বন্দীশ অথবা সেতু নির্মাণ

তমাল রায়



পাখীদল অলিখিত পদ্য আর প্লেটো
সে আঁকছিলো ধুলো আর বালির মাঝে বসে। তিনটি বিন্দু জুড়লে ত্রিভুজ হয় তত দিনে জেনে গেছিলো সে। এ সত্য তখনো বোঝেনি যে সমস্ত বিন্দু থেকেই দাগ টানা যায় কিন্তু সব বিন্দুই এক সরল রেখায় আসে না। প্রথম বিন্দুতে রেখেছিলো বাবাকে। বাবা নামক এই শব্দে তার লোভ ছিলো অনেক, কিছু মায়াও। কিন্তু স্নেক ল্যাডারের খেলায় সে কখনোই সাপের মুখে পড়ে পৌঁছতে পারেনি বাবা নামক শব্দের কাছে। আর সাপের মুখ তো, তাতে ছোবলও থাকে, থাকে বিষ। দ্বিতীয় বিন্দুতে রেখেছিলো মা নামক শব্দ কে। পৌঁছেও ছিলো। শীতে পাতা ঝরেছিলো। বসন্তে বাতাস হাত ধরে মা নামক শব্দের কাছে পৌঁছনোর আগে সে তাল পাটালির গন্ধ পেয়েছিলো, জর্দা পানের গন্ধ আর কিছু ভুল বোঝাবুঝির মত পুরনো স্মৃতিও যাদের সে পাশে সরিয়ে সোজা দ্বিতীয় বিন্দুতে। তৃতীয় বিন্দু অবশ্যই সে নিজে। সিন্ধু হওয়ার বাসনায় সে বিন্দু থেকেই শুরু করেছিল। ত্রিভুজের মাথায় সে রেখেছিলো আর এক বিন্দু উলম্ব স্থানে। ক্রন্দন বা তারা খসা দিনে সে প্রাবল্য বা হীনতায় ওইখানে পৌঁছনোর লড়াইতে।দিন শুরু করলেও অন্ধকার জমা হয়েছিলো প্রবল। অন্ধকারেই জমা হয়েছিল প্রবল নুন, ভীরু পাখীর দল অলিখিত কিছু পদ্য আর প্লেটো।

We can easily forgive a child who is afraid of the dark; the real tragedy of life is when men are afraid of the light.
Plato

তবু অন্ধকার,নিবিড় ভালোবাসা
বইতে এ কথাটা সে পড়েছিল। এবার সে একে একে কুড়িয়ে নিচ্ছিল নদী, অরণ্য, বাতাস। তাই নদী নিয়ে রাখলো সেই ত্রিভুজে, তাকে বইয়ে দিলো পুবের দিকে। নদী তাকে বিজ্ঞান শেখাতে শুরু করলো নিজের মত। বাতাস তো তার কখনো বন্ধু ছিলো না, তাই বাতাস তার কথা শুনলো না, সে নিজের মতই বইতে শুরু করলো এলোমেলো। যাবার পথে ওকে ছুঁলোও না। কিন্তু ভাষা নগরে নিয়ে গেলো সেই। অরণ্যকেও সে নিয়ে এসেছিলো। অরণ্য তার বন্ধু। তার ঘাম মুছে সে দিল তিল আর নারকেলের নাড়ু। শুনতে বসলো ইতিহাস। নীচে আঁকা তিনটি বিন্দু। আর তাদের স্পর্শ করে তিনটি বিষমবাহু আর কাল্পনিক ত্রিভুজ, সে ত্রিকোণ ক্ষেত্রে ধুলো, বালি মাখা ঘটমান নদী, বাবু হয়ে বসা অরণ্য, আরঙ্গতির স্বপক্ষে সওয়াল করা বাতাসকে নীচে রেখে সে ওপরে রাখলো আকাশ, বা জ্যামিতির শিক্ষককে। এবার ওপরে যাওয়া। এবার উচ্চতা পাওয়া। এক লড়াই। এক ঘোষণা। হ্যাঁ সে আলোকে ভয় পায়নি কখনো। সে অন্ধকার কে নিবিড় করে ভালোবেসেছে।

You have your way. I have my way. As for the right way, the correct way, and the only way, it does not exist.
Friedrich Nietzsche

নির্মাণ আদতে একটি খোঁজ
শুধু মাত্র বিশ্বাসকে সাথী করে ছোলা ভাজা খেতে খেতেই ওপরে উঠে যাওয়া যায়। বাবা পেরেছিলেন? মা? এ সব প্রশ্নে দ্বিধা বিভক্ত হতে হতেই সে রওয়ানা দিলো ওপর পানে। উহুঁ প্রদীপ জ্বালানোর আগে ছিলো সলতে পাকানো। তৈলাক্ত বাঁশ আর বাঁদরের গল্প তো সে শুনেছিলো আগেই। তাই তা দিয়েই অভ্যেস শুরু হল, কিছুটা সে ওঠে, আবার নেমে আসে, সে জানতো একটা চৌবাচ্চায় তিনটি গর্ত আছে, দুটি দিয়ে জল বেরিয়ে যায়, একটিতে ভরে, কতক্ষণে সেই চৌবাচ্চা খালি হবে? সময়কে সে রাখলো জ্যামিতিক স্কেল বানিয়ে, যা দিয়ে মাপা যায়, আর হ্যামার থ্রোয়ের মত হাত ঘুরিয়ে সে ছুঁড়ে দিলো তার কল্পনার রেখাকে সু উচ্চে। আর কিছুদূর যাবার পর অভিকর্ষটান এবং আকাশকে সাম্যে নিয়ে এসে সে নির্দিষ্ট করলো তার উচ্চতম বিন্দু। জীবন তো তাই। সূর্য নামক প্রবল ক্ষমতাশালী এবং বুদ্ধিমান তাকে স্বাগত জানালো, চাঁদ ওষ্ঠ চুম্বন করলো সে বিন্দুকে, আর সারি সারি নক্ষত্র তাকে আলো দিয়ে জরিপ করলো। সবুজ চির হরিৎ আর ধূসর অজানার রঙে সে আঁকলো শরীর। এবার হেলছে, দুলছে, মাটি কাঁপছে, প্রবল লড়াই শুম্ভ নিশুম্ভ নামক প্লেটের, সে তৈরী হচ্ছে, আকাশ নামক জ্যামিতি নির্ধারক পুস্প বৃষ্টি করল, বাতাস শিস দিয়ে উঠলো অজান্তেই, আর সে নির্মিত হতে লাগলো। কোথাও কিভাবে যেন আতঙ্ক প্রবেশ করলো এ নির্মাণ রহস্যের মাঝেই, যা চিরকাল হয়ে এসেছে, শ্বেত শুভ্র বরফ হয়ে সে ছুঁয়ে থাকলো এ শাঙ্কব নির্মাণকে। পাখী গান গাইলো, পোকামাকড়ের দল গাইলো তাদের জাতীয় সঙ্গীত, আর কে যেন তার গা বেয়ে গড়িয়ে পড়তে পড়তে জানালো এ নির্মাণ আসলে উচ্চতার স্বীকৃতি। তাকে সে সেই সে ছেলেটি নাম দিলো পাথর, আর পাথরে পাথরে কানাকানি হয়ে চকমকি জ্বালিয়ে হল নতুন নির্মাণের ব্যাপটাইজেশন। হ্যাঁ,পাহাড়। বাবা আর মার হাত ধরে নিজের সৃষ্টিকে মাথা নীচু করে সে অভিবাদন জানালো, যেমনটা হয় যে কোনো পৌত্তলিকতায়। তুমি যে রাস্তায় হাঁটছো তা তোমার। বাকী ঠিক ভুল বলে আদৌ কিছু হয় না।এ কথা মনে পড়ায় সে বেরলো আরো অনেকের খোঁজে।

To know, is to know that you know nothing. That is the meaning of true knowledge.
Socrates

উচ্চতার অভিজ্ঞান

এবার দলে দলে এসে পড়লো এক্সট্রার দল। আদতে কে এক্সট্রা আর কে হিরো বা ভিলেন এ বোধে তো পৌঁছয় কেবল মাত্র দাম্ভিক অধ্যাপক। সে তো নিতান্তই ছাত্র। তাই সে মেঘকে আনতে গেল মেঘের বাড়ি। কুয়াশা তার পিঠে চেপে নিজেই এলো, সে পড়তে শিখলো অধ্যবসায়, সাথে এলো আশঙ্কা, আর কোথা থেকে প্রজাপতির মত উড়ে উড়ে এলো এক অপরূপ সৌন্দর্য। এবার কাজ শেষ হয়নি। সৃষ্টিতেই শেষ হয় নাকি কাজ, লিখতে হয় তো তার মত করে অভিধানও। ভীড় করলো ম্যাপ, রুকস্যাক, কাঁটা জুতো, লাঠি, টেন্ট, শেরপা, ব্লিজার্ড, সিংকিং জোন, খাদ, হেয়ার পিন কার্ভ, বেস ক্যাম্প, সামিট আরও কত কি। আর এই সব মিলে মিশে বেশ বড় সড় এক দেশ তৈরী হল। আর দেশের গায়ে চড়ে বেড়াতে লাগলো কত প্রানী, আর হ্যাঁ মানুষও। কিঞ্চিৎ বিষন্ন চিত্তে সে জানলো তার নির্মাণেই শেষ হয়নি এখনো তার নির্মাণ চলছে অথবা ধ্বংস। ততক্ষণে গায়ে এসে বসেছে নদী, উপত্যকা, আর গিরিখাদও। মা হাসছেন। বাবা গম্ভীর, পাছে কেউ বুঝে ফেলে বাবার উচ্চতা। সে তখন আবার ছাত্রাভ্যাসে। পড়ছে, জানছে, আর শিখে নিচ্ছে কিভাবে, কিভাবেই বা ওপরে ওঠা যায়, সত্যি সত্যি।

Our greatest glory is not in never falling, but in rising every time we fall.

Confucius

শিখরে ওঠা,তারপর?
এবার সে রওনা দিলো তার দলবল সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে পাহাড়ে। উঠতে তো হবেই। সে যেভাবেই হোক। আস্তে চল ক্ষতি নেই, থেমো না। কে যেন তাকে শিখিয়েছিলো। বাবা কিছুদূর গিয়েই থেমে গেলো। পারলো না বলতে নেই। বললেন আমি এখানে আছি তোমরা ঘুরে এসো। আমি এখান থেকেই তোমাদের শুভেচ্ছা জানাই, আর সৌন্দর্য উপভোগ করি।
মা পারছিলেন গেলেন না। মা তো বাবার অর্ধাঙ্গিনী। কত সুখ যে মা ছেড়েছেন বাবার জন্য। সে রওনা দিলো একাই। উঠতে তো জীবনে একাই হয়। পিঠে রুকস্যাক। পায়ে কাঁটা জুতো সে ওপরে উঠছে। উঠুক। আমরা বরং বলে নিই এবার ঐহিক পাহাড়ে। হ্যাঁ এবারই ঐহিক ২৫শে পা। ১৯৯০ থেকে শুরু করে এই ২০১৫। এক লম্বা ট্রেকিং। নয় কি? সেও তো এক পাহাড়। আসুন শক্ত করে হাত ধরি। কে বলতে পারে এভাবেই আমরাও এক পাহাড় বানাবো না।
ভয় কেবল একটাই সে তো ওপরে পৌঁছবেও হয়ত বা। কিন্তু তারপর?
মা আর বাবার মাঝখানে এখন কুয়াশা, আর ছেলে মেঘের হাত ধরে ওপরে উঠছে।

We build too many walls and not enough bridges.
Isaac Newton

ছেলে তো দেওয়াল টপকাচ্ছে একের পর এক। দেখা যাক সেতু বাঁধতে পারে কিনা। আসুন ততক্ষণ আপনার আর পাহাড়ের মধ্যে সেতু বাঁধার কাজ করুক ঐহিক। সে পাহাড় হোক ভাল পাহাড়।