বোকা বাক্স, বাংলা ভাষা, আমি আর প্রেম

নীলাদ্রী বাগচী


তখন সপ্তম শ্রেণী। ক শাখা। মফস্বলি জিলা বিদ্যালয়ের ছাত্র। রোজকার মত বেলাবেলি বাড়ি ফিরে দেখলাম বাড়িতে বেশ একটা সাজো সাজো ব্যাপার। বাবা মা গলা নামিয়ে কি যেন আলোচনা করছে। আমার সমালোচনাই হবে। এর চোট যাবে আমার ওপর দিয়ে। এইটে বুঝে ধাঁ কুয়োতলা। হাত পা ধুয়ে বইতে মুখ গুঁজে দিতে পারলেই ব্যাস। পড়তে বসে গেলে বাতাস হাল্কা হয়ে যায়। হল্কা গুলো এ দিক ও দিক কেটে যায়। আমার ওপর আসে না। কিন্তু দিনটা ছিল অন্যরকম। কুয়োর আগেই গ্রেফতার হয়ে গেলাম মার হাতে। তেমন কিছু হল না। আমরা কোনখানে একসাথে যাব। মানে আমি সমেত বাবা মা যাবে। তৈরি হয়ে বেড়িয়ে পরলাম। বিবেকানন্দ পাড়ার মোড়ে একতালা এক বাড়িতে গেলাম সবাই মিলে। দিব্যি বাড়ি। বাইরের ঘরে একটা বড় আরাম কেদারা অবধি আছে। বাবা মা আর দরজা খুলেছিল যে ভদ্রলোক সবাই একসাথে ভেতরের ঘরে চলে গেলে আমি মহানন্দে আরাম কেদারায় দোল খেতে লাগলাম। একে তো একদিনের পড়ার হাত থেকে বেঁচেছি তার ওপর দোল খাওয়ার জন্য এমন একটা আরাম কেদারা। দেখলেই মনে হয় সত্যজিৎ রায়ের আঁকা। যেন এর ওপর বসেই অম্বিকা ঘোষাল বলেছিলেন, ‘নিজের বুদ্ধিশুদ্ধি না থাকলে গণেশ কি করবে?’ বেজায় ফুর্তিতে দোল খাচ্ছি, মা ও ঘরে ডাকল। গিয়ে দেখি হরি, হরি! এটা কারো বাড়ি নয়। গুদাম।

আমাদের বাড়িতে তার ক দিন বাদেই বোকা বাক্স যাকে বলে, সেইই এলো ওই গুদাম থেকে। সারা বিকেল ছিদামদা আর তার ওস্তাদ দুই সাগরেদ মিলে বাঁশের মাথায় একটা বড় রুপালি ডাণ্ডা বেঁধে তার এ ফোঁড়ে ও ফোঁড়ে গোটা কতক নানান মাপের রুপালি কাঠি লাগিয়ে কত যে বিচিত্র মাপজোক করে, বাতাসে আঁক কষে, এ ওকে দোষারপ করে, পেয়ালা তিনেক চা আর গোটা কয় পাঁউরুটি চিবিয়ে শেষমেশ সন্ধ্যার মুখে মুখে বাঁশ খাড়া করলো। রাতের অন্ধকার সবে যখন জমতে শুরু করল আমার বাড়িতে বোকা বাক্স চালু হল। প্রথমে কাঁপা কাঁপা ছবি, বাঁশে ধাক্কাধাক্কি করার পর স্পষ্ট ছবি। আমাকে যদিও বাইরের ঘর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে পড়তে বসার নামে কিন্তু আমার তো চোখই কেবল বইতে। মন তো সবটাই ওই ঘরে। কিচকিচ- খ্যাচখ্যাচ পার করে একসময় শব্দ স্পষ্ট হল।তখনও কার্শিয়ং থেকে দিল্লী দূরদর্শন দেখান শুরু হয় নি। একমাত্র দেখা যেত বাংলাদেশের অনুষ্ঠান। আমি আমার বাড়িতে প্রথম চল ছবির আওয়াজ শুনলাম- সব কটা জানালা খুলে দাও না......

বিজয়ের গান বাজিয়ে ছিদামদা আর তার সাগরেদরা চলে গেল। তখন সংবাদ শুরু হয়েছে। বাবা বোকা বাক্স বন্ধ করে আমাকে পড়াতে এল। আমার মাথায় তখন ওরা আসবে চুপি চুপি, যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ। তারা কারা? প্রতিবেশী রাষ্ট্র সম্পর্কে আমি তখন ওয়াকিবহাল। ভূগোলের জন্যই শুধু নয়। আমার পাড়ার মোড় থেকেই চাউলহাটির গাড়ি পাওয়া যায়, চাউলহাটি পেরলেই বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ভাষা আমার শহরে হামেশাই শোনা যায়। আমি আর শুভ্র মাঝেমাঝেই পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে শুনি সেই ভাষা, বাজার হাটেও প্রায় ওই ভাষাই, আমাদের কথ্যও সেই ভাষারই এদিক ওদিক। সেই দেশেরই তো তারা যারা দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ। দেশকে ভালোবেসে প্রাণ দেওয়া মানুষের কথাও তো আমি অনেক পড়েছি। প্রফুল্ল, ক্ষুদিরাম, বিনয়, বাদল, দীনেশ, সূর্য সেন। এদের কথাই কি বলা হচ্ছে গানে? কিন্তু ভারতবর্ষ বাংলাদেশ এরা তো আলাদা দেশ। তা হলে?

পড়তে বসে এ সব কথা জানা যায় না। পড়া শেষ হল। বাইরের ঘর থেকে বরাদ্দ বকুনি আর কানমলা খেয়ে ভেতর ঘরে এসে ভাত খেতে বসলাম। বোকা বাক্স চালানো হল। খাওয়ার সময় দেখা হবে। এতক্ষণে সুযোগ পেয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম প্রথম সন্ধ্যার প্রশ্ন। বাবা খেতে খেতে বলল, বোঝাল, জানাল এক দেশের ভাষার প্রতি ভালোবাসা আর আত্মভিমানের রূপকথা। ৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৯ বঙ্গাব্দর রূপকথা। বোকা বাক্সে চোখ গেল না। হাঁ মুখে বাবার গল্প শুনে গেলাম। রাতে শুতে গিয়ে অন্ধকার কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম সেই দিনটার কথা। মানুষে মানুষে ছয়লাপ আমতলার কথা। এত মানুষ শুধু ভাষার টানে, আবেগের টানে জড় হয়েছিলেন? দেশের টানেই এসেছিলেন তাঁরা। দেশ কি? ভূগোল বই’র ছাপান মানচিত্র? শুধু নিজস্ব মানচিত্রের কি এত তাড়না হয়? তখন সেই সপ্তম শ্রেণীর আমি, গ্রীষ্ম রাতে বিছানায় শুয়ে থাকা একা আমি, আমার ভাবনায় আমার মত করে প্রথম বুঝলাম অস্তিত্ব শব্দটিকে। এ শব্দের লাগসই অস্তিত্ব ই হয়তো এতদিন আমার জীবনে ছিল না। কিন্তু ভাষা নামক আবেগের রূপকথা তীব্র ভাবে আমাকে শব্দটির উপস্থিতি বুঝিয়ে দিল। বাইরে নিস্পন্দ রাত্রি, ঘরে বৈদ্যুতিক পাখার ক্ষীণ ধ্বনি সব কিছুকে অপ্রাসঙ্গিকে আমার কাছে তখন সেই আশ্চর্য দিনের রূপকথা।। না জানি কি দিন ছিল সেটা। ভাষার অস্তিত্ব জাতির অস্তিত্ব হয়ে উঠেছিল। শুধুমাত্র তাঁর ভাষা আর তাঁর দেশের ভাষা ভিন্ন হয়ে যাবে, এইটুকুই মেনে নিতে পারেন নি তাঁরা। [জনান্তিকে মাফ চেয়ে নিচ্ছি এইখানে। ভাষা আন্দোলনের সরলীকরণ আমার উদ্দেশ্য নয়। সে স্পর্ধাও নেই আমার। আমি আমার একাদশ বৎসর বয়সে, সেই রাতে যা ভেবেছিলাম এখানে স্মৃতি থেকে তাই উদ্ধারের চেষ্টা করছি।]
পরের দিন স্কুল যাচ্ছি, আমি আর রাজা। দু সাইকেলে দু জন। রাজা দারুণ ছাত্র। তীব্র মেধা আর প্রত্যয়ে যে কোনও বিষয়কে স্বচ্ছ করে পৌঁছে দিতে পারে শ্রোতার কাছে। আমাদের এই স্কুল যাওয়ার রাস্তায় ও ই বলে, আমি শুনি। আমি জন্ম শ্রোতা। আমার এই একটিই গুণ। সেদিন কিন্তু আমি রাজাকে বললাম, জানিস বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন হয়েছিলো। আমি রাতে শোনা গল্প বলে যাচ্ছি আর আমার কানে আমারই আওয়াজে আমার ভাষা আমাকে আমার ভাষার গল্প শোনাচ্ছে। হ্যাঁ, আমার ভাষা। আমি তাকে অবলম্বনে নিজেকে প্রকাশ করলেও এতদিন তার গুরুত্ব বুঝি নি। আমার বাড়িতে প্রথম বোকা বাক্স আসার গল্প তাই আসলে আমার ভাষাকে চেনার গল্প।

সেই তো সপ্তম শ্রেণী নিজের ভাষাকে চিনল। ভাষা মানে মা এরকম একটা ধারনাও তার মধ্যে গুঁজে দিল পাঠ্য পুস্তক। কিন্তু সপ্তম যখন অষ্টম, নবম, দশম টপকে একাদশ, যখন মল্লিকা বনে প্রথম কলি ধরার দিন, যখন প্রথম কবিতা পড়ার পর একহপ্তা একটাই কবিতায় কি একটা লাইনে কি কিছু শব্দে মরে পরে থাকার দিন তখন একটা সন্দেহ রিনরিন করে উঠল ভেতরে। ভাষা প্রেম কি মাতৃ প্রেম? মা আমার আজন্ম মা। আমার আসছি, জামা কোথায়ের মা। ভাষা কি ঠিক অত সহজের মা আমার? ভাষার কোনওখানে রহস্য রয়েছে, যে রহস্য আমার সেই বড় হয়ে ওঠার দিনগুলোর কিছু বোঝা আর অনেক না বোঝায় একাকার তখন। ভাষার আবেগকে ছুঁতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর অতল জলের আহ্বান আমার কাছে একাকার তখন। সেই সময় প্রেম পত্রের সময়। লম্বা, লম্বা চিঠি বা ছোট, ছোট চিরকুটে নিজেকে পৌঁছে দেওয়ার যুগ সেটা। ভাষা তখন আমার প্রেম, আমার প্রেম প্রকাশের মাধ্যম। বন্ধুর চিঠিতে বান্ধবী সাড়া না দিলে বন্ধু কলেজ চত্বরে নারকেল গাছের নীচে বসে বিড়ি ধরিয়ে আক্ষেপ করত, আমার ভাষা বুঝল না! আমার বাংলা!! সেই আর্তিতে তার প্রেম- তার বাংলা- তার ভাষা একাকার হয়ে যেত। সেই ভাষা কি মা নাকি? আমার ঘোর সন্দেহ হত। সেই ভাষা তো প্রেম। কোনও কোনও সময় সে আমি নিজেই। বিশেষত যখন চিঠি পাঠানোর পর লম্বা একটা অপেক্ষা থাকত। এক কি দু দিন ব্যাপি দীর্ঘ সেই প্রতীক্ষায় সে ভাষা আমি কারন আমি নিজেকে বোঝাতে চেয়েছি হরফে হরফে। যদি জবাব মিলত তো তখন ভাষা প্রেম কেননা তখন আমি তাকে বুঝতে চাইছি হরফে, হরফে। ভাষাপ্রেম ভাষা ও প্রেমকে একাকার করে দিয়েছিল তখন।

আমার বাংলা ভাষা নিয়ে ভাবনার এইসব আবোলতাবোলের শেষে এসে আর একবার গত শতাব্দীর নয়ের দশকে ফিরে যাই। দূরদর্শনের কোলকাতা কেন্দ্রের সামনে প্রতীকী প্রতিবাদের অবস্থান। বিষয় দূরদর্শনে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান করতে হবে। কেবল বাংলা নয় সমস্ত আঞ্চলিক ভাষায় অনুষ্ঠান করতে হবে এই ছিল দাবী। প্রতিবাদ মঞ্চে প্রতিদিন বাংলা ভাষায় নানা অনুষ্ঠান। একদিন। সন্ধের সময়। প্রথমে ঝিরিঝিরি তারপর দ্রুতলয়ে বৃষ্টি শুরু হল। রাস্তার এধারে ওধারে তখন যে দু একখানা ছোট্ট দোকান আর অনেক গাছ তার নীচে আশ্রয় নিয়েছে শ্রোতারা মানে আমাদের মতো অনেকে। মঞ্চে অনুষ্ঠান চলছে। প্রতুল মুখপাধ্যায় গাইছেন। প্রবল বৃষ্টি। একটা ট্যাক্সি থেমে গেল পথে যেতে যেতে। ট্যাক্সির কাচ নামিয়ে কেউ প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান শুনতে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমাদের মধ্যে কে যেন বলল, দেখ লোকটা ট্যাক্সি থামিয়ে গান শুনতে দাঁড়িয়ে গেল সামনে। আমরা সামনে যেতে পারি না? আমাদের বন্ধুদের ছোট্ট দলটা তারপর পায়ে পায়ে বৃষ্টিতে নামলাম। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গিয়ে মঞ্চের সামনের ফুটপাথে বসে পড়লাম একে একে। বৃষ্টি এত ঠাণ্ডা, বৃষ্টি এত মিষ্টি। মঞ্চে প্রতুল মুখপাধ্যায় আমার ভাষার জন্য আমার ভাষায় গান গাইছেন। শুনছি আর ভাষায় স্নান করছি, বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে। সেইদিন প্রথম আমি সামসের আনোয়ারের সেই পঙক্তি মা কিম্বা প্রেমিকার অর্থ বুঝতে পারি। মা কিম্বা প্রেমিকা যেই হও তুমি একই, তুমি আমার বাংলা, তুমি আমার ভাষা। আমার আনন্দ বেদনা বিরহ মিলন সঙ্কট......