কবিতার ভাষা

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ


মানুষ কবিতায় কতো কিছু বলতে চায়। সে তার সামাজিক ব্যক্তিপুরুষের অধীনে নিজেকে মেলে দিয়ে হয়ত অনেক কথাই বলে। জন্ম-মৃত্যু জয়-পরাজয় যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রেম- বিরহ হর্ষ-বিষাদ রক্ত-রাজনীতির কথাকাহিনি কতো কিছুই। এইসব চরম মূহুর্তগুলো লিখে দিলেই হয়ত ঐতিহাসিক মানুষ এক রকম আনন্দ পায়। যা ব্যক্ত, যা প্রচারিত যা সত্য, যা এমনিতেই প্রকাশিত তার রচনা মানুষের কাছে কত আকষর্ণীয় কত আরামদায়ক। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সে যদি একজন কবি হয়- তাহলে সে এইসব ব্যবহৃত মোহন চোরাবালির দিকে চোখ দেয় না বা পা বাড়ায় না। সে এইসব বলা থেকে নির্দয় ঋষিসুলভ, মৌন মানসিকতায় বিরত থাকে। কারণ এইসবে তার কোনো কথা নেই, বলা নেই। তার এই নিষ্কৃতি এক রকমের কবিতা-সংকেত, কবিতার বীজ বহনের অপেক্ষা-ঋতু। এই যে সে ঋষির মতো যে রকম অপেক্ষা করল, সেখানে ধীরে ধীরে শিশুর মতো বড় হতে থাকে এক গোপন পরাক্রান্ত ভাষা। তখন তার এই ভাষাই তাকে পৃথক করে ফেলে। তার সেই ভাষাই তার তার সব প্রাণ-অধিকারের চাবি। তাই প্রশ্ন আসে মনে- কবিতায় আমি কী বলতে চাই? উত্তর আসে- কিছুই বলতে চাই না, শুধু ইশারাটা ধরতে চাই, ইশারা দিতে চাই। রাতের সেই আধফোটা, আধজাগা গাছগুলির জুঁই অথবা টগর হয়ে ওঠার মতো যা। তাই সরে যাই এক পথ থেকে অনেক পথে, ধরাটা কখনো স্থির হয় না, চলে অবিরত। সে রকম, সেই যে লাল রঙের দাঁড়িয়ে থাকা স্টেশন, ট্রেন চলে যায় সামনে দিয়ে শুধু। হলুদ দাগের কিনারা হতে রেলস্লিপারের কয়েদি-চোখ একা জ্বলে ওঠে। সেইসূত্রে এই ধারণা জাগে মনে- কবিতার কোনো সত্য নেই, কোনো মিথ্যাও নেই। আছে একটি আকার গ্রহণের চেষ্টা, চোখ মুখ নাক কান গলা নিয়ে ক্রমশ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। এই জ্বালা বা যন্ত্রণার কী রঙ, কী বিশেষণ, কী স্থিতি বা অস্থিতি? যদি কিছু একটা থেকে থাকে তাহলে কবিতার মিথ্যা কবিতার নির্মাণে, কিন্তু ভাবে ও বোধে লুকিয়ে থাকে কবিতার সত্য। এই সত্যের কোনো প্রমাণ নেই, কোনা নিশ্চয়তা নেই, আছে শুধু অনুভব-উপলব্ধি, অভিজ্ঞতার একটা লাইট-হাউজ- যার দূর থেকে আসলে কোনো আকার হয় না, সংজ্ঞা হয় না, শুধু থাকে নীরব বিচ্ছুরণের দান। যে এই অনুভব-উপলব্ধিকে তার চিন্তাবোধের সাথে মিশিয়ে দিতে পারে সে তো কিছু দেখে, আগের ও সামনের। সেই রকম দেখার সাথে বাস করা উপলব্ধির ঘুম ঘুম অবস্থান থেকে কবিতার উত্থান, নীরবে, লোকচক্ষুর আড়ালে। তাই প্রকাশে তার আলোও না, অন্ধকারও না। প্রকাশই তার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। সেটি একটি চলন্ত মানসিক অভিজ্ঞতা যার চারিদিকে আছে কতগুলি প্রতিষ্ঠিত সামাজিকতা। কিন্তু যে কবি, সে এইসব প্রতিষ্ঠিত সামাজিকতা, ইতিহাস, লোকসভ্যতার স্তরায়ণস্পর্শ উপস্থিতি বিনিয়োগযোগাযোগ ইত্যাদি থেকে উঠে গিয়ে সেই লাইট-হাউজের বিশেষ আলোয় তার রসায়নের ঘটনা ঘটায়। তখন কবিতার সৃষ্টি হয়। তার মানে লেখাটা আপাতত একটি যৌথ ক্রীড়া হলেও, কবির এই সামজিকতা একটি ভান মাত্র, একটি গোপন চাঁদমারি।। তার জন্যও তো একটি অপেক্ষা আছে, কখনো একদম প্যাসিভ মুড নিয়ে, চলন্ত কিন্তু স্থির, উড়ন্ত কিন্তু নিষ্চল।



যেহেতু সামাজিক তাই কবিতার হয়ে ওঠার এই অন্তহীন অদৃশ্য যোগাযোগ বিনিয়োগ কিন্তু ভাষার প্রজননপ্রক্রিয়া নিরপেক্ষ নয়। কারণ কবিতার আকার আকরণ ঘটে শেষ পর্যন্ত একটি মানবভাষাকে ধরেই। ভাষা যেহেতু একটি সামাজিক সাংঘঠনিক সিস্টেমেটিক মাধ্যম, তাই কবিতা লেখার জন্য কবিকে সেই স্বনির্মিত খোলস ভেঙ্গে আলো-অন্ধকার পেরিয়ে জনসম্মুখে বেরিয়ে আসতে হয় একদিন। আসতে হয় যোগদান করতে- একটি পূর্ব নির্ধারিত ভাষিক কার্যে। একটা অকেজো দায়বদ্ধতা দেখাতে হয় কখনো। এই সামাজিক ভাষাকে নিয়ে অক্ষম একটি কায়দা চালানো যায়, কিন্তু ভাষাই কবিতা নয়। ভাব, বোধ আর কল্পনার ঢেউটি যদি বড় না হয় তাহলে ভাষা শুধুই অথর্ব আর নপুসংক একটি আয়োজন। আমাদের সামনে একটি ব্রিজের বাস্তব উপস্থিতি থাকতে পারে। সাধারণ চোখ এটিকে শুধু্‌ই একটি কাঠের বা ইস্পাতের প্রয়োজনীয় বাহন হিসাবে দেখে। ‘ব্রিজ’ শব্দটাই তার সব ঐতিহাসিক বাস্তবতা নিয়ে, গাড়ি ঘোড়া, পারাপারের ব্যস্ত অভিজ্ঞান নিয়ে আসে। কিন্তু একজন কবির চোখ ব্রিজটার একটা প্রাণ পাওয়া চরিত্র উপস্থিতি টের পায়। এর সংযোগ সীমানা চিন্তা করতে পারে প্রাচীন যুগের কোনো পাহাড় বা ডানাওলা পাখির সাথে। যার তলা দিয়ে বহে যাচ্ছে সময় নামক আর এক বিবিধ রঙের ধারণা।বস্তু ছাড়িয়ে, এর গভীর গভীর আবহে আর মূল্য সংযোজনে একটি নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম হয়। কবিতায় যা একটা নতুন ভাষা দেয়। অন্যদিকে শুধু শব্দ কারসাজি একটি অকবিসুলভ মুদ্রাদোষ-কখনো তার যাদু কবিকে স্বীকৃত, নিরাপদ ও বহু ব্যবহৃত ভাষিক অলঙ্কারের ক্র্যাফ্টম্যানশিপ বিহ্বলতায় ফেলে দেয়। সে প্রাথমিক সংগমবোধকে উপলব্ধি না করেই ভাষার চর্চা করে শুধু যা মূলত যান্ত্রিক। ভাব ও কল্পনাবোধ বা এই বোধিভাবনা ছাড়া সামাজিক নিয়মকানুন বা কোনো একটা ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাকে ভাষার ঝিল্লি দিয়ে লিখিত করা যায় মাত্র, প্রাণদান করা যায় না, কবিতা করা যায় না। কারণ এই ভাব, গত ও আগতের চিন্তা, অনুভব-উপলব্ধির সাথে ভাষার আক্রমণে কবিতার জন্ম। নিশ্চিত, এরকম দৃশ্য অদৃশ্য যোগাযোগ ছাড়া কবিতার কোনো উৎপাদন নেই। কবিতার জন্ম বিবিধ চিন্তা, বহু বস্তু, বস্তুবিচ্ছিন্ন স্মৃতি বা জ্ঞান-নির্জ্ঞান, ভাবি কালের অনুভবের সাথে জড়িত। কিন্তু লক্ষ্য করি যে প্রথমে ভাব ও চিন্তার নিমজ্জনে, আবার পরবর্তীতে এই বিশেষ ভাবের নাশকতায়, ভাবনার নিধনে কবিতার সৃষ্টি চলে। কারণ তাকে সামাজিক ভাষার বশবর্তী হতে হয়, শৃঙ্খলিত হতে হয় পদে পদে। কবিতার হয়ে ওঠার সাথে সংশ্লিষ্ট এই বাস্তব ঐতিহাসিক ভাষিক যোগাযোগের প্রলেপটুকু বাদ দিলে দেখা মেলে এক অহংপীড়িত মনোসত্তার, যার দখলে আসে এক স্বৈরাচারি বাসনা। কারণ মন যেকোনো আধারকে, যেকোনো সময়কে নিজের ভেতর গজিয়ে তুলতে পারে। তার ভাষার দরকার পড়ে না। তাই কবিতার হয়ে ওঠা কবিতার মিথ্যা কিন্তু ভাব আর অনুভূতির সত্য। এই সত্য অভিজ্ঞতার মুক্তি- বিমূর্ত বিশৃঙ্খলে, কখনো আপাত অর্থহীন, নতুন অর্থের সাজসজ্জায়। যেমন আমাদের এই বাইরের পৃথিবী। শৃঙ্খলতা যতটুকু আছে তা তো আমাদের এই খালি চোখে দেখা। সেখানে একটি আড়াল, ছলনা, মিথ্যার উপস্থিতিছাপ অহরহ। যেমন যাকে দেখছি চোখের সামনে এখন সে তো আসলে এমন নয়, আসলে সে বিভিন্ন রূপ ও সত্তার, অন্য কিছু। তাই আপাত যুক্তিবিরোধী বলাটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই পৃথিবীর চারিদিকের বস্তু সামগ্রীর- ছদ্মবেশী আক্রমণ হওয়ার ফল। কবিতার জন্মপরিচয় যেমন আছে নিজের কাছে নিজের মনোভূমিতে, তেমনি তার মুক্তি তার আহরিত পরাভাষায় যা আপাত সংখ্যাজ্ঞানহীন, ব্যাকরণের অ্যানাটমিতে যাকে কাটাছেঁড়া করেও তার স্বভাবটি চেনা যায় না, তাকে ঠিক পাওয়া যায় না। তার ক্রনোলজি ধরা যায় না। সেই জয়ী যে কি না তাকে ধ্যান করে তুলে আনতে পারে মনোভাষায় ধরা, না-লিখিত অবস্থা থেকে, ব্যক্তির গোষ্ঠীগত সামাজিক ভাষার ভেতরে গুম হয়ে যাওয়া আর একটি সুপ্ত ভাষায়।


ভাষার আবহমানতায় থাকে- মানুষের তৈরি কৃষ্টিকালচার, মানুষের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, বস্তু বা বস্তুরহিত রূপকাঠামোর যোগাযোগ। ব্যক্তির সাথে কাল কালহীনতার মিলন,তলে তলে বাহিত জ্ঞান বিজ্ঞানের চালচলন। সেই সূত্রে তার ভেতরে গড়ে ওঠে নীরব ভাব, বোধ, পর্যবেক্ষণ-পঠন, যা একটি প্ররোচনা তৈরি করে মনে, শেষ পর্যন্ত তার ভাষাবোধের সাথে মিলে যায় এটি। এরকম যোগাযোগে একটি মাটির দলা তৈরী হয় প্রথমে, তার থেকে ধীরে ধীরে এক একটি পদ, পদবিন্যাস, আকার। তার পথ ধরেই তৈরি হয় ঘাস মাঠ জলাশয়, তখন গাছ ওড়ে, পাখি ডাকে। তাই কবিতা সবসময় বিচ্ছিন্ন, একদম ছন্নছাড়া কোনো ঘটনা নয় হয়ত। একটা হয়ে থাকা জুড়ে থাকা শিকড়ের সাথে, মায়ের নাভিদড়ির সাথে সন্তানের যেমন। কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে আলগা হয় কবিতার নুতন বোধ, নতুন পথঅভিজ্ঞতা আহরণের সাথে সাথে। তার সাথে ঘটে ভাব-কল্পনা, অনুভবের ক্রম বির্বতন। এইগুলি একটি ভাষাবোধের সাথে মিশে থাকে গোপনে,বা তৈরি হয় হাজার হাজার বছর ধরে। তাই কবিতা শূন্যের হতে পারে, হতে পারে আকারের। তার শিকড়সন্ধানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ভাব-কল্পনা সবকিছু থাকে পথে, সেই পথ অবলম্বন করে কবি। তাই কবিতার হয়ে ওঠা বা গড়ে ওঠা কোনো রকম জন্ম-মৃত্যু ছাড়াই। পথ-ভ্রমণ থেকে তার উত্থান, পথ থেকেই সে সংকেত ধরে আনে, আনে সম্ভাবনা। পথেই সে নাঙ্গা হয়, পথে গড়ে ওঠা শত সহস্র পাঠশালার জাতক হয়। এই পথে পলায়নের নাম করে যে নামে, সে সৃষ্টি করে এক পরাভাষাআক্রান্ত বিবিধটানেল। সেই টানেলের আলো অন্ধকার ধরে তখন উপচানো পানির মতো কবিতা আসে। শব্দ শোনা যায়।