যারা ইন্ডিয়া খেলতে চায়

জুবিন ঘোষ

(The most important thing for an artist is, the show must go on)

ফুটবল খেলা দেখতে বসলেই আমার ষষ্টিচরণের কথা মনে পড়ে ;
যে বারবার ডিফেন্স লাইন অতিক্রম করে
বীরের মতো এগিয়ে যেত আঠারো ইয়ার্ড বক্সের দিকে
ড্রিবলিং-এর সম্মোহনে গোটা মাঠ জুড়ে ধরা পড়ত তার বিপুল পরাক্রম।
বিপুল চেহারার ষষ্টিচরণ মাঠে নামলে প্রতিটা ক্লাবই তাকে ভয় পেত
নিখুঁত পাসে বল রিসিভ করে এগোতে শুরু করলে
ঘিরে ফেলত বিপক্ষের অন্তত তিন থেকে চারজন;
ষষ্টিচরণ তাদের ভ্রূক্ষেপ করত না,
কোনোদিন করেছে বলেও শুনিনি।
চিতল হরিণের মতো সবাইকে পাশ কাটিয়ে
অনায়াসে ঢুকে যেত বিপক্ষের চক্রব্যূহে –
ম্যূহমান সূক্ষ্ম টাচে বল বাড়িয়ে দিত চোরা পজিশনের স্টাইকারটিকে
কিংবা গোলরক্ষককে বিন্দুমাত্র নাচবার সুযোগ না-দিয়েই
নিমেশে জাদুকরী ছোঁয়ায় বল জড়িয়ে যেত জালের গায়ে।
ষষ্টিচরণকে আজ পর্যন্ত কেউ বল বারে মারতে দেখেনি
ষষ্টিচরণও কখনও বল বারে মারেনি।
তার বল কখনও উড়ে যায়নি গোল লাইনের ওপারে।
এসব দেখে আমরাও ভাবতাম, ষষ্টিচরণ একদিন ঠিক ইন্ডিয়া খেলবে।
ষষ্টিচরণকে আমরা সমীহ করতাম---
সে কখনও কারুর পা ভাঙেনি, কারুর জামা ধরেও টানেনি,
বিপক্ষ প্লেয়ারকে উল্টে পিষে দেয়নি ঘাসের ওপর।
তবুও সবাই তাঁকে সমীহই করত।


আমাদের গ্রামবাংলায় ষষ্টিচরণ ফুটবল খেলে।
আমাদের শহরে-মফস্‌সলে-অলিতে গলিতে ষষ্টিচরণ ফুটবল খেলে।
ঠিক যেমন আমরা দেখেছি---
আমাদের আশেপাশের প্রায় সব বাপে-খেদানো ছোকরারাই ফুটবল খেলে !
নামগুলোও প্রায় একইরকম হয়---কার্তিক, বিশু, কেষ্ট, মাণিক
এদের একেকজন হয় এপাড়ার রোনাল্ডো, নয় ওপাড়ার মেসি।
ছোকরাদের কেউ কেউ স্বপ্ন দেখে বড় ক্লাবে যাবে
তাদের লম্বা-লম্বা চুল, হাতে বালা, মস্ত বড় বাইকের পেছনে স্পাইকের জুতো দেখলেই
চেনা যায়, আমরা যারা বিকেলবেলা মাঠের ধারে বসি, সবাই তাদের চিনি।
ষষ্টিচরণও স্বপ্ন দেখত, কলকাতার বড় ক্লাবে খেলবে।


ফুটবল খেলা দেখতে বসলেই এহেন ষষ্টিচরণের কথা মনে পড়ে যায়।
ষষ্টিচরণকে ঘিরে রাখত অ-নে-ক-গুলো স্বপ্ন---আসলে তার স্বপ্নের শেষ ছিল না।
ষষ্টিচরণ স্বপ্ন দেখত সে মরে গেলে
তার নামে একটা রাস্তা হবে,
ক্লাবের নাম বদলে রাখা হবে ‘ষষ্টিচরণ স্মৃতি সংঘ’,
যে শিল্ডটা সে প্রতিবছর ক্লাবের ঘরে এনে দিত, ষষ্টিচরণ স্বপ্ন দেখত---
একদিন টুর্নামেন্টটার নাম হবে ‘ষষ্টিচরণ মেমোরিয়াল শিল্ড’।
বি.এম.ডব্লিউ, মার্সেটিজ বেন্‌জ বা ‘অর্জুন পুরস্কার’-এর কথাও তার জানা ছিল।
স্বপ্ন দেখতে দেখতেই ষষ্টিচরণ বল পায়ে চকিতে ঢুকে যেত
সাইড লাইন থেকে একেবারে গোল এরিয়ায় ;
এখনও বল পায়ে কারুর ওই প্রচণ্ড দৌড় দেখলে, সর্বপ্রথম সেই ষষ্টিচরণের কথাই মনে পড়ে।


আমাদের ষষ্টিচরণ কখনও ময়দান দেখেনি।
নিজে থেকে কোনও বড় ক্লাবের ট্রায়ালেও যায়নি, লিগে কিংবা জেলাস্তরেও খেলেনি,
এমনকি কোনও ক্লাব কর্তার নেক নজরেও পড়েনি।
তার সঙ্গে কারুর যোগাযোগও ছিল না।
তবুও ষষ্টিচরণ স্বপ্ন দেখত, ভাবত এই বুঝি
কোনও ক্লাব কর্তা তাঁকে নেমন্ত্রন্ন করে নিয়ে যাবে তাঁবুর ভেতরে।
ষষ্টিচরণ অনেক কিছু ভাবত, ডুবে যেত ভাবনার জগতে
আর প্রতিদিন সকালবেলায় বল পায়ে ছুটতে যেত কমপ্লেসের চারপাশ
এক-পাক, দুই-পাক, পাঁচ-পাক, দশ-পাক...
ষষ্টিচরণের স্বপ্নগুলোও এইভাবে পাক খেতে থাকত মফস্‌সলের গণ্ডি ঘিরে,
বড় ক্লাবের খেলা হ’লেই সে সবার আগে বসে পড়ত টি.ভি.র সামনে
তার আছে আলাদা কোনও জার্সির রং ছিল না
সে কেবল ভাবত, স্কিল নিয়ে ভাবত, স্ট্রাটেজি নিয়ে ভাবত,
ভাবত প্রকৃত শিল্পীদের যেচে কিছু করতে নেই।
ষষ্টিচরণ কখনও মফস্‌সলের বাইরে বেরোয়নি
কখনও খোঁজ নেয়নি কখনই-বা ট্রায়াল হয়ে যায়, কখনই-বা
ঢুকতে হয় বড় তাঁবুর ভেতর। তারও কেউ খোঁজ নেয়নি।
সে কেবল জানত, বিপক্ষকে কাটিয়ে কীভাবে ঢুকতে হয় পেনাল্টি বক্সের মধ্যে।
বাকি যা কিছু ছিল, তার সাধ্যের অতীত।


ষষ্টিচরণ এখন আর কিছু ভাবে কিনা জানি না
ষষ্টিচরণ ধারাভাষ্য দেয় না, ক্লাবের কোচ নয়, এমন কী গেম সেক্রেটারিও নয়।
ষষ্টিচরণকে এখন আর কেউ পোঁচে না, আমাদের মধ্যে সে বেঁচে থাকে কিংবদন্তীর মতো।
পুরোনো লোকেরা ওর কথা শুনলেই আক্ষেপ করে বলে---
“ছেলেটা ইন্ডিয়া টিমে খেলতে পারত”
আমারও নতুন কোনও ছেলেকে ভালো খেলতে দেখলেই এহেন
ষষ্টিচরণের কথা মনে পড়ে যায়
তাদের ভাবনার সঙ্গে কোথায় যেন ষষ্টিচরণ মিলে গেলে
ঠিক সেই সময় ষষ্টিচরণ সবজি বেচে ফিরতে থাকে
হনহনিয়ে যেতে যেতে ষষ্টিচরণ মাঠটাকে দেখেও দেখে না।
কী জানি কীসের এত তাড়া !
ষষ্টিচরণকে দেখলে কেন জানি না, আমার ষষ্টিচরণকেই মনে পড়ে যায়।