পর স্তর কালির প্রলেপ।
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভাল
এত কালো মেখেছি দু হাতে
এত কাল ধরে।
কখনো তোমার করে, তোমাকে ভাবিনি।

এতক্ষণ ওপরের দিকে তাকিয়ে আঁধারে আলো খোঁজা চোখ... কিছুক্ষণ নীচের দিকেও তাকিয়ে থাকে একই ভাবে। ছাইয়ের গতিপথ... প্রত্যাখ্যাত সিগারেটের গতিপথ, আগুনের গতিপথ... আঁধারে মিশেছে সেই নীচে; আরও নীচে। যতটা নীচে তাকালে, আঁধার ছাড়াও কিছু আছে বোঝা যায়। এভাবেই স্তূপাকার ব্যবধান... ভস্মাবশেষ। তারপর, পাহাড়ী বাতাসের শব্দ... পাতা ঝরার শব্দ... পায়ের শব্দ। পদক্ষেপ এগোয়ে না কি পিছোয়ে আঁধারে বোঝা যায় না। সামনে প্রশান্ত শূন্যতা... অদূরে বাঁক নিয়ে পড়ে থাকা হেয়ারপিন বেণ্ড। দীর্ঘশ্বাস মিশে যায় পাহাড়ী বাতাসের প্রতিধ্বনিতে... সেই বাতাসও হেয়ারপিনের বাঁকে সচেতন হয়, হয়ে ওঠে সাবধানী... এতদিনের অভ্যেস। তারপর নীরবতা, তবে বেশিক্ষণ নয়... অন্ধকার চিড়ে এক জোড়া হেডলাইট ধীরে ধীরে হেয়ারপিন পার করে চলে যায় দীর্ধশ্বাসের প্রতিধ্বনিকে পেছনে রেখে।
যেতে পারি,
যেকোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাবো?

আর আমি? কোথায় আমি… এতসবের মাঝে কোথায় ছিলাম? এসব কি আমিও দেখেছিলাম সেই আঁধারে সাক্ষী থেকে? আমার কথা থাক… অন্য দিকে তাকালে দেখা যায়, হেয়ারপিন বাঁকগুলোর সেই সাইনবোর্ড, অন্ধকারে সামান্য আলো পড়লেও কেমন জ্বলজ্বল করে। গাড়িটা চলে গেছে বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেল। রাস্তায় চাকার দাগও বোঝার উপায় নেই। চুপচাপ, আবার কোনও সাবধানী চালকের অপেক্ষায় শুয়ে আছে একের পর এক হেয়ারপিন বেণ্ড, এক একটা স্তরে। কোথাও কোনও পাহাড়ী ঝর্ণা, বর্ষার ধারা নিয়ে তিরতির করে নেমে ধুয়ে দিয়ে যায় চাকার দাগগুলো। ভেজা পিচ রাস্তা… তার নিচে শাবল আর গাঁইতির দাগ… আর ডায়নামাইট ফাটানো ঘা’গুলো। হয়ত পাহাড়ও কোনও দিনও প্রশ্ন করে বসবে, - “কি রে? ওই গাঁইতি আর ডায়নামাইটের দাগগুলোকে ছুঁতে পেরেছিলি?” ওই শাবল, গাঁইতি আর ডায়নামাইটের স্মৃতি… পাহাড়েরই থাক। ওসব ভাবতে বসলে… এইসব হেয়ারপিন বেণ্ড-এর মাঝেই রাতের পর রাত কেটে যাবে এই ভাবে।