টোয়েন্টি ফার্স্ট ফেব

তুষ্টি ভট্টাচার্য্য


টোয়েন্টি ফার্স্ট ফেব – ভাষা দিবস। কী যে ভালো লাগে এই দিনটা এলে! আমার বাংলা , আমার বাংলা ভাষা – এই সেন্টিমেন্টে কেমন যেন ভাজা ভাজা লাগে নিজেকে। ওহ সরি! ‘ভিজে ভিজে লাগে’ হবে আসলে! অফ কোর্স , এরকম এক দিনের জন্য ওয়েট করে থাকা যায় সারা বছর ধরে। অ্যাকচুয়ালি যাদের মাদার টাং বাংলা , তাদের প্রত্যেকেরই এরম ফিলিংস ন্যাচারালি আসবেই। বাংলা ছাড়া আর গতি নেই আমাদের। জাস্ট ইমাজিন , আমাদের রবীন্দ্রনাথ না থাকলে কী হত ! বাংলা না জানলে রবীন্দ্রনাথ পড়া হত না। ও ইয়েস্ , জীবনানন্দও পড়েছি। বাট বড্ড টাফ্ লাগে এই যা। তবে কোথায় যেন একটা মন কেমন করা ওয়েভ আসে , পুরোটাই ইনার ফিলিং , যদি তুমি পড় একটু মন দিয়ে , ইউ নো দ্যাট – ব্যাপক একটা এক্সাইটমেন্ট পাবে। একুশে নিয়ে বাংলাদেশে এক তীব্র উন্মাদনা দেখতে পাই , আমাদের ওয়েস্টবেঙ্গলে অবশ্য ততটা হাইলাইটেড নয় একুশে। তবুও আমার বেশ ভাল্লাগে একুশের এই ইমোশোন। তাতে তোমরা আমায় যতই গাঁইয়া বল না কেন , আই কেয়ার আ ড্যাম!
এবার আমার একুশের রেসোলিউশান – একদম খাঁটি বাংলায় কথা বলব। একটাও ইংলিশ বা হিন্দি শব্দ আনবো না কথা বলার সময়ে। আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট। বন্ধুরা- প্রে ফর মি… আসলে আমিও চাই , সত্যি বলছি , মন থেকে চাই – বাংলার জয় হোক। সে ভাষা বা যে কোন ফিল্ডেই হোক । বাংলা থেকে যেন ব্রেন ড্রেন না হয় , আমাদের প্রতিভা , আমাদের ট্যালেন্টের যোগ্য দাম দিতে পারে যেন বাংলার এই মাটি। আমরা যদি অফিসিয়ালি বাংলায় লিখতে পারতাম , আমাদের ন্যাশানাল ল্যাঙ্গুয়েজ যদি বাংলা হত , এই বাংলায় যদি শুধু বাঙালিরাই থাকত , বাংলায় কথা বলত , তাহলে কি আর আমি এমন খিচুড়ি বলতাম! শুধু আমাকেই দোষ দাও কেন! স্কুলে আমার ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ ইংলিশ , বাংলায় কথা বলা বারণ , একটা বাংলা ওয়ার্ড বললেই মাইনাস ফাইভ – আমাকে কি তোমরা বাধ্য কর নি এই ভাষায় কথা বলতে! এখন যে বড় আঙুল তুলছ! সিলেবাসের বাইরে আমার বাংলা পড়া হয় না , স্কুলের লাইব্রেরিতে শুধুই ইংলিশ বই। পড়ার চাপে অন্য বই পড়ব কখন , ভেবেছে কি কেউ! আমার বেস্ট ফ্রেন্ড পূজা আর নেহা। একজন পাঞ্জাবী আর একজন মাড়োয়ারি। স্কুল টাইমের বাইরে ওদের সাথে বাংলিশ , হিংলিশ বলে এসেছি , ওদের রান্না ভর্তা , লিট্টি , আচার , তড়কা খেতে শিখেছি। ওরাও তেমনি পোস্ত , আলুরদম আর মাছ খেতে শিখেছে , যদিও মাছটা লুকিয়েই খেয়েছে , তবু তো খেয়েছে। আমরা মিক্স হয়ে যাচ্ছি। তাতে ক্ষতিটা কী হচ্ছে শুনি! আমরা আমাদের লাইফ এনজয় করছি আমাদের মত। তোমরা তোমাদের ‘গেল গেল’ শাউট নিয়ে গো টু হেল ম্যান!
এভাবেই আমরা গ্রো আপ হই। স্কুল পেড়িয়ে কলেজের লাইফেও সেই একই প্রবলেম। এখন তো আর গড়গড় করে বাংলা পড়তে পারি না। বাংলায় হায়ার স্টাডিস করাও খুব মুশকিল। বাংলার টার্মগুলো খুব খটমট লাগে। মনে রাখব কেমন করে ? তাই এভাবেই আমাদের চলতে হয়। তোমরা আমাদের কালচার নিয়ে লেগপুল কর , আসলে তোমরা আমাদের হেল্পলেসনেস বোঝ না। আমরা বাই হার্ট বাংলা ভালোবাসি , তোমরা সেটা বুঝতেই চাও না। আমাদের কেরিয়ার গড়তে হবে, এত হাই কম্পিটিশানের যুগে না খাটলে আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াবো কি করে! আমরা কেউই অন্যের ওপর ডিপেন্ড করতে চাই না, আমাদের সেলফ-কনফিডেন্স লেবেল খুব হাই। সো, এতসব করতে গিয়ে বাংলা ভাষার জন্য আলাদা করে টাইম দিতে পারি না। তাই এই ল্যাংগুয়েজ , আমাদের মাদারটাং, ইয়েস-আমাদের মাতৃভাষাকে আমরা ইগনোর করে ফেলি। ইট’স ভেরি পেনফুল ফর আস্‌। বাট্‌, নাথিং ক্যান বি ডান।
আমার অনেক অবাঙালি বন্ধুরাও রবীন্দ্রসঙ্গীত জানে, একটু একটু গাইতেও পারে ঠিক সুরে। ওরা অ্যাডমায়ার করে রবীন্দ্রনাথকে। আমাদের মধ্যে অনেক এলিটদের যদিও দেখি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আগড়াম-বাগড়াম বকতে। তাদের কনটেন্টে শুধু জেলাসি দেখি, আরে বাবা তুমিও একটা রবীন্দ্রনাথ হয়ে দেখাও না তাহলে! প্রুফ ইয়োরসেলফ! হাতের কাছে যেসব বাংলা ম্যাগাজিন পাই , সময় পেলে নেড়েচেড়ে দেখি কখনও সখনও। ছোট গল্প বেশ লাগে , তবে মডার্ন বেঙ্গলি পোয়েম বুঝতে পারি না। শুনেছি এর জন্য আলাদা একটা প্রেপারেশন লাগে, মাইন্ড সেট-আপের। আরও শুনেছি মডার্ন বাংলা কবিতায় খুব ভালো কাজ করছেন আজকের পোয়েটরা। দে আর টু মাচ সিরিয়াস অ্যাবাউট দ্যাট। অনেক নতুন স্টাইল নাকি আসছে, যত ওল্ড থিয়োরিস ভেঙে ফেলে , দে কাল্টিভেট দ্য আল্টিমেট। খুব ইচ্ছে হয় এসব পড়তে , জানতে – অথচ পারি না। আমার প্রোনাউন্সিয়েশন নিয়ে তোমরা হাসবে তখন , অথচ তোমরা যেভাবে ইংলিশ বল বা বলতে চাও – কী আর বলব! আমরা কিন্তু হাসি না, আমরা জানি তোমরা বেঙ্গলি মিডিয়ামে পড়েছ , তোমাদের ভুল প্রোনাউন্সিয়েশন কেউ কোনদিন কারেক্ট করে দেয় নি, তাই তোমরা পার না। এটা কোয়াইট নর্মাল , হতেই পারে। আমরা অনেক উদার হতে শিখেছি , এবার তোমরাও শেখো। আমাদের শিখিয়ে দিও নিজের মনে করে। শুধু ভুল ধরো না, আঙুল তুলো না। উই আর ট্রাইং।
সত্যি বলতে কি লেটেস্ট বাংলা ফিলমি সং আমায় একটুও টানে না। সো বোরিং! ওই গান শোনার চেয়ে আমি ওয়েস্টার্ন রক, পপ শুনবো। শুধু শুধু কপি করে ওরা। তবে আবার বেশ কিছু গান, ভীষণ ভালো লাগে। সো রিদমিক, মেলাঙ্কলি টাইপ, আবার হিলিংও বটে। শুনেছি এখনকার কিছু ফেমাস পোয়েটরা আজকাল বাংলা ফিলমের গান লিখছেন, সুর করছেন কবীর সুমনও। সেই জন্যই বোধহয় কিছু গান এত ভালো হচ্ছে। আফটার অল বাংলা ভাষার সুইটনেসটা আর কোন ভাষার মধ্যেই পাওয়া যাবে না, হিন্দির মধ্যে একটা আরবান টান আছে, আর সাউথের ভাষাগুলো বড্ড খটমট, কাঠখোট্টা টাইপ। অবশ্য সবার মুখের বাংলা এক রকম নয়। যেমন আমার কাজের মাসি যে বাংলায় কথা বলে , আমরা ওরকম পারি না। আমরা মানে আমাদের বাড়ির বড়দের কথা বলছি আর কি! আমরা তো একেবারেই ডিফরেন্ট। তোমাদের কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, পাতে দেওয়ার মত না। আবার যখন আমরা একটু উত্তরের দিকে যাই, যত জেলা বদলায় তত রকম বাংলার টান। কোন কোন এরিয়ার বাংলা আমি তো বুঝতেই পারি না। আমার দাদুদিদা যখন বাংলাদেশ থেকে আসতেন , ওঁদের কথাও আমি কিচ্ছু বুঝতাম না।ইনফ্যাক্ট আদর, ভালোবাসাটুকু বুঝতাম ওঁদের বডি ল্যাঙ্গোয়েজ থেকে। তবে খুব সুইট লাগত বাঙাল ভাষা।
আমাদের বাংলা ভাষায় সমস্যা আছে। কিন্তু সেটা শুধু বলার বা পড়ার। সত্যি বলছি, মানো অউর না মানো, আমরা মানে আমাদের জেনারেশন কিন্তু বাংলাতেই থাকতে চাই, অনেস্টলি বলছি। নিজেরদের লোক ছেড়ে, বাড়ি ছেড়ে, ভাষা ছেড়ে কে আর দূরে যেতে চায়! হোম সুইট হোম। আমাদের দূরে রেখো না তোমরা, একটু ফ্রিমাইন্ডে আমাদের সাথে মিশে দেখো, আমরাও তোমাদেরই মত বাংলায় আছি, শুধু তোমাদের কানে লাগছে আমাদের কথা, আমাদের অ্যাটিটিউড, এই যা। আমরা বুঝি সব, এবার তোমরাও একটু আমাদের আপন করে নাও, আমাদের কারেক্ট করে নাও। লং লিভ বাংলা। এটুকুই আমার বলার।