সাম্প্রতিক সাহিত্যের ভাষা

সরদার ফারুক


আমাদের সাম্প্রতিক কবিতা ও গদ্যে একধরণের অদ্ভুত ভাষা কিছুদিন ধরে দেখছি--অনেকটা গুরুচণ্ডালী ভাষা । প্রচলিত প্রমিত ভাষার মাঝখানে সাধুভাষার ক্রিয়াপদ অথবা আরবি/ফার্সি/আঞ্চলিক শব্দ ঢুকিয়ে আসলে কী করতে চাওয়া হচ্ছে, বোঝা মুশকিল ! এটাই কি সেই ‘ ভাষাকে আক্রমণ করা ’ ?
যেমন ধরা যাক প্রবন্ধে - “ জ্ঞানতাত্ত্বিক বিষয়ে আপনের লগে একটা বাহাস করবার চাইতেছি …ইত্যাদি ”

অথবা কবিতায়-
“ তোমার বাড়ির দিকে যাইতে যাইতে হয়রান হয়া
শুনতেছি যৌনপাথরের গান … ইত্যাদি ।”

এই ভাষায় যারা লিখছেন না , ধরে নেয়া হচ্ছে ,তারা গোবিন্দচন্দ্র দাস অথবা বন্দে আলী মিয়ার আমলের ।
তো অনেক অনুসন্ধানে জানলাম ,একদল নব্য ভাষাতাত্ত্বিক( রাজনীতিক?) এই ভাষার পথিকৃৎ । তাদের যুক্তি , “ কলকাতার দাদাদের প্রমিত ভাষা আমরা কেন অনুসরণ করবো? আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ, এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান, তাই আমাদের ভাষাও হবে আলাদা ।”

বেশ কথা ।তবু আমার মনের সংশয় আর কাটে না ।প্রমিত ভাষাটি, যদ্দুর জানি, নদীয়া-শান্তিপুর অঞ্চলের -কলকাতার নয় ।আর নদীয়ার বড়ো একটা অংশই বিভাগ-পরবর্তীকালের কুষ্টিয়া জেলার মধ্যে পড়েছে । আমার ধারণায় কুষ্টিয়া ছিলো নদীয়ার জেলার হৃৎপিণ্ডস্বরূপ। এখানেই লালন ,গগণ হরকরা, কাঙাল হরিনাথ এবং মীর মোশাররফ হোসেনের বাড়ি । শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লীলাভূমি ।
সেক্ষেত্রে প্রমিত ভাষাটিকে কুষ্টিয়া অঞ্চলের ভাষা বলতে আপত্তি কোথায়?বৃহত্তর খুলনা থেকে শুরু হয়ে যশোর এবং পাবনা অঞ্চল পর্যন্ত এই ভাষার সন্ধান পাওয়া যায়

আঞ্চলিক ভাষায় অবশ্যই সাহিত্য রচিত হতে পারে , পাশাপাশি সারাদেশের মানুষের বোধগম্যতার জন্য একটি প্রমিত ভাষাও থাকা জরুরী ।কিন্তু নব্য পণ্ডিতদের এই ভাষা কোন্ অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা ? সাহিত্যের ভাষা হিসাবে ঢাকার কুট্টি এবং বস্তিবাসীর বারোমিশালি স্ল্যাং-প্রধান ভাষাকে কতোখানি গ্রহনযোগ্য করা যাবে?
নাটক - গল্প - উপন্যাসের সংলাপে আঞ্চলিক ভাষার সার্থক ব্যবহার অনেক আগে থেকেই ছিলো । মাইকেল মধুসূদনের ‘ বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ অথবা ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ নাটকে আমরা এর প্রমান পেয়েছি । সেলিম আল দীনের ‘ হাত হদাই’ ও এক সার্থক সৃষ্টি । হাসান আজিজুল হক তাঁর ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসটির পুরোটাই আঞ্চলিক ভাষায় লিখেছেন । সৈয়দ শামসুল হকের ‘নুরলদীনের সারাজীবন’ নাটক অথবা ‘পরাণের গহিন ভিতর’ শীর্ষক কবিতাগুচ্ছে বিশুদ্ধ আঞ্চলিক ভাষার অনবদ্য ব্যবহার আমাদের মুগ্ধ করে ।
কিন্তু অধুনার কিছু টেলিভিশন নাটক এবং সিনেমায় যে ভাষার ব্যবহার দেখি তা শুধু শ্রুতিকেই পীড়া দেয় ।সাহিত্যের ভাষাকে মুখের ভাষার কাছে নিয়ে যাওয়াটা খুবই দরকার ,কিন্তু কার বা কাদের মুখের ভাষা ?একধরণের চাপিয়ে দেওয়া উদ্ভট ভাষার চাপে আজ রুচির দুর্ভিক্ষই প্রকট হয়ে উঠছে । ভাষা এক সামাজিক চুক্তি । অল্প কিছু উন্নাসিকের ব্যবহার্য ভাষা কি সর্বসাধারণের বা জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশের অনুমোদন পেয়েছে ?

ভাষা বদলায় ,ভাষার নিয়মেই বদলায় ।কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর এই উদ্যোগ দেখে মনে হয়, এর পেছনেও উদ্দেশ্য আছে - রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ।
পাকিস্তান আমলে এই ভাষাকেই ধ্বংস করার প্রয়াস নেয়া হয়েছিলো ,আবারও আঘাতটা সেখানেই ?