তারা থেকেই যায়

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


- কি হ'ল? বল না?... থামলে কেন মা...
- তারপর...

তারপর অনেকটা দূরে... সেখান থেকে কিচ্ছু শোনা যায় না। কার চোখে কৌতূহল... কার চোখে প্রত্যাশা, তা দেখাও যায় না স্পষ্ট ভাবে। শুধু অবয়বটা বোঝা যায়। ওই অবয়বটুকুই অস্তিত্ব হয়ে গেছে। যাকে 'থাকা' বলে, যাকে 'রাখা' বলে। আছে তো... ওই যে, দেখতে পাচ্ছি।

দেশ নিয়ে তর্ক হ'তে দেখেছি। মাটি নিয়ে তর্ক হ'তে দেখেছি... মাটি থেকে জমি, জমি থেকে ভূখণ্ড... দেশ। আমার দেশ... আমাদের দাশ। কি সাংঘাতিক আবেগ এই দু'টো কথার মধ্যে! ভিক্টোর হুগো'র একদম শেষের দিকে উপন্যাস... নাইন্টি থ্রি। এক পক্ষ বলছে রাজতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক... আর পক্ষ বলছে গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক। জানি, গণতন্ত্রর চিৎকারের সামনের রাজতন্ত্রের হুঙ্কার চিরকাল শৈরাচারী শোনায়। অথচ সেখানে বার বার উঠে এসেছে... তারা নিজেদের মধ্যে লড়েও দেশের প্রতি কতটা সৎ। নিজের নিজের অবস্থান নিয়ে নিজের কর্তব্যের প্রতি কতটা নিষ্ঠাবান! সেই রকম আবেগ... ঈশ্বরসম ভক্তির প্রতিরূপ - আমার দেশ।

ঠিক এইখানে দাঁড়িয়ে, দেশ হয়ে ওঠে জাতি... জন্ম নেয় জাতীয়তাবাদ। শুরু হয় আর শেষ হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একের পর এক তত্ত্ব, তর্ক, বিশ্লেষণ।

তারপর?

তারপর গুলি চলে... জনপথ রক্তে ভিজে লাল হয়... রক্ত শুকিয়ে যায়... বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়। জন্ম হয় তারিখের... বার বার ফিরে আসা ইতিহাস। অতীতের চোখে ভবিষ্যৎকে ঘাড় ধরে দেখিয়ে দেওয়ার সাবলীল প্রক্রিয়া।

এরপরেও, প্রশ্ন এসেছে ভেসে বার বার। দেশটা আসলে কি নিয়ে? মাটি? জাতি? জাতীয়বাদ? নাকি মানুষগুলো? দেশবাসীদের মধ্যেই তো দেশ বেঁচে আছে!
সেই বেঁচে থাকার মধ্যেই যদি সংকট দেখা দেয়... সেখানেই যদি অসংগতি, সেখানেই যদি সংশয় দানা বাঁধে... তাহ'লে?
কথা বলতেই না পারা একটা জাতি... মূলতঃ, নিজের মর্জি মত কথা বলতে দেওয়া হবে না যে জাতি কে... তার ভাল থাকা কোথায় থাকলো তবে? তাদের দেশ কোথায়? তারা দেশের না দেশ তাদের? মা... দেশ... ভাষা... স্বাধীন ইচ্ছা... এইসব কিছু কে ঘিরে 'রাষ্ট্র' শব্দ যে কাঁটা তাড় দিয়ে একের পর এক পাক দিয়ে চলে... তার কাঁটায় কাঁটায় তৈরী ক্ষত আর রক্তের দাগ!

ওরা বলল তুমি এই বলবে... সন্তানেরা বলল না।
ওরা বলল তোমাদের বলতে হবে... সন্তানেরা বলল না।
ওরা বলল বলতেই হবে!... সন্তানেরা মানল না।
ওরা গুলী ছুঁড়ল... মায়ের কোল খালি হ'ল।

- তারপর? কি হ'ল... চুপ করে গেলে কেন মা?
- তারপর... সেই রক্তে ভেজা মাটি। মায়ের পা দু'টো জড়িয়ে বাঁচা... আর সেখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার শপথ। এতো আগেও হয়েছে... আবার হবে।
সন্তানেরা বাঁচলে আন্দোলন হয়... আন্দোলন হয় বলেই সন্তানেরা বাঁচে। মায়ের ছায়া আর অবয়ব... নীল আকাশ... সবুজ ঘাস... গেরুয়া কাপড়... লাল সূর্য... সব জায়গায়। আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাটাই সব। সন্তান আর মায়ের মাঝে যে নাড়ীটা কে ভালবাসা বলে... তাকে বাঁচিয়ে রেখে।

তারপর... ২১শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৩ সাল। শহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম এসেছিলেন... বাংলাদেশের ভাষা শহীদদের প্রতি উৎসর্গ সেই শহীদ মিনারের উদ্বোধন করতে। ১৯ শে মে ১৯৬১ এর কয়েক বছর পরেও হয়ত এমন মায়েরা এসেছিলেন সিলচর রেল স্টেশনের কাছে সেই রাস্তায়।

ভালবাসা শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে যে 'ভাষা'... সেই ভাষাই প্রসারিত হয়ে এই ভালবাসা হয়ে যায়... জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়। সেই একইভাবে, সেই নাড়ীটাকে বাঁচিয়ে রেখে।