অবচ্ছিন্ন বিষাদ

প্রশান্ত গুহ মজুমদার


ভাষাআন্দোলন বিষয়ক একটি আলোচনা বাসরে সেদিন উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। তার - ও কিছু কাল আগে বাঙলা ভাষার সংরক্ষণ, সংবর্ধন ইত্যাদি নিয়ে কিছু সুধীজনের কথা শুনেছি ইতস্তত। মূল্যবান সে সব উচ্চারণ। সমসাময়িক কালে বাঙলা ভাষার ব্যবহার, অন্য ভাষার আগ্রাসন, ভাষাপুলিশ বিষয়ক প্রস্তাব এবং প্রাসঙ্গিক কিছু ভাবনাও চোখে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সমস্ত কিছুই প্রাসঙ্গিক মনে হয়। অথবা বাহুল্য হল বোধ করি। উপপ্লবকালই তো বিদ্বজনকে এবম্বিধ সচেতকের ভূমিকায় উপস্থিত হতে বাধ্য করেছে। তাঁদের শুনতে শুনতে যা মনে হচ্ছে, সে সব না হয় লিখেই ফেলি। ইবলিশের মতই না হয় হোক সে ভাবনার শব্দাবলী। প্রাপ্তি কি হবে, সত্যিই জানা নেই।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে স্বৈরতান্ত্রিক, একদলীয় বা বহুদলীয় গনতান্ত্রিক, যে ব্যবস্থার মধ্যে দিয়েই শাসনবয়বস্থা বহাল থাকুক না কেন, তাবৎ আয়োজনই যেহেতু ব্যক্তিমানুষকে নিয়ে, আমরা দেখেছি, তার মুখের ভাষাও কিন্তু রাজনীতির অন্যতম বোড়ে হয়ে উঠেছে বারবার। কখনো গুরুত্বহীন করে তোলার মধ্যে দিয়ে, কখনো বা রাজনীতিরই সংকীর্ন প্রয়োজনে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করে। আর এ সব যখন করা হয়েছে, ব্যক্তিসংখ্যা, বিভিন্ন পরিসংখ্যান ( যা বহুসময়েই ত্রুটিমুক্ত বলা যাবে না) ইত্যাদিকে গৃহীত সিদ্ধান্তের সপক্ষে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘সংস্কৃতি’ শব্দ তখন যথেচ্ছ ব্যবহৃত। সংস্কৃতি-র মেরুদন্ড যে ভাষা, সে সত্যকে পাঠানো হয়েছে অন্ধকারে, ‘মাতৃভাষা’ শব্দটিকে যত দূর সম্ভব করে তোলা হয়েছে অর্থহীন। সময়ের দাবী, প্রগতির প্রয়োজন, বিশ্বায়ন ইত্যাদির ভার বিশেষ বিশেষ ভৌগলিক অঞ্চলের আপামর জনমানসে চাপিয়ে দেওয়া হয় চমৎকার পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ কে করে তোলা হয় একপেশে, প্রচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বেচারী মানুষকে বোঝানো হয়, এই ধরাধামে আর্থিক পুষ্টির জন্য একটি বিশেষ ভাষা চর্চা তথা সেবন করাই বিধেয়, সর্বোত্তম। এ এক অনন্য মৌলবাদ।
ফলত, পরিচিত বিভিন্ন প্রকারের মৌলবাদ সম্পর্কে যখন মানুষ ভাবে, তার সামনে উপস্থিত হয় আরেক ভয়। ভাষা বা সাংস্কৃতিক মৌলবাদের ভয়। ঘটনাচক্রে দেখা হয়ে যায়, সংস্কৃতি, ভাষা, মাতৃভাষা - এমনতর শব্দ রাজনীতির কটাহে মশলারূপে কি চমৎকার ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ বিশেষ প্রকারের বিদ্যালয়ে দীর্ঘ হয় ভীড়, বিচিত্র বিঞ্জাপনে আচ্ছন্ন হয়ে যায় ক্ষেতিবাড়িবলদের পাশে বেঁচে থাকা মানুষ, তার মুখের ভাষা। কুয়োতলা একা একা আকাশ দেখে। নিকটদূরের মানুষেরা তার কাছে হয়ে পড়ে ক্রমশ অপরিচিত। তার ভাষা বোঝার মানুষ আর কই!
অথচ অতীতের দিকে যদি যাই, এই ভারতেও দেখা যাবে বৈচিত্রপূর্ণ বহুভাষিক সাংস্কৃতিক এক পরিমন্ডল। আসমুদ্রহিমাচল প্রতিটি জনপদ নিজস্ব ভাষাসংস্কৃতিঅর্থনীতি নিয়ে স্বগতিতে বহমান। সেখানে বিলুপ্তির যেন আশংকা নেই। হারিয়ে যাওয়ার কালো মেঘের ভয় নেই। সত্যিই, বহু বিচিত্র ফুলের সে বর্ণময় মালা সোনালী স্মৃতি কেবল।
আজো, প্রাকৃতিক নিয়মেই, পৃথিবীর সর্বত্র সেই মালা রয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, বিশেষত এই উপমহাদেশের মত উন্নতিশীল বা পৃথিবীর অনুন্নত দেশে আর বর্ণবৈচিত্র নেই, নিজস্বতা নেই। মায়ের ভাষা, পূর্বসূরীর চেতনাঐতিহ্য, যাপন-সব কিছুই বাহুল্য, অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। প্রকট কেবল বেঁচে থাকার জন্য বর্তমানের লড়াই। কিন্তু সে দৌড় নিজের সবটুকু হারিয়ে, বিনষ্ট করে! এমনটা কিন্তু সর্বত্র নয়। ভৌগলিক রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নির্বিশেষে এমন বিনষ্টি সেখানে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কেন? তবে কি সেখানে ‘জীবনযুদ্ধ’ অনুপস্থিত! নাকি প্রবল জাত্যাভিমান! আকাঙ্খার সম্পূর্ণ নিবৃত্তি কি ঘটেছে সেখানে! তা হলে কেন জাপান ইত্যাদি দেশে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা নিয়ে ভূমিপুত্রদের মমতাময় ইতিহাস সচেতন সংরক্ষণশীল মানসিকতা যখন ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে বিশ্বের সামনে, এই আমার স্বদেশে যেন তার অনেকটাই বিপরীত। তার মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মাতৃভাষার অর্থই বদলে যাচ্ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে। না কি কেবল আমাদের এই বদলে যাওয়া, অন্তরে বাহিরে, উভয়ত!
একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর নানাবিধ সংস্কার বিশ্বাস মূল্যবোধ যাপন নিয়েই সেই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। এর মধ্যেই একদিকে যেমন সংহত থাকে তাবৎ আহরিত ঞ্জান, বিশ্বাস এবং লোকাচার, অপরদিকে এই ধর্ম মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের দিকে, যোগ্যতর করে তুলতে এবং উত্তরপ্রজন্মের হাতে সেই অর্জন তুলে দিতে। সাধারণভাবে তা হলে বোধহয় বলাই যায়, একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে থেকে যায় ব্যক্তি তথা গোষ্ঠীগত মূল্যবোধ, প্রথা, প্রতিষ্ঠান, জীবন এবং মননের প্রয়োজনে নির্মিত শিল্পকর্ম। জীবনসম্পর্কিত যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ, সব কিছুই ধারণ করে মূল্যবোধ, যা কিনা সার্বিক সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত যাপন এবং মুল্যবোধ দীর্ঘ এবং নিশ্চিত এক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে সমাজে সঞ্চারিত হতে থাকে।
এ প্রসঙ্গে আমাদের দেশের কথায় ‘আত্মবিস্মৃত’ শব্দটি এসেই যায়। এসে পড়ে অশিক্ষা এবং অনীহাসঞ্জাত ইতিহাস সচেতনতার অভাবের কথা। আসে ধর্মযাজকদের একদা ভূমিকার কথা। দারিদ্র তাবৎ হেতুসমুহের অন্যতম, এ তথ্যও উঠে দাঁড়াতে পারে, পারে হাত তুলতে ভুল রাজনীতির দিকে। এ রকম এক একটি হেতুর সঙ্গে অপর ঘটনা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাই অতীতের কোন ঘটনাকে অস্বীকার না করে ঐতিহ্যসংস্কৃতিমাতৃভা ষা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বর্তমানের কেমন প্রবহমানতা বাঞ্ছিত, এ আলোচনা এবং তদনুসারী ব্যবস্থা গ্রহন অনতিবিলম্বে জরুরী।
একটু ফিরে যাওয়া যেতে পারে মানব ইতিহাসের প্রাচীন কয়েকটি বহু আলোচিত পৃষ্ঠায়। যেমন, মায়া, ইন্‌কা, মিশরীয়, রেডইন্ডিয়ান সভ্যতা। আজ এরা অতীত এবং বিস্মৃত। কিন্তু এতদূর অবধি পথ চলায় এদের ছায়া কি আমরা অস্বীকার করতে পারি? অথচ এরা যে হারিয়ে গেল, সে কি কেবল সময়ের প্রয়োজনে! তাই যদি সত্য হয়, তবে সে ‘কাল’ বহন করে এনেছিল কারা? মানুষ এনেছিল। আপেক্ষিকভাবে উন্নত কিছু মানুষ প্রাকৃত প্রয়োজনের তাগিদে মুছে দিল জনপদ, তার ঐতিহ্য, তার ভাষা। তার অস্তিত্ত্ব কোথাও কি আর দৃশ্য থাকলো! ঐ সকল সভ্যতারই অদূরদর্শী অথচ আপেক্ষিকভাবে অধিকতর সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের কিছু দায় কি ছিল না এই নিশ্চিহ্নকরনের প্রেক্ষাপটে? তাৎক্ষনিক কিছু চাহিদা তাদেরও কি প্ররোচিত করে নি ঐ কালের গহ্বরের দিকে হেঁটে যেতে? আমাদের মত বহুকথিত উন্নতিকামী দেশগুলিরও ‘উন্নত’ হওয়ার প্রয়োজনে এমন পরিণতির সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হচ্ছে কি?
কি ক্ষতি হয় এ প্রকার নিমজ্জনে? সময় তো গড়িয়ে চলেছে। প্রযুক্তির তীব্র আলোয়, বাজারায়নের আকুল আহ্বানে, উন্নততর পর্বে উন্নীত হওয়ার স্বপ্নে পৃথিবীর সমস্ত অনুন্নত অথবা উন্নতিশীল দেশ আজ মগ্ন। আমরাও। এগোচ্ছি আমরা সবাই। শুধু সে যাওয়ার পথে দাহ করে চলেছি পিছনের সেতুগুলি। আমরা বিস্মৃত হচ্ছি গতকাল, গত দশক, গত শতাব্দীর বৈচিত্রময় ইতিহাস। একটা ছাঁচে, একই ধাঁচে, একই প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হওয়ার জন্য জারী রয়েছে আমাদের আপ্রান সকরুণ প্রয়াস। কিন্তু শিকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে। এ কেমন পথ চলা!
এই হচ্ছে আমাদের এখন বেঁচে থাকা। একদিকে বহুভাষিক বিচিত্র পরিমন্ডলে ঐক্যময় এক বর্ণবহুল মানবসমাজের অতীত অস্তিত্ব, অপর দিকে এক ভাষার, এক সংস্কৃতির উন্নততম মানবসমাজ নির্মানের প্রয়াস। আত্মবিচ্ছেদ ঘটে যাবে না তো? এখনো কি নিজস্ব ভৌমতা সন্ধান আর ঐতিহ্যের শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে আগামী দিনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদী এক যাত্রা শুরু করার সময় হয় নি? এ ভাবেই তো ব্যক্তি সমাজ সভ্যতা পরস্পরকে করে তুলতে পারবে স্থিতিস্থাপক, সহনশীল। অবসানের আশঙ্কা অমূলক হবে। তার ভাষাসংস্কৃতি জায়মান পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন থাকবে। কেউ অপ্রয়োজনীয় বা বাহুল্য হয়ে পড়বে না কখনোই।
আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক উত্থানের ভিত্তিভূমি বহুভাষিক বৈচিত্র। অনেক পাশ্চাত্য ভাষার থেকেও ভারতের কিছু উপভাষায় অনেক বেশি মানুষ কথা বলেন। ভারতীয় ভাষাসমূহের মধ্যে পারস্পরিক পার্থক্য, অন্তত ব্যকরণগত এবং অর্থগত পর্যায়ে যথেষ্ট স্বল্প। এ দেশে প্রচলিত ভাষাসমূহের সর্বাধিক অস্তিত্ব এখনো পাওয়া যায় উঃপূঃ অংশে। এ অঞ্চলে এমন ‘উপজাতির ভাষা’- র সংখ্যা অন্তত ২১০। এইসব ভূমিতে প্রতিটি এলাকা বহুভাষিক এবং চার থেকে ত্রিশ শতাংশ মানুষ উপভাষায় স্বচ্ছন্দ। অসমে অন্তত দশ মিলিয়ন মানুষ অসমিয়া ভাষায় কথা বলেন। এই ভাষার সঙ্গে আধুনিক হিন্দি, বাংলা এবং ওড়িয়া ভাষার সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে অসমে আগত অহমিয়া মানুষ প্রাথমিকভাবে ‘থাই’ অভ্যস্ত থাকলেও সময়ের প্রয়োজনে অসমিয়া ভাষায় সাবলীল হয়ে ওঠেন। বাংলায় কথা বলেন অসমের প্রায় ১/৩ ভাগ মানুষ।
ত্রিপুরায় ভাষাগত দিক থেকে তিপেরা বা ত্রিপুরি উপজাতি বোড়ো। ত্রিপুরার ভাষা ককবরক। উচ্চারনগত দিক থেকে এই ভাষার সঙ্গে কাছারি বা গারোদের খুব মিল আছে। ঐতিহাসিক কারণে কিন্তু ত্রিপুরায় বাংলা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। এ অঞ্চলের প্রায় সমস্ত মানুষ বাংলাভাষী। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বললে বোধহয় আর বাহুল্য হবে না। উঃপূঃ ভারতের সর্বত্র বহুলপ্রচলিত একটি ভাষা হচ্ছে বাংলা।
নাগাল্যান্ডের মত একটি ছোট্ট প্রদেশে অন্তত কুড়িটি উপভাষা এখনো জীবন্ত। নিজেদের লিপি না থাকায় ব্যবহৃত হয় রোমান লিপি। এ ব্যতীত হিন্দি, বাংলা, অসমিয়া, মালয়ালম, ওড়িয়া, পাঞ্জাবী, নেপালি, মণিপুরি আর উর্দু ভাষাও সমাদৃত।
এই সামগ্রিক মানবগোষ্টী সার্বিক উন্নয়ণের সহভাগী। সেটাই কাঙ্খিত। কিন্তু নিজস্ব ভাষা বা সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে নয়। লোকাচার, লোকসংস্কৃতির সঙ্গে মাতৃভাষার নিগূঢ় সম্পর্কের ফলে একে অপরকে পুষ্ট করে চলে। সেখানে যদি মাতৃভাষা গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে, এক প্রায়অপরিচিত ভাষাতেই যদি আহরণ করতে হয় বেঁচে থাকার ক্ষুদকুঁড়ো, শিশুমুখে যদি মাতৃভাষা হয়ে ওঠে ব্রাত্য, তবে সে পরিণতি তো ভয়ংকর!
একটা ভাষা যখন কোন একটি ওষ্ঠেও আর উচ্চারিত হয় না, সে ভাষার তো মৃত্যু ঘটে যায়। ভাষাগত সংযুক্তি চূড়ান্ত পযায়ে পৌঁছলে এ ধরণের ঘটনা ঘটে। অবশ্য এও দেখা গেছে যে, অবস্থাবিশেষে ভাষামৃত্যুর কারণ অন্য হতে পারে। যেমন, আকস্মিক ভাষামৃত্যু। অর্থাৎ বিশেষ ভাষার একটি গোষ্ঠী সমূলে হয়ত বিনষ্ট হল আগ্রাসন বা অন্য হেতুতে। আবার রাজনৈতিক উৎপীড়ন বা গণহত্যার মত ঘটনায় একটি ভাষার ব্যবহারই হয়ত সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী বন্ধ করে দিল আত্মরক্ষার তাগিদেই। সেক্ষেত্রে ঘটে যায় মৌলিক ভাষামৃত্যু। ‘আত্মরক্ষার প্রয়োজনে’ দক্ষিণ-পূর্ব ওড়িশার পাহাড় জঙ্গলে মহানদীর দক্ষিণে অধিবাসী কন্ড-দের ক্ষেত্রে প্রায় এ রকমই ঘটেছিল।
আমাদের ক্ষেত্রে প্রথম পরিস্থিতি কি আশঙ্কা করব?
তাৎক্ষণিক কোন প্রতিক্রিয়া অদৃশ্য থাকলেও মাতৃভাষার জন্য, শিকড়ের খোঁজে ব্যক্তিমানুষের আবেগ কিন্তু দীর্ঘকাল রুদ্ধ থাকে না। এক দিকে এই আবেগ যেমন তৈরি করে বিচ্ছিন্নতাবোধ, অপর দিকে জমে উঠতে থাকে এ প্রকার পরিস্থিতির হেতুসমূহের প্রতি ক্রোধ। এই ক্রোধ বহু সময়েই আর স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধির আয়ত্ত্বাধীন থাকে না। এখানে উঠে আসতে পারে উঃপূঃ ভারতের বৈচিত্রময় ভাষিক সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির সম্ভাবনা। মনে পড়েই সময়ান্তরে ঘটে যাওয়া বাংলাভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের কথা। দেশকালনির্বিশেষে ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখি, হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক থেকেই উদ্ভূত অভিমান পরিবর্তিত হয় একটা জাতির রোষে। মাতৃভাষাকে, মুখের ভাষাকে অবহেলা করার, অপমান করার যে প্রচেষ্টা, তাকে প্রতিহত করা এবং মাতৃভাষাকে স্বভূমিতে প্রতিষ্টিত করা। সংখ্যাগরিষ্ঠের মুখের ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়া ছিল অন্যতম দাবী। সময়ের চাহিদায় আরো কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় জড়িত হয়েছিল সে আন্দোলনে। সে ইতিহাস অশ্রুর, অভূত অত্যাচারের, তথাপি বড় গর্বের।
বাংলাভাষার জন্য এই অনতীত আন্দোলনে অন্য কোন মাতৃভাষাকে অবহেলা করার কোন লক্ষ্য কিন্তু ছিল না। এটাই তো সুবিবেচনা। আমি আমার মাতৃভাষাকে লালন করব ব্যক্তিজীবনে, সামাজিক জীবনে। কিন্তু তার অর্থ তো এই নয় যে, আমাদের ভালবাসা অন্য ভাষা বিষয়ে হয়ে পড়বে শ্রদ্ধাহীন। যাই হোক, আমাদের সামনে এখন শিলচর কাছার বাংলাদেশ অনির্বাণ আলোকস্তম্ভ।
কিন্তু এ তো প্রত্যক্ষ কারণের ফলশ্রুতি। যদি ক্ষয়টা শুরু হয় ভিতর থেকেই! যদি সমাজের আলোকপ্রাপ্ত সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর মানুষ নিজেরাই হারিয়ে ফেলতে চায় নিজের মাতৃভাষাকে, নিজের সংস্কৃতিকে, ঐতিহ্যকে, নিজস্ব আত্মপরিচয়কে! জীবনের দৌড়ে টিকে থাকার অভিপ্রায়ে। সেটাই তো ঘটে চলেছে বাংলাভাষার ক্ষেত্রে। ‘আ মরি বাংলাভাষা’ এই প্রদেশে হয়ে উঠছে ক্রমশ এক ভুলে যাওয়ার ভাষা। পাঠ্যের বাধ্যতামূলক সীমিত পরিসরের বাইরে পঃবঙ্গে বাংলাভাষীর কাছে আজ বাংলা-র ব্যবহার কত টুকু প্রাণের টানে? ভাষাকর্মী ব্যতিরেকে কত সংখ্যক বাঙালী আজ এই ভাষাকে আদরণীয় মনে করছেন? আর করবেনই বা কেন! বেঁচে থাকার যে কোন প্রয়োজনে অন্য ভাষার ব্যবহার যদি সর্বজনগ্রাহ্য হয়, তবে কেবল ‘মাতৃভাষা’র শিরোপা পরিয়ে বাঙলাভাষার উজ্জীবন কতদূর সম্ভব? বারবার এসেই যাবে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ। উচ্চশিক্ষায়, উন্নততর প্রযুক্তি, কারিগরি বা স্বাস্থ্যপরিষেবায়, শিল্পচর্চায়, অর্থনীতিতে মাতৃভাষার যথার্থ ব্যবহারের সদর্থক প্রয়াস তাঁদের আজ দৃষ্টান্ত। বাংলা ভাষাকে তাঁরা জড়ত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন, স্থিতিস্থাপক করেছেন, করেছেন সময়োপযোগী। বাংলাভাষার ব্যবহারে সেখানে পর্বান্তর ঘটেছে। আর আমাদের এখানে? এই বাংলায় ন্যূনতম যে কোন প্রয়োজনেই বাংলার আজ বড় অনাদর। গ্রামগ্রামান্তরে তাবৎ যোগাযোগের মাধ্যমকে আমরা সহজলভ্য করতে সক্ষম হয়েছি। বিশ্ব এখন মাউসে। কিন্তু সে সব পরিচিতির সিংহভাগই তো ঘটছে অন্য ভাষায়। আন্তর্জাতিক ভাষায় আমরা সাবলীল হচ্ছি, শুধু সবটুকু জড়তা আমাদের মাতৃভাষায়। সে দায় কি এই সমাজের আলোকপ্রাপ্ত মানুষেরা নেবেন না? বিভিন্ন পাঠ্যবিষয়ে ঞ্জানভান্ডারের যে পৃথিবী বিশ্বায়নেরই কল্যাণে আজ অনিবার, তার মাধ্যম বাংলায় কি অসম্ভব? পন্ডিতজন বলবেন। অফিস আদালতে বাংলাভাষার ব্যবহার করতে হবে, এমন বিধি আছে। কিন্তু সে বিধি অগ্রাহ্য করার মধ্যে যে আভিজাত্য, গ্রাহ্য করার কি তার সামান্যতম আকুলতা আছে? নতুন প্রজন্মের জন্য আমরা বাংলাভাষার সম্ভার কতটুকু তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছি? কোন মাধ্যমেই বাংলাভাষায় তাদের জন্য আকর্ষনীয় কিছু উপস্থাপন করা যায় নি আজো। ভারতের তাবৎ ভাষার শিল্পসাহিত্যের উন্নত অনুবাদ বাংলায় যেমন কাঙ্খিত, অপরদিকে বাংলাভাষার ক্ষেত্রেও তদনুরূপ তৎপরতা প্রার্থিত। অনুবাদকর্মকে দ্বিতীয় শ্রেণীর গোত্রে বিবেচনা করা ভুল হবে। অন্যসিকে গ্রামীণ ভাষার, সাধারণের মুখের ভাষার উত্তরণ তেমন ঘটল না সাহিত্যে, পাঠ্যবিষয়ে। এখানেও তৈরি হল দূরত্ব। আমি গ্রামের মানুষ। যে ভাষায় বাপ্‌পিতাম’র সাথে কথা বললাম, লেখাপড়া করতে গিয়ে তার কোন হদিশ তো পেলামই না, রুটি রোজগারের লড়াইয়ে নেমেও সেই একই অভিঞ্জতা! জানলাম, আমার ভাষা একটুও কাজের ভাষা নয়। তা যতই বাংলা হোক না কেন। এ ভাবেও তৈরি হচ্ছে অনিবায অথচ অনভিপ্রেত এক বিচ্ছিন্নতা।
বহুকথিত ‘ভাষাপুলিশ’ এ সংকটে কি করবেন? সমস্যা তো তাৎক্ষনিক বা অপরাধমূলক নয়! বহিরঙ্গের কিছু পরিবর্তন হয়ত তাদের পক্ষে ঘটানো সম্ভব, কিন্তু আদ্যন্ত দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটানো কি তাদের পক্ষে সম্ভব! এখনো যদি মনে হয়, আমাদের ভাষা বিপন্ন, আমাদের সংস্কৃতি আহত, তবে মনে হয় ভিতরেবাইরে, দু দিক থেকেই চাপ তৈরি করতে হবে। ভিতর থেকে চাপ তৈরি করতে হবে ধীরে, সুবিবেচনায়, সহনশীলতায়। সুধীজনের সুচিন্তিত পরামর্শে বাংলাভাষাকে করতে হবে স্থিতিস্থাপক। বানানবিধির সরলীকরণ প্রয়োজন কিনা, ভাবতে হবে। লোকশিল্প, লোকাচার, লোকগান, লোককথা, লোকভাষা সংরক্ষণ, তার যথোপযুক্ত ব্যবহার বহু গুণীজনের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ নিছকই সাময়িক বিনোদন। আর কত অপেক্ষা! সামাজিক জীবনে বাংলাভাষা আর কত অন্ত্যজ হয়ে থাকবে! পাঠ্যবিষয়ে, জীবিকা অর্জনে বাংলাভাষাকে যথোচিত মযাদা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা আশু প্রয়োজন। একজন বাঙালী বহু ভাষায় পারদর্শী হতেই পারেন, কিন্তু বাঙালীর প্রথম শর্ত হোক মাতৃভাষায় সর্বতো ভাববিনিময়। আর বাইরে থেকে, সমস্ত অফিস আদালতে, বিপণি, প্রচারে বাংলাভাষার প্রাধান্য হোক প্রশ্নাতীত। প্রয়োজনে অন্য ভাষার ব্যবহার হতেই পারে, তবে বাংলা পাবে অগ্রাধিকার।
এই বঙ্গের বাইরে বাংলাভাষী মানুষ চরম বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে মাতৃভাষাকে, নিজস্ব সংস্কৃতিকে যে মমতায় লালন করেন, তার আবেগের উষ্ণতা কি এই বঙ্গের মানুষকে নাড়া দেয়! এখনো, বিরল হয়ে উঠলেও, এই বঙ্গে সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠানে বাঙালীসুলভ পোষাক পরিধান করা হয় বটে, ২৫শে বৈশাখ উল্লাসে উদ্‌যাপিত হয়, ২১শে ফেব্রুয়ারী ঘটা করে বাংলা চর্চা করা হয়, কিন্তু সে যেন একান্তই মোড়ক। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলাই যায়, কোনটাই তার স্বভাবের অন্তর্গত হতে পারে নি। দ্বিচারিতায় আমরা আজ এতটাই সাবলীল।
এই বিচ্ছিন্নতা দূর করার জন্য, বাঙালীর সংস্কৃতিকে হৃদয়ে গ্রহণ করার জন্য, ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় স্মৃতি উত্তরপ্রজন্মের যাপনে সঞ্চারিত করার উদ্দেশ্যে নিরন্তর আলোচনা হোক সমস্ত স্তরে। সব ধরণের উন্নাসিকতাকে দূরে সরিয়ে।
এ যাবৎ ভাষা আন্দোলনের ঋত্বিকদের জন্য নিবেদিত হোক যথার্থ শ্রদ্ধা। কিন্তু বিশেষ কোন দিনে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতি আয়োজনে, সব বিনিময়ে আমাদের স্মরণে থাকুক বাংলা। সে পথেই হবে তাঁদের প্রতি, মাতৃভাষার প্রতি আমাদের প্রণাম।