ও বাংলা

অপরাহ্ণ সুসমিতো


বারটা রাত ন’টার পর মোটামুটি জমে উঠে । সেইন্ট ক্যাথরিন স্ট্রীটের উপর । সিকিউরিটি দরজা ঠেলে ঢুকতে বিশাল দেহী এক বাউন্সার মুখ গম্ভীর করে মুনিয়াকে দেখে । মুনিয়া আন্তরিক করে বলে;
: বোঁ সোয়া ফ্রাঁসোয়া ।
: স্যালু
আলো কম । বিশাল ফ্লোরটায় আজ বেশ লোকজন এরই মধ্যে । মুনীয়া অন্ধকারে ঘড়ি দেখে । স্পষ্ট দেখা গেল না সময় । অনুমান করো ন’টা বিশ । নাতালি,রিক আর রহিমা আসবার কথা । এসে পড়েছে হয়তো । আছে কোথাও ।

মনে হলো মাটি ফুঁড়ে ওর সমানে এসে হাজির হলো লম্বা ঢ্যাঙা মতো এক ছেলে । চুল জেল করে সাজানো । পোড়া চেহারা ।

: হে মি আব্বাস ফয়েজ। ফ্রম অটোয়া । মন্ট্রিয়লে থার্ড টাইম । দো মাই প্যারেন্টস ফ্রম পাকিস্তান । আর ইউ ফ্রম ইন্ডিয়া ?
মুনীয়া ঠান্ডা হয়ে উত্তর করল;
: মুনিয়া । মুনিয়া বার্ড । ফ্রম বাংলাদেশ ।

বাংলাদেশটা সে থেমে থেমে বলল । লাইক বা-ং-লা-দে-শ ।

মুনিয়া ছেলেটার দিকে এক মূহুর্ত তাকিয়ে পরক্ষণে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল ।

; আব্বাস ফয়েজ ? আর ইউ ফ্রম ..তুমি কি এ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে ?

ছেলেটা কথার ধরন না বুঝে মুনিয়ার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল । মুনিয়া হড়হড় করে বলে যায়;

: লুক । জাস্ট মাইন্ড ইয়োর ওন বিজনেস । হোয়াট টাইপ অব এ্যামেনেস্টি ইউ গাইজ আর ওয়ার্কিং ফর ? মানবতা লংঘন ? এত যদি রিপোর্ট করার সখ,তো যাও না,ইজরায়েল যাও । সিরিয়া যাও । হোয়াই বাংলাদেশ ?
আমরা কাকে ফাঁসি দিব না দিব সেটা আমাদের ট্রাইবুন্যাল জানে । ১৯৭১ এ কই ছিলে তোমরা ?

এক টানে কথাগুলো বলে সে থামল । মুনিয়ার জন্ম মন্ট্রিয়লে । সে বাংলা বা ইংরেজীর চেয়ে ফরাসি বলতে সহজ বোধ করে ।

ছেলেটা হেসে দেয় ।

: না না । আমি এ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কেউ না । কার্লটন ইউনিভার্সিটি থেকে । বেড়াতে এসেছি মন্ট্রিয়ল ।

মুনিয়া খানিকটা থতমত খেয়ে ওঠে । বিব্রত বোধ করে । ওর এই দশা থেকে বাঁচিয়ে দেয় ওর ফোন । প্যান্টের পেছনের পকেটে ব্লাকবেরিটা ভাইব্রেট মোডে, কম্পন টের পায় । ‘এক্সকুজে মোয়া’ বলে ওখান থেকে হনহন করে বারের বাইরে এসে দাঁড়ায় । অন্ধকারে কল ডিসপ্লেতে নাম্বারটা পুরো দেখতে পাচ্ছিল না । হ্যালো বলতেই ওপারে ওর ফুপি’র কন্ঠ ।
: মুনিয়া মা কেমন আছিস ?

মুনিয়ার যখন ২ বছর বয়স তখন ওর মা ব্রেস্ট ক্যানসারে মারা যায় । এই ফুপি ওকে বড় করে । টেলিফোনে আজ ফুপির কন্ঠ শুনতেই ও আজ আর্দ্র হয়ে ওঠে । অস্ফুট কন্ঠে মুনিয়া ঘোরের মাঝে বলে;
: মাম্মান মাম্মান..

ফুপি স্পষ্ট শুনতে পায় না ।
: এই মেয়ে কী বলিস ? জোরে বল । শুনতে পাই না কেন ? কোথায় তুই ? কেমন আছিস মা ?

মুনিয়ার কোত্থেকে কান্না পায় যেন । এমনিতে সে খানিকটা নিস্পৃহ গোছের । আপ্রাণ চেষ্টা করছে ও পুরো এক লাইন বাংলা বলতে ফুপিকে । শুধু মাথায় কিলিবিলি করে ফরাসী ।
কান্না ধরে আসে তবু,নিয়ন্ত্রিত হতে চেষ্টা করে সে ।
বিরবির করে ফোনের এ প্রান্তে ..

: মা মা,আমি তোমাকে ভালোবাসি ।

ঝকঝকে এই স্মার্ট মেয়েটা আজ কী অবলীলায় কাঁদতে থাকে একাকী বারটার সামনে ।

: মামনি কী হয়েছে কী হয়েছে ? ও মা কাঁদছিস কেন ? বল বল..

ফুপি ক্রামাগত বলে যেতে থাকে । মুনিয়া চুপ করে ফুপি মা’টার উদ্বিগ্ন গলা শুনতে থাকে । জবাব দিচ্ছে না । কী যে ভালো লাগছে আজ । ইশ চোখ ভিজে যাচ্ছে কেন ?

ফরাসী সুরভিত মন্ট্রিয়লের রাতের আকাশে ছিটেফোটা মেঘ নেই আজ । কলকল সুখী মানুষের কোলাজ আর রঙের বাড়ই । দূরে ডাউন টাউনের স্ট্রিট নিয়ন বাতির ঝলমল ।

আহ ! মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে ।