কথা বলা

শামীম আজাদ


বেঁচে থাকার কালে ভাষা প্রবাহে শূন্যস্থান বলে কিছু থাকে না। যাহা পাওয়া যায় তাহাই খাদ্য, নিঃশ্বাস, তেল ও তরল। যা পারা যায় তা নিয়ে টিকে থাকাই কথা। কিন্তু মোক্ষ তাহাই যাহা পরীক্ষিত সংযোগ সফল, প্রাকৃত কিন্তু নিশ্চিত, সুগম্য এবং সংযোগ সফল। তাহাই একক।ভাষা সমভাষীদের মধ্যে হাঁটে এভাবেই। কারণ জনে জনে তা বিবিধ। তুলাদন্ডে এক করা যায় না।কিন্তু মানুষ নিজ গরজেই এ প্রাকৃত ধারা অব্যাহত রাখে।
দায়িত্ব সমূহের, সকলের, গনজনের। এ জনগনেরই ভাষা।

আমাদের যে প্রাকৃত বাংলা বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অংশে তারও নানা রূপ আছে । সংস্কৃতের যুগে যেমন ভিন্ন ভিন্ন রূপ ছিল তেমনি। সে প্রাকৃতই প্রচলিত ছিল। এখন সে প্রাকৃতেরই একটা বিশেষ প্রাকৃত চলেছে আমাদের দেশের ছাপা ও বৈদূতিনে। যা কিনা বলা,শোনা, লেখা ও পড়া নির্ভর অর্থাৎ ভাষা বিদ্যায় ‘ভাষা’ বলতে যা বোঝায় এ তাই।

ব্যাক্তিগত ভাবে পঁচিশ বছর আমার দেহ মূলত থাকছে বিদেশে কিন্তু বাকি সময় দেশে। জীবদেহ বিদেশে হলেও মনোদেহ মূলত থাকে বাংলাদেশে আর স্বল্প সময় দেশে। দেশের যোগাযোগ ধরে রেখেছি প্রাকৃত আর প্রমিতে। লিখতে প্রমিত। বলতে প্রাকৃত। বিদেশেও তাই। কিন্তু সারাক্ষনই মনে মনে, বাইরে ও ভেতরে বলে চ্লছি এক বাংলাভাষা। তবে এই থাকা না থাকার কালে আমার ভাষার মধ্যে যা কিছু শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল তা ডায়াস্পোরার কুটো, কষ, ফুল, ফসফরাস, লেগুন ও লবঙ্গে ভরেছে। ‘শোনা’ থেকেই যেহেতু মানবের বলা। তারপর লেখা। আর নিজের লেখা থেকে পড়তে গিয়ে দেখি আমার প্রয়োজনের নিমিত্তেই আমার ‘বলা’ হয়েছে প্রভাবিত। কিন্তু আমার পরিষ্কার বোঝা হয়ে গেছে যে আমার কিছু লুটও হয়ে গেছে। আর এ লুটপাটের প্রক্রিয়া পরিব্যপ্ত ছিল দীর্ঘ সময় ধরে তাই তার প্রতিফল বুঝতে পারলাম এবার দেশে এসে একটু দীর্ঘ সময় অবস্থানের পর। যেমন দৌড়ে থাকলে পাশের কিছু দেখা যায় না- দম নিলে যায়।

দেখলাম শুধু আমি না ইথারে ইথারে স্নায়ু অবসকরা শব্দ শুনে শুনে ‘বলা’ বদলে গেছে আমাদের দেশের মানুষের। ভাষাতো পোশাকের মত, তার পকেটে পাথর ভরলে হাঁটা যায় না। বরং হাওয়ার ফুল এখানে অনায়াস। আর তাই সে ফুল গুঁজে দিয়ে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের এই প্রজন্মের সম্পৎ। এ কেমন জামা যে জানাজা থেকে জানজট, নাটক থেকে নৃত্য, সাংসদ থেকে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, বক্তৃতা থেকে বংগভবন! সব এক? একি আলামত! হা প্রমিত! কোথায় গেলে মা? উচ্চারণ ক্ষয়, দেশের মানুষের ভাষার এই লয়, উপায় কি?

আধুনিক বাংলাসাহিত্যে প্রাকৃতের এই স্বভাব নিয়ে লেখকেরই প্রধান বিপদ। তারতো লিখতে হয়। আর তিনি যা লিখেন তাই সবাই পড়ে। আর পড়ে পড়েই ভাষা বেছে নেন অনেকেই। মনে করি তারই দায়িত্ব বেশি। তার লেখা থেকেইতো নাটক, চলচ্চিত্র, গান। কিন্তু তাকেই চলতি বাংলা চলতি বলেই সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা নয় বলেই উচ্চারণে এবং বাক্যব্যবহারে তা পোশাকের মতই স্থান ও পরিবেশ রক্ষা কল্পে তা ব্যবহার করতে হবে। কারো দিকে আংগুল নির্দেশ করার আমি কে? আমি নিজের দায়িত্বই নিচ্ছি। যা লুট হয়েছে তা নতুন নির্মান করছি আর মৌখিক ভাষার বেলায় নিজের কানকেই করছি কলিজা। তাই কাওরান বাজারে যেতে বেছে নিচ্ছি এমন ভাষার পোশাক যেখানে যাদের সঙ্গে কারবার তাদের কাছ থেকে আমাকে না বিশ্লিষ্ট করা যায়। এ নিয়ে আমাদের একজনের সঙ্গে আর-একজনের মিল না থাকতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বুঝেই ভাষার প্রায়োগিক রূপ নিশ্চিত করার কথাটা অস্বীকার করা যায় না। কারণ এই শোনা থেকে বলা, বলা থেকে লেখা ও লেখা থেকে পড়া এবং আবার তা থেকেই বলা। এই চক্র থেকেই তো ভাষা সাহিত্যে আশ্রয় নেয়। এবং তাকে নিয়ে এলোমেলো ব্যবহারে মহা ক্ষতির আশঙ্কা আছে। বিব্রত না হয়ে বিক্ষিপ্ত না হয়ে ভাষার এই পথগুলিকে একটি পথে মিলিয়ে নেবার কাজ করবার কথা মনে করবার মাস এটি। আসুন তাই করি।