বেস-ক্যাম্প

উমাপদ কর



লম্বা শিস ধ্বনি ধ্বনি প্রতি প্রতি
লম্বা হতে হতে কোথাও একটা হারায়
শীর্ষে শীর্ষে রণচাতুরী ঘুগু বসে থাকা এমন দুপুর
হারিয়ে যাও হারিয়ে যাও মেঘ লুকিয়ে পড়ো শরীর জোড়া ঠোঁটে
কী বাতাস বয়ে গেল, কোন ঝুমঝুমি বেজে বেজে রেশ ধরে রাখে
কার চুলোয় আজ প্রথম অস্তরাগ, লাল নয় খয়েরি খয়েরি।
আলসেমির পিঠে চড়েছে ভ্রমণ, গাধাগুলোর ব্যাকব্রাশ চুল
ঘুরছে ফিরছে আলো, দূরে অন্ধকারের এক বিন্দুর মধ্যে জেগে আছে চোখ
চলো চলো চলো দুলে উঠল পিঠ, বাতাস বানালো ঘূর্ণি
সকালের আমেজ সিগারেট ধরিয়ে দিলে এমনই রিং রিং ধোঁয়া
কে যে ছুটি দিয়ে দিল ক্লাসঘর বসতে না বসতেই...

রাস্তাটা উঠছে নামছে করতে করতে উঠেই যাচ্ছে
একপাশে খাড়াই বিপরীতে খাদ খাদেরও নিচে
রাস্তার মাথাব্যথা, ঘুসঘুসে জ্বর যন্ত্রনায় ছোটে
আর আমাদের বসেথাকাগুলো মিচকি হাসিতে উঠে দাঁড়ায়
তিন ধরিয়ার পাশাপাশি সাপ বুকে হাঁটে সমান সমান
পাঁচ ধরিয়ার ভেতরে ভেতরে পাপ
এত বড় সাপ এত এত পাপ আকাশ তার রোঁয়াগুলো কোনওমতে সামলায়
এত রাগ ফুলে ফেঁপে পাথরের জমাট কালোয় কিছুটা মেশে কিছু ফিরে আসে
এত চাপ বুঝতে না বুঝতেই পাতার খোলশ থেকে শ্বাপদ শব্দ
মিথ্যেই আশ্বাস, ফিরিস্তি দেওয়ার আগেই বুঝে যাই
আকাশ আজ যাবে না মজলিশে
ফেরৎ এসেছে লেফেফা ঠিকানা বেপাত্তা
ঘর নেই, ছাউনি আছে ফাঁকা দেয়ালের ওপর
একেকটা আকাশ চড়কি ঘোরায় এমনই বাউন্ডুলে
নেই নেই রবের মধ্যে রঙবেরঙের পতাকা
যেন এক মনস্টারি ভেতরে তার কয়েকটা প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে...

এখান থেকেই শুরু তোমাকে দেওয়া আমার আংটির জ্বলে ওঠা
এখান থেকেই তোমার বে-দমে শ্বাস দিচ্ছে পাইনের পাতারা
তোমার হৃদপিন্ডে আমার ধুকপুকি ঠিক এখান থেকেই
এসো আজ আকাশকে আকাশ বলি চাঁদকে বলি আহা হা
প্রস্থানের সাজ পরো গো রাধা রাধা পা
চলো কোনও এক গুহার পাশে রেখে যাই চোখের জলমোছা রুমাল
চলো তোমার উড়নির কোণাটাও রেখে যাই আশেপাশে
আমাদের চিহ্নগুলি খুলে খুলে রাখি পথে খাদে আপাত চূড়ায়
আমাদের খেদগুলো ঝরণার জলে মিশিয়ে দিই
লুকিয়ে ফেলি বিষাদমাখা গয়নাগুলো কুয়াশায় কুয়াশায়...

রাত এসে গেল চূড়ার নিচে গলার কাছে, তাঁবুহীন তিনহাত স্পেস
কয়েক টুকরো হাত সেঁকছে কয়েক টুকরো কাঠের অঙ্গার
প্রতিফলিত তোমার মুখের লাল আমাকে তামাটে করুক
পতঙ্গ নেই, ভেতরের পতঙ্গ উড়ছে কামকেলি কেলি
বনের দীর্ঘ ছায়ায় এই বুঝি উল্কি এসে পড়ে এই বুঝি গ্রাস
তুমি যে কোথায়, কোথায় লুকিয়ে পাত্তা দিচ্ছে না বাতাস
ধীরে নয় বইছে মাতাল, বোঝেনি তুমি আমাতেই অন্তর্লীন
তোমার স্বেদবিন্দুগুলি আমার জলে মিশে রমণ রমণ
চরমে প্রসার পেতে পেতে এইমাত্র বজ্র হয়ে যাই
বিদ্যুতলেখায় কাল যাব গলা থেকে ওর মুখে ও মাথায়...

আমি জ্বলছি না, কোথাও জ্বলছে না আলো সতীন আকাশে
কাঠ খাচ্ছে গেরিলা বন পুড়ব ভেবে, আলো হয়ে আছে বসবার ঘর
হরিণ মাথা বুনোমোষ মাথায় আলো ফেলো গেস্টদের জন্যে।
কান পাতা আছে হাই অলটিচুডের জঙ্গলে
পাখি সুর কোথায় রে শ্যামা
বন কেটে বসতের কথা কেউ কি বলে
হাসতে হাসতে বাঁকগুলো সহসা মিলিয়ে যায়ওয়ার সন্ধিক্ষণে
আঁকা হতে থাকে দু-চারটা গ্রাম, গ্রাম মানে ঘর
সন্ধ্যার গায়ে গয়না পরাতে থাকে পছিমা রোদ
আমি তোমার শরীরে পরাতে থাকি তামার তবক
চাঁদ থেকে চিমটি কেটে এনে
এসো মিশে যাই অরণ্যানি আমাতে আমাতে...

এখানে দুয়ার সবদিকে খোলা কিন্তু চোখ আটকে যাচ্ছে
সবদিকে তুষার খুল্লামখুল্লা মাঝে মাঝে লিঙ্গের আকার
শ্রম রেখে যাব পায়ের গোড়ালি যতই নাছোড় হোক
মেধা রেখে যাব খেয়ালী বাঁকের ভুলভুলাইয়ার মধ্যে
ফাঁকি রেখে দু-চারটে শামুক এখানে কি করে এল
এলই যখন ওরা হাঁটছে না কেন, হাঁটছে না কেন আমাকে বুকে করে
নাহয় এসো হাঁটি পাশাপাশি হাঁটি আড়াআড়ি খুঁটি ছেড়ে যাই
দুপাশের লগ্নতা থেকে ছুটি চাই ছুটি চাই চাতক স্মরণ
বিষাদের পেখমের কাছে আর নয় মোহমুগ্ধতা আর নয় কেলি
ফেলে দিই সাজ পিরেনের দাহ ফেলে ফেলে দিই নজর ওজর
শাঁখ থেকে ফেলে দিই নাদ, কেউ আর ডাকবে না আমাদের
আমরাই ডাকব চূড়ার অহমিকা চূড়ার অভিমান...

আর তুমি? তোমাকে কোথায় রেখে যাই, খাদে পড়েছিলে অনেককাল
চালাকির স্তনে ভর দিয়ে উঠে এসেছো অনেকটা, অনেকটা বাকি
হাসছ, যেন পেরে যাবে ছুঁয়ে দিতে ফিতের লাশ লাস্য লালসা
তোমাকে কি আমার মধ্যে পুরে নেব শ্রাবণজল
যেন কোনওদিন ছিলেই না, যেন আমারই খোয়াইস থেকে
এক অ্যাবস্ট্র্যাক্ট মুর্তি কল্পনা কিছু আলো কিছুটা অন্ধকার
রেখে যাব না খাদে ওখানে অন্ধকারের পোকা শব্দকেও কুড়ে খায়
ফেলে যাব না পাতার ফসিলে কিংবা বাঁকের চোরাকুঠুরিতে
প্রেমের ফ্রেমে থাকতে থাকতেই তোমাকে গিলে নেব
আমার বানানো প্রেমের অঙ্কুর হয়তবা প্রথম ক্যারিশমা...

ঠান্ডাও নেমে এল আসরে দুহাত মুঠো হতে ভুলে যায়
হিম হাড় হিম সায়রে
২০৬, একটাই হাড়ের সানাই একলপ্তে
খাঁচার অচিন বন্ধ করবে যেন যাওয়া আসা
যেন মাংস জমে এক তাল লয় মীড়, মজ্জা খড়ের রূপভেদে
আশা যা এখনও ক্ষীণ, ক্ষীণতম কুয়াশার ঘণত্বে
ফিরে কি যাওয়া যায় সূর্যের না-দেখা আলো তুমিই বলো
তুমি এক অস্তিত্বহীনতার সফল ফেরারি
বাতাস এত পাতলা তবু এসো একবার আলিঙ্গন করি আচমন সারি
তারপর না হয় বরফ সমাধি...

যৌতুক পাওয়া চোখ আর চাবিছড়া আমি খুলে রাখি
শিরস্ত্রান খুলে লুটিয়ে পড়ুক পায়ের কাছে মাথাশুদ্ধ
বে-আব্রু বাসনা আমার এসো গচ্ছিত রেখে যাই গুহাকন্দরে
বেদনাকে বলি ছড় ঘোষো না আর বেহালার মমতা মাখানো সমে
শুশ্রুষা তাও ফেলে দিই ঘোর কুয়াশার জংঘায়
কী আর রইল? গান্ডিব তেজ, ফোলা-ফাঁপা অহং
জমা খরচের কিছু পানসে বিবৃতি আর শীতল যৌনতা
ভালোবাসা বলে কিছু যে ছিল সারাক্ষণ ভাবতাম
তাও ফেলে ফেলে শূন্য হয়ে যাব এই চূড়ার সংক্ষেপে...

ফিরে যাব ভাবনাটাও লগি ঠেলে নৌকা ভাসিয়ে দিল
খোলশেরও কোনও তাপ উত্তাপ নেই, নেই এক রত্তি স্পন্দন
কাউকে কিছু থেকে আলাদা করতে পারি না, তোমাকেও না
এসো এসো আমি, শুয়ে পড়ি, তারপর তুষার ঝড় বয়ে যাক...

বহুদিন পর নাহয় আমিই আবার আবিস্কার করব আমাকে। ফসিল থেকে জন্ম নেবে আমার চূড়া আমার খাদ। চূড়ায় অপার আলো খাদে অন্ধকার। আমার খাড়াই আমার আমার ঢালু। মোহ আর যৌনতা। আমার পারানি আমার ভ্রমণ। লোভ আর ভালোবাসা। আমার নিজস্ব এক পাহাড়। একটা বিমূর্ত প্রতিভা। যদিও আমার কোনও বেসক্যাম্প ছিল না...।