আ - মরি

কেয়া মুখোপাধ্যায়


একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির বড় গৌরবের দিন। এই দিনটিতেই আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ঘরেরপাশের চিরচেনা শান্ত দিঘির রূপটি ছেড়ে হয়ে উঠেছে এক অপার সমুদ্র, এক আন্তর্জাতিক তরঙ্গ।যে কোন ভাষার আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠা এক বিস্ময়কর যাত্রা। বাংলা ভাষাজননীকে আন্তর্জাতিকতার এই মুকুট পরিয়েছেন একদল ছাত্র। আজ থেকে তেষট্টি বছর আগে এই দিনটিতেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঊর্দুর পাশাপাশি বাংলার সম-অধিকার চেয়ে ঢাকার রাজপথে নেমেছিলেন বাঙালি ছাত্ররা। দাম্ভিক শাসকদের জবাব এসেছিল বুলেটে। রফিকউদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালাম, আবুল বরকত, আবদুল জব্বারের রক্তে ভিজে গিয়েছিল ঢাকার রাস্তা। কিন্তু বাংলা বিদ্বেষী শাসকদের শত অত্যাচার আর নিপীড়নেও থেমে যায়নি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালির সেই সংগ্রাম। তখন রবীন্দ্রনাথ নেই, কিন্তু তাঁর বাণী অন্তরে নিয়ে, তাঁর গান গাইতে গাইতেই বাংলা ভাষাজননীর মর্যাদা রক্ষায় শামিল হয়েছিলেন আপামর বাঙালি।

শেষপর্যন্ত ১৯৫৪ সালে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন পাকিস্তানের শাসকরা। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান সংবিধানের ২১৪(১) অধ্যায়টি সংশোধন করে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে লেখা হয়েছিল: "The state language of Pakistan shall be Urdu and Bengali." এল ১৯৭১। পৃথিবীর মানচিত্রে একমাত্র বাংলাভাষী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান বাঙালিদের শুধু স্বাধীন করেননি, বাঙালির মাতৃভাষাকেও পাঠিয়েছেন আন্তর্জাতিক জয়যাত্রায়।

বাংলার ভাষা আন্দোলনের উজ্জ্বল অধ্যায়টির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছিল ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। সেদিন ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিনটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হবে।

আমরা গড়পড়তা বাঙালি প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারির সময় বাংলা ভাষা নিয়ে আবেগ আর উচ্ছ্বাসের বাঁধ ভাঙ্গা প্রাবল্যে ভেসে যাই। কুম্ভকর্ণের ঘুম ভেঙে হঠাৎ চোখ মেলি একুশের সকালে। সেদিন পাটভাঙা পাঞ্জাবি-উত্তরীয় কিংবা বাংলা হরফ-ছাপ তাঁতের শাড়ি আর বড় টিপে সেজে বাংলা আকাদেমির সামনে ফাগুনের হাওয়ায় ভেসে আসা বাংলা গানের সুরে দুলতে দুলতে অপেক্ষা করি ভাষাদিবস উপলক্ষে সেমিনার শোনবার জন্যে। আস্ফালন করে বলি, বাংলা পৃথিবীর পঞ্চম ভাষা, কলকাতাই ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। আর অনিবার্যভাবে গর্ব করি বাংলা ভাষাজননীর শ্রেষ্ঠ সন্তান রবি ঠাকুরের বাংলা ভাষায় নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে। আর তারপর? স্রেফ ভুলে যাই। বছরের বাকি ৩৬৪ দিন বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের আর কোন ভাবনা নেই। সে ভাষা রইল কি গেল, তা নিয়ে আমাদের মনে আর কোন আলোড়ন নেই।
অথচ ভাষা তো একটা সংস্কৃতির ধারক আর বাহক। বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতি বাঙালি হিসেবে আমাদের পরিচয় তৈরি করেছে পৃথিবীর কাছে। এই ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছেন শহিদরা। এই ভাষার সম্মান আর স্বীকৃতির সংগ্রাম ক্রমশ একটা দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠেছে। তাহলে এই ভাষার সঙ্গে একাত্ম আবেগকে কি করে ভুলে যেতে পারি আমরা?বাংলা ভাষা নিয়ে উত্সব নিশ্চয়ই থাকবে। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারির উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে সেই উত্সব শেষ হয়ে গেলে চলবে না। উত্সবের মূলে যে আবেগ আর ভালবাসা, প্রতিদিনের জীবনে তাকে সঙ্গী করতে হবে। নাহলে অতীতের ইতিহাস চর্চা আর ঘটা করে একদিন বচ্ছরকার ভাষা উত্সব পালনের সঙ্গে মাতৃভাষার প্রতি ভবিষ্যতের কোন সংকল্প বা দায়বদ্ধতা যোগ হবে না। সেটা বাঙালি হিসেবে আমাদের কাছে বড় লজ্জার!

কিন্তু আজকের এই বিশ্বায়নের দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক বাঙালির কাছে বাংলা ভাষার ভূমিকাটা ঠিক কী? মর্যাদা আর গুরুত্বই বা কতটা?‘গ্লোবাল’বাঙালি জীবনধারণের অনিবার্যতায় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি বাঙালির চিরায়ত আকর্ষণ আর ভালবাসা কি ক্রমশ পথ হারাচ্ছে? এইসবনানা প্রশ্ন ভিড় করে আসে মনে।

সন্তানের ভবিষ্যতের ভাবনা থেকে আমরা, বাঙালি অভিভাবকেরা আজ পড়াশোনার মাধ্যমে হিসেবে মাতৃভাষার প্রতি ভরসা রাখতে পারছি কি তেমন করে?আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠাই। বিশ্বাস করি, তবেই তারা এই বিশ্বায়নের দুনিয়ার উপযুক্ত ভবিষ্যত নাগরিক হিসেবে তৈরি হয়ে উঠবে, তবেই তারা দুধে-ভাতে থাকবে। আর্থ-সামাজিক কারণে যারা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সন্তানকে পাঠাতে পারি না, তারা হীনমন্যতায় ভুগি। কারণ আমরা ভাবি ইংরেজি ভাষাই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে।

একসময় ভাবা হত শুধু ইংরেজিতে কথা বলা আর শোনা নয়, ইংরেজিতে স্বপ্ন দেখতে হবে, তবেই ভাল করে ইংরেজি শেখা যাবে। আর, ভাল ইংরেজি শিখতে গেলে বাড়িতে বাংলা বলা একদম চলবে না। এই পদ্ধতি এখন অচল। কিন্তু দেখা যায় ইংরেজি ভাষা শেখাতে গিয়ে অনেক বাবা-মা ছেলেমেয়েদের প্রায় বাংলা ভাষা ভুলিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন। এ প্রসঙ্গে ভাষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র সরকারের একটি লেখার অংশবিশেষ তুলে না দিয়ে পারছি না:
“অনেক বাবা-মা নিজেরা শিক্ষক শিক্ষিকাদের মতো যথেষ্ট ইংরেজি জানেন না, কিন্তু তাঁরা স্কুলের বাইরে তাঁদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজির দুর্ধর্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা হয়ে ওঠেন। স্কুলে যেতে বা স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে আসার সময় ছেলেমেয়েদের বাঙালি ইংরেজি উচ্চারণে বলেন,
‘লুক টিটু, দি ম্যান ইজ রাইডিং অন এ হর্স।’
'দি' কোথায় 'দ্য' গোছের হবে, 'এ' কোথায় 'আ' গোছের হবে, রাইডিং এর পর অন হবে কি না, এ সম্বন্ধে তাঁদের অনেকের কোনও ধারণা নেই, কিন্তু ছেলেমেয়েকে তাঁদের ইংরেজি জ্ঞান দিয়ে সমৃদ্ধ করতে তাঁরা কোমর বেঁধে লেগে যান। কাজেই ছেলেমেয়ে যদি বলে ওঠে,
‘মা ওই দ্যাখো, একটা বেড়াল দৌড়ে রাস্তা পেরল।’
তখন তাঁরা বকে ওঠেন,
‘বেড়াল বললে কেন টিনা, ক্যাট বলতে বলেছি না?’
এবং রাস্তা ঘাটে প্রাণপণ তাঁরা ওয়ার্ডবুকের মত ছেলেমেয়েদের প্রতিশব্দ শেখাতে থাকেন,
‘গরু নয় কাউ। কুকুর নয় ডগ। হাতি নয় এলিফ্যান্ট। ইঁদুর নয় মাউস।’

আসলে বাবা মা-দের এই মরিয়া চেষ্টার কারণ তাঁদের মানসিক বিপন্নতা। তাঁরা মনে করেন ইংরেজি ভাষা শিক্ষাই সন্তানের সাফল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু ইংরেজি বা অন্য কোন ভাষা শেখার জন্য বাংলা ভোলার প্রয়োজন হয় না। শিশুবয়সেই গ্রহণ করার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। তাই সেসময়ে একাধিক ভাষা শেখা ছোটদের পক্ষে মোটেই কঠিন নয়। বরং যে বাচ্চারা একাধিক ভাষা শেখে, দেখা যায় তাদের মেধা একটিমাত্র ভাষা জানা বাচ্চার থেকে অনেক বেশি। ভবিষ্যতের সুযোগ সুবিধার কথা ভেবে আমাদের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি শিখুক, কিন্তু বাংলা ভাষার ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সঙ্গেও তারা সমানভাবে পরিচিত হোক। ইংরেজি আর বাংলা গল্পের মধ্যে দিয়ে দুটো ভাষার প্রতিই তাদের আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব। এই দায়িত্বটুকু অভিভাবকদের নিতে হবে। একবার বাংলা ভাষার প্রতি এই আগ্রহ সৃষ্টি হলে তারা নিজেরাই বই তুলে নেবে হাতে। অন্য ভাষার পাশাপাশি বাংলাভাষাকেও ভালবাসতে শিখবে।

দেশের থেকে অনেক দূরে আছি বলে বুঝতে পারি, বাংলাভাষার প্রতি সন্তানদের এই ভালবাসা তৈরি করাটা দেশে থেকে যত সহজ, তার চেয়ে অনেকগুণ কঠিন বিদেশে। তাই বিদেশে অনেক বাবা মা-ই সেই কঠিন পথটা এড়িয়ে চলেন। বাংলা ভাষার সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের সংযোগ ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।এভাবেই আমাদের ভাষার ঐশ্বর্য অধরা থেকে যায় আমাদের সন্তানদের কাছে, আর আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধীরে ধীরে যায় হারিয়ে।যে ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আবেগ, যে ভাষায় আমাদের ভালবাসারপ্রকাশ, বিদেশে থেকে যখন দেখি অনেক পরিবারে ঠিক পরের প্রজন্মের কাছেই সে ভাষা অর্থহীন হয়ে পড়ছে, তখন আশঙ্কা হয়- তবে কি অন্য ভাষা আর সংস্কৃতির কাছে বাংলা ভাষা মাথা নত করবে?

আট সপ্তাহ বয়স থেকে আমাদের ছেলের দিনে ন’ দশ ঘন্টা সময় কাটে ডে-কেয়ারে। সেখানে সারাদিন ইংরেজি কথা, ইংরেজি গল্প, ইংরেজি গান শোনে। তাই বাড়িতে ইংরেজি নৈব নৈব চ, বাড়িতে শুধু বাংলা। দেড় বছর বয়সে দেখা গেল ইংরেজি আর বাংলা- দুটো ভাষার কথাই সে বোঝে, তবে বলছে মূলত ইংরেজি। বাংলা গল্প শোনা, গান শোনা, ছড়া-কবিতা শোনা আর একসঙ্গে গান গাওয়ার মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরি হবার ফলে দেখা গেল তিন-সাড়ে তিন বছর বয়সে সে একই কথা ইংরেজি আর বাংলা দুটো ভাষাতেই বলতে পারছে। আর এখন চেষ্টা করছে নিজের মত করে ইংরেজি আর বাংলাতে টুকরো টুকরো গল্প তৈরি করার।

বাংলা শেখাতে গিয়ে মাঝে মাঝে নিজেরাও হিমসিম খাচ্ছি। এই তো সেদিন কনুইয়ের একটু ওপরে ব্যথা পেয়ে এসে দেখাল- ‘এইখানে লাগছে।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘এইখানটাকে কি বলে?’ বলল, ‘জানি না তো!’ আমি বললাম, ‘বলো, হাতে লাগছে।’ খুব অবাক হয়ে বলল,‘হাত তো হ্যান্ড। এইখানটা তো হ্যান্ড নয়, এটা আর্ম। আর্ম-এর অন্য বাংলা নাম নেই?’ প্রমাদ গণলাম। সচরাচর কাঁধ থেকে আঙুলের ডগা পর্যন্ত সবটাই ‘হাত’ বলে উল্লেখ করে থাকি আমরা। তাও বঙ্কিমচন্দ্রকে স্মরণ করে মনে মনে ‘বাহুতে তুমি মা শক্তি’ গেয়ে উঠে বললাম,‘এইখানটাকে বলে- ‘বাহু।’ নতুন শব্দ শিখে খুব খুশি। এরপর বাবাকে সারাদিনের কার্যবিবরণী দিতে গিয়ে যখন জানাল, ‘আমার বাহুতে লেগেছে’, তখন বাবার হোঁচট খাবার পালা।
একইভাবে প্রশ্ন করে, ‘জল কেন খাব! উই ক্যান্ট ইট ওয়াটার্। উই ড্রিঙ্ক ইট্।’ তখন নিজেদের কথ্য-বাংলার সীমাবদ্ধতার কথা ভাবি মনে মনে।

তবে এভাবে শুধু শুনে বাংলা শেখা বা বলা যথেষ্ট নয়। খুব জরুরি হল ছোটদের বাংলা অক্ষর পরিচয় আর লিখতে শেখানো। এই সময় আমার শহরে বাংলা স্কুলের অভাব অনুভব করি খুব। সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখাটা সম্পূর্ণ করে তুলতে পারলে নিজের শিকড়ের সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে যোগটুকু বজায় রাখাটা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কঠিন হবে না। ছেলেমেয়েদের বড় করা যাবে বিশ্বনাগরিক হিসেবে।

আর একটা কথা না বললেই নয়। দেশেই হোক বা বিদেশে- যখন বাংলা ভাষাটা শেখানো কি বলা হবে, তখন তাতে অযথা কিছু ইংরেজি কথার মিশেল দেওয়া ঠিক নয়। এতে বাংলা ভাষাকেও সম্মান করা হয় না, ইংরেজির প্রতিও শ্রদ্ধা প্রকাশ পায় না। খিচুড়ি বাংলা নয়, শুদ্ধ বাংলা শেখা আর বলা খুব জরুরি। রক্তের বিনিময়ে অর্জন করা বাংলা ভাষার পবিত্র অহঙ্কারকে খিচুড়ি ভাষা বলে অমর্যাদা করব না- মনে মনে এই সংকল্পটুকু নেওয়া কি খুব কঠিন?

প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের চেতনায় আর মননে বাংলা ভাষার প্রতি যে ভালবাসা জেগে ওঠে- সেটা যেন এই একদিনের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনেই শেষ না হয়ে যায়। সারা বছর মাতৃভাষার প্রতি, বাংলা ভাষার প্রতি সেই ভালবাসাটুকু, হৃদয়ের সেই আর্তিটুকু যেন জীবনীশক্তি হয়ে জেগে থাকে। যেন পরম মমতায় অন্তরের উষ্ণতা দিয়ে বাংলা ভাষাকে আগলে রাখে বিশ্বজুড়ে সমস্ত বাঙালি, অনাগত ভবিষ্যতেও, বছরের পর বছর,প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে।